কামাল সেই বাবার বড় ছেলে। তখন সতেরো পেরিয়ে মাত্র আঠারো ঘরে পড়েছে। কিন্তু আব্বার বিশ্বাস ও সরল দর্শনে সেও অবিচল।
বিয়েতে সে আপুকে দিয়েছিল অপূর্ব এক উপহার। শৈশবের সেই ফড়িং প্রজাপতি দিনগুলোতে কত কিছুই সে এনে দিয়েছে বোনকে। হাসুর বিয়ের দিনও দিলো। সুদুর ব্রাসেলসে বসে সব স্মৃতি আজ মনে পড়ছে ছবির মতো। সেই অমূল্য উপহার দু’হাতে অঞ্জলিভরে নিচ্ছিল। ছুঁয়ে দেখছিল। কামাল ভাইরে আমার অমন উপহার আবার তুই আমায় কবে দিবি!
স্মরণীয় সেই রাতটি। শব-ই বরাতের। সালটা ১৯৬৭। শেখ সাহেব জেলখানায়। তার বড় কন্যার বিয়ে। লোহার ভারি গরাদ ভেদ করে ছুটে যাওয়ার উপায় নেই স্নেহশীল পিতার; এই মানুষটির। মাগরিবের পর কোনো এক সময় রসুমত হবে – এটা তিনি জানতেন। নামাজ পড়ে তিনি খুবই উচাটন। ভেতরটা কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। হাসু তার কলজেরই টুকরা। বার বার মেয়ের মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বিয়ের এই রাতে নিশ্চয়ই খুব মায়াবতী লাগছে কন্যাকে –
বন্দি মানুষটি বিষণ্ণ। দু’রাকাত, আবার দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লেন পিতা। তারপর নিবিষ্ট মনে দোয়ার জন্য দু’হাত তুললেন। পিতার স্নেহবঞ্চিত কন্যাটি যেন সুখী হয়। পায় যেন পরমায়ু ।পায়চারি করলেন অনেকক্ষণ। ফালতু আজিজ, আবু বকর কাছে পিঠেই ছিল ফুট ফরমায়েশের অপেক্ষায়। শেখ সাহেবের সঙ্গে কোনো কথাবার্তাই হলো না। জেলখানায় বরাতের রাতে ভালো খাবারের বন্দোবস্ত থাকেই। আজিজ কেবল তাকে পানি গড়িয়ে খাওয়াল। একরকম অভুক্তই থাকলেন বাবা।
গভীর রাতে আবারও মগ্ন ইবাদাতে। আকুলচিত্তে দোয়া করলেন। এভাবেই রাত কাটছিল। কখন যে সুবেহ সাদিক – আসসালাতু খায়রুম মিনাল নাউম – ভোর নামাজের শেষে হাত তুলে নীরব মুনাজাত। তার চোখ তখন একটু ঘুম ঘুম।
হাসু মা আমার কষ্ট নিশ্চয়ই পায়নি। ছোটবেলা থেকেই কন্যাটি হাসিখুশি। ওর হাসি যেন খুশির ঝরনা। ওর জন্মের পর কলকাতা থেকে বাড়িতে ছুটে গিয়ে প্রথম যে বার কোলে নিয়েছিলেন, তার মনে হচ্ছিল কন্যাটি যেন হাসছে। তার মুখে দেখেছিলেন স্বকীয় এক অভিব্যক্তি। চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। বাবাকে বিস্ময়ের সঙ্গে বুঝি দেখছিল। সেই সোনার কন্যাটির মুখ বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। গুটুল মুটুল হাত। ফুলের মত মুখ। অবুঝ শিশুর উল্লাস। সে সবই ছিল পিতার মনে! অফুরন্ত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। কন্যাটিকে যত দেখছিলেন, ততোই যেন দু’চোখে মায়াবী আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছিল কেউ।
জেলখানার নির্ঘুম রাতে ইবাদাতের ফাঁকে সেই মায়ার ঘোরে আবার ভুগছেন। হাসু হাঁটি হাঁটি পা পা এগুচ্ছে। কলকাতা থেকে আনা ঝুমঝুমি, নীল চাঁদোয়া মশারি – কি বিস্ময়ে আনন্দে হাসু দেখছে। ঝুমঝুমি বাজাচ্ছে। অনন্তের দেয়ালে কান পেতে ঝুমঝুমির মিষ্টি রিমঝিম শব্দ শুনতে পাচ্ছেন তিনি। হাসুর হাঁটার কোমল আওয়াজও আসছে কানে। প্রথম প্রথম আব্বা বলতে না পেরে বলত আব্বাব্বাহ। কখনো বলত আবা।
ওই হাসু আব্বাব্বাহ বলে ডাকছে। খুব কি অভিমান করেছে কন্যাটি? মনের ভেতর গুমরে নিশ্চয়ই কাঁদছে। খুব অসহায় লাগছে শেখ সাহেবের। ওর যখন জন্ম হলো, তখনও ছিলেন দূরে। কলকাতায় হাজারো নিরীহ প্রাণকে বাঁচাতে। আর আজ বিয়ের লগন; এ দিনও ঢাকায় থেকেও অনেক অনেক দূরে।
কিন্তু হাসু তারই কন্যা। তারই আত্মজা। ও নিশ্চয়ই বাবার কষ্ট বুঝবে। তার বাবা এখনো দেশ ও মানুষের জন্য জেলের কুঠুরিতে বন্দি। বাবার এই অসহায় আকুতি সেও নিশ্চয়ই বিয়ের আসরে বসে অনুভব করছে।
সারা দেশের মানুষ তখন বঞ্চনার শেকলে বন্দি। নিগ্রহ লাঞ্ছনা, বৈষম্যের শিকার। ব্যক্তি নয়, দল নয়, তিনি বাঙালির পক্ষে লড়ছেন। পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানে তিনি সামান্যতম জাঁকজমকের পক্ষে নন কখনোই।
তাই বলে চরম দীনহীনভাবে কন্যার বিয়ে হোক – সেটা কোন পিতাই বা চাইবে? অন্তত তার উপস্থিতিতে আকদ হবে – এটুকু শখ তারও ছিল।
কিন্তু পিতার সে শখটুকু পূরণের সকল রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিল জালিমশাহী। ওরা মুজিবকে একঘরে, আত্মীয়-পরিজন বিচ্ছিন্ন করে কঠিনতম দণ্ড দিতে বদ্ধপরিকর। ওদের মাথায় মুজিবকে হত্যার নেশা চেপেছে। ওদের বিশ্বাস – একটি মুজিবরকে বিনাশ করতে পারলে বাঙালির সকল আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারবে।
এখন জালিমশাহী একের পর এক খুনের নীলনকশা ফাঁদছে। কিন্তু ফৌজিশাহীর চক্রান্ত ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ওরা যতই শকুন দৃষ্টি হানছে; গোঁফে তা দিচ্ছে – বাংলাদেশের হৃদয়ে ততই মণি হয়ে উঠছেন শেখ মুজিব। সে কারণে ওদের প্ল্যানও বদলাতে হচ্ছে বার বার। ওরাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছে ক্রমশ।
শেখ সাহেবের গভীর বিশ্বাস এই জেলজুলুম, হত্যা হুমকি ভয় – এই বাঙলার আকাশে অন্ধকার করা সংশয়ের কালো মেঘই শেষ কথা নয়; জ্বলজ্বলে সূর্য একদিন উঠবেই। আজ কিংবা কাল। নয়তো পরশু।
কিন্তু তাই বলে জীবনের অনিবার্যতাকে, স্বাভাবিক গতিকে শ্লথ বা থামিয়ে রাখবার তিনি পক্ষে নন।
কারাগারের ভেতর বাইরে – যেখানে তিনি থাকুন – রানু যেন তার সংসার দায়িত্ব পালনে কাবু, নিশ্চল হয়ে না পড়ে; এটাই ছিল স্ত্রীকে পরামর্শ। আর দশটা মধ্যবিত্ত বাঙালি কন্যার যখন বিয়ে হয় – হাসুরও তাই হোক। সম্বন্ধ দেখা, খোঁজ খবর চলুক। ভালো ছেলে পেলেই তার জন্য অপেক্ষার কোনো দরকার নেই। কন্যার কপালে পিতার স্নেহ চুম্বন, অফুরন্ত আশীর্বাদ তো সবসময় আছেই। ঘরে থাকলেও আছে, জেলে থাকলেও আছে।
আর যে আশঙ্কাটা তিনি করছিলেন, রানুর কাছে তার আলামতের কথা শুনেছেন। বাঙালির জন্য রাওয়ালপিন্ডির পিণ্ডি চটকে চলেছেন তিনি। এমন পিতার কন্যাকে বিয়ে করার অকুতোভয় যোগ্য পাত্রের অভাব হওয়াটা বিচিত্র নয়। মোনায়েম খানসামার মোসাহেবী মাত্রা ছাড়ানো। সে তো বলেই দিয়েছে একরকম – মুজিবরের সঙ্গে আত্মীয়তা মানেই সিভিল সার্ভিস থেকে তালাক। নিকাহ করে আয়ুবশাহীর লোটা কম্বলের লোভ সামলানোর মতো সাহসী পুরুষ দুষ্প্রাপ্য বৈকি।

অলংকরণে: উত্তম সেন
তরুণ প্রতিভাদীপ্ত মেধাবী বিজ্ঞানী ওয়াজেদের কথা যখন শুনলেন, বাবা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে মত দিতে দ্বিধা করেননি।
এই সুদর্শন যুবককে তিনি ভালোভাবেই চিনতেন। ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী। মেধাগুণে ফজলুল হক হল সংসদের ভিপি হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের তার ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা। সব পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া স্টুডেন্ট। পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিয়েছে মেধায় সবাইকে টপকে। লন্ডনে পিএইচডি করে ফিরেছে সম্প্রতি। জামাই হিসেবে নিশ্চয়ই সুযোগ্য।
বাবা তাই নিশ্চিন্তে দ্বিধা ও বিলম্ব করতে বারণ করেছেন। আকদ হয়ে থাকুক। পরে শুভদিনে অন্য অনুষ্ঠানগুলো করা যাবে। শুভ কাজ যত শীঘ্র হয় ততই উত্তম।
রানু একা সব সামলাতে পারছে তো! ওর উপর একটা টানাটানির সংসারের হাজারো দুঃখ সেই কবে সঁপে দিয়েছেন। ও কখনোই মুখ ফুটে কোনো অভাব অনুযোগ করেনি। দুঃখকষ্টে সে পুড়ছে – কিস্যু বলে না। শেখ সাহেব সবই টের পান। কখনো ভীষণভাবে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে মন। দুশ্চিন্তা হয়। মন পোড়ে। হৃদয় বিষণ্ন। তারপরও অদ্ভুত অলৌকিক এক স্বস্তি। রানুর উপর বিশাল ভরসা। ও ঠিকই সবকিছু ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে পারবে। কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ব্যত্যয় হতে দেবে না। রানু সর্বংসহা বাঙালি মা। সব দুঃখ একা সয়ে সন্তানদের ঠিকই পৌঁছে দেবে সৌভাগ্যের বন্দরে।
ঘরে কানাকড়ি কিচ্ছুটি নেই। শেখ সাহেব যে জানেন না, তা তো নয়। রানু কখনোই কিছু বলেনি।
তাই উৎকণ্ঠা একটু হচ্ছেই। আকদ ঠিকঠাক হয়েছে তো? হাসুকে সোনার সামান্য কোনো অলংকার গড়িয়ে দেয়া গেছে কি! কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব? রানু টুঙ্গীপাড়ার যা কিছু আয় – সর্বস্ব খরচ করে স্বামীর মামলার খরচ মেটাতে হিমশিম। রানু তার কেমন করে নিচ্ছে সামলে!
কিন্তু অলংকারের চাক-চমক ছাড়া বিয়ে-রসুমত কি হয় না! হিজল তমাল ফুল, বকুল পারুল, লাল গোলাপ – কন্যা তার ফুলের মতোই প্রফুল্লমনা। ওকে সবচেয়ে মানাবে ফুলেতেই।
হাসু ছোটবেলা থেকেই নানারকম ফুল নিয়ে খেলত। টুঙ্গীপাড়ার একান্ত স্বর্গভূবনে গিয়ে কন্যার কাছে কতরকম ফুল দেখেছেন। শিমুল পলাশ, সজনে, বেলকুঁড়ি, কাঁঠালচাঁপা – হাতে একগাদা ফুল নিয়ে বাবাকে দেখাত আর ফুল মুখেই যেন হাসত। একবার সজনে ফুল চিনতে পারেননি বাবা। কন্যার কি হাসি। আব্বুকে না চেনা একটা ফুল চেনাতে পেরে সে কি আনন্দ।
সেই ফুলকন্যার বিয়ে। শেখ সাহেব বেশ খানিকটা অবাক তো বটেই। ভোররাতে কোত্থেকে যেন বকুল সুরভি আসছে। তার সঙ্গে মিঠে কাঁঠালচাঁপার গন্ধ। সারারাতে নির্ঘুম চোখে ভোরবেলাতে একটু একটু ঘুম। হৃদয়জুড়ে সুন্দর কল্যাণী স্বপ্ন। ফুলের মালায় কী নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ চমৎকার লাগছে মেয়েকে। বিয়ে কি তবে ফুলের অলংকারে হচ্ছে! এই অলংকার যে তুলনাহীন।
সঙ্গে স্বর্গীয় সব সুগন্ধ। শেখ সাহেবের উন্মনা চিত্ত আস্তে আস্তে ফুল ও সুগন্ধে সুরভিত হয়ে উঠতে লাগল। বত্রিশ নম্বর বাড়ির আঙ্গিনার শিউলি, বকুল, জুঁই গাছে যেন অঢেল উচ্ছ্বাস। শেষরাতের ছিন্ন ফুলেরা ভোরের হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে সারা বাড়িতে।
আংটি বদল হয়েছিল একদিন আগেই। রংপুর নিবাসী সুজন-সজ্জন মতিউর রহমান সদালাপী মানুষ। গুলশানে তার যে বাড়িটি, সেটি একতলা। ঢাকার বাড়িতেই একদিন ওয়াজেদের সঙ্গে তার কথা হলো। মতিউর গিন্নি জানতে চাইলেন, বিদেশে সুধা মিয়া বউ টউ রেখে এসেছে কিনা! অবাক হলেন ওয়াজেদ। সুধা তার ডাক নাম।
সেকি! এ কেমন ধারার প্রশ্ন। অবশ্য খানিকবাদে বুঝলেন, ভাই-ভাবী একটু রস করেই প্রসঙ্গটা পেড়েছেন। অন্য কোনো শানে নুজুল আছে নিশ্চয়ই।
তিনি সহাস্যে জানালেন, ড. সালাম সাহেবের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সে মওকার কোনো উপায় ছিল না। গবেষণা আর ল্যাবরেটরি বাদে অন্য কিছুর সঙ্গ লাভের সুযোগ মেলেনি। বলল, আমি এখনো হান্ড্রেড পারসেন্ট ইলিজেবল ব্যাচেলর।
ভাই-ভাবী অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে নিজেরা পরস্পরের দিকে তাকালেন।
মতি ভাই জানতে চাইলেন, বিয়ে শাদীর ব্যাপারে কি ভাবছো! জলদি জলদি বিয়ের পিঁড়িতে বসবে – নাকি আরও কিছুদিন ফুল ব্যাচেলর থাকতে চাও।
না, বিয়ে যখন জীবনে একবারই করব – শুভস্য শীঘ্রম। শুভ কাজে দেরি না করাটাই ভালো।
বেশ কথা। আবার নিশ্চয়ই গবেষণা টবেষণায় জড়িয়ে পড়বে। সায়েনটিস্টের ল্যাবরেটরির বাইরে তো আর কোনো জগত নেই। বিয়েটা তার আগেই সেরে নেয়া ভালো।
ইয়েস, তেমনটাই ভাবছি। পাত্রী-টাত্রী কেউ ভাবীর কাছে আছে নাকি!
– কী রকম পাত্রী চাইছো! কোনো কোটিপতির কন্যা! তুমি যেমন বিলাত ফেরত পাত্র, একটু আওয়াজ দিলেই শ্বশুর বাবাজীরা লাইন দেবে। সকৌতূকে বললেন মতিউর গিন্নি। সম্ভবত সুধা মিয়াকে একটু বাজিয়ে নিতেও চাইলেন।
– মাফ চাই ভাবী। কোটিপতির সম্পর্কে আমার লোভ নেই। কোটিপতির কন্যার পানিগ্রহণ আমার কম্মো নয়। অমনটি কেউ থাকলে লিস্ট থেকে সেটি বাদ রাখুন।
– তাহলে কেমন চাইছ!
– আপস্টার্ট গার্ল একদম নয়। ফাস্ট লাইফের কোনো কন্যার সঙ্গে আমি মানিয়ে নিতে পারবো না।
– তেমন কোনো ফাস্ট গার্ল তোমার পিছু নিয়েছে নাকি সুধা মিয়া! ভাবী হাসছেন।
আমারও তোমার মতো ভাবনা-চিন্তা। কোনো চালাক চতুর সাজুগুজু মেয়ের পাল্লায় পড়লে তোমার ভবিষ্যত গোল্লায় যাবে। তোমার জন্য চাই সদালাপী সুশিক্ষিতা কন্যা।
জ্বী। মনের কথাটাই বলেছেন। মিডল ক্লাস ফ্যামিলির কন্যা হলেই আমার সঙ্গে ঠিক মানাবে। অমায়িক সদাচার স্বভাবের তো চাইবই। আর তার রুচিবোধও উন্নত হওয়া চাই। তা আপনার কাছে কোনো সম্বন্ধ আছে নাকি!
ভাবী মুখ টিপে হাসেন। তোমার পছন্দ বরাবর কন্যা তাহলে খুঁজতে শুরু করি। যে ৪/৫টি শর্ত দিয়েছো; সবগুলো মেলানো যায় কিনা দেখি।
ওয়াজেদ সেদিন উঠলেন। ভাই-ভাবী একটু চেষ্টা চরিত্তির করলে এটা কোন কঠিন কাজই নয়।
ঘটকালির কাজে মতিভাই এর আগেও ফেল করেননি।
স্নেহের হাসি ফুটে উঠলো মতিউরের মুখে।
মাত্র দুই দিন পরেই মতি সাহেবের ফোন। বললেন, আজ দুপুরে আমার বাসাতেই খাচ্ছ। তোমার ভাবীর রান্না। একদম মিস করবে না।
আজ? এর মধ্যেই পাত্রী পেয়ে গেলেন বুঝি!
তা একরকম। তুমি রাজি থাকলে ফার্স্টক্লাস একটা সম্বন্ধ হতে পারে। আগে এসো। খেতে খেতে প্রস্তাবটা পাড়ব।
মতিউর গিন্নির হেশেলের মুরগি রান্নাটা অসাধারণ। সঙ্গে রুই-এর কারি রসনার।
টেবিলের উপাদেয় আয়োজন দেখে ওয়াজেদ হাসছেন। বাহ! টেবিল সাজিয়েছেন চমৎকার। পাত্রীর রান্নার হাতটাও যদি এমনটা হয় – খুব বর্তে যাই। পাত্রীর ব্যাপারটা ভেঙে বলুন।
মতিউর সাহেব স্মিত হাসলেন। পাত্রীর রান্না কখনো খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে কিনা – মনে করে বলতে পারছি না। তবে তোমার ভাবী শাশুড়ির অতি সুস্বাদু রান্না খেয়েছি। এখনো যদি তিনি ফোনে আমাকে খেতে ডাকেন – আমি স্বাদের লোভে সব ফেলে ছুট লাগাবো।
যাক। আজ আর ছুট লাগাতে হবে না। তার আগে সম্বন্ধটা পাকাপাকি করে যাও।
গিন্নির দিকে তাকিয়ে মতিউর সাহেব বললেন, হ্যাঁ – তা তো বটেই। যাই হোক সুধা মিয়াকে সব ভেঙেই বলি।
তা তুমি যেমনটা বলেছ মিয়া, তার ষোল আনাই তোমার সঠিক বাসনা। পাত্রী হলে অমনটাই হওয়া উচিত। তবে যে পাত্রীর কথা তোমাকে বলবো – তাকে তুমি ভালো করেই জানো, চেনো।
মানে!
মানে পাত্রী অত্যন্ত অমায়িক, সদাচার, সুরুচিসম্পন্ন কন্যা। আর তার বাবাকে সারা বাংলা এক নামে চেনে।
কে সে!
হাসিনা শেখ। মুজিব ভাইয়ের বড় মেয়ে হাসিনা। তুমি তাকে দেখেছো।
এই তো ক’দিন আগেও তার সঙ্গে এই বাসায় তোমার দেখা হয়েছিল-নিশ্চয়ই তা ভুলে যাওনি! তোমার ভাবীর পছন্দ হয়েছে এই সম্বন্ধ। ওর সঙ্গে তোমাকে দারুন মানাবে।
মতি গিন্নি সায় দিলেন। মানাবে মানে খুব মানাবে। বড় মিষ্টি দেখতে মুজিব ভাইয়ের কন্যাটি। হাসিনা নামটি ষোল আনাই স্বার্থক।
ওয়াজেদ যারপরনাই বিস্মিত। প্রস্তাবের আকস্মিকতায় একটু ভড়কেও গেলেন। কি শুনছেন এসব! এরা কি সত্যি সত্যি জননেতা শেখ মুজিবের কন্যার সঙ্গে বিয়ের কথা বলছে?
ঠাট্টা করছে নাতো!
কি বলছেন মতি ভাই!
সত্যি বলছি ছোটভাই!
এটা কি আদৌ সম্ভব? শেখ সাহেবকে তো আমি ভাই বলে সম্বোধন করি।
ওসব কোন সমস্যাই নয়। উনি সকলের মুরুব্বি। আর রাজনীতির সভা সমাবেশ মিছিলে বাপের নামে শ্লোগান দিলেও ভাই বলেই দিতে হয়। তখন কি আব্বা বলে শ্লোগান কেউ দেয় নাকি! রাজনৈতিক সম্পর্ক আর নিকট-আত্মীয় রক্ত সম্পর্ক কখনোই এক নয়। ওয়াজেদ তবুও আমতা আমতা করছেন। শেখ সাহেবের জামাই হওয়ার প্রস্তাব তার কাছে এখনো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
ঘটনা খুব দ্রুত পরিণয়ের দিকে গড়ালো। দু’দিন বাদেই বর-কনে পরস্পরকে দেখার পর্ব। এ উপলক্ষে মতি ভাই-ভাবীকে নিয়ে ওয়াজেদ বায়তুল মোকাররমে সামান্য কেনাকাটাও করলেন। একটি আংটি পছন্দ হলো। হাসিনার আঙুলের মাপ কারো জানা ছিল না। তবু আন্দাজ করে কেনা হল। আংটি বদল গুলশানের একতলা বাড়িতেই। সন্ধ্যেতে বেগম মুজিব, শেখ কামাল আরও দুই একজন ভাই-মুরুব্বী এলেন।
বাড়ির ডাইনিং-এ খাবার টেবিলে দু’দিকে বেগম মুজিব, ওয়াজেদ বসলেন।
তখনও হাসিনা আসেননি।
যখন এলেন, ঘরের পরিবেশ কেমন আনন্দময় হয়ে উঠলো। মায়ের পাশে নম্র কন্যাটি দাঁড়িয়ে। শেখ সাহেবের সেই উন্নত নাসা, উজ্জ্বল ললাট, চোখও যেন মায়াবী পটে আঁকা। কন্যাটি বাবার আদলই পেয়েছে। দেখতে ভারি মিষ্টি। এক নজরেই প্রশান্তিতে ভরে যায়। প্রিয়দর্শিনীর মুখে ব্যক্তিত্বের দ্যুতিও ভাস্বর।
ওয়াজেদ জানতে চাইলেন, তুমি হাসিনা না! তোমাকে তো এর আগে একবার দেখেছি।
হ্যাঁ, আমি হাসিনা। কন্যাটির কন্ঠ অকপট ও স্পষ্ট।
ওয়াজেদের খুব ভালো লাগলো স্পষ্ট ভঙ্গি। শেখ সাহেবের মতো সবার শ্রদ্ধা-ভালবাসার মানুষটির কন্যার সঙ্গে সম্বন্ধ-ওয়াজেদ নিশ্চিন্তে তার পূর্ণ সম্মতি জানালেন।
ডাইনিং-এ সামান্য নাস্তার আয়োজন ছিল। সেটা সেরে সবাই বসার ঘরে গিয়ে বসলেন। হাসিনা এবার ওয়াজেদের মুখোমুখি। সঙ্গে করে আনা আংটি পরিয়ে দিলেন তিনি। লক্ষ্য করলেন-আংটিটা আঙুলে বেশ একটু ঢিলেই হয়েছে। হাসিনা মৃদু লাজনম্র। সহজ কন্ঠে বললেন ব্যাপারটি। না হয় একটু বড়ই। কি আর এমন সমস্যা?
বেগম মুজিব আরেকটি আংটি পরিয়ে দিলেন ওয়াজেদের আঙুলে। এটি মাপমতোই হলো। বেগম মুজিব এবার দোয়া করলেন দু’জনার জন্য।
রসুমত ও বিয়ের কাবিন হল পরের দিন। ওয়াজেদ স্যুট পরে গিয়েছিলেন। তাকে খুব হ্যান্ডসাম ও সুদর্শন লাগছিলো।
আংটি বদলের মতোই অনন্য সাধারণ আয়োজন। বত্রিশ নম্বর বাড়ির ড্রইংরুমে। সঙ্গে ডাইনিং। সবমিলিয়ে রুমটা তেমন বড় নয়। খুবই সাধারণ বসার ঘর। আসবাবের তেমন কোন বাহুল্য নেই। সোফা রয়েছে। বেতের কয়েকটি মোড়াও রয়েছে।
একপাশে আলাদা করে গুছানো ডিভানে ওয়াজেদকে সমাদরে বসানো হল। পাশের চেয়ারগুলোয় হাতে গোনা কয়েকজন মুরব্বি। একজন শেখ সাহেবের ছোট বোন জামাই। অন্যজন হাসিনাদের তানু নানা। এছাড়া বিয়ের মওলানা সাহেবও সেখানে রয়েছেন। খুবই অকিঞ্চিৎ আয়োজন।
ওয়াজেদের সঙ্গের বহর মাত্র কয়েক জনের। একজন তার বড় ভাগ্নের মামাশ্বশুর। অন্যজন ভাস্তে বৌয়ের বড় ভাই। আর মতি ভাই-ভাবী তো আছেনই। বরের সঙ্গে কনে উপহারের যে ফর্দ তার জন্য কয়েকটা অক্ষরই যথেষ্ট। মাঝারি আকারের ক্রিম কালার স্যুটকেস। ডিজাইনটা খুব চমৎকার। তার ভেতর লাল গোলাপি রঙের শাড়ি। কিছু প্রসাধন সামগ্রী; আরো কিছু কাপড় চোপড়। আর এক জোড়া স্যান্ডেল। স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে তড়িঘড়ি এসব কেনা হল।
ওয়াজেদের কাছে টাকা-পয়সাও বিশেষ তখন ছিল না। তিনি মতি ভাবীর কাছ থেকে কর্জ করলেন।
মধ্যবিত্ত পরিবারের বিয়ে উৎসবমুখর যেমনটা হয়-হইচই হট্টগোল, খাবার দাবারের আয়োজন-তার ছিঁটেফোঁটাও আজ হলো না।
ধানমন্ডি তখন উঠতি বসতি। বাড়ি বলতে একতলা, দোতলা বিল্ডিং রয়েছে কিছু কিছু। বিস্তর জায়গাই বিরান। গ্রামীণ পরিবেশ কাছে পিঠেই। মানুষজন, কোলাহল কম। শবে বরাত; তাই দূরে কোথাও বিচ্ছিন্ন পটকাবাজির আয়োজন হচ্ছিল। কলাবাগানের দিকটায় নিঝুম অন্ধকারে মৃদু আগুনের হলকা ফুটেই মিলিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় অনেক বাদে বাদে রিকশার টুং টাং রিং বাজছিল; ক্যাচ ক্যাচ করে যান্ত্রিক শব্দ। সুমসাম লোকালয়ের নীরবতায় সেসব শব্দ যেন ধীর লয়ে মুর্চ্ছনা তুলে চলেছে। প্রিয় হাসু আপুর বিয়ে। কামালের মনটা বিষন্ন। পরিবারের প্রথম বড় অনুষ্ঠানে আব্বা থাকতে পারলেন না। আব্বা একটু উপস্থিত থাকতে পারলেই পুরো পরিবেশ অন্য রকম হতো। কামালের কিছুতেই ভালো লাগছে না। আব্বা বারান্দায় কেবল যদি ইজি চেয়ারটায়ও বসে থাকতেন। তাতেও না কত উৎফুল্ল হয়ে উঠতো সকলে। (চলবে…)
অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন







