বাবা ডাক্তারকাকাকে বাধা দিয়েই যাচ্ছেন – অপারেশন পিজি হাসপাতালেই হতে হবে। নিজ দেশের ডাক্তারদের একান্ত যত্নে তার কোনো রকম ক্ষতি হবে না। ডাক্তারদের উপর তার প্রবল আস্থা।
ডাক্তার না হয় আছে, দরকারি ইনস্ট্রুমেন্টের অভাব তো অস্বীকার করা যাবে না। দক্ষ-ভালো ডাক্তারের হাত যশে সেই সমস্যা মিটবে না। প্রয়োজনীয় সুবিধাদি পিজিতে কোথায়!
নূরুলকাকা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা তাকে বিশেষভাবে বোঝালেন। অনুরোধ করলেন।
বাস্তব সমস্যাকে তো মানতেই হবে।
আব্বুকে অনেক কষ্টে কাঠখড় পুড়িয়ে সম্মত করা হলো।
চারপাঁচদিন পর নিমরাজী বাবা লন্ডন যান চিকিৎসার জন্য। যখন ঝুঁকিমুক্ত সফল অপারেশনের খবর দেশে এলো, মা তখন নফল নামাজের জায়নামাজে। এরপর গত বছরও আব্বা শ্বাসনালীর সমস্যায় ভুগলেন। এবার বড় ধরনের ফাঁড়া কেটেছে।
অক্লান্ত পরিশ্রম, বিশ্রাম নেবার কোন নাম নেই। কেবলি কাজ কাজ কাজ। বাংলার মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যের টান সব সময় তাকে চুম্বকের মতো টানছে।
নূরুলকাকা তাকে যতোই একান্ত দরকারি বিশ্রামটুকুর কথা বলেন, তিনি কানেই তোলেন না।
খুব সম্ভব কুমিল্লায় মার্শাল কুচকাওয়াজ ও মহড়ার লম্বা সেশন ছিল। সেদিন সেখান থেকে ফিরেই হঠাৎ বিছানায়। নাক থেকে রক্ত ঝরছিল। তা দেখে সবাই খুব ব্যাকুল হয়ে পড়ল। রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছিল না। নূরুলকাকা যথারীতি ছুটে এলেন। ভালো করে দেখে বললেন, শ্বাসনালীতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
তিনি জানালেন, কুমিল্লায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে ধুলোবালির মধ্যে থেকেছেন। এই ধকল শরীর সইতে পারছে না একদম। আবার বেশ কিছু দরকারি মেডিক্যাল টেস্ট হলো। ডাক্তাররা বললেন, ফুসফুসে ক্ষত তৈরি হয়েছে। ওই ক্ষত সারিয়ে তুলতে ওষুধপত্র দেয়া হলো। দুই তিন দিন গেল। ওষুধে বিশেষ কোনো নিরাময় হচ্ছে বলে মনে হলো না। রক্ত ঝরা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
বাবা অসুস্থ। সবার মন খারাপ। হাসু তার পাশে পাশেই আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাতাস করছে। কন্যার শুশ্রুষায় সব সময় বাবার চোখে মুখে দেখা গেছে পরম আরাম। সেই চিরাচরিত দৃশ্য। অসম্ভব সহ্য ক্ষমতা আব্বুর। কন্যার যত্নে রক্তরক্ষণ বন্ধ হওয়ার কথা নয়। তিনি খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। তার মুখ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। একটু শুয়ে থাকা, সামান্য বিশ্রাম, একটু সেবাতেই খুব সন্তুষ্ট। কিন্তু হাসুদের উদ্বেগ বাড়ছেই। আম্মা দুশ্চিন্তায় একদম নির্ঘুম। কী না কী হয়ে যায়। একে ফুসফুসের ক্ষত, তার উপর রক্ত পড়ছেই। বাবার দুশ্চিন্তার কোনো নাম নেই। তার মুখ অমলিন। মা বক বক করছেন, নিজের ব্যাপারে তোর বাবার কি একটুও খেয়াল হবে না? সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি। তার ভালোমন্দের আমি ঠেকা নিয়েছি নাকি!
বেদনা সত্ত্বেও বাবা হাসেন। হাসুও অনুযোগ করে, এতটা খামখেয়ালিপনা তোমার একদম ঠিক নয়।
আব্বুর সেই আত্মভোলা, ভুবন ভোলানো স্মিত হাসি সবসময় চোখের সামনে দেখতে পায় হাসু – তুই যত্ন করছিস, এই তো বেশ আরাম পাচ্ছি – দেখবি ওষুধে ঠিক ধরে যাবে।
না, ওষুধে একদমই ধরলো না। বিশেষজ্ঞরা তাকে নিয়মিত দেখছেন। উন্নতির কোনো লক্ষণ না দেখে তারা বললেন, এ জন্য মডার্ন টেকনোলজির জটিল এক অপারেশন দরকার।
আবার অস্ত্রোপচার। আর অস্ত্রোপচার মানেই উদ্বেগ আশংকা।
ডাক্তাররা জানালেন, আর এই অস্ত্রোপচার হবে বেশ সূক্ষ্ম। একটি বিশেষ যন্ত্র আব্বুর শ্বাসনালী দিয়ে ঢুকিয়ে অপারেশন করতে হবে। এছাড়া ফুসফুসের ওই ক্ষত সারানোর দ্বিতীয় পথ নেই।
ভালো কথা। নূরুলকাকা আব্বাকে বিশেষভাবে বোঝালেন। রাজিও হলেন তিনি। কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র। দেশে ওই সূক্ষ্ম অপারেশনের যন্ত্র নেই। তদুপরি-অপারেশন করবেন এমন কোনো সার্জন নেই। এজন্যে বিদেশে না গিয়ে উপায় নেই। পরিস্থিতি সঙ্গীন।
চিকিৎসকরা নিরুপায়।
আব্বা সরল শিশুর মতোই বললেন, বিদেশে তিনি যাবেন না। গরীব দেশের টাকায় তিনি বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা নিতে রাজি নন। চিকিৎসা যাই হোক – দেশের মাটিতে হওয়া চাই। তিনি একটু ক্ষুব্ধও – যন্ত্রপাতি, সার্জন নেই বলে। কেনো তার দেশে ওই রকম সার্জন তৈরি হলো না! কী মুশকিল। রাতারাতি কোত্থেকে সার্জন তৈরি হবে! পশ্চিমাদের নানা ষড়যন্ত্রে অনেক কিছুই হয়ে ওঠা হয়নি বাঙ্গালিদের। এমন আত্মাভিমানী মানুষটাকে কে বোঝায়? কার সাধ্যি।
নূরুলকাকাও বোঝালেন। বললেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে। পরাধীন দেশে অনেক কিছু হয়নি। এবার সার্জনও তৈরি হবে। চিকিৎসা সরঞ্জামও আনা হবে।
কে শোনে কার কথা।
সতেরই মার্চ বাবার জন্মদিন। তিনি চুয়ান্নতে পড়লেন। জন্মদিনের আড়ম্বর, আনুষ্ঠানিকতা আব্বার একদম অপছন্দ। এবার রক্তক্ষরণে শয্যাশায়ী। কোটি কোটি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত মানুষটির জন্য সবার দোয়া চাইল হাসুরা। বাবা যতই আপত্তি করুক, মানুষ তা মানবে কেনো! ফুল এলো। অজস্র ফুল। ভক্তি ভালবাসা শ্রদ্ধায়। বাবা অসুস্থ বিছানায় জেনে সবাই সেদিন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, সবার মন খারাপ। বাবাকে এক নজর দেখতে ভক্তদের সেকি আকুলতা। অথচ কি নিষ্ঠুর নিয়তি। ওদিনই বাবা পেলেন আশ্চর্য দুঃসংবাদ। পল্টন ময়দানে জনসভা ডেকেছিল জাসদ। সেখানে মেজর জলিল হুমকি দিলো বাবাকে উৎখাতের। এমন কি মার্শাল টেররিজম করতেও পিছপা হলো না। সে অবলীলায় বললো, পাকিস্তান ফেরত সেনা অফিসাররা তার সঙ্গে। তারা তার সমর্থক। তাদেরকে নিয়ে অস্ত্রবলে মুজিবকে উৎপাটন করে ছাড়বে সে।
হাসুরা যতই বাবার কাছেপিঠে থাকে; মাথার কাছে কত লোক আসছে যাচ্ছে। চারপাশের খবর-অখবর বাবার কানে আসছে। দেশের তিনি প্রেসিডেন্ট। জাতির পিতা। কিন্তু বিন্দুমাত্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপ তার পছন্দ নয়।
তিনি সর্বদা থাকতে চান পাখির মতো মুক্ত।
পাহারা টাহারা দিয়ে কী হবে। এই যে কোটি কোটি মানুষের প্রাণের ভালবাসা। এর চেয়ে কঠিন পাহারা আর হয় কি!
কেউ তাকে আঘাত করবে, সেই ভয়ে তার জন্য কী পাহারা, নজরদারি, নিরাপত্তা। কে আঘাত করবে তাকে! সবাই যে তার ভাই-বেরাদার-পরমাত্মীয়। তারপরও তার অজান্তে পেছন থেকে কেউ যদি তাকে আঘাত করে করুক, তিনি নির্ভিক। কিন্তু তিনি বাঙালির সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকতে পারবেন না।
এইরকম মানুষ-ভোলা, আত্মভোলার যা হয়! তাকে ঘিরে ভক্তদের ভিড় আছেই।
তাকে উৎখাত-উৎপাটনের জঙ্গী হুমকি শুনে রুষ্ট হননি মোটেই। তার মুখে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ কিস্যুটি দেখা গেল না। ওরা ওরকম একটু বলবেই। হয়তো যা চেয়েছিল; দিতে পারেননি তাকে। সম্পদ নেই অঢেল। অথচ সকলের সবকিছু চাই। অঢেল চাই। সবাইকে সীমিত সম্পদ দিয়ে কেমন করে খুশি করা সম্ভব? এই জন্য আগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সম্পদ তৈরি করতে হবে। মানব সম্পদ, মাটির নীচের সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে। কৃষি বিপ্লব চাই। সবুজ বিপ্লব। তারপর সবাই মিলে সুখকে ভাগ করে নিতে হবে। সেজন্য পাঁচদশটা বছর সময় তো চাই। কে শোনে কার কথা। সবাই অস্থির। সকলের জলদি জলদি সব চাই।
হাসুকে বলেন বাবা-
মা রে, আমি সেই কবে থেকে ছুটি চাই। টুঙ্গীপাড়ায় গিয়ে নেবো বিশ্রাম। বাইগার নদীর পাড়ে বাকি জীবন কাটাবো। পাখপাখালী, গাছপালার সঙ্গে থাকবো।
গাছতলায় পাটি পেতে শুয়ে শিশুদের কন্ঠে সোনার বাংলাকে ভালবাসার শপথ শুনবো। শিশু ও পাখির কলকাকলি শুনবো। ধনে ধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদেরই বসুন্ধরা। সবাই আনন্দচিত্তে গাইবে।
কী আশ্চর্য বাবার এই আকাঙ্ক্ষা। তিনি ছুটি নিতে চাইছেন। তার সোনালি গ্রাম, তার নদী, তার পাখপাখালি, গাছপালা, টুনি খাল, আকাশ ফুঁড়ে ছুটে চলা বিস্তীর্ণ ফসল ক্ষেত, কিষাণ মজুর-মানুষজন, সারা বাংলা থেকেই তাকে ডাকছে। বাবা যখন এই আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন, হাসু দেখেছে – মানুষ ও প্রকৃতির জন্য তখন তীব্র উন্মুখ হয়ে পড়েছেন তিনি। বাইগার নদীর তীরের শস্য-শ্যামলা ঠাঁই ঠিকানার লোক তিনি। সেই ঠিকানাতেই ঠাঁই তার কাম্য।
তিনি সরল মুখে হাসেন – গুলি বন্দুক কী দরকার মাগো, আমি তো এমনিতেই ছুটি নিতে চাই। কবে ছুটি?
বাবার কথায় আশ্চর্য এক অনুভূতি হয় হাসুর। কবিগুরুর সেই ছুটি গল্পের ফটিকের নিষ্কলুষ মুখটা সে দেখতে পায়। ইট-কাঠ-পাথরের এই নগর; সবুজ প্রাণকে সংহার করে যে যন্ত্রনগর অগ্রসরমান; যেখানে নদী নেই, মাঠ নেই, খাল নেই, বিল নেই, স্ফটিক জলে মাছের মুক্ত সাঁতার নেই – কেবলি কলুষ, হিংসা, বিদ্বেষ; সেখানে প্রাণ আইটাই করছিল ফটিকের। সেই কোমল শিশুর ‘কবে ছুটি’ সংলাপ যেন গল্পের বইয়ের পাতার থেকে জীবন্ত ফুটে উঠছে হাসুর চোখের সামনে। ওর চোখ ক্ষণিকের জন্য জলে ভিজে উঠেছে তখন।
বিকেলেই দুঃসংবাদটা অজানা রইল না বাবার কাছে। পল্টন সভা শেষে একটা মিছিল দ্রুত পৌঁছে যায় মিন্টো রোডে; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে তারা জঙ্গি হামলা চালালে পুলিশের পাল্টা এ্যাকশন। রক্তাক্ত সংঘাত। গুলি বিনিময়। লাশ। আহত অনেক।
এই রক্তক্ষয়ের দুঃসংবাদ পেয়ে বাবা ভীষণ মর্মাহত। অকল্পনীয়, অপ্রত্যাশিত এই ঘটনা। এমনটা এর আগে স্বাধীন বাংলায় আর হয়নি। নিজের শরীরের অব্যাহত রক্তক্ষরণে মোটেই বিচলিত হননি যে মানুষ; হাসিমুখে সয়ে যাচ্ছিলেন বেদনা, তিনি প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। তার মুখ মেঘলা গম্ভীর। অসুস্থ দেহে যা হয় – তাকে এবার কাবু, বিষণ্ন লাগছিলো।
তার ফুসফুসের রক্তক্ষরণ আরো বেড়ে গেল। কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না। আবার তার চিকিৎসা নেই দেশে। মারাত্মক উভয় সঙ্কট। তিনি বিদেশ যাবেন না। ওয়াজেদ সাহেব বোঝালেন। বললেন, সবার জন্য আপনাকে যেতে হবে। অন্যরা বোঝাল। দেশের কথা ভেবে সুস্থতার জন্য বিদেশ যাওয়া যুক্তিসঙ্গত। দেশে অপারেশন করা গেলে না হয় কথা ছিল। ওষুধে কাজ হলেও চলত। এখন জীবন বাঁচাতে যেতে হবে। বাবা নিরুত্তর। গম্ভীর। বার বার নিজের প্রত্যাশা স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কাছে হেরে বসছেন তিনি। বাবা বিষণ্ন। তার জীবনের দামেও যদি বাঙ্গালি মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় – তিনি হাসিমুখে মরণবরণেও রাজি।
হাসুও বোঝালো। মাও সায় দিলেন। বিকল্প যখন নেই, কী করা।
শেষে অনেক কষ্টে তিনি নিমরাজি। মস্কোয় সোভিয়েত সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছিল সুচিকিৎসার। রুশ উন্নত চিকিৎসা প্রশ্নাতীত।
মস্কোতে অপারেশন হয়েছিল বাবার।
সুস্থ হয়ে ফিরেছিলেন বাবা।
ফিরে বললেন, কিরে মা, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলে বুঝি!
বাবার অভয় মুখটা দেখতে পাচ্ছে হাসু। মাত্র দুই বছরে বড় ধরনের দু’টা অপারেশন। আকুলতায় দুলে উঠছে মন। বারবার। চুয়ান্ন বছরের জীবন। শৈশব ছাড়িয়ে বাকিটা জুড়ে শুধু খেটে চলেছেন মাটি ও মানুষের জন্য। ফুসফুস, শ্বাসনালী, তলপেট, গলব্লাডার কেনো – শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-অণু-পরমাণুই তো পরিশ্রমে ক্রমশ কাবু হয়ে পড়েছে দিনে দিনে। আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম, মৃত্যুর সঙ্গে অসম সাহসে পাঞ্জা, মাইলের পর মাইল, পায়ে পায়ে সারা বাংলা ছুটে চলা; মিছিলে মিছিলে লাখো মানুষের লাখো সভায় বজ্রকন্ঠ; দেদীপ্য কোমল কঠোর উচ্চারণ আর বাঙালির সঙ্গে অবিশ্রাম কথামালা; সেই কথোপকথন অনিঃশেষ, একটা প্রাণ, একটা দেহ আর কতো সয়।
তবে আব্বারই কি কিছু হলো!
কী-ই বা হবে আর।
কোটি মানুষের ভালবাসার বন্ধনে নিশ্চয়ই তিনি পরমায়ু।
তারপরও জীবন তো অনন্ত নয়।
আব্বা কি শেষে অমলিন হাসি দিয়ে রুখতে পারেননি অন্ত:ক্ষরণ?
একটা চিঠি ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মানুষের ভালবাসা দেয় পরমায়ু; আব্বা বাংলার অনন্ত পথচলায় পেয়েছেন ভক্তি শ্রদ্ধার মুক্তোমানিক। ভক্তিতে অপরিমেয় শক্তি; ক্ষয় তো হবার কথা নয়।
বাবার তৃপ্তির উক্তি শুনতে পাচ্ছিল কানের কাছে – দেখতে পাচ্ছিল চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে কথা বলার অপূর্ব ভঙ্গি – মারে, রোগব্যাধি কী-ই বা কাবু করবে আমাকে? তোর মতো কোটি মা বোনের ভালবাসা, দোয়া শুশ্রুষা; সারিয়ে তুলছে সব ক্ষত, সব ব্যথা বেদনা ব্যাধি।
এই বাঙালি-ভোলা মানুষটাকে আঘাত করেছে ঘাতক-রোগ, হাসু কল্পনাই করতে পারছে না। কিন্তু যে চিঠিটার কথা ওরা জেনেছিল। সেই যড়যন্ত্র – সেই গোপন রোগ-বীজ! সে খবর তো শত্রুশিবিরের এক জাঁহাবাজের কাছ থেকেই এসেছিল।
সে কথা মনে আসতেই ঝিম ঝিম করে উঠলো হাসুর মাথাটা।
এই গেল এপ্রিলেই চিঠিটা ওরা পেয়েছিল। ইংরেজি স্পষ্ট অক্ষরে লেখা চিঠি। লিখেছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন বিগ্রেডিয়ার। মেডিক্যাল কোরের। মানে ডাক্তার। মার্শাল ফিজিশিয়ান খুব উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন আব্বার অসুস্থতার বিষয়ে। তার চিঠির বিষয়বস্তু এই যে – শ্বাসনালীর রক্তক্ষরণের কথা শুনেই ভয়ংকর এক আশঙ্কায় তিনি পত্র লিখে ডাক্তার হিসেবে মানবিক দায় মেটাচ্ছেন। মি. শেখ সাহেবকে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে। চক্রান্ত চলছে পাকিস্তানে ও দেশের বাইরে। তার জীবন মৃত্যুহুমকির বাইরে নয়। এমনকি অত্যাধুনিক টেকনিকেও তাকে হত্যার চেষ্টা হতে পারে। এমন কোনো গোপন ঘটনা ঘটানো হতে পারে যার বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটবে বেশ কিছুদিন পরে। যেখানে যখন ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটবে, সেটির টেরও পাওয়া যাবে না।
বিগ্রেডিয়ার চিঠিতে এরপর যেটা জানালেন, তা রীতিমত রোমহর্ষক। ফেব্রুয়ারিতে শেষ সপ্তাহে আব্বা লাহোর গিয়েছিলেন। ইসলামি সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে। পাকিস্তান – যারা, যে হানাদাররা সোনার বাংলাকে রক্তের সাগরে ডুবিয়েছে – সেই লাহোর যেতে তার মন একদমই টানেনি। রাতের পর রাত তিনি অস্থির চিত্তে হেঁটেছেন দোতলার বারান্দায়। গম্ভীর তার মন জুড়ে হাজারো চিন্তা, হিসাব নিকাশের কালো ছায়া। এক হিমালয় সমান সম্পদ পাকিস্তান চব্বিশ বছরে লুটে নিয়ে গেছে সোনার বাংলা থেকে। বাংলার সকল উন্নয়ন রুদ্ধ করে সোনালি আঁশের অফুরান মুদ্রায় সোনায় সোহাগা করে গড়ে তুলেছে পশ্চিমের রাস্তাঘাট, শিল্প কারখানা; মনোরম রাজধানী গড়েছে বিত্তবিলাস ও আয়েশে। এখন বিশ্ব সংসারে লালসবুজ মুকুটে আত্মপরিচয় তুলে ধরেছে বাঙালি। বীরসংগ্রামী স্বতন্ত্র জাতিকে সালাম জানাচ্ছে আত্ম-সমুন্নত দেশ ও জাতিগুলো। এবার আসল লড়াই। নিজেদের গৌরবে শ্রমে মেধায় কর্মে সেরা হিসেবে গড়ে তুলবার সময়। কিন্তু চারদিকে কেবলি ধ্বংস; ওরা গণহত্যা-লুট-অগ্নিসংযোগ আর কাপুরুষ হামলায় তছনছ করে গেছে এই বঙ্গীয় জনপদ। রাস্তাঘাট, শিল্প কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গেছে। মাটিতে গুড়িয়ে নিঃশেষ করতে চেয়েছে একটি জাতিকে। বাংলাদেশকে পরিণত করতে চেয়েছে মৃত ধ্বংস দেশে। সেটা পারেনি। কিন্তু মৃত্যুপুরী বানানোর অবিরাম হানা-হামলার দুঃস্বপ্ন দেশজুড়ে। এখন দুঃস্বপ্নকে স্বপ্নের সোনার বাংলাতে রূপান্তরের কাস্তে কলম উদ্যোগ বাবাকে ঘিরে। কেবল বাংলা, বাঙালিই তো নয় – কৌতুহল আর বিস্ময় নিয়ে স্বাধীন বাংলার প্রগতিকে দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি – দুর্বৃত্তকে সমুচিত শিক্ষা দেয়া হয়েছে। ৯৬ হাজার হানাদারের নৃশংস শিরস্ত্রাণ, বিষছোবল, রক্তপায়ী জিহ্বা, শ্বাপদ-হিংস্র নখর ও দৃষ্টি পরাভূত। ওরা পরাজিত বাঙালির বীরব্যঞ্জক উত্থানে – ওরা যুদ্ধবন্দির শৃংখলে ফিরে গেছে।
কিন্তু রক্তাক্ত বাংলাকে কেমন করে সোনার বাংলায় রূপান্তর সম্ভব? একজন ব্যক্তির দিকেই দুনিয়ার চোখ। সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা। বাবা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দৃঢ় অবিচল। কিন্তু বাস্তবায়ন কোন পথে! সম্পদ কোথায়? লুটে নেয়া সম্পদ-সিন্দুকরাজিকে উদ্ধার কোন পথে! পশ্চিমা পাঞ্জাবি দস্যুদের রত্নভাণ্ডার থেকে হিস্যা কড়ায় গন্ডায় আদায় করে আনা – সে এক সুকঠিন কাজ। রূপকথার ভয়ংকর সব অপশক্তি সেই সম্পদের পাহারায়।
মৃত্যুভয় পদে পদে। কেউ বিষনাগিনীর ছোবল নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। কেউ অজগরের মতো গিলে খেতে হা মুখ। রক্তপায়ী দস্যুদের বহুরূপী বন্ধুরাও স্বাধীন বাংলার অস্তিত্বকে ঘিরে পেতেছে মায়াজাল; ইন্দ্রজালিক শঠতা তাদের কবজায়। কেমন করে এই ভয়ংকর যজ্ঞে ধনুর্ভেদ!
বাবা বাঙালীর হিস্যা আদায়ে ধনুর্পণ। তিনি রাত জেগে পাহাদারি করছেন। বাবার চোখে ঘুম নেই। এই নির্ঘুম বাবার কথা কোনোদিন কি জানবে মানুষ; কোনোদিন এই কাহিনী কি ঠাঁই পাবে বইয়ের পাতায়?
নানারকম বুদ্ধি শলাপরামর্শ বাবা পাচ্ছেন নানা তরফে। বাবা জানেন, কিছু পরামর্শে আছে বহুরূপীদের ষড়যন্ত্রের গোপন শূল! পায়ের নিচে শর-কার্পেট রেখে বাবার পায়চারি গভীর রাত অবধি। কী করা! সবাই ঘুমাক, শান্তিতে থাক; ধনুর্ভেদ তো করতে হবে বাবাকেই।
বিষাক্ত হাজারো সাপের মৃত্যু ছোবল যে বাবাকে ঘিরে – তার তত্ত্ব তালাশ জানা গেল বিগ্রেডিয়ারের পত্রে। তিনি জানিয়েছেন, লাহোর ইসলামি সম্মেলনে শেখ সাহেবের উপস্থিতিকে ঘিরে পাতা হয়েছিল ষড়যন্ত্র জাল। ওই সময় তার শরীরে সঙ্গোপনে বিশেষ কৌশলে রোগ-বীজ ঢোকানোর প্লান হয়েছিল। এজন্য ক্যান্সার জাতীয় মারাত্মক ব্যাধির ভাইরাস পরীক্ষাগারে তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল পাকিস্তান অথরিটি। ঝানু গোয়েন্দারা ছিলো সর্বোচ্চ হুঁশিয়ারিতে তৎপর। আর এই নির্দেশটা দেয়া হয়েছিল ওই ফৌজি ডাক্তারকে। তাকে বলা হয়, প্রস্তুত ওই ভাইরাস একটি ক্ষুদ্র গোপন সূচের মধ্যে সংরক্ষিত থাকবে। যা কোন বিশিষ্ট শীর্ষ ব্যক্তি তার হাতের তালুতে কিংবা আঙুলে দিব্যি এঁটে নিতে পারেন। বিগ্রেডিয়ারের তথ্য মতে, এই মিশনে জুলফিকার আলী ভুট্টো শামিল বলে তাকে জানানো হয়েছিল। সম্মেলনের প্রথা মাফিক করমর্দন কিংবা আলিঙ্গনের সময় তিনি ভাইরাস ভর্তি সূঁচটি শেখ সাহেবের শরীরে ঢুকিয়ে দেবেন। এটি ঘটবে মৃদুভাবে – কিস্যুটি টের পাওয়ার কথা নয় শেখ সাহেবের। কিন্তু তার ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া ঘটবে পরবর্তীতে।
পত্রে জানা যায়, বিগ্রেডিয়ার সাচ্চা মুসলমান হিসাবে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে শামিল হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। মুসলমান হয়ে আরেক মুসলমানের ক্ষতির কোনো কাজ করতে তার বিবেক সায় দেয়নি।
তবে তিনি সংশয়ে সন্দিহান। শেখ সাহেবের ফুসফুসের রক্তক্ষরণের দুঃখজনক খবর জেনে তিনি বিচলিত হয়েছেন। তার আশঙ্কা – অন্য কোনো মেডিকেল বিশেষজ্ঞ কিংবা রোগ-বীজ বিজ্ঞানী ভাইরাস তৈরি করেছেন কিনা; সেটা প্ল্যান মতো শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে কিনা।
বিবেকের তাড়নায় পত্রটি লিখেছেন বিগ্রেডিয়ার। বাবার রোগমুক্তি কামনা করে দোয়া-খায়ের করেছেন তিনি।
এ চিঠি যখন হাসুদের হাতে তখন বাবা সুস্থ।
চিঠিটা পরিবারের সবাইকে উদ্বিগ্ন করেছে নিঃসন্দেহে। বিস্মিত হয়েছে ওরা। তবে কি ষড়যন্ত্রের ডালপালা এমনও হয়! এমন ভয়ঙ্কর! গোপন সূচ; সেটি প্রাণঘাতী ভাইরাসে পূর্ণ। দু-এক বছর লম্বা স্লো-পয়জনিং মিশনে বৈরী দুঁদে গোয়েন্দারা তৎপর, তারা ছকের পর ছক আঁটছে। বাবাকে ঘিরে ছায়া আততায়ীদের সতর্ক মহড়া – বিদেশে বাবার প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই আশঙ্কাপূর্ণ। হাসুদের চোখের সামনে থ্রিলার উপন্যাসের গা ছমছমে কাহিনী যেন জীবন্ত হয়ে ভাসছিল। তবে কি মানুষকে ভালবাসতে গিয়ে বাবা কেবলি জড়িয়ে যাচ্ছেন নানা অজানা ফাঁদে? ষড়যন্ত্র করেছিল আইয়ুব; ইয়াহিয়া। তারা পারে নি। এখনও কি পাকিস্তান আর তার দোসররা অবিরাম চেষ্টা করছে বাবাকে হত্যার? বাবা মৃত্যুভয় কখনো পাননি। মৃত্যুশঙ্কার মুখেও তিনি নির্ভীক চিত্তে মানুষের আন্দোলন সংগ্রামে অবিচল।
কিন্তু এই গোপন রোগ-বীজের ভয়; নিখুঁত সূক্ষ্ম প্ল্যান এঁটে ধীরে ধীরে তাকে হত্যার যে ষড়যন্ত্র – কিংবা তার চেয়েও যদি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র হয়, তখন নির্ভীকতা দিয়ে তাকে মোকাবেলা কেমন করে সম্ভব! আদৌ কি সম্ভব? থোকা থোকা প্রশ্ন হাসুর মনের মধ্যে বিঁধছিল।
হাসু, ওর ভাইবোন সবাই মধ্যবিত্ত সরল সাদাসিধে জীবনের গণ্ডিতে নিস্তরঙ্গ ছন্দে জীবনযাপন করছিল – খুব ভালোই চলছিল। আম্মা তো তাদের চারপাশে পরিষ্কার লক্ষণ রেখা এঁকে দিয়েছেন – সোজাসাপটা বলে দিয়েছিলেন – বিত্ত বিলাসহীন সাধারণই আমরা থাকবো। বিত্ত আমাদের ছোঁবে না।
আর বাবা তার চিরাচরিত লুঙ্গি, গেঞ্জি, পাজামা পাঞ্জাবীতে অমল ধবল সফেদ সুদর্শন। পায়ে চটি, বাইগার নদীর পলিতে সুখ চাষীদের চাষাবাদ, সেই ফসল দেখে অবসরযাপন – বাবার একান্ত স্বপ্ন। তিনি যন্ত্র-পাথর-ইট শহর থেকে চান মুক্তি।
কিন্তু আব্বুকে ঘিরে তো দেখা যাচ্ছে তার চারপাশে থ্রিলার ভয়ংকর নাগপাশ। হাসু তার মেয়ে। সে তো উদ্বিগ্ন হবেই।
বাবাকে যখনই বলেছে শংকা আশঙ্কার কথা। বাবা হাসেন। তার কণ্ঠে ঋষির আপ্তবাক্য, রাখ তো মা-আমাকে কে মারবে!
কোনো ভয়, কোনো আশঙ্কাকেই তিনি আমলে নিতে চান না। মরতে তো একদিন হবেই। আজ কিংবা কাল। কিংবা পরশু। এজন্য গোপন শত্রুর ভয়ে এক বিন্দু আতঙ্ক, তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একদম যায় না। ভয় তার ভারী অপছন্দ। তার একটাই ভয় – স্বাধীন বাঙ্গালি যেন আর কোনোদিন পরাজিত না হয়। স্বাধীনতার এই অনির্বাণ শিখা যেন জ্বলে চিরন্তন।
বাবার যতই বয়স বাড়ছে তিনি সরল হয়ে উঠছেন। শঙ্কাকে তিনি কোনো পাত্তায়ই নেননি। আম্মা নিশ্চয়ই বিচলিত। তিনি গজ গজ করলেন। তোর বাবার বয়স তো হচ্ছে নাকি। মানুষটা বুড়ো তো হচ্ছে নাকি। আর কতো! এই বয়সেও কাজ কাজ কাজ। স্বাধীন দেশ। মানুষটাকে একটু বিশ্রাম দেয়া দরকার।
মায়ের ভৎর্সনায় বাবা হাসেন। কিছু বলেন না। কী বলবেন! তিনি কেবল হাসু আর পাঁচ সন্তানের বাবা নন। তার পিতৃত্বের পরিধি বিশাল বাংলাময়।
আম্মা অন্য একটা ব্যাপার নিয়ে ছিলেন বেশ উদ্বেগে। চুয়াত্তর সাল থেকেই সে উদ্বেগ। এদ্দিন মিন্টো রোডে পুরাতন গণভবনে ছিল বাবার বৈকালিক অফিস। এটি আয়তনে সংকীর্ণ। বড় জোর গেস্ট হাউস। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসাবে উপযুক্ত নয়। বিল্ডিংটি ছিলো বাবার অত্যন্ত অপছন্দ। পশ্চিমা খুনি কুচক্রী খান সেনা – ইয়াহিয়া আইয়ুবের ঘাঁটি ছিল এটি।
শেরেবাংলা নগরে হলো নতুন গণভবন। বিশাল অঙ্গন সুপ্রশস্ত। চুয়াত্তরের মার্চেই উদ্বোধন হল। তারপর বিকেলে বাবা বসছেন এখানে। এটি রাষ্ট্রীয় বাসভবন কাম অফিস। পরিবারসহ স্থানান্তরের কথা সেখানে। কিন্তু আম্মা ৩২ নম্বর ছাড়তে একেবারেই রাজি নন। ৩২ নম্বর বাবুই পাখির বাসা হোক, সেই সই। প্রাসাদে মা যাবেন না। বিলাস বসন, আরাম মায়ের চূড়ান্ত অপছন্দ। তার কথা, অতি আরামে আসল সুখ হারাম। তিনি দোতলা এই বাড়িতে অনাবিল অঢেল সুখে আছেন। এই ঠাঁই ছেড়ে সুরম্য অট্টালিকায় যেতে তিনি রাজি নন। (চলবে…)
অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন







