কিন্তু পিন্ডিতে ইয়াহিয়া খান কি ক্যারিকেচার করছে কে জানে। রান্ডিবাজ খান খান্দান শুধু জেনারেল কেন, ফিল্ডমার্শাল হলেও কাজের কাজ অ্যাকশন করতে পারে না। ইয়াহিয়ার যা কোয়ালিটি- সে পাকিস্তানের মসনদে ফৌজীরাজ নয়, রান্ডিরাজই কায়েম করতে পারবে। অক্ষমতায় সে আঙ্গুল কামড়াচ্ছে। হারামজাদা বালুচি সিপাইটা গেল কই। ওকে এখন মনখুশি বক্সিং না দিতে পারলে তার চিত্ত স্থির হবে না। ইয়াহিয়ার এই রানী জেনারেলকে কয়েকবার দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে টিক্কা খানের। আহামরি সুন্দরী তো নয়ই। শুনেছে লেড়কিটা নাকি পাঞ্জাবি। কিন্তু মুখের ছিরিছাদ পাঞ্জাবি আউরতের মতন নয়। মোটা থলথলে চর্বি। নূরজাহানের মতো বুড়ি টাইপ থোবড়ানো খোমা। গায়ের রঙটা অতিরিক্ত ফরসা- এই যা। খান্ডারনীদের মতো হাঁটে। মনে হয়, এক্ষুনি সে খেমটা নাচতে স্টেজে উঠতে যাচ্ছে। ফকিরনীটাইপ খাসলত। সবসময় পাতলা লালনীল বেগুনি কটকটে শাড়ি সায়া ব্লাউজ পরবে। সারা মুখে একগাদা কড়া মেকআপ। মাথার চুলের সেকি বিচিত্র বাহার, সব সময় মাথার ওপর ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাখবে। তার উপর আঁচল দিয়ে একটু ঢাকনি দেয়। নামেই রানী, সুরতে আরব্যরজনীর কামওয়ালি বাঈ মর্জিনা। ইয়াহিয়া তাকে পার্সোনাল কেয়ারিং-এ না রাখলে রান্ডিবাজারে ডাম্পিং হয়ে খালাম্মার ডিউটি করতো। রাওয়ালপিন্ডির নও হেলাল অফিসার্স পার্টিতে রানীকে প্রথম দেখেছিল। পার্টিতে অনলি কাপলস এলাউড। স্পাউস ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। জুনিয়র অফিসারদের অবশ্যই বউ নিয়ে আসতে হয়। সিনিয়র জেনারেলরা এই রেওয়াজ মানেন না। জেনারেলদের নিকাহি বিবিরা এই পার্টি মাড়াতে চায় না। তাই তারা আসে লাহোর ইন্ডাস্ট্রির ফিলমি হিরোইন, মশহুর সোসাইটি গার্ল, সিঙ্গার, মুজরা ডান্সারদের বগলদাবা করে। সেগুলোর সঙ্গে খুনসুটি করে। আর শরাবে বুঁদ হয়ে থাকে। পার্টি সেন্টারের মাঝখানে থাকে বিশাল রুপালি-সোনালি এক বাক্স। সেটির মধ্যে ফৌজীবিবি আর জেনারেল সঙ্গিনীদের নাম ঢুকে যায়। তারপর চলে লটারি। একরাতের জন্য আওরতগুলো বিলিবন্টন হয়ে যায়। সিনিয়রিটি অনুযায়ী অফিসাররা গিয়ে একটা একটা নাম তোলে। যার হাতে যে নাম, ওই আওরত সারারাতের জন্য সেই পুরুষের ভোগ্যা। একরাতের জন্য যেমন ইচ্ছে স্ফুর্তি। টিক্কা খানের মদ ও মেয়েমানুষের আগ্রহ অন্য জেনারেলদের চেয়ে একটু কম। কামনাবাসনা মেটাতে জেনানা চাই। কিন্তু জেনানার পেছনে ছুটতে সে রাজি নয়। আর ইয়াহিয়া ঠিক উল্টো। নজরদোষের জন্য সে মশহুর। তার নজর কারও উপর পড়লে আর রক্ষা নেই। ঘোর মদ্যপ। কবে কোনরাতে কার সঙ্গে কোথায় শুয়েছে, কোনো হিসাব কখনোই রাখেনি। সেই কিনা বেগমরানীর খপ্পরে। বিষয়টা জানাজানি হয়েছিল সেবারই। রানীর নামও বাক্সে পড়েছিল। সেটা একটা বিগ্রেডিয়ারের হাতে উঠল। সে ফৌজীটাও খাস পাঞ্জাবি। লাহোরের খোশবাগের খাস খান খান্দান। শরাবে চুর হয়েছিল সেও। রানীকে কব্জায় পেয়ে ঠা ঠা করে হাসল। ডিয়ার সুইট লেডি বলে রানীর হাত ধরে টানলো। আর যায় কোথায়। ইয়াহিয়ার লাল রক্তচক্ষু। বললো, জুনিয়র, ইয়ে মাল তুমহারা কে লিয়ে নেহি হ্যায়। ছোড় দো।
বিগ্রেডিয়ার নাছোড়বান্দা। লটারিতে কপালগুণে পেয়েছে। নিজের বিবিকে অন্যের হাতে সঁপে দিতে মোটেও দ্বিধা করেনি। এই রান্ডি আওরতটা হোক না ফোরস্টার জেনারেলের রাতের সঙ্গিনী। তাকে সে ছাড়বে কেন। সে তো বেগম ইয়াহিয়া খানমের হাত ধরে টানাটানি করে নাই। না। কোনোক্রমেই ছাড়বে না।
শেষে সেই রাতে পাকিস্তান আর্মস ফোর্সেস-এর চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে প্রায় চুরমার। ফোরস্টার জেনারেল তার রানীকে ভোগ করতে দেবে না অন্যকে। বিগ্রেডিয়ারও তার মওকা হেলায় হারাবে না। সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ইয়ে রানী আসলি রানী নেহি হ্যায়। ইয়ে কোই জেনারেল কা আসলি বেগম নেহি হ্যায়। ইসকা আসলি নাম আকলিম আখতার হ্যায়। হীরামান্ডি মে, নেপিয়ার রোডকা রান্ডিবাজার মে মেয়নে ইসকো দেখা হ্যায়। দো ব্রথেল কা মালকিন হো। ক্যায়সি ইয়ে রান্ডি ইধার আয়া! রান্ডি তো রান্ডিই হ্যায় না!
ইয়াহিয়া সপাটে চড় কষে দিল। চোপ বেয়াদব। ইতনি হিম্মত! রানীকো তুম রান্ডি বলতে হ্যায়।
কোল্ট থেকে রিভলবার বের করে একদম কপাল বরাবর ঠেকালো। ট্রিগার টিপে দেয় আর কি!
অনেক কষ্টে দুই মশহুর মদ্যপের হুজ্জতি সেবার কন্ট্রোল করা গিয়েছিল। সেই থেকে রানীও রাওয়ালপিন্ডিতে ভয়ঙ্কর মশহুর। আস্তে আস্তে ফৌজী মহলে আতঙ্ক হয়ে উঠল। জুনিয়র অফিসাররা রানীর লাল নীল হলুদ শাড়ি-সায়াতে টুস্টার লাগিয়ে দিল। জন্ম হল জেনারেল রানীর। ফৌজী পার্টিগুলোতে খুব সাজুগুজু করে আসত। তার মহল থেকে সাজসজ্জা করে বেরুতে আড়াই তিনঘন্টা লাগিয়ে দিত। গোলাপি গাল রুজ পাউডার মেখে আপেলের মতো লালচে করতো। সাজসজ্জা মেকাপের জন্য তার আলাদা ডিভিশন রয়েছে। ঘাঘড়া পরতো নিজস্ব স্টাইলে। উপরে ছোট্ট কামিজ। নীচে পোলাজ্জো টাইপ পাজামা। আর উড়না হাতে একটা থাকত বটে। না থাকারই মতো। চুল বাধতো উঁচু খোপা করে। সেটির ওপর উড়না চাপিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতো। আর শাড়ি পরলে হালকা ফিনফিনে। মদ্যপায়ী হিসেবেও ছিল বহুত মশহুর। অনেকেই বলে, মদ্যপানটা সে ইয়াহিয়ার কাছে থেকে শিখেছে। রাওয়ালপিন্ডির কাছেই বিশাল তার মহল। সবার কাছে রানী মহল। সেখানে তার বেডরুমে নিজস্ব পানশালা। দুনিয়ায় এমন কোনো সুস্বাদু ও দামী শরাব নেই; যেটি তার তহুরা-তশতরীতে ছিল না।
এই রানী-আসক্ত চব্বিশ ঘন্টা মদ্যপ জেনারেলের হাতে যেদিন আইয়ুব খান ফৌজী কাপ্তানি দিল; পাকিস্তানের চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর কাম সদরে শাহী বানিয়ে নিজে পালাল, সেদিনই মিল্লাতে পাকিস্তানের দুর্ভাগ্যের সূচনা। একটা মদ্যপ আদৌ শেখ মুজিবকে সামলাতে পারবে কি! মুজিবটাইপ এনিমি বন্দুকের নলের প্রথম দেখাতেই ফায়ার করে দিতে হয়, এসব ইয়াহিয়াকে কে শেখাবে! ফায়ার এন্ড কিল এট দ্য ফার্স্ট সাইট। বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। কিন্তু ক্ষমতার উৎসব ততক্ষণ; যতক্ষণ সেই নল থেকে মরণঘাতি গুলি বেরুবে। অকেজো বন্দুক দিয়ে মসনদ রক্ষা হয় না। মুজিব যতই জিন্দা থাকবে, প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে উঠবে। শেখের জিন্দেগানি মানেই পাকিস্তানের পেরেশানি। বিশ্ব জনমত! কিসের কি বিশ্বজনমত! বিশ্ব জনমত মানেই তো হিন্দুস্থান আর রুশিয়া। একটা মালাউন; আরেকটা কমিউনিস্ট। এদের আবার কিসের মতামত। টিক্কা খান ঢাকায় বসে কেবলি আঙ্গুল কামড়াচ্ছে।
পঁচিশে মার্চের আগেই পশ্চিমের জাহান্নুমের দরোজা খুলে হাজার হাজার নরক-সিপাহী আনা হয়েছিল জাহাজভর্তি করে। মউতের দানব হয়ে তারা ছড়িয়ে গেছে সারা বাংলায়।
ধানমন্ডির আঠার নম্বর রোডের ছাব্বিশ নম্বর বাড়িটা বেশ নির্জন। সুনশান। বাড়ি তো নয়, গুদামঘর। পুরো ফ্লোর জুড়েই ধুলোর আস্তরণ। গাছের মরা পাতা। কাঁচের টুকরা। জানালা ভাঙা। কোনো জানালায় কপাটই নেই। হু হু বাতাস ঢুকছে। খাট, পালঙ্ক, বসার চেয়ার টেয়ার কিছুই নেই। মিলিটারি বহরটি মুজিব পরিবারকে এই পরিত্যক্ত বাড়িতে এনে তুলল। আস্ত একটা পরিবারকে ঠেসে ঢোকালো। আম্মা অনেকটাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাকে এবং তার পরিবারকে নিয়ে কি টানাহেঁচড়াই হচ্ছে।
হেনস্থার তো সবে শুরু। ফৌজীগুলো পুরো বাড়ির পাহারায়। কুড়ি-পঁচিশজন সশস্ত্র সৈন্য গেটে, বারান্দায় সঙ্গীন উচিয়ে দাঁড়িয়ে। কয়েকটার ভাবগতিক কেমন বেপরোয়া। তারা অস্ত্র তাক করে রইলো। পারলে এখনই ফায়ার করে দেয়। গুদামখানার যে চার্জে, সে পরিস্কার বলল- বাড়ি থেকে এক কদমও বাইরে বেরুনো চলবে না। উপরের কড়া অর্ডার আছে। কোনো অঘটন ঘটলেই স্পট-ফায়ারিং।
জামাল জানতে চেয়েছে, তারা হাউস এরেস্ট কি না। এখানে এভাবে ডাম্পিং করার মানে কি!
ফৌজীগুলোর মুখে রা নেই। কোনো জবাব দেয় না। কি ঘটতে চলেছে মুজিব পরিবারের ভাগ্যে, সবই অনিশ্চিত। মেজরটা কেবল বলে গেছে, দি ফ্যামিলি ইজ আন্ডার এরেস্ট। এই টুকুই।
এই বাড়িটা কি তবে কয়েদখানা। নাকি পরবর্তীতে এখান থেকে তাদের অন্যত্র নেয়া হবে, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। একটামাত্র কম্বল ছুঁড়ে দিল তারা। আরেকটা শূন্য হাঁড়ি। হাঁড়িটা কেন, ঠিক বোঝা গেল না। পুরো ভুতুড়ে বাড়িতে চালডাল দানা পানি কিছুটি নেই। সিদ্ধ পানি খেয়েই থাকতে হবে নাকি! আর এতগুলো মানুষ, একটা মাত্র কম্বলে ফ্লোরিং করবে কেমন করে!
প্রচন্ড ক্ষুধায় রাসেল কাতরাচ্ছিল। কি ই বা এমন বয়স! নিষ্পাপ শিশু। চারপাশে কি হচ্ছে; কেন হচ্ছে, ঠিক ধারণা করতে পারছে না। অনেকক্ষণ ধরে আশায় আশায় ছিল। কিছু না কিছু খাওয়া জুটবেই। যখন হাঁড়িটা এলো, রাসেল ছুটে গিয়েছিল। নিশ্চয়ই কোনো খাবার। ও আল্লাহ। এতো একদম খালি। খুব মন খারাপ হলো তার। তেষ্টা পেয়েছে প্রচণ্ড। কলঘরে গেল রেহানাআপুর পেছন পেছন। কিন্তু যেই না কলের ছিপিটা খুলল, অনেক ক্ষণ ঘড় ঘড় আওয়াজ। তারপর বেরিয়ে এলো ময়লাপানি। দেখে গা ঘিন ঘিন করে উঠল। তৃষ্ণার পানিও জুটলো না রাতে। আর সহ্য করা যাচ্ছে না। রাসেলের চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছে। কিছুতেই রুখতে পারছে না। জোরে কান্না করা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না। কতক্ষণ আর কান্না বুকে চেপে রাখা যায়। বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। বত্রিশ নম্বর বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে। একটু খাবারের জন্য এতটা কষ্ট আর কখনও করতে হয়নি তাকে। কান্নার শব্দটা বেশ একটু জোরেই বেরিয়ে যাচ্ছে গলা থেকে। কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না। হঠাৎ করে চোখের সামনে মুর্তিমান আজরাইলকে দেখতে পেল। একটা বিকট গোঁফঅলা সিপাই এসে তার ডান ডানাটা ধরল। টেনে হিঁচড়ে বারান্দায় নিয়ে গেল। ভয়ে আতঙ্কে নীল হয়ে গেল রাসেল। গাদ্দার! গাদ্দার কি বাচ্চে। কিউ রোতা হ্যায়। গুলি কর কে জবান বন্ধ কর দেগা।
জল্লাদটা তার মুখের মধ্যে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেয় আর কি!
আর কি কাঁদে রাসেল। কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে এসে মায়ের আচলের নীচে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মেজদাদা, রেহানা আপু, আম্মা, কাউকে কিছু বলার সাহস পর্যন্ত হলো না।

সারাটা রাত অভুক্ত রইল পুরো পরিবার। রাত তখন বেশ একটু গভীর। হঠাৎ ফৌজী গাড়ির শব্দ। হর্ন বাজাচ্ছে। ক্রাক ক্র্যাক ক্যাচ ক্যাচ আওয়াজ। কি হলো আবার। জামালদাদার পেছন পেছন এগিয়ে গেল রাসেল। শিশুমনের কৌতুহল।
খাবার এসেছে গাড়িতে। এক ডেকচি ভরা গরুর গোশত। সেটির ঢাকনা খুলে সিপাহিরা দেখছে। খাবারের তীব্র গন্ধে ভরে উঠল আঙিনা। আহ। কি সুস্বাদু সুগন্ধ। রাসেলের ক্ষুধা আরও চাঙ্গা। এলো ড্রাম ভর্তি পানি। এলো ডেচকি ভরা মোটা মোটা রুটি।
বারান্দায় খাওয়ার উৎসব। ফৌজীগুলো তাড়িয়ে তাড়িয়ে খাচ্ছে। আহ উহু শব্দ করছে। নির্জন নি:শব্দ বাড়িতে পাঞ্জাবিদের ভোজনের আওয়াজ তীব্রভাবে প্রকট হয়ে উঠছিল। ড্রামের পানিতে ওরা হাত ধুচ্ছে। মুখে পানি দিচ্ছে। পান করছে।
ম্রিয়মান রাসেল তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখল। তার জিহবায় এক ফোটা পানিও জুটল না।
আম্মাও প্রচন্ড অসুস্থ। ব্লাডপ্রেশারের রোগী তিনি। টানহেচড়া ধকল একদম সহ্য করতে পারেন নি। জ্ঞান হারানোর পর আর ফিরছেনা। তার মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছে না। হাসু, জামাল, রেহানা সবাই খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। জরুরি চিকিৎসা না দিলেই নয়। জামাল গিয়ে সিপাহিগুলোকে বলল। তারা শুনে খট খট করে হাসছে। জামাল একজন ডাক্তার আনার কথা বলল। ডাক্তার কিউ! ডাক্তার নেহি মিলেগা। না না। ডাক্তার আনার কোনো অর্ডার নেই।
জানোয়ারগুলো অজ্ঞান হওয়ার ব্যাপারটাকে অত্যন্ত সুখবর হিসেবে নিল। যখন তারা শুনল, মেডিসিন না পেলে জীবনাশঙ্কা দেখা দিতে পারে, তাদের হাসির ফোয়ারা আরও উচ্চগ্রামে উঠল। বলল, শেখ মুজিবকা বিবি লোগ মরনে সে কেয়া লোকসান। বুড়ি আউরত কো মরনে দো। জামালের প্রচন্ড রাগ হচ্ছিল। বাড়িটাকে ঘিরে কয়েকস্তর পাহারা। মাঝেমধ্যেই গুলিল আওয়াজ। মনে হচ্ছিল বাড়ি লক্ষ্য করেই ছোড়া হচ্ছে। কি চাইছে এই হায়েনারা। পুরো পরিবারকে ওরা মারতে চায়, নাকি ভয় আতঙ্কের মধ্যে নির্ঘুম রাখতে চায়। সারা শহরে কারফিউ। নিস্তব্ধ রাত। মাঝেমধ্যেই ফৌজী ট্রাক-জীপ সশব্দে রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। গুলির শব্দ; হাহাকার; হঠাৎ কান্না- রাতকে করে তুলেছে বড় বিপন্ন। সবাই অনাহারী। আম্মা জীবনাশঙ্কায়। কারও ঘুম নেই।
বাড়িটার বারান্দায় ফৌজীগুলোর উল্লাস আর অট্টহাসি। মুজিবকা বাচ্চে, বাহার আও তো ফায়ার কর দেগা। মুজিব মরে গা। মুজিবকা বিবি ভি মরে গা। হা হা।
জাহান্নুমের দরোজা খুলে গেছে। দলে দলে আজরাইল বেরুচ্ছে। কতল কতল, খতম খতম- জিগির তুলেছে মুখে। খুনপিপাসায় তারা উম্মাদ। উম্মত্ত। তাদের পেছন পেছন ইয়াজুজ মাজুজ জুটেছে। গোলাম দাজ্জাল বাহিনী আরও ভয়ঙ্কর।
সৈয়দপুর টাউনে পয়লা বৈশাখ এল মিল্লাতি জেল্লাহ আর অমাবশ্যার অন্ধকার নিয়ে। ইয়াজুজ মাজুজরা আগে থেকেই ছিল পূর্ন প্রস্তুত। বিহারিজিন্দানখানায় মাত্র কয়েকটা জিন্দা বাঙ্গাল পরিবার বন্দী। তাদেরকে নিয়েই মচ্ছব। বানচোত। গাদ্দার। শেখ মুজিবকা বস্টার্ড পয়দা। হারামজাদাগুলো জয় বাংলা বলেছিল। কমজাতগুলো রবীন্দ্রার হারাম-তারানা গায়। আমার সোনার বাংলা ধনে ধান্যে পুষ্পেভরা। ওদের পশ্চাদদেশে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিয়ে জয়বাংলা সোনার বাংলা ছোটানো হবে। শহীদ মিনার বানায়। মালাউনের জারজ পয়দা মালাউন। ইন্দিরা কা আউলাদ। পাকিস্তানশরীফের হারামখানায় নওরোজ, নববর্ষ পালন করছে। নাপাক করেছে মিল্লাতকে। অনেক দিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিল ইয়াজুজ মাজুজরা। এখন গোলাম পাকিস্তানির দাজ্জালি পয়দাপুঙ্গবরাও এসে জঙ্গে-খতমে শামিল। রংপুর থেকে আজহারুল সংঘ ছুরি কাচি দা বটি শানিয়ে নিয়ে এসেছে। হারাম জাত বাঙ্গাল। এমন শিক্ষা দিতে হবে পাকিস্তানশরীফে আর কেউ যেন জয় বাংলা, রবীন্দ্রার নাজায়েজ তারানা গাওয়ার সাহস না করে।
বাঙ্গাল মানেই হিন্দুস্থানি এজেন্ট। বাঙ্গালা একটা হিন্দুস্থানি জবান। হারামখোররা এই জবানে বাতচিৎ করে। উর্দু হচ্ছে জান্নাতি জবান। আরবীর সঙ্গে কত তালমিল। হারামজাদগুলো সেই জান্নাতি জবানকে তালাক দিয়েছে। পাকশরীফে কওমী-মিল্লাতি তারানা একটাই, পাক সার জামিন বাদ সাদ। কিশোয়ারে হাসিন সাদ বাদ। আর কোনো তারানা গাইলেই জিহবা কর্তন করা হবে। বে-জবান করা হবে হারামজাদাদের। আজহারুল ভাইয়ের স্পেশাল ফরমান। ফতোয়ায়ে খাস। কত বড় দু:সাহস। সৈয়দপুর টাউনে তারা নাপাক হারাম শহীদ মূর্তি বেদী করেছে। তাকে আবার ডাকে শহীদ মিনার বলে। যতসব পৌত্তলিক। বাল ছাল একুশে ফেব্রুয়ারি। আমার ভাইয়ের রক্তের রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি। এখন শরীফজাদা পাকিস্তান ফৌজ এসে গেছে। হারাম নাপাক হয়ে পড়া ইস্ট পাকিস্তান আবার হালাল জায়েজ হতে শুরু করেছে। ফৌজী বেরাদার, ছাত্র সঙ্ঘের কওমী নওজোয়ান লিডার আজহারুল ভাই, গোলাম পাকিস্তানির সঙ্গে কান্ধে কাধ মিলিয়ে ইস্ট পাকিস্তানকে পাক সাফ করতে হবে।নো কম্প্রোমাইজ। নো মার্সি।
পাকিস্তানকে পাকসাফ করার কাজ সৈয়দপুরে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই শুরু করে দেয়া হয়েছে। সৈয়দপুর বাংলা হাইস্কুল। সেখানে শহীদ-মূর্তি করেছিল বাঙ্গালরা। এবার ওদেরকে আর মালাউনী পূজা-অর্চ্চনা করতে দেয়া হয়নি। বিরাট একটা কওমী সাফল্য। শহীদ মিনারের পুরোটা জুড়ে ড্রাম কে ড্রাম মানুষের গু ঢেলে দেয়া হয়েছে। সারাটা জায়গায় মল আর মল। হা হা হা। আজহারুলের দারুন ব্রেন। স্কুলের কম্পাউন্ডেও মলে মলাকার। দুর্গন্ধ। তীব্র দুর্গন্ধ। পারলে কর এবার শহীদ মূর্তিপূজা। গাইতে পারলে গা হারাম একুশে ফেব্রুয়ারির তারানা। হা হা হা। হারামজাদাগুলো দল বেধে এসেছিল, হাতে ফুল। ফুলের মালা। মূর্তিতে দেবে বলে। গানও গাইতেছিল। কিন্তু স্কুল কম্পাউন্ডে এসেই সব সঙ্গীত থেমে যায়। কিসের কি পুষ্পদান; কিসের গান, দুর্গন্ধ আর মল দেখে সবাই ছুটে পালাচ্ছিল। দারুণ একটা কান্ড হয়েছে।
ইয়াজুজ মাজুজদের খতম অপারেশন সেই শুরু। আর থামে নাই।
গোলামসিপাহি আজহারুলের নখদর্পনে পুরো অপারেশন চলছিল। জামান মিয়া খুব বেড়েছিল। লিস্টের একনম্বরে ছিল তার নাম। এই হারামজাদা শহীদ মূর্তি বানানোর আসল কর্তা। তাকে হুশিয়ার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল সৈয়দপুর টাউনে শেখ মুজিবের কোনো খেলাফতি চলবে না। এটা আজাদ পাকিস্তান। এইখানে জয় বাংলা উচ্চারণ নিষিদ্ধ। মুজিবের বাস্টার্ড পোলাপানের মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ। একুশে ফেব্রুয়ারি নিষিদ্ধ। আজাদ টাউনে উর্দুই কওমী জবান। অন্যথা ঘটলে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়ানো হবে। জামান ফরমান শোনে নাই। শহীদ মিনারে মল ঢালার জন্য সে মেথর পট্টিতে গিয়ে খোঁজখবর করেছে। তার জানকবজ হয়ে যায় সেইদিনই। এরা জিন্দা থাকলেই পাকিস্তানের বিপদ। জামান আবার লোকজন নিয়ে ঘোঁট পাকাবে। জয় বাংলা বলবে। মুজিবগিরি করবে। বাঙ্গালদের একজোট করবে। বাঙ্গালদের আর একজোট হতে দেয়া যায় না। এখন কোনো ভয় নাই। পাকিস্তানকা গাজী ফৌজ এসে গেছে। জামানকে পাওয়া গিয়েছিল রেলস্টেশনের কাছেই। পাকিস্তানি নিশানবরদার নওজোয়ানরা মিছিল দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। সবার হাতে রাম দা। তলোয়ার। মুহুর্তেই কল্লাকাটা হয়ে যায়। গো গো করে কল্লাটা। তারপর একডজন জল্লাদ জামানের পুরো শরীর কেটে টুকরা টুকরা করে। গরুর গোশতের মতো কুচি কুচি করে।
আরেকদল উম্মাদ নওজোয়ান সারা টাউনে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগানে এলাকা কাঁপিয়ে তোলে। দল বেধে গাইতে থাকে পাকসার জমিন বাদ সাদ। তারা ন্যাশনাল এনথেম গাইছে আর শহরের ডাল কুত্তাগুলোকে খুঁজছে। এক একটা কুত্তা ধরছে আর তার মাথায় পাকিস্তানি চানতারা পতাকা বেধে দিচ্ছে। চব্বিশ পঁচিশটা কুত্তা যোগাড় হয়ে গেল। দেখনদার দৃশ্য বটে। সেগুলোকে তু তু বলে আকর্ষণ করে এবং তাড়িয়ে তাড়িয়ে রেলস্টেশনের কাছে আনা হচ্ছে। সেখানে তাদের জন্য নরমাংসভোজনের মহোৎসব অপেক্ষায়। কুকুরগুলো অনেকটা অস্থির। তারা সমস্বরে ঘেউ ঘেউ চিৎকারে মত্ত। অন্যদিকে নওজোয়ানরা পাকসার জমিন সাদ বাদ গাইছে কোরাসে। অদ্ভুত ভয়ঙ্কর সেই মুহুর্তগুলো। অবিশ্বাস্য।
জল্লাদখানায় জামানকে টুকরো টুকরো করা শেষ। নিপুন নৈপূন্যে তাকে খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছে। ডালকুত্তাগুলো অকুস্থলে আসতেই ছুড়ে ছুড়ে দেয়া হলো টুকরা। মাথায় চানতারা পতাকাবাহী সারমেয়রা পরমানন্দে ভোজনে লিপ্ত।
আর তাদেরকে ঘিরে পত পত করে উড়ছে পাকিস্তান। হাওয়ায় তুমুল গান, পাক সার জমিন বাদ সাদ।
পরবর্তী টার্গেট রহমান ফ্যামিলি। বিহারি জিন্দানখানায় বন্দী। আজহার কোম্পানির অর্ডার এসেছে ফ্যামিলিটাকে পয়লা বৈশাখের আগেই খতম করে দাও। ওরা যেন আর পয়লা বৈশাখ করে মরতে না পারে।
রহমান গোষ্ঠির বিরুদ্ধে মালাউনী আর মুজিবগিরির নানা কুকর্মের বিশাল ফর্দ রয়েছে। তার একটা কন্যা কমিউনিস্ট। ছাত্র ইউনিয়নের লিডার। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। আউরত জাতের একটা লজ্জা। একটা জেনানার পড়াশোনাই তো বেদাতি না-ফরমানি কর্ম্ম। তারউপর আবার কমিউনিস্ট। নাস্তিক। বেহায়া। ধর্ম্মকর্ম্ম করে না। আল্লাহ খোদা মানে না। এমন একটা মাইয়ে ছেলে পয়দা করাই তো রহমান মিয়ার দোজখি গুনাহ হয়েছে। এই মাইয়ে ছেলে তো তার জন্য কবরস্থানে আজাবে বারজাখের এন্তেজাম করে ফেলেছে। এই সৈয়দপুর টাউনকে তো সে নাপাক, হারাম করে ফেলেছে। এর একটা কঠিন পানিশমেন্ট হওয়া দরকার।
রহমান মিয়া নিজেও কম কিসে! সে একটা আস্ত বদমাশ। সত্তুর সালের ভোটে সে জয়বাংলা পার্টি করেছে। নৌকায় সিল দিয়েছে। সবাই যাতে নৌকায় সিল ছাপ্পড় দেয়, সেজন্য দৌড়বাজি করেছে। খুব ভোরবেলা গিয়ে ভোটকেন্দ্রে হাজির হয়। নৌকার জন্য তার জান যায়। রেলওয়ে কমিউনিটিতে ঘোষনা দিয়েছিল ভোটের দিন সে ফার্স্ট ভোটটা দিতে চায়। সবই চালবাজি। গভর্নমেন্ট সারভেন্ট। তাই চালবাজি করে জয়বাংলাগিরি করেছে। বাস্টার্ড সন অব শেখ মুজিব। আরও একটা গল্প তার সম্পর্কে মশহুর। সদরে ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে সে চরম বেয়াদবি করেছে। কওমের কত বড় গাদ্দার। ইয়াহিয়ার বক্তৃতা শুনে খুব চোটপাট করেছে। ইয়াহিয়া বলেছে পাকিস্তান জিন্দাবাদ। সে চেচিয়ে বলেছে পাকিস্তান মুর্দাবাদ। জয় বাংলা। কত বড় বেয়াদব। ইয়াহিয়ার প্রতিবাদে সে একটা রেডিও ছুড়ে ফেলে বাড়ির কম্পাউন্ডে। সেটি ভেঙে চুরমার হচ্ছিল তখন বেজে চলছিল পাক সার জমিন বাদ সাদ। ন্যাশনাল এনথেম বিকৃতভাবে বাজছিল। বিহারি জিন্দানখানায় থেকে এত বড় দু:সাহস। কোনোভাবেই তা সহ্য করা হবে না। ছাত্রসঙ্ঘের উর্দু-ক্যাডারদের কাছ থেকে আজহারুল যখন রহমান মিয়ার দুষ্কর্মের বিবরণ শুনছিল, তার বুকের ভেতর তখন আজরাইল গজরাচ্ছে। বেটার পুতের ঘাড্ডিখানা মচকানো না পর্যন্ত মোটেই শান্তি মিলছে না। লোকটা নাকি রেলকলোনীতে জয় বাংলা পতাকাও তুলেছে। রহমানের বাড়িটা দোতলা। কাঠের বারান্দা। সেই বৃটিশ টাইপের বাংলোঘর। বারান্দার বাইরে আর্থিং পাইপ। বজ্রপাত ঠেকানোর ব্যবস্থা। সেই পাইপের মাথায় সে চিকন বাঁশ লাগিয়ে শেখ মুজিবের মালাউন বাংলার লাল সবুজ পতাকা উড়িয়েছে। এত বড় আস্পর্ধা। তিন চারদিন পর্যন্ত হারাম নিশান নামায় নাই। বিহারীরা জোর জবরদস্তি করেছে। শোনে নাই। খতমের নোটিশ দিয়েছে। ভয় পায় নাই। এত সাহস ভালো না। যে সাহস দেখায় তার জন্য ভালো না। মিল্লাতি পাকিস্তানিদের জন্যও ভালো না। সাহস বড় সংক্রামক। একজন সাহসী মানুষ আরেকজনকে সাহসী করে। তার দেখাদেখি আরেকজন। এভাবে চক্রবৃদ্ধিহারে সাহসীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। বাড়লেই মহাবিপদ। ভীতু কাপুরুষদের বাঁচিয়ে রেখেও দমন করা যায়। কিন্তু সাহসীদের মেরেকেটেও দমন করা যায় না।
রহমান ছিলেন সেই বিরল গোত্রের মহান সাহসী। তিনি কেবল স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলনই করলেন না। প্রতিদিন সন্তানদের নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিতেন। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি গাইতেন। তিনি উচ্চস্বরে বলতেন জয় বাংলা। তার সাতটি সন্তান। তারাও সমস্বরে বলতো, জয় বাংলা। তিনি গাইতেন, ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা। তখন তার সন্তানরাও গাইতো সবাই মিলে। তার স্ত্রীও এসে গলা মেলাত। অত্যন্ত আবেগপ্রবন এই মানুষটা। নিজ হাতেই স্ত্রীর সাহায্য নিয়ে সেলাই করেছেন পতাকা। সবুজের মাঝে লাল সূর্য। গোল সূর্যের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র যখন একেঁছেন। অপরিসীম ভালোবাসায় কেবলি কেঁদেছেন। পতাকাটি যখন নীল আকাশের মাঝখানে অসীম ডানা মেলে পত পত করে উড়ত, অনেক ক্ষণ ধরে একাগ্রচিত্তে দেখতেন। তারপর তার চোখ ভরে আসত জল। তিনি ঘরের মধ্যে নামাজচৌকি বাইরে আনতেন। সেটির ওপর দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়তেন। দোয়া করতেন দুহাত তুলে। হে আল্লাহ, হে রব্বুল আলামিন, তুমি বাংলাদেশকে হেফাজত করো। তুমি শেখ মুজিবকে হেফাজত কর। তুমি আমার জান সদকা কবুল করো। শেখ সাহেবকে রক্ষা কর।
মানুষটা একগুয়ে একরোখাও বটে। সৈয়দপুর টাউনকে বিহারীরা জেলখানা বানিয়ে ফেলেছে। যে সব বাঙ্গাল পরিবার আছে তাদেরকে হত্যা করে চলেছে। প্রতিদিনই একটা একটা হত্যাকাণ্ড ঘটছেই। রহমান সাহেব নির্ভিক। ভাবলেশহীন। সন্তানদের বললেন, আল্লাহ আছেন সঙ্গে। যদি কপালে শহীদান লেখা থাকে হাসিমুখে মেনে নেব বাবা।
কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি বড় সঙ্গীন। বিহারী আর ছাত্রসংঘের পান্ডারা মিলে তাদেরকে ঘেরাও করে রেখেছে। বেরুলেই সপরিবারে খতম করবে।
আজহারুল নামে একটা কুলাঙ্গার বার বার শাসিয়ে যাচ্ছে, লিস্টে তোমাদের নাম আছে। সব খতম করে দেব। আজরাইলের খাতায় নাম যখন উঠে গেছে, বেশীদিন আয়ু নাই। যত পার জয় বাংলা গিরি করে নে।
রহমান সাহেব ঘাবড়ে যান নি। তিনি বদ্ধ ঘরে রীতিমত আত্মরক্ষার কেল্লা গড়ে তুললেন। সন্তানদের বললেন, শেখ সাহেব বলেছেন, যার কাছে যা আছে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। শত্রুর মোকাবেলা করতে। আমরা তাই করবো মা। আমরা তাই করবো বাবা। মরার আগে আমরা মরব না।
সন্তানরাও বাবার মতো সাহসী। বাবার কথায় তারাও উদ্দীপ্ত। লোহার পাত দিয়ে তীরধনুক বানালেন তিনি। সেগুলো দিয়ে সেগুনকাঠের ভারি দরজায় প্রাকটিসও চলছে। পাকিস্তানি হানাদার সেনা বা বিহারী চ্যালাচামুন্ডা যেই হামলা করুক না কেন কোনো ছাড় নেই। লড়াই করতে হবে। জীবনবাজি লড়তে হবে।
গিন্নিকে তিনি বললেন, সব সময় চুলায় গরম ফুটন্ত পানি রাখতে। প্রচুর পরিমাণ মরিচ গুড়ো করে রাখা হলো।
বাইরে আজহারুল কোম্পানি প্রস্তুত হত্যার উৎসবে। রহমান ফেমিলি প্রস্তুত আত্মরক্ষায়। লড়াইয়ের কৌশলও ঠিক করা হলো। বিহারী গং হামলা করলেই প্রথমে তীরধনুক দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরি করতে হবে। তার স্ত্রী ও সন্তানরাও উপর থেকে মরিচের গুঁড়া ও গরম পানি ছুঁড়তে থাকবে।
সব খবরই আজহার কোম্পানির কাছে যাচ্ছিল। সে সদলবলে হাসছে। খুব বাড়িছে শালার পুত। ওদের একটাকেও বাঁচতে দেয়া হবে না। বেটা মুজিব সাজিচ্ছে। মুজিবের খান্দানের আর আয়ু নাই। তাদের নাকের ওপর আজরাইল নাচতেছে ঢাকাতে। জমাতের পার্টি লাইনে খাস খবর আসছে তার কাছে। এই রহমান খান্দানেরও আয়ু শেষ। খুব বাড়িচ্ছে শালার পুত। জ্যান্ত মাটিতে পুতি দিব।
কিন্তু রহমান মিয়া কিসব তীরধনুক বানিয়েছে শোনা যাচ্ছে। খবরি খয়েস খান খবর নিয়ে আসছে, ওই বাড়িতে অতি গোপনে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হচ্ছে। বন্দুক, বোমা নিয়ে প্রাকটিস চলছে। রহমানের পোলাপান কইন্যা মুক্তির ট্রেনিং করছে। কী অসম্ভব আস্পর্ধা। খবরটা ক্যান্টনমেন্টে মেজর বাদশা খানকে দেয়া দরকার। সে একটা বিহিত ব্যবস্থা করুক। যদি মুক্তির আর্মস ট্রেনিং কা কেস হয়, সেটা আর্মিরাই দেখুক। রহমান মিয়াকে বিশ্বাস নাই। দেখা গেল, তারা যেতেই রহমানের পোলাপান তাদের ট্র্যাপ করলো। যদি কোনো শক্ত হামলা ওরা করে বসে, রহমান গোষ্ঠি তো মরেই আছে, কিন্তু মরার আগে যদি দুচারজনকে মেরে বসে, সেটা আজহারুলের ইজ্জত কা সওয়াল হতে পারে। বড় জিল্লতি হবে পাকীদের। রিস্ক নেয়াটা ঠিক হবে না। রহমানের ছোট্ট একটি স্যাবোটাজ বাঙ্গালদের দু:সাহস বাড়িয়ে দিতে পারে। বর্ডারের দিকে সাঁওতালরা নাকি খুব বেড়েছে। ঘায়েল করছে পাকিস্তানি ফৌজীদের। তাদের তীরধনুকে বিষ মাখানো থাকে। গায়ে লাগলে মরণ ছাড়া গতি নাই। রহমান মিয়া আবার সাঁওতাল দিয়ে কনভার্টেড কি না কে জানে। তার কাছে তীরধনুক আসলো কোথা থেকে। আজহারের জানার বাইরে তবে কি কিছু ঘটে চলেছে। খবরিরা সঠিক খবর আনতে পারছে তো। রেল কলোনি এখন রহমানের জন্য জিন্দান ছাড়া কিছু নয়। সেখানে বসে তার তো স্বাধীনতা ঘোষণার কথা নয়। সে নাকি চানতারা পতাকায় আগুন দিয়েছে। স্বাধীন বাংলার বদখত নিশান উড়িয়েছে। কোথাও একটা ভুল হচ্ছে গুরুতর। তাদের অগোচরে অন্তরালে বাঙ্গালরা জঙ্গ প্রস্তুতি নিচ্ছে মনে হয়। মেজর বাদশা খান বালুচিস্তানের বাসিন্দা। খবর পেয়েই সে ছুটলো। রহমানের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল। কিন্তু সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করেও কিছু পেল না। রহমান পাকিস্তানের গভর্নমেন্ট অফিসার। বালুচি তাকে তমিজ দেখিয়ে ফিরে এলো। আজহারুল সঙ্গে সঙ্গে ছিল ফৌজীদের। খুব হতাশ হলো সে। আশ্চর্য! স্বাধীন বাংলার নিশানটা পর্যন্ত পাওয়া গেল না। এই না-মর্দ বালুচি নিয়ে যাওয়াই ভুল হয়েছে। বালুচিদের পাকিস্তানী ফৌজে নেওয়াই ঠিক নয়। অপারেশনে যখন যাবি, হ্যান্ড মাইকিং করে কেউ কি যায়! বলদের বলদ। মাইকিং শুনেই তো রহমান সব অস্ত্র ভোজবাজির মতো উধাও করে দিয়েছে। রহমান খুব ঘড়েল মাল। একটা বালুচি মেজরকে যদি বলদ বানাতে না পারে, কিসের সে বাঙ্গাল মুবি সৈনিক। বালুচিরা এখনও জাতে উঠতে পারে নাই। কি একটা নেতা ওদের ছিল। তার নামও তো ছিল বাদশা খান। তার টাইটেল ছিল নাকি সীমান্ত গান্ধী। মালাউন গান্ধীর নাকি পরম ভক্ত। এইগুলা এখনও জাতে উঠতে পারে নাই।
বাদশা খানকে বলদ বানাতে পারলেও আজহারকে বোকা বানাতে পারবে না। রহমানের বিরুদ্ধে যা অ্যাকশন জলদিই নিতে হবে। এজন্য জবরদস্ত প্লান দরকার। ওদের কোনো প্রস্তুতিই নিতে দেয়া হবে না।
তখন রাত এগারটা। মসজিদের লাশবহন করার কাঠের খাটিয়া; তার উপর কালো চাদর। চাদরে সোনালী সব কারুকাজ। চারটে মানুষ বহন করছে খাটিয়া। তাদেরকে ঘিরে কয়েকশ মানুষ। সবাই উচ্চস্বরে জিকির করছে, নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর। একজন হ্যান্ড মাইকে বলছে, পাকিস্তান, পাকিস্তান, অন্যরা বলছে জিন্দাবাদ পায়েন্দাবাদ। ভীষন শোরগোল। রেলকলোনীতে হট্টগোল। কাঠের বাড়িগুলো আওয়াজে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
খাটিয়া নিয়ে কোথায় যাচ্ছে এরা। খাটিয়ার ভেতরেও বা কি! কখনও ওরা আওয়াজ দিচ্ছে ইয়া হোসেন, ইয়া হাসান বলে। আশ্চর্য! এরকম লাশবহর দেখা যায় না কখনও। মুর্দার খাট হলে দোয়া দরুদ পড়বার কথা। কলেমা পড়ার কথা। কিন্তু এরা যে চেঁচিয়ে মাত করেছে এলাকা। মিছিল যত এগুচ্ছে বিহারী বহর বাড়ছেই। এরা কোনো কিলিং মিশনে যাচ্ছে কি! কিন্তু সবাই নিরস্ত্র। অন্য সময় ওদের হাতে খোলা তলোয়ার, রামদা, কিরিচ, বেয়োনেট অলা বন্দুক দেখা যায়। আজ কিছুই নেই। হাতে ও মাথায় কেবল কালো পট্টি বাধা। আজ কারও শিরস্ত্রানে পাকিস্তানি পতাকাও নেই। কৌতুহলী বিহারী জানতে চাইছে, কেয়া হুয়া। গলতি ক্যায়া।
জবাব আসছে, হসপিটাল মে বিহারী শহীদ ভাইয়ো কা মুর্দা হ্যায়। গাদ্দার মুজিবকা বাচ্চে সাওতাল লোগ তীর মার কর খুন কিয়া।
হাসপাতালে সেই লাশ আনতে যাচ্ছে। কিন্তু মিছিলের যাত্রা হাসপাতাল মুখো নয়। এরা কি তবে পুরো শহরকে গরম করে তারপর লাশ নিয়ে হৈহাঙ্গামা বাধাবে।
আজহারুল বিকট মুখ ব্যাদান করে মিছিলের সঙ্গী। তার উত্তেজনা চোখ মুখ ছিড়ে বেরুচ্ছে। সে শ্লোগান দিচ্ছে, পাকিস্তান কা গাদ্দার, মার দে মার দে।
ইয়া হোসেন, ইয়া হাসান ধ্বনির মধ্যে তার শ্লোগানটা বিশেষ জমছে না।
রহমান মিয়া নামাজ চৌকিতে ছিলেন মশগুল। ইবাদাত বন্দেগি করছিলেন। এশার নামাজ পড়েছেন। কদিন ধরে তিনি বেশী বেশী ইবাদত করছেন। নফল নামাজ পড়ছেন। তার উচ্চারণ অতি সুমধুর। দরদী গলায় যখন তিলাওয়াত করেন, এক জান্নাতি পরিবেশ সৃষ্টি হয় সারা বাড়িতে। ছেলেমেয়েরা মুগ্ধ হয়ে বাবার তিলাওয়াত শোনে। ছেলেমেয়েগুলো সবাই বাড়িতে। তিনি সূরা আজ রাতে সূরা বনি ইসরাইল তিলাওয়াত করছেন। অনেক বড় সূরা। সারা বাড়িতে যেন জান্নাতের স্বপ্নময় সুর এক মায়াবী ইন্দ্রজাল তৈরি করেছে। বাবা যখন কালামে পাক তিলোয়াত করেন, ছেলেমেয়েরা কেউ শব্দ করে না। বাড়িটা থাকে সুনসান। নি:শব্দ। আশে পাশের বাড়িতেও তার কণ্ঠের যাদু ছড়িয়ে পড়ে। বাবা খুব আবেগ আক্রান্ত হয়ে পড়েন এই সময়। তার চোখ বেয়ে অশ্রু দরদরিয়ে বেরিয়ে আসে। কেন কাঁদেন বাবা। বড় কন্যা জানতে চেয়েছে যখন তিনি বলেছেন, মাগো, যখন কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করি, মনে হয় যেন আল্লাহর আরশের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি আলোক বর্ষ দূরে থেকে তার আরশের দিকে কায়মনোবাক্যে তাকিয়ে আছি। আলোয় আলোয় ভরা এক নূরানি জগত যেন দেখতে পাই। সেই নূর যেন ঝলসে দিচ্ছে আমার চিত্ত। সারা জগত আলোয় আলোয় ভেসে যাচ্ছে। মধ্যরাতে আলোর বন্যায় উদভাসিত বিশ্বমন্ডল। অসাধারণ এক অনুভুতি আম্মা। আনন্দে বিস্ময়ে বুঝি আমার চোখে পানি আসে মাগো।
আজ কি আব্বা সত্যিই ভুবন প্লাবী আলোর ঝরনাধারা দেখতে পাচ্ছেন। তার মুখে অদ্ভুত এক আভা। কণ্ঠে ভুবনভরা শিহরণ তোলা অলৌকিক উচ্চারণ।
ওয়া কা-দা-ইনা ইলা বানী ইছরা ইলা ফিল কিতা-বি লাতুফ ছিদুন্না ফিল আর দি মার-রা তাইনি ওয়া লাতা লু-ন্না উলুওও-আং কা-বি-রা।
বাবার তিলাওয়াত সুরের ঝরনাধারা তুলেছিল। জান্নাত থেকেই বুঝি মেঘমল্লারে ভেসে ভেসে তার কণ্ঠ নেমে আসছে ধুলির ধরনীতে।
ফাইযা জা আ ওয়াদু উলাহুমা বা- আছনা.. .. ..
আব্বা আর শেষ করতে পারেন নি, এমন সময় রোজ কেয়ামত বুঝি শুরু হয়ে গেল। বাঁশির ভয়ংকর শব্দ। হুইসেল। হ্যান্ড মাইকে পাকিস্তান পাকিস্তান লোমহর্ষক বিভৎস সব শ্লোগান। মুহুর্তেই সব লণ্ডভণ্ড। শাদ্দাদের ফেরাউনরা উঠানে এসে ভয়ংকর শোরগোল তুলেছে। নরক গুলজার। জান্নাতের আবহ মুহূর্তেই দোজাখে বারজাখ।
আজহারুল বিকট গলায় চেঁচাচ্ছে, ওই মুজিব কা জাউরা বাচ্চা, বেরিয়ে আয়। আজরাইল আসছে দেখ। আজকে তোর জান কবজ করবো। হারামজাদা মুসলমানের হারাম আওলাদ। তোর নামের আগে শ্রী লাগাইছোস। ওই শ্রী রহমানের বাচ্চা, বাইরে আয়।
তোর জন্য মউতের খাটিয়া নিয়া আসছি। এই খাটিয়ায় তোর গোষ্ঠির লাশ নিয়া যাব।

রহমান ফ্যামিলি কিছুক্ষণ আগেও জান্নাতে ছিল। এখন ঠিক জাহান্নুমি জল্লাদদের মুখে পড়েছে। কোনোরকম প্রস্তুতির সুযোগ পেল না। সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়।
বাড়ির কম্পাউন্ডের ভেতরে নীচতলায় আলো আধারি। সেখানে খটাশ করে খাটিয়াটা ফেলল। কালো হিজাবটা হ্যাঁচকা টানে তুলল কয়েকটা জোয়ান। খাটিয়া ভর্তি অস্ত্রের মজুদ। তলোয়ার, রামদা, নকশাদার ছুরি- চক চক করে উঠল। পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে সেগুলো হাতে হাতে তুলে নিল আজহারুলরা।
কলোনির বাড়িগুলো বেশ অন্ধকার। বেশ কিছু বাড়ি একদম খালি। অন্যরাও আছে গুটিয়ে। আলো নিভিয়ে এমনভাবে থাকে, যেন বাড়িতে কেউ নেই। কয়েকটা হ্যাজাক বাতি জ্বলে উঠল। নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর। বেশ কয়েকটা মশাল জ্বলে উঠল। নীচতলায় সেগুনকাঠের ভারি দরজা। কেরোসিন তেলে ভেজানো হলো সেটি। জ্বালানো হল আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলছে। কেরোসিনের বিশাল বিশাল দপ দপ বিষ্ফোরণ। কয়েকশ জল্লাদ ফেটে পড়ছে উল্লাসে। লালহলুদ অগ্নিশিখায় হাস্যরত মুখগুলো বড় বিভৎস।
বাবার তিলাওয়াত তখনও চলছে। আম্মা দরুদশরীফ পড়ছেন জোরে জোরে। সন্তানদের বললেন, দোয়া ইউনুস পড়তে। মাছের পেটে আটকা পড়েছিলেন নবী। এই দোয়া পড়েই মিলেছিল পরিত্রান।
রহমান সাহেবের দোতলা ঘরটির বাইরে হায়েনাদের ভয়ঙ্কর হাসির ফোয়ারা। ভেতরে সবাই কোরআন শরীফের শরণাপন্ন। সুরা পড়ছেন। দোয়া পড়ছেন। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করছেন। জল্লাদদের উল্লাসের আগুনে বাবার তিলাওয়াত যে ব্যঞ্জনা তৈরি করলো, এমনটা কেউ কখনও শোনেনি। আজহারুল খুব খেপে গেল। তাদের পাকিস্তান জিন্দাবাদ আওয়াজ কিছুতেই রহমানের তিলাওয়াতকে চাপা দিতে পারছে না। তাদের জাহান্নামি আগুন কিছুতেই জয়বাংলা পরিবারটিকে ভয় দেখাতে পারছে না। তাদের শাদ্দাদি উল্লাস কিছুতেই রহমানকে দুর্বল করতে পারছে না। বরং সে তখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে কোরআনের আয়াতে আওয়াজ দিয়ে চলেছে। লম্বা একটা তলোয়ার নিয়ে অগ্নিদগ্ধ দরোজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল আজহারুল। সিঁড়ি ভেঙে উঠল দোতলায়। রহমানকে পেল সামনেই। নামাজচৌকিতে বসা। এক ছুটেই তার পেছনে থেকে বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল সে। এই তিলাওয়াত অসহ্য লাগছে তার কাছে। মনে হচ্ছে তার কানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কেউ। এই হারামজাদার তিলাওয়াত বন্ধ করতেই হবে। জয়বাংলা লোক, মুজিব কা বাস্টার্ড আওলাদ কোরআন পড়ছে, এটা ভীষণ কর্নপীড়াদায়ক। তলোয়ার টেনে বের করলো। ছলকে রক্তের ঝরনা বেরিয়ে এলো। লোকটার কন্ঠ নালি ভেদ করে তলোয়ারটা ঢুকিয়ে দিল আবার। বল হারামজাদা, পারলে জয় বাংলা বল।
তলোয়ারর ফলাটা গলার পাশ থেকে গেল।
রহমান সাহেব অতিকষ্টে আজহারের দিকে তাকালেন। বললেন, জয় বাংলাও বলব। কলেমা পড়েও মরব। কোনো কিছুই ঠেকাতে পারবি না তোরা। তুই যেদিন মরবি, কলেমা পড়ার সুযোগও পাবি না।
আবার তলোয়ারটা সামনে থেকে কণ্ঠনালি বরাবর ঢুকিয়ে দিল। এবার আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। রহমান সাহেব কথা রাখলেন। অন্তিম মুহুর্তেও তিনি বললেন, জয় বাংলা। বললেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ.. .. ..। নামাজ খাটিয়ায় লুটিয়ে পড়লেন রহমান। তার স্ত্রী ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরতেই একদল হায়েনা ছুটে আসল দোতলায়। রহমানকা আউরত। গনিমতকা আউরত। লে লো।
হাতে হাতে তাকে তুলে নিল জল্লাদরা। প্রথমে তাকে জলন্ত সেগুন কাঠের আগুনের মধ্যে ছুড়ে মারল। তার শাড়িতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।
আম্মা দৌড়ে দিয়ে পানি ভর্তি চৌবাচ্চার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। রেহাই মিলল না। চৌবাচ্চার মধ্যে তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করল ওরা। রক্তে লাল হয়ে গেল হাউজের জল। আয়াতুল কুরসি পড়ছিলেন তিনি। আজহারের কানে তা শেলের মতো বিঁধছিল। বার বার সে বলছিল, মাগিটার গলায় কোপা। মাগিটার গলা কাট দো। পানির মধ্যে আম্মা পিছলে যাচ্ছিলেন। তীব্র যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি।
দোজখের সিংহ দরোজা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে আজহারুল কোম্পানি। রহমান সাহেবের তিন পুত্রেরও রেহাই মিলে নি সেরাতে।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাত। গাঢ় নিকষ গভীর অমানিশা শহরজুড়ে। কুয়াশার ঢল অন্ধকারকে করেছে আরও তীব্র। ইয়াজুজ মাজুজরা পিল পিল করে বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়। নরকের অতলান্ত পিপেটা তৈরি করা হয়েছিল টন কে টন ইস্পাত ও লোহা গলিয়ে। কাজ হয়নি তাতে। অবিরাম চর্বনে বিনাশ করেছে লোহার বেষ্টনী। আগ্নেয় দম্ভে ভর করে বুকে ঠেলে তারা এগুচ্ছে। চোখে সাপের জিহবার মতো চঞ্চল চাহনী। ট্যাঙ্কের গিয়ার-হুইল পায়ে দাবড়ে এগিয়ে চলছে সামনে। রাতের তীব্র ঘুম-নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান। পিচের রাস্তায় লোহার চাকার ঘর্ষণ। আগুনের ফুলকি ছুটছে।
ফারুকের জিহবাটা আধখানা বেরিয়ে পড়েছে মুখের বাইরে। লালা ঝরছে। বারবারই জিহবাটা ভেতরে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে সে। নিতেই পারছে না। সফরসঙ্গী আরমার সেপাইটা মহাবিস্ময়ে তাকে দেখছে। আধখানা জিভ বের করা মানুষ কখনও সে দেখে নি। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। কয়েকবার আঙ্গুল দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেও বসকে ব্যপারটা দেখাল। বলল, স্যার, জিভখান ভিতরে ঢুকাই লয়েন। আন্ধারে ইয়াজুজ মাজুজের মতো আপনারে লাগতাছে।
ইয়াজুজ মাজুজ! প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেল ফারুক। বলে কি এই বাস্টার্ড পেটি সেপাই। একটা লাত্থি মেরে আন্ডা ফাটিয়ে দেয়া জরুর মনে হচ্ছে তার। হারামজাদা আবার দাঁড়িয়াল। বিশাল দাড়ির বহর। ভণ্ড। আস্ত ইবলিশ।
অর্ডারলি গলায় বললো, ইয়াজুজ মাজুজ! হোয়াট ইউ সে বিয়ার্ডেড মুল্লাহ।
সিপাইটা অতি বিয়াদব। বললো, ইয়াজুজ মাজুজের নাম শোনেন নাই! আপনি না মুসলমান। আপনারে দেইখা সেই দাফনি জন্তুর চেহারা মাথায় আসতেছে। আপনি কি দুইন্নাটারে চাইটা খাইবার জন্য কোথাও যাইতেছেন। জিহবা ঢুকান মিয়া। কুৎসিত লাগতেছে দেখতে।
তাকে কি পাল্টা ধমক দিল লোয়ার ডিভিশন সিপাইটা। রিভলবারটা বের করল ফারুক। দুম করে গুলি করতে যেতেই দেখল, কই কেউই তাকে কিছু বলছে না।
সে কি তবে বিভ্রমে ভুগছে। এইরকম একটা অপারেশন সার্চলাইটে নামার মুহূর্তে এমন আলভোলা থাকলে চলবে না। আশ্চর্য। কে তবে বলল কথাগুলো। কন্ট্রোল। কন্ট্রোল মেজর, কন্ট্রোল ইয়োর সেলফ।
কিন্তু জিহবাটা নিয়ে কি করবে। তার নিজেরই তো মনে হচ্ছে, জিহবাটা ঝুলে গিয়ে থুতনিতে গিয়ে লাগছে। সত্যিই কি তাকে ইয়াজুজ মাজুজের মতই দেখাচ্ছে।
বিকার কাটছেই না। তাকে অবশ্য জরাগ্রস্ত করেছে সেই গুমনাম পীর। মার্জার পীর। সারাক্ষণ বেড়াল হয়ে হাঁটে। সব নাকি সে টের পায়।
মার্জারের হুজরায় ফারুক গিয়েছিল। রশীদ মার্জারের মুরীদ। অতিশয় ভক্ত। রশীদ বলেছিল, সে পীরের তাবিজ নিয়েছে। কবজ দেয়া তাবিজ। যতক্ষণ সেটি সঙ্গে রয়েছে গুলি ছুরি বোমা কোনো কিছুই দেহভেদ করতে পারবে না। ভয়ঙ্করী। ধন্নত্বরী।
কিসের আন্ডার তাবিজ। সৈনিকের আবার তাবিজ কিসের। ফারুকের তিক্ত-জবানে রশীদ হেসেছিল। সব অপারেশনে লাগে না। কিন্তু যে অপারেশনে আমরা যাচ্ছি, কবজ চাই। সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য কঠিন কবজ দরকার।
রশীদের পীড়াপিড়িতে শরণাপন্ন হয়েছিল ফারুক। মার্জার পীর ভড়কে দিয়েছে তাকে। ছোটখাট একটা রিলিজিয়াস ভাইবা নিয়ে নিল। ইয়াজুজ মাজুজ কি দেখেছেন।
ইয়াজুজ মাজুজ! হোয়্যার আর দে স্টে!
নাম নিশ্চয়ই শোনেন নি!
আর দে এরাবিয়ান! এই শব্দটা এরাবিয়ান বলেই মনে হচ্ছে।
পীর হাসেন। আমার শিয়ামিজ বিড়াল দুটি ঠিকই নাম শুনেছে। ওই দেখুন আপনার অজ্ঞতায় তারা হাসছে। এলাস। ইউ আর রিয়েলি ইগনোর্যা ন্ট এবাউট ইয়াজুজ-মাজুজ! হোলি কুরআন সেস এবাউট দেম।
হুজুর দেখি ইংরাজিও কচলাচ্ছে।
ফারুক অবাক হয়ে দেখল বিড়াল দুটি সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। খিল খিল হাসি। কেবল শব্দটা নেই। ভঙ্গিটা অবিকল। ফারুক বিস্মিত। সে কোনো ফ্যান্টাসির মধ্যে ঢুকে পড়েছে কি না। বিড়ালের হাসি, সেটা কেমন করে সম্ভব। অথচ চোখের সামনে সেটাই জলজ্যান্ত বাস্তব।
পীরের বদনে স্মিত হাসি। বললেন, ইয়াজুজ মাজুজ আরব্য মিথ। পবিত্র কোরআনও স্বীকৃতি দিয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে আরব-সেমেটিক বিশ্বাসের প্রাণী। তারা মানুষ। ইয়াজুজ মাজুজ সম্প্রদায় হযরত আদম আলাইহিসসালামের বংশধর। তারা রোজ কিয়ামতের আগেই পৃথিবীতে অভ্যুত্থান ঘটাবে।
তারা অজ্ঞাত স্থান থেকে বিকটভাবে বেরিয়ে আসবে। জুলকারনাইন নামে এক বাদশা ছিলেন। সেই বাদশা সাহেব তাদেরকে এখনও প্রাচীর দিয়ে আটকিয়ে রেখেছেন। তাদের পায়ে জুতো নেই। হাতে তেমন কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই। কেবল আছে অনি:শেষ ক্ষুধা। টন কে টন লোহা গালিয়ে বানানো সেই জুলকারনাইনের প্রতিরক্ষা-দেয়াল।
ঐ প্রাচীর ভেঙ্গে তারা যেদিন বেরিয়ে আসবে। সামনে যা পাবে সব খেয়ে ফেলবে। তারা অসীম ক্ষুধার্ত। তাদের প্রথম দলটি দজলা ফোরাতের পানি খেয়ে শেষ করে ফেলবে। অন্য দল এসে বলবে, এখানে কোনো একসময় নদী ছিল। তাদের সাথে কেউ লড়াই করতে পারবে না। সবাই মহা-আতঙ্কে ঘরে বসে।
আয়াত-উল-কুরসি পড়বে। হত্যার নেশা পেয়ে বসবে তাদের। মুরুব্বিদের হত্যা করবে। নারী ও শিশুদের হত্যা করবে। গর্ভবতী নারীও তাদের রক্তগ্রাসী জিহবা থেকে রেহাই পাবে না। উম্মত্ত হত্যার নেশায় তারা নিজেদের মধ্যেও রক্তের ধারা বইয়ে দেবে। বিশ্বাসঘাতকতা, বেঈমানির দুর্ধর্ষ সব নজির রেখে তারা আত্মশ্লাঘা বোধ করবে। রক্ষক, আশ্রয়দাতাকে তারা হত্যা করবে। জীবনদাতাকে হত্যা করবে। কে কার চেয়ে বড় নিষ্ঠুর এবং বিশ্বাসঘাতক তা নিয়ে গর্ব ও অহঙ্কার করবে। কিন্তু এই প্রবল উত্তেজনা তাদের সাময়িক। তারা অমর নয়। এক সময় তারা এক পাহাড়ের সন্নিকটে গিয়ে বলবে, দুনিয়াতে যারা ছিল তাদের হত্যা করেছি। এখন আকাশে যারা আছে তাদের হত্যা করব। তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাদের তীরে রক্ত মাখিয়ে ফেরত পাঠাবেন।
রক্তপাতের বিভীষিকায় তারা অভিশপ্ত হবে।
তাদের স্কন্ধের দিকে এক প্রকার দেহখেকো পোকা জন্ম নেবে। তাদের ধ্বংস অনিবার্য। তাদের লাশ পরম ঘৃণ্য হবে। কেউ শোক করবে না। তারা সবাই মারা যাবে। তাদের দেহ পঁচে দুর্গন্ধ হবে। তাদের জিহবা বের হয়ে আসবে। সারা পৃথিবী জুড়ে তাদের লাশ থাকবে। শকুন ভক্ষণ করতেও ঘৃণা বোধ করবে।
ফারুক ভীষণ বিরক্ত। এ পাগলাটে পীরের কাছে রশীদ কেন তাকে পাঠাল। কিসব ছাগলা কথাবার্তা সে বলছে।
ইংরাজিতে সে বলল, এই আরব্য মিথ আমাকে কেন বলছেন! আমি কেন এসেছি, নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে।
দুটি বিড়াল মিউ করে ওঠে।
পীর একদৃষ্টিতে বিড়ালের দিকে তাকিয়ে। ইয়েস, রশীদ সাহেব সবই আমাকে বলেছেন।
এই মিথলজি কি রশীদকেও শুনিয়েছেন।
না। বলি নাই। তিনি নিজেকে সর্পশীতল মনে করলেও আসলে অতি অ্যারোগ্যান্ট। অতি ভয়ংকর খুনীরা অতি শীতল হয়। তাদের দৃষ্টি হয় ঠান্ডা ও সাদা। কথা বলে কম। তারা তাদের মনের ভার নি:শব্দ খুন-খারাপির মধ্যে দিয়ে লাঘব করে। আর ভালো মানুষরা অনেকেই হয় কথাবীর। তিক্ত কথা বলেই মনের ভার লাঘব করে। রশীদ হচ্ছে প্রথম ক্যাটাগরির। তার জন্য অপেক্ষা করছে অতি বিভীষিকাময় ভবিষ্যত। তার পুরো পরিবারকে সেই স্কন্ধের পোকা চেটেপুটে খাবে। বেঁচে থাকা তার জন্য হয়ে উঠবে জীবন্ত কবর। তার কন্যারাও তার বন্ধু ও অনুজদের ভোগ্যা-রক্ষিতা হয়েও রেহাই পাবে না।
তাহলে এসব কথা আমাকে বলার কারণ!
বিড়ালের গলায় হাত বোলান পীর। বিড়াল তার হাতে চুমু খায়। বিরল দৃশ্য। এসব কি সত্যিই ফারুকের সামনে ঘটছে।
মেজর সাব, ইয়াজুজ মাজুজ কেবল মিথ নয়। এটা আরব্য নীতিকথা। ফেবলস। এসবই প্রতিকী উপদেশ। সব ধর্মেই আছে। পীরদের পকেটে পিস্তল নেই। রাগ প্রচণ্ড হলে পিস্তল দিয়ে বিরাগভাজনের খুলি উড়িয়ে দেয়ার জঙ্গী খায়েশ পীরের নয়। পীরকে নীতিকথা-ফেবলস-এর আশ্রয় নিতে হয়। সেসব বলেই সমস্যাকে আন্দাজ ও তার প্রতিকার বাতলাতে হয়।
ফারুক অবাক। পীর কি টের পেল, তার তো সত্যিই এখন প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল, পীরের মাথায় গুলি করে। খুলি উড়িয়ে দেয়। কেবল রশীদের কথা ভেবে পারছে না। নিজেকে সম্বরণ করে ফারুক।
আপনার ফেবলসের উপসংহার শোনার ইচ্ছে আমার নেই। কবজ তাবিজ দিন। আমি চলে যাই।
পরিনতি ও ফলাফল না বলে তাবিজ দিয়ে আমি আপনাকে ঠকাতে পারব না। পীরের উসুল অবশ্যই রক্ষা করতে হবে আমাকে।
বলুন! কি আমাদের ফলাফল। মহাবিরক্তি চেপে ফারুক বলল।
আপনারা যে কর্ম্মটি করতে চলেছেন, সেটির ফলাফল এই ফেবলসে রয়েছে। আপনাদের উত্থান ঘটবে আকস্মিক। আপনারা আচম্বিতে মহাপরাক্রম দেখাবেন। ধরাকে সরা জ্ঞান করবেন। আপনাদের জিহবা লক লক করে সব গ্রাস করতে চাইবে। রক্তের দরিয়া বইয়ে লোহু আপনারা চাটতে চাইবেন। কিন্তু আখেরে সর্বনাশ।
সর্বনাশ মানে!
আখেরে শেষ রক্ষা হবে না। আপনারাই আপনাদের সঙ্গী-সাথী-ইয়ার-দোশতদের একলাইনে দাঁড় করিয়ে ফায়ার করে খুন করবেন। জানে-ইয়ারকে খুন করবেন। জীবনদাতাকে খুন করবেন। আপনার এক মাজুজ জেনারেল নিজের জীবনদাতা-জ্ঞাতি-গোষ্ঠি-বন্ধু-বান্ধবকে খুন করতে করতে নমরুদের মতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। ঠান্ডা খুন হয়ে উঠবে তার নিত্যনেশা। ভয়ের নেশায় সে কাবু করে রাখবে সবাইকে। শেষ রক্ষা তার হবে না। কঠিন মৃত্যু হবে। তার লাশ নিয়ে মহাতামাশা হবে। প্রহসন হবে। কেউ খুঁজে পাবে না তার লাশ। ছিন্নভিন্ন হবে সে সহকর্মী-পরম বন্ধুর হাতে। বিনষ্ট হবে। স্টেনগানে এমনই ঝাঁঝড়া হবে, তার সেই নষ্ট দেহের দিকে তাকানোর মতো মায়াবান পুরুষ কিংবা মায়াবতী নারী খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও। তার মা-ও তার লাশ দেখতে বিবমিশা বোধ করবে। সবই তার কর্মফল। যেমনটা সে করেছিল পিতার সঙ্গে; পরমবন্ধুর সঙ্গে, তারই হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটবে তার সঙ্গেও। তার বিধবা স্ত্রী, সন্তানও দেখতে পাবে না তার লাশ। কিছু মাটির দলা-ঢেলা তাদেরকে দিয়ে বলা হবে, এই তোমার স্বামী। মাটির দলায় ভর্তি কাফন জড়িয়ে বিধবা কাঁদবে। মহাকরুণ হবে সেই পরিণতি। সারাজীবন মাটির দলাকে স্বামী মেনে পুজা করে যাবে। লোকজন হাসবে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য-কৌতুক করবে, ঠাট্টা মশকরা করবে সবাই, কিন্তু নিষ্ফলা নারীর নিয়তি হবে মাটির কবরপুজা। তারপরও রেহাই নেই। সারা দুনিয়া তন্ন তন্ন করে আপনাদের একত্র করা হবে।
পীরটার স্পর্ধার বাড়াবাড়ি দেখে ফারুক মৃদু হাসে। তারপর!
আপনাদের জিহবা বেরিয়ে আসবে মুখের বাইরে। বিকট দর্শন হবে মুখমন্ডল। লাশ পঁচবে হাজার হাজার বছর ধরে। দুর্গন্ধে ভরে উঠবে ইতিহাসের পাতা। শকুনও মুখ ফিরিয়ে চলে যাবে প্রবল ঘৃণায়। ক্ষণিকের উত্তেজনার খায়েশে অভিশপ্ত হবেন মহাকাল ধরে। (চলবে…)
অলংকরণ: শিল্পী শাহাবুদ্দিন








