কিন্তু তাদের কাছে কী যেন জানতে চাইবে – সেটাই তো গুছিয়ে বলতে পারছে না হাসু। ওরা সবাই মনমরা হয়ে বসে আছে। হাসু সবার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। দেখছিল সবাইকে।
এই মানুষগুলোরও বা কী হলো! সবাই নির্বাক। জবান বন্ধ। এরা কি কেউ কথা বলতে জানে না!
এদের তো অন্তত বলা উচিত – না, তোমার বাবার কিছু হয়নি। কামাল, জামাল, বেগম মুজিব – কারও কিস্যুটি হয়নি। সবাই বহাল তবিয়তে। সবাই ভাল আছেন। এই তো কিছুক্ষণ আগে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে।
কিন্তু কই! কেউই তো তেমন কিছু বলছে না। সবার দিকেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে সে । কেউই তার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। ওরা কি তবে পণ করেছেন – হাসুদের সঙ্গে কথা বন্ধ। চোখের দিকে তাকানোও বন্ধ।
ওদেরকে ঘিরে বিশিষ্ট কয়েকজন। তারপরও নিজেকে নিঃসঙ্গ, একা একা লাগছে। বেগম হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে, তার চোখ-মুখের বিষাদ-বিষণ্ন দশা দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারল না। হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল।
বেশ ক্ষুব্ধ স্বরে জানতে চাইলো, কেউ কিছু বলছেন না কেনো! ঢাকাতে ভয়ংকর যাই ঘটুক না কেনো – আমাকে জানানো হচ্ছে না কেনো!
কিন্তু তাদের যে ধনুর্পণ। মুখে কুলুপ। চোখ-মুখ মলিন, কষ্ট ম্লান। বেগম হুমায়ুন জড়িয়ে ধরে রেখেছেন হাসুকে। অস্ফুটকণ্ঠে কিছু বলছেন। সে সবের বিন্দু বিসর্গও শুনতে পাচ্ছে না।
হাসু কি তবে ক্লান্ত অবষণ্ন হয়ে জ্ঞানহারা হতে চলেছে? একবার টেলিফোনে ঢাকায় কথা বলার আর্জি জানাল। সে অনুরোধ কারও কর্ণকুহরে ঢুকছে কিনা আন্দাজ করতে পারছে না।
বেগম হুমায়ুন ওদেরকে উপরতলায় একটা রুমে নিয়ে এলেন। ফোনের কথা আবার তাকে বলল।
তিনি বললেন, ঢাকার সঙ্গে সকল ট্রাংককল বন্ধ। নো কম্যুনিকেশন।
একই কথা হাসু ব্রাসেলস-এ সানাউল হক সাহেবের কাছেও শুনেছিল। ঢাকা কি তবে এখন সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন!
সকল ফোন লাইন কেটে দিয়েছে কারা!
২৫শে মার্চের কালোরাতের মতো আবারও কি তবে বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে হানাদার হায়েনারা?
আব্বা কি ওদের হাতে বন্দি! যে বিজয়সূর্য পূব দিগন্তে জ্বল জ্বল করে জ্বলছিল – সেই উজ্জ্বল সূর্যকে গ্রাস করেছে রাহুচক্র!
বত্রিশ নম্বর বাড়ির ফোন কাটা! ঢাকার টেলিযোগাযোগ অচল! অবিশ্বাস্য!
স্বাধীন দেশে এ কেমন করে সম্ভব!
হাসু বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলো না। কিন্তু চারপাশের নীরব কয়েকজনকে দেখল – হাসুর বিস্ময়ে, হতাশায়-অবিশ্বাস সন্দেহের মুখে তারা বড্ড বিমূঢ়; তারাও অসহায়। বিশ্বাস করতে তাদেরও কষ্ট হচ্ছে খুব।
ওয়াজেদ সাহেবের হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে থাকল। তার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে – তীব্র আগুনের হলকায় পুড়ে কৃষ্ণ-তামাটে; ম্যাডাম এ্যামবাসেডার হাসুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত রাখতে চাইছেন; বিড়বিড় করে তিনি সম্ভবত দরুদ শরীফ পড়ছেন। হাসুকে উদ্দেশ্য করে নিম্নস্বরে যা বলছেন তা শুনতে পাচ্ছিল না সে। বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে সে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ব্রাসেলস থেকে বনের কনিংসউইটার – দু-দু’টো রাষ্ট্রদূত ভবন থেকে ঢাকা কেনো বিচ্ছিন্ন – এ প্রশ্নের জবাব কেউ দিচ্ছে না তাকে।
জানতে চাইল, আমার আব্বা কি ইন্তেকাল করেছেন! কিভাবে, কোথায় – কী অসুখ হয়েছিল আব্বার! আব্বার তো ইন্তেকাল করার কথা নয়। তিনি তো সুস্থ সমর্থ ছিলেন।
কেউ কোনো জবাব দিচ্ছে না তাকে। ম্যাডাম এ্যামবাসেডর বললেন, পরিষ্কার কিছুই তারা জানেন না।
তার মানে কী! কেনো তারা পরিষ্কার করে বলছেন না – না, শেখ সাহেবের কিছু হয়নি। পরিষ্কার কিছুই যদি তারা না জানবেন – কোন আশঙ্কায়, কোন অমঙ্গলের জন্য তারা সবাই এ্যামবাসেডর হাউসগুলোকে কবরস্থান বানিয়ে রেখেছেন? কেনো সবার মুখে তীব্র শোকের চিহ্ন?
হাসুর চিৎকার করে জানতে ইচ্ছা করছে – কেনো আপনারা এমনটা করছেন! কেনো আপনারা বুঝতে পারছেন না – ঢাকায় যাই ঘটুুক – সেটা না জানতে পেরে নানা আশঙ্কায় অমঙ্গল চিন্তায় আমরা দু’বোন যে মরমে মরমে মরতে চলেছি! দু’চোখে পাথর পাথর কষ্ট; বুকের মধ্যে অচিন শোকের হাহাকার – এই কষ্ট যে নিষ্ঠুর সত্যের চেয়েও ভয়ংকর।
একটি প্রশ্ন তার মাথা থেকে যাচ্ছেই না – বত্রিশ নম্বর বাড়ি, ঢাকা শহরের সঙ্গে ফোন যোগাযোগ কেনো বন্ধ!
প্রলংকরী ঝড়ের তাণ্ডবের কথা তো কেউ বলছে না! কি এমন ঘটলে এটা হতে পারে! কেউ কেনো কিছু বলছে না; তার চিন্তাপ্রবাহ নানা আশঙ্কায় মুহুর্মুহু ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বড় নিঃসঙ্গ লাগছে।
ঢাকা কেনো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন! তবে কি ২৫শে মার্চের কালো রাতের চেয়েও ভয়ংকর কিছু ঘটেছে সেখানে! তবে কি সোনার বাংলাকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার মতো প্রচণ্ড কিছু ঘটেছে ঢাকাতে!
তাই বা কেমন করে হবে! অযুত প্রাণহানি, নিযুত রক্তক্ষয় – পদ্মা মেঘনা যমুনা কীর্তনখোলা – রক্তনদীর বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলা – মাতৃভূমি বাংলায় কি আবার হামলা করেছে হায়েনা ও শকুন!
ভয়ংকর সব ভাবনা মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় – ভয়ংকর আতঙ্কের নানা আশঙ্কায় সারা শরীরে দুশ্চিন্তার জ্বর-কম্পন।
যাই ঘটুক হাসুকে কেনো রাখা হচ্ছে অন্ধকারে! ঢাকার খবর এরা নিশ্চয়ই কমবেশি জানেন। সে সব সে-ও জানলে কী ক্ষতি!
তবে কি ৩২ নম্বর বাড়িতেও হামলা করেছে হানাদার-হায়েনারা! ৩২ নম্বর বিধ্বস্ত! তাও বা তেমন নতুন কি? ’৭১-এর রক্তাক্ত বাংলার সেইসব স্মৃতি অক্ষয় ফ্রেমে এখনো জ্বলজ্বলে!
হাসু পেটের মধ্যে জয়কে ধারণ করে দেশ অন্ধকার করা অমাবস্যায় কৃষ্ণরাতে লড়ে চলেছিল – একটি জীবনের সূর্যোদয়কে জন্ম দিতে। আম্মা, রেহানা, রাসেল, জামাল কেমন করে যে বেঁচেছিল – সে সবই লড়াকু জীবনের জীবন্ত গল্প। রক্তপিপাসুদের লাল জিহ্বার নিচে দুঃস্বপ্নের জীবন – তার আঁচলের নিচে সুরক্ষা করছেন সন্তানদের – সেই বীর মায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা অকুতোভয় চিত্ত – মুহুর্মুহু মৃত্যুর শ্বাসরোধী দড়ির গেরোয় আটকে থেকে বেঁচে থাকা – হায় এবার কি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটলো! এবার কি তবে মৃত্যু জল্লাদ কেড়ে নিয়েছে হাসুদেরই জীবন অস্তিত্বের কোনো অংশ! তারই প্রাণপ্রতীম কেউ হায়েনাদের নিষ্ঠুর শিকার!
তাই বুঝি এরা সবাই নিশ্চুপ! এরা শোকস্তব্ধ পাথর! তাই বুঝি এ্যামবাসেডর হাউসকে ঘিরে রেখেছে কষ্টের কালো চাদর!
সেই কষ্ট হাসুরা সহ্য করতে পারবে না ভেবে কেউ তার চোখে চোখটি রাখছে না। তাকে রাখতে চাইছে মৃত্যুপুরীর নিঃসঙ্গতায়।
৩২ নম্বর বাড়িতে ওর অস্তিত্বের অংশ একগুচ্ছ প্রাণ – তারা কেমন আছে – তোমরা অনুগ্রহ করে আমাকে বলো! এই নৈঃশব্দ, এই লুকোছাপা, এই নিঃসঙ্গতা আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না।
তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো না – আমার সারা শরীরের সমস্ত প্রাণশক্তি নিংড়ে নিংড়ে দু’চোখ ভরে ঝরছে অশ্রু; অসহায় ক্রন্দনে আমি যে নিঃশেষ হতে চলেছি –
আমাকে সত্যগুলো জানতে দাও – তারপর মরে গেলেও না হয় মরি – কিছু মৃত্যুময় শোকের ধকল থেকে রক্ষা করো আমাকে।
কী-ই বা এমন ভয়ংকর দুঃসংবাদ শোনাবে আমাকে! কী-ই বা এমন ভয়ংকর মৃত্যুর পাথরকষ্টে ক্ষতবিক্ষত করবে আমাকে!
এখন পর্যন্ত এই যে আমি বেঁচে আছি – তার বেশিরভাগ সময় জুড়েই দুঃখ-কষ্ট, ত্যাগ-তিতিক্ষা সয়ে এসেছি। কেবলই কষ্ট আর কষ্ট। দুঃখে যাদের জীবন গড়া – তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষায় কী বা ভয়!
কেউ শুনতে পাচ্ছে হাসুর কথা?
তার বাবা তো মৃত্যু আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে লড়ে চলেছে সারাটা জীবন। তাকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। বাংলা ও বাঙালিকে ভালবাসার দায় যদি মৃত্যুর দানেও শুধতে হয় – বাবা নির্ভীক উন্নত শিরের দৃঢ় পায়ে এগুবেন সম্মুখে।
আর মা জননী। তিনি সেই যুবতী বয়স থেকে সর্বংসহা মাতৃপ্রতিমা। পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই টুঙ্গীপাড়ার স্বপ্নপল্লী ছেড়ে ঢাকায় এসে ঠাঁই নিয়েছিলেন। হাসুও ছিল মায়ের সঙ্গে। তখন কতই বা তার বয়স – ছয় কি সাত বছর। মায়েরই বা কত! তেইশ কি চব্বিশ।
তখন থেকেই মায়ের আগুন পোড়া জীবনের শুরু। যুদ্ধ এবং যুদ্ধ। বাঙালির তরুণ মহানায়কের স্ত্রী হওয়ার পরিণামে কি ভীষণ-বিষম সেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আম্মা কারও কাছে সামান্য অনুযোগটিও করেননি। কেউ তখন সামান্য সহানুভূতি-সাহায্য নিয়ে আসেনি – জানতে চায়নি ওরা বেঁচে আছে না মরে গেছে, মরে যাচ্ছে। প্রতিটা দিন কেটেছে দুঃখকষ্ট অভাব লাঞ্ছনাকে সঙ্গী করে।
আব্বা তরুণ নেতা থেকে ক্রমশ মহত্তম হয়ে উঠছেন – একের পর এক ঘটনায় জন্ম নিচ্ছেন মহানায়কের অবয়বে। এই মহত্তম জন্মগাঁথায় মা তখন নেপথ্যের প্রেরণাদায়ী। মা আগলে রাখছেন সন্তানদের। তার গায়ের রং দুধে আলতা। তা ত্যাগের অনলে পুড়ে পুড়ে কয়লা হচ্ছিল – কিন্তু তিনি এমনই সর্বংসহা – বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় ছিল না।
কিন্তু হাসু তো দেখেছে তিলে তিলে। হাসু দেখেছে প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে আইয়ুব জুলুমশাহীর সূচারু নখর কীভাবে প্রতিদিন রক্তাক্ত করেছে ওদেরকে। হাসু সবই দেখছিল, টের পাচ্ছিল। কিছুই ভোলে নাই সে। চিরউন্নত শির মুজিবের অকুতোভয় পত্নী – একটুও দমেননি।
৫৪ সালই হবে। এলাকাটার নাম গেন্ডারিয়া। গ্রামাচ্ছন্ন শহুরে পরিবেশ। রজনী-চৌধুরী লেন। সরু গলি; ঢাকা তখন সংকীর্ণ শহর।
তাল, হিজল, শিমুল, পলাশ বন; স্বচ্ছ তোয়া নদী; টুনি খাল। হালকা সবুজ উজ্জ্বল পলিমাটি। আম-কাঁঠাল-বেল-সজনে বৃক্ষ। আদিগন্ত শর্ষে ক্ষেত – ডাহুক, কোকিল, কাঠঠোকরা – শত পাখ-পাখালির মাঠ – স্বর্গসুখের অনাবিল জগত ছেড়ে ইটকাঠের শহরে আম্মা। সে কেবলই আব্বার কাছে আসার জন্য আসা। তার পাশে লড়াই সংগ্রামে সুখে দুঃখে থাকার জন্য। সন্তানরা বাবার সান্নিধ্য পাবে – মাও প্রিয় স্বামীর হাতে পছন্দের ঝোল তরকারি তুলে দিতে পারবেন – মানুষটার প্রাত্যাহিক আহারে পরম তৃপ্তি – এসবের সন্ধানেই মা ছুটে এসেছিলেন ঢাকাতে। নইলে গোলাভরা ধান, পুকুর ভর্তি মাছ – ক্ষেতে সোনালি ফসল – শত ফলফুল সর্বত্র সবুজ সুবাস-সোনার সেই সংসার ছেড়ে কে-ই বা আসে দম আটকানো শহরে। মা সেখানে ছিলেন দারুণ সুখের ঘরণী-মহাসুখী। মায়ের যেমন ভয়ংকর সব দুঃখ-কষ্ট সইবার অসীম ক্ষমতা – আরেকটি গুণে তিনি চিরচঞ্চলা – তা হলো অল্পতেই দারুণ সুখী। আরাম আয়েশ ভোগ দু’চোখের বিষ। কষ্টসহিষ্ণু হলে অল্পতেই সুখ – আর আরাম বিলাসী হলে হারাম সর্বসুখ – মায়ের সরল জীবন দর্শন।
কিন্তু রজনী-চৌধুরী লেনের ভাড়া বাসার ছোট্ট ঠাঁইটি পোক্ত হয়নি মোটেই – তার আগেই হাওয়া বদল। তখন তো ঐভাবে ভালো করে সবকিছু বোঝেনি হাসু। একদিন মিষ্টি এলো বাসাতে। পাড়াতে বাবার উৎফুল্ল ভক্তদের আনন্দ হিল্লোল। মিনিস্টার হয়েছেন আব্বা।
ওরা উঠে এলো শাহবাগে-মিন্টো রোডে। দারুণ সবুজ বিরাট একটা বাড়ি। খোলা জায়গা-গাছপালা। নারকেল-সুপারি গাছ। সুন্দর রাস্তাঘাট। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার লাল-হলুদ ব্যঞ্জনা; বট-পাকুর ঝোপে পাখির কাকলী – নিঃশ্বাস নেবার স্বস্তি পেল অনেকদিন পর; ফুল পাখি-পল্লব নিয়ে খেলবার দিনগুলো পেল শৈশবের মুঠোয়।
কিন্তু সেই মুঠোর আঙুলগুলো একদমই আটকে রাখতে পারেনি। কয়েকটা মাত্র দিন ওরা ভাইবোনরা ছুটে বেড়িয়েছে সবুজ আঙ্গিনায়। শিরিষ, শিলকড়ই-রেইনট্রি’র পাতার বিশাল ছাউনি দেখেছে আকাশপানে তাকিয়ে। দেখিয়েছে কামালকে। বাদুর দেখে কামালের চোখে সেকি কৌতুহল, আপু আপু বাদুর – প্রবল উত্তেজনা। আর অচিন আকাশ থেকে উড়ে আসা টিয়ের ঝাঁক কামরাঙ্গা গাছে জুড়ে বসে নিশ্চিন্তে ঠুকরে খাচ্ছে ফল। সবুজ পাখির লাল ঠোঁট। ভাইবোন সেই দৃশ্য দেখে মন্ত্রমুগ্ধ। জামাল তখন কোলে কোলে। অবুঝ। হামাগুড়ি দেয়। কখনো একপা দু’পা হাঁটে। তাকে কোলেপিঠে টিয়ে দেখায়; কামাল দেখায় উল্টো বাদুর। শিশুটি কিছুই বোঝে না। তবে খালি হাসে। বাদুর বললেও হাসে। টিয়ে বললেও তাই।
সেই লাল সবুজ টিয়ে দিনগুলো কোন ফাঁকে ফুরুৎ করে হারিয়ে গেল – একদম টের পায়নি। সুখের একরক্তি পরশ পেতে ওরা যে আসেনি এই পৃথিবীতে। সুখপাখি আম্মার সংসারের উঠোনে বসতে না বসতেই আবার উড়াল। ঠিকানা তার দিকশূন্যপুর।
আব্বা করাচিতে অনেক অনেক দূরে। নদীর পরে নদী – তারপর অজগর মহাদরিয়া পাড়ি দিয়ে সেইখানে যেতে হয়। বাবা দূরদেশে।
আম্মা ওদেরকে নিয়ে বাংলা-সংসার সামলাচ্ছেন। বাবার নেতাকর্মীরা আসছে। চা-টা দিতে হয়। কেউ কেউ সাহায্যের জন্য আসছে। মেয়ের বিয়ে – কারও জমিজিরাত বন্ধকের কবলে বেহাত হচ্ছে – সে সব দেন দরবারের কিছুই হাসু বুঝত না তখন; কেবল জেনেছে – আব্বা মিনিস্টার। বিরাট একটা ব্যাপার। কিন্তু কত্ত বিরাট – তা কেবল টিয়াপাখি, আকাশমনি পত্রপল্লব দেখার চিত্তসুখ ছাড়া অন্য কোনো অনুভবে বিন্দুমাত্র পায়নি। খাবার দাবার – ঝোল তরকারি – কই শিং পাতি পুঁটি। মিষ্টি বলতে কদাচিৎ দই। আর জেনেছিল – মিনিস্টার হলে মানুষকে সবকিছু দিতে হয়। মানুষকে সবকিছু উজাড় করে দিতেই তো বাবার মিনিস্টারি। মানুষের জন্য সবকিছু আদায় উসুল করে আনতেই ঝঞ্ঝা দরিয়া পাড়ি দিয়েছেন আব্বা।
মিনিস্টার বাড়ির পাহারায় বুঝি পুলিশ ছিল দু’এক জন। থাকত অনেক দূরে। সবুজ নিসর্গ চেনার পাঠশালায় তাদের অস্তিত্ব স্মৃতিতে আঁচড় কাটেনি তেমন।
কিন্তু একদিন চেহারা বদলে হালুমমুখো হয়ে এলো সেই পুলিশেরা। বিড়াল যেন গোঁফ মুচড়ে মেসো বাঘের ভড়ং ধরেছে। তারা সদলবলে হানা দিলো মায়ের সদ্য সংসারে। যে সংসার সামান্যতম গুছিয়ে ওঠা হয়নি।
কি ব্যাপার! পুলিশ তলব কেনো!
বাবার মিনিস্টারি নাকি খতম। করাচির জনগণের গভর্নমেন্ট বাতিল। মিনিস্টার বাবার নামে ওয়ারেন্ট। সেই তলবে পুলিশ হানা। মায়ের হাতে ১৪ দিনের নোটিশ। এই সবুজ বাড়িটা আর হাসুদের থাকছে না। টিয়েপাখি, উল্টো বাদুর, এককোণের ঝুলন্ত লাউ ঝাড়টা আর দেখতে পাবে না। মেঘবৃক্ষের ছাদ ও রোদ উধাও। বিনা মেঘেই বজ্রপাত।
ওরা আবার ঘরছাড়া। ওদের এক্ষুণি ঠাঁই খুঁজতে নামতে হবে পথে। আম্মার মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়ল। মিনিস্টারি এতই অনিশ্চিত। মায়ের তখন কী-ই বা বয়স।
পশ্চিমের বেতাল পাগলা জঙ্গী মাতালশাহীর মাদারির খেলা তার তখনও বুঝে ওঠার কথা নয়। বাংলা ও বাঙালি তখন আব্বার ঋজু বজ্র উচ্চারণে মত্তহস্তিদের বেকুব বুদ্ধি কূটচাল, দুঃশাসন – সম্পদ লুটের আগ্রাসন কেবল বুঝতে শুরু করেছে – আর আম্মা তখন সবার অজান্তে – সবার অলক্ষ্যে অসহায় প্রথম শিকার। তাকে স্বস্তিকর সংসারের স্বপ্ন মাটিচাপা দিয়ে নেমে আসতে হয়েছে নিঃসঙ্গ রাস্তায়। শুরু আবার ঠাঁইয়ের সন্ধান।
কিন্তু ভাড়া বাসা তিনি কই পাবেন! কে দেবে ঠাঁই। অগত্যা অভয় ললাট মুজিবপত্নী এখন দুয়োরানী। মুজিবকে খুঁজছে পুলিশ। হয়রানি, জুলুমবাজি চলছে আম্মার উপর। মা নিশ্চয়ই তখন ভেঙে পড়ছিলেন ভেতরে ভেতরে। বাঙালির উপর মাতালশাহীর প্রবল ভয়ংকর জুলুমবাজির নিষ্ঠুর প্রতিকী আক্রমণ চলছিল আম্মার উপর – ঝড়ঝঞ্ঝার দিনগুলো গর্ভবতী আম্মা মোকাবেলা করেছেন ক্লেশহীন মুখে। দৃঢ়চিত্তধারিণীর অটুট মনোবল। তিনি একটুও মচকাননি।
একরত্তি পাখির বাসা খুঁজে পেল নাজিরাবাজার গলিতে। রাতারাতি উদার আকাশ ছেড়ে এটো ঘিঞ্জি পাড়ায়। মা তখন আসন্ন প্রসবা। রেহানা আসছে। কিন্তু তার ক্লান্তি নেই। বেঘর হয়ে এঘরেও শত ব্যস্ততা। সব দায়িত্বই তাকে সামলাতে হবে সূচারুরূপে। কালের পাতায় কষ্টক্লিষ্ট কালিতে আঁচড় কাটতে শুরু করেছে অনাগত ইতিহাসের সুবর্ণ অক্ষর।
মা জন্ম দেবেন রেহানাকে। নাজিরাবাজারের সেই বাসা। অন্ধকারাচ্ছন্ন বাংলার আকাশ। বাঙালির ভবিষ্যত কৃষ্ণমত্ত মেঘে ঢাকা। মানুষের জন্য রাজনীতি যেন মহাপাপ। মাথায় বিষাক্ত মৃত্যুতীর গেঁথে বাবা এগুচ্ছেন সামনে। নাজিরাবাজার বাসাতে পুলিশি হামলা আকছার। বাবার খোঁজ গতিবিধি জানতে চায় তারা। মুজিবের প্রতিটি পদক্ষেপে ওরা খুঁজে ফিরছে বাঙালির পথরেখা। মুজিব কোথায়! মাতাল মার্শালশাহী মরিয়া।
রেহানাকে পেটে রেখেই মা সামলেছেন দুঃসহ দিনগুলো। আঁচলের নিচে আগলেছেন আরও তিনটিকে। দুঃখ-দুর্দশায় কাবু হননি।
এই হাসুর মা। মমতাময়ী-কোমল কঠোর।
একদিন কাঁদতে কাঁদতে জানল – বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। তিনি জেলখানায়। তাকে চৌদ্দ শিকের আড়ালে আটকে মানুষের জন্য রাজনীতি করার দণ্ড শেখাবে। মানুষকে ভালবাসার কী মূল্য – তা আদায় করবে কড়ায় গণ্ডায়।
মায়ের সোনার সংসারের কেমন হাল তখন! স্বামী লাল দালানে বন্দি। সেখানে থেকে তিনি সংসারের হাজারো ঝক্কি-ঝামেলা থেকে আপাতত মুক্ত। বাইরের জগত থেকেও এক রকম বিচ্ছিন্ন। এই বাইরের দুনিয়ার ভার একা মায়ের কাঁধেই। একাই তিনি সামলে নেবেন সবকিছু। সদ্য প্রসূতি। ফুটফুটে আরেকটি মায়াবী কন্যা এসেছে কোলজুড়ে। জামালের কণ্ঠেও আধো আধো বোল। এটিকে সামলাচ্ছিল হাসু। আর মা সবার উপর বিছিয়ে দিয়েছেন মায়া চাদর। সেটির তলায় জাগছে, ঘুমুচ্ছে – খাচ্ছে দাচ্ছে। মা একহাতে নবজাতক রেহানাকে আগলে অন্য হাতে দশহাতের কাজ করছেন। সংসার বৈতরণীর বৈঠা বাইছেন। বন্দি মুজিবের এই নৌকাকে গুণ টেনে হলেও গন্তব্যে নিতে হবে তাকে। এক হাতে বৈঠা বেয়ে, কখনো গুণ টেনে ক্লান্ত নন মোটেও। তিনি অদম্য। জ্বর, অসুখ বিসুখ অবষণ্নতা – কোনো কিছু পাত্তা পাচ্ছে না তার কাছে।
নাজিরাবাজারের অকিঞ্চিৎ ঠাঁইয়ের চারপাশ ঘিরে অসংখ্য টিকটিকির আনাগোনা। ওরা নজর করছে। ইস্পাতের মতো দৃঢ় মুজিব জেলখানায় – কিন্তু তার হৃদপিণ্ড পড়ে আছে সরু গলিতে। এই হৃদয়কে সচল রাখার অদৃশ্য ভার মার হাতে ন্যস্ত।
ক্ষুদ্র কুটিরের সদা লড়াকু জননী – আপন মহিমায়, গুণে মাতৃস্নেহে, বোন ও ভাবীর অখণ্ড মূর্তিতে সবার অলক্ষ্যে বঙ্গজননী হয়ে উঠছেন। টুঙ্গীপাড়ার এক সরলমনা ললনার এই অত্যাশ্চর্য রুপান্তর সেই সময়ে কেউ আন্দাজ করেনি। তার সন্তানেরা ছিল অবুঝ; তাদেরও ঠাওর করবার কথা নয়।
আজ কনিংসউইটারের হিলটপ হাউসের তিনতলায় নিঝুম কক্ষে পশ্চিমের জানালায় চোখ রেখে হাসু দেখতে পাচ্ছিল দূর অতীত। ইউরোপের এই আবিরমাখা আকাশ মোটেই অচেনা লাগছে না। সূর্য ডুবে যাবার পর পৃথিবীজুড়ে অখণ্ড শূন্যতা – এই মগ্ন-লগ্নে সে দেখতে পাচ্ছিল মাকে। আদুল রেহানা মাতৃক্রোড় ছাড়ছে না। আঁচল ধরেই হাঁটছে এতটুকুন জামাল। বাকি দুই ভাইবোন উঠানে আকাশ খুঁজছে। বাড়ি থেকে বস্তা ভরা চাল ডাল নিয়ে এলেন চাচু – ওরা উল্লসিত হয়ে উঠল। এসব বস্তার সঙ্গে সফেদা, বেল, আতা, শরিফা – টক মিষ্টি গোলবরই – কিছু না কিছু থাকবেই। কয়েকটা দিন ফল খেয়েই কাটবে আনন্দে। কিন্তু সেসব ফলপাকুড় কি দখলে রাখার জো আছে! হাসুদের দুরন্তপনার ফাঁকেই অজান্তে খালি হচ্ছে ভাণ্ডার। অমুক কাকু, তমুক কাকু এসে সালাম দিচ্ছে মাকে। ওরা ভাবী বলতে অজ্ঞান। মা তাদের টাকা পয়সা দিচ্ছেন। চাল ডালও দিচ্ছেন কখনো কখনো। কাকুরা জামালকে আদর করে কোলে তুলে নেয়। খুব বেশি সময় কখনোই থাকে না। এই আসে তো এই যায়।
মায়ের কাছে জানতে চায় হাসু, এই কাকুরা কোন বাড়ির।
পার্টির লোক। তোর বাবার জন্য জান কুরবানি দিয়ে খাটছে।
পার্টির লোকের জন্য জীবন কুরবানি দিচ্ছেন আম্মাও। চাল-ডাল যতই আসুক গ্রামের বাড়ি থেকে; লাভ নেই। মাত্র ক’দিনেই টানাটানি অনটন।
সে সব অবশ্য সন্তানদের বুঝতেই দেননি তিনি। শাক শুক্তো, ঝোল ভর্তা কিছু না কিছু খেয়েই দারুণ তৃপ্ত সন্তানরা। মায়ের হাতের রান্না মানেই ভরপেট খাওয়া। কখনো আলুভর্তা, ডাল, ডিমের ঝোল কি সুখেই না খেয়েছে। সংসারের ভাণ্ডার শূন্য হচ্ছিল অজান্তে – কিন্তু যৎসামান্য দানাপানিতে সুখের ঘাটতি পড়েনি। কখনো পাতে ভাগ বসিয়েছে পার্টির লোক। মা ওদেরকে না খাইয়ে দানাপানি ছোঁবেন না। তিনি খেতেন সবাইকে খাইয়ে – সবার শেষে। কোনোদিন তার জন্য হাড়িতে অবশিষ্ট থাকত না কিস্যুটি। ঝোল ডাল তরকারি অন্যরা চেটেপুটে খেয়ে সাবাড় করেছে। মাকে দেখেছে হাসু – পড়ন্ত বিকেলে একমুঠো চাল, একটা আলু একসঙ্গে চড়িয়ে ভর্তা ভাত চটকে শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে খাচ্ছেন। তার মুখে তখন বঙ্গললনার অকৃত্রিম তৃপ্তি।
সেই কমল-কোমলা মায়ের মুখটি এই মুহূর্তে প্রাণভরে যেন দেখছিল হাসু। দেখতে পাচ্ছিল চুলায় হাড়ি – তাতে ভাত ফোটার বুদ্বুদ। মায়ের মুখে মুক্তোদানার মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম – পরনে অতি সাধারণ শাড়ি; আঁচল দিয়ে ঘাম মুছছেন তিনি। ক্লান্তি নেই। তার কণ্ঠে কখনো হা-হুতাশ আফসোস শোনেনি।
হাতে পাতলা তামার মতো রুলি। একি আম্মার গলার হারটা দেখছে না কেনো! কই গেল? হাসুও দু’একবার পরে দেখেছে। সোনার অলঙ্কার সেই বয়স থেকেই হাসুকে তেমন আকর্ষণ করে না। কিন্তু মাকে অপূর্ব ছবির মতো লাগত। ওটি গলায় না থাকলে মা যেন মায়ের মূর্তিই নয়। হারটা কে নিল! ও আম্মা, আপনার গলার হার কই! গলাটা খালি যে!
আম্মা হাসেন। কোথায় যেন খুলে রেখেছেন! টেবিলে, কাঠের কৌটায় কোথাও নিশ্চয়ই রয়েছে।
কিন্তু হার খালি মাকে মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। হাসু ও কামাল জবরদস্ত একটা কাজ পেয়ে গেল। মায়ের হার খুঁজে বের করতেই হবে। খোঁজ খোঁজ। হেথায় খোঁজে, হোথায় খোঁজে; মায়ের অজান্তেই সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে। কোথাও নেই যে।
বিফল মনোরথ হয়ে বিরস বদনে দুঃসংবাদটা মাকে জানায়। হারটা বুঝি চুরিই হয়ে গেছে। ওদের মন খারাপ।
মাকে মোটেই মন খারাপ করতে দেখে না। তিনি এক চিলতে হাসছেন। কি আশ্চর্য – সোনার হার হারিয়ে কেউ হাসে নাকি!
মা হাসতেন। মা চাল ডাল, ফলমূল, সোনার অলঙ্কার হারিয়ে ফেলতে ভালবাসতেন। হারিয়ে পরম তৃপ্তি পেতেন তিনি।
একবার সুন্দর বসার চেয়ার, চা নাস্তার টেবিল বাসায় এসেছিল। হাসুরা আনন্দে ডগমগ। ফোম দেয়া চেয়ার। বসলে বড় আরাম।
সোনার হার না হয় চুরি যায়, হারিয়ে যায়। আশ্চর্য – আরাম করে বসার চেয়ার টেবিলও একদিন উধাও। আম্মা হারিয়ে ফেলছেন সেসব।
ওই বয়সেই আম্মাকে সব হারানোর রোগে পেয়ে বসেছিল ষোলআনা।
কিন্তু এই ভূতকাণ্ড ওদের তো ভাল লাগার কথা নয়। ওরা ক’দিনই বা একটু আরাম করে বসল, এর মধ্যেই লাপাত্তা।
আম্মার কাছে জানতে চায় – হারটা হারিয়ে কই গেল! তুলার চেয়ারও বা কে নিল?
তার মুখে রহস্যময় হাসি। কেমন বিরস বিরান ভাব।
ধ্যাত। হারটা দেখতে পচা ছিল। ওকি সোনা না পিতল! ওসব কি মানুষে পরে! তোর বাবা জেলখানায়। সোনার হার দিয়ে আমার কি হবে!
তার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না। যে হারটা মাকে সেই ছোটবেলা থেকে পরে থাকতে দেখেছে – মা আর ওই হার অভিন্ন বলে জেনেছে – সেটা নাকি পরবার মতো কোনো জিনিসই ছিল না।
কি আশ্চর্য!
মায়ের নাকি মোটেই পছন্দেরও ছিল না!
আম্মা কত রঙ্গ জানে!
গয়না হারের হারিয়ে যাওয়া না হয় মানা গেল; কিন্তু ফার্নিচারও যে উধাও হয়ে যাচ্ছে – তার বেলা! সেগুলো কি পছন্দ হচ্ছিল না বলে বিক্রি হচ্ছিল কম দামে। মা কখনই বেহিসাবি ছিলেন না। গয়না-আসবাবপত্র নিয়ে আদিখ্যেতা করার মানুষ নন তিনি। মায়ের ধাতটাই অন্য রকম। বয়স তখন খুব কম। মাত্র তিন বছর। তখন তিনি হারিয়েছেন বাবাকে। মাতৃহারা হয়েছেন পাঁচ বছর বয়সে। তারপর হাসুর দাদীর আদর-যত্নে পরম স্নেহে বড় হয়েছেন। মা হারানোর অভাব কখনো বুঝতে পারেননি। তারপরও অতি শৈশবে পিতৃ-মাতৃহারা; মনের গহীন গোপন কোণে অচিন কোনো কষ্ট থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আব্বার সঙ্গে তার বিয়ে সংসার তো বলতে গেলে পুতুল খেলতে খেলতে। পুতুল খেলার দিনগুলো যে কখন কবে কীভাবে সত্যিকারের সংসার হয়ে উঠলো – শৈশব থেকে কৈশোর – যুবতী বয়সে পদার্পণের দিনগুলো হয়তো খেয়াল করে উঠতে পারেননি আম্মা। আর শেখ মুজিবের বউ হওয়া সে তো চাট্টিখানি কথা নয়। তাকে বিপদতাড়িনী, বাহান্ন হাতঅলা নারী না হলে কেমন করে চলবে। মুজিবর মানেই যে আন্দোলন, মুজিব মানেই পশ্চিমা বাদশাহীর আতঙ্ক – মুজিব শৈশব থেকেই লোকতন্ত্রের ডাকে জনগণের কাছে মোহনবাঁশী বাজাবার ভার নিয়েছেন – সেই উদাস উন্মনা বাঁশিঅলার যিনি ঘরণী; আ-কৈশোর লোকনেতার ঘরে বিলাস ব্যসন কেমন করে ঢুকবে! আম্মা যে নিজে অতি সাধারণ সহজ সরল জীবনজীবী এটাই তার আত্মতৃপ্তি।
পড়াশোনার জন্য একান্ত দরকারি জিনিস বাদে অন্য কিছু চাইতে তার সামনে কখনও সাহস করে উঠতে পারে নি হাসুরা। একবার একটা টেবিল ল্যাম্পের আবদার করবে বলে চিন্তা-ভাবনা করছিল – কিন্তু মা যখন বললেন – তিনি চুবানী খাইতে খাইতে সংসার, সন্তান নিয়ে সাঁতার দিয়ে চলেছেন – গরিবের নেতার ঘরে বিলাসিতার জায়গা নাই – অদ্ভুত কণ্ঠে কথাগুলো কানের কাছে বাজতেই টেবিল ল্যাম্প চাওয়া আর হয়নি।
জেলবন্দি লোকনেতার বাড়িতে অভাব অনটন, দৈন্য থাকবেই। কিন্তু অভাব কি এতোটাই তীব্র যে গয়না, ফার্নিচার সবই বেচতে হচ্ছে মাকে? বাড়ি থেকে বস্তাভর্তি চাল-ডাল যে দাদা পাঠাচ্ছেন; নানাজীর রেখে যাওয়া সহায়-সম্পদ থেকেও আয় উপায় হচ্ছে – সে সব অর্থকড়ি কোথায় যাচ্ছে! ওই বয়সে অত সব পরিষ্কার বুঝত না হাসু; প্রশ্নও জাগেনি। শুধু জানত, ওরা মুজিবরের সন্তান; আটপৌরে জীবন, সাধারণ খাবার, পোশাক-আশাকের বাড়তি কোনো চাওয়া-পাওয়া ওদের জন্য হারাম। ওরা সেভাবেই বেড়ে উঠছিল। কোন মনোকষ্ট ছিলো না। কোনরকম লোভ করেনি। অন্যায্য কিছু চায়নি। মায়ের স্নেহের নীচে মুজিব কন্যার তৃপ্তি নিয়ে বড় হয়ে উঠছিল। গ্রামের ফসল বিক্রির টাকা, ধান-চাল, হার, ফানির্চার কোথায় যাচ্ছে এ নিয়ে কোনো প্রশ্নও মনের মধ্যে জাগেনি।
তারপরও আম্মা ওদের শুনিয়ে শুনিয়ে কৈফিয়ত কেনো দিতেন! কেনো বলতেন, ওসব পছন্দ নয় বলে বাতিল করে দিচ্ছেন!
তখন বুঝেনি; পরে ঠিকই বুঝতে আর অসুবিধা হয় নি। তখন জানত না। পরে জেনেছিল।
মুজিবের ঘর-সংসার মানে তো ওরা চারটি ভাই বোনই নয়। মুজিবের ঘর মানে টুঙ্গিপাড়ার বাড়ি আর রজনী লেনের ভাড়া বাসাই নয়। মুজিবরের সংসার যে অনেক অনেক বড়। বিশাল রকম বড়। আম্মা কেবল হাসুদের ঘিরে থাকা ছোট্ট সংসারের কর্ত্রীই নন; তিনি সেই বিশাল সংসারের ঘরণীও বটে। তার হাতে কত রকম কাজ। কত কর্তব্য।
মাতালশাহী গ্রেপ্তার করে জেলে রেখেছে বাবাকে। কিন্তু বাবার সংসার চালিয়ে নিতে হবে মাকেই। বিশাল সংসারের কত বাসিন্দা। কেবল ফরিদপুর-বরিশাল থেকেই রাজনৈতিক জ্ঞাতিরা আসছে না; আসছে সারাদেশের নানা জায়গা হতে। সবাই জীবনবাজি রেখেই দেশের ভালোর জন্য লড়ে চলেছে। তাদের দুঃখ-কষ্টে মা পাশে থাকবেন না সে কি হয়! সেজন্য গয়নাগাটি, ফার্নিচার, সাংবাৎসরিক খাওয়ার চাল-ডাল বিলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি।
তিনি দশ ঘরের দশ মায়ের দায়িত্ব একাই নিজের কানাকড়ি উজার করে সামলাচ্ছিলেন; সেটা ওদের শিশু মনে কোনো দাগ কাটে কিনা; তা ভেবেই নিশ্চয়ই সান্তনা দিতেন। ওই সব হাস্যকর কৈফিয়ত দিয়ে বোকা বানাতে চাইতেন, আব্বা যখন মুক্ত হয়ে আসবেন; আবার গয়না গড়িয়ে দেবেন, আবার সোফা, চেয়ার টেবিল হবে।
কিন্তু ওরা তেমনটা কখনোই স্বপ্ন দেখেনি। কেনো দেখবে! ওরাও যে মুজিবরের আত্মজা – আত্মজ। মায়ের স্নেহ-সান্নিধ্যে ওরা অতি অল্পে তুষ্ট থেকেছে – সুখ খুঁজে পেয়েছে।
আরও খোলাসা করে বলা যায় – মায়ের সংসার কখনোই কুসুম বিছানো ছিল না। গায়ে পায়ে কাঁটা ফুটেছে। তার পা রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। সন্তানদের বুঝতে দেননি। তিনি বিলাস ব্যসনহীন জীবন দর্শনের কথা শুনিয়ে বুঝিয়ে উপলব্ধি করিয়ে কঠিনেরে সহজভাবে নিতে শিখিয়েছেন। আর তাই ওদের মনে কখনো অসুখ, অপ্রাপ্তির কষ্ট বাসা বাঁধেনি। যৎসামান্য যা পেয়েছে তাই গ্রহণ করেছে দু’হাতের অঞ্জলি ভরে।
আর মা চলছিলেন অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, অকল্পনীয় লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। সেই বেদনার আগুন থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে মায়ের কত কসরত! অমুককে তমুককে দিয়ে থুয়ে মায়ের অলংকার; অন্যান্য সামগ্রী হাওয়া। ভাঁড়ার ঘরে চালও নেই। সন্তানের মুখে কী তুলে দেবেন এবার? ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ।
ঘরে ভাতের চালও নেই – সেই কথা কেমন করে বলবেন তিনি! কিছু একটা যোগাড় যন্তর নিশ্চয়ই করেছেন। হাসুদের একদম না খাইয়ে রাখবেনÑতেমন মা তিনি নন। ভাতের বদলে কিসের বন্দোবস্ত হয়েছে! খুদ চালের জাউ। সে তো ওদের জন্য পরমান্ন। চটা পিঠা, একটু নারকেল। উফ! জিভে জল আসে।
এসবই যে চালের আইটেম। চালের গুড়া, খুদ চাল – তাও যখন হাতের কাছে নেই। আম্মা খুব ত্যক্ত বিরক্ত ভঙ্গি করে বললেন, রোজ রোজ ভাত কেউ খায় নাকি! ভাত তরকারি প্রতিদিন মজার হয় নাকি!
ভাতের বদলে মজার খাওয়াটা তা হলে কী! ওরা উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। পিঠা পায়েস কিছু একটা হবে।
মায়ের প্রস্তাবে অবাক হয়ে গিয়েছিল। মা বললেন, আজ আমরা রুটি খাবো। শুনে হাসু কিঞ্চিৎ বিষণ্ন হয়ে পড়েছিল। আটার রুটিকে মাছ ভাতের বাঙালিরা মজার খাবার কেমন করেই বা মানবে! সেদিনও মানতে কষ্ট হচ্ছিল। রুটি তখন ভীষণ অপ্রচলিত খাবার। তারপরও মায়ের কথায় আশ্বস্ত হয়ে কামাল, জামাল ডাল রুটি খেয়েই তৃপ্তি পেয়েছিল। হাসুও খুব বুঝদার। বিরক্ত করেনি মাকে। দশ ঘরের দশজনকে সাহায্য সহযোগিতা করে যার ভাণ্ডারের চাল বাড়ন্ত – সেই জননীর সংসারে সস্তা রুটি ডালের মাধ্যমে উদর সংস্থান ছাড়া উপায় কী!
হাসু সেই মায়ের মেয়ে। রাজনৈতিক সংসারের নিত্য অনটনে পঞ্চাশের দশকেই অপছন্দের রুটি খেতেও দ্বিধা করেনি। রুটির সঙ্গে মাংস তরকারি খাওয়ানোর সঙ্গতি মায়ের ছিল না। মা চুবানি খেয়ে খেয়ে অকুল নদী সাঁতরে চলেছেন জীবনভর। পঞ্চাশের দশক। বাবার রাজনৈতিক জীবন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তিনি বাংলার হৃদয়মণি হতে চলেছেন।
কিন্তু এই চড়াই উৎরাই আম্মাকে তুফান ভরা অশান্ত দরিয়ার মাঝখানে ঠেলে দিয়েছে – তিনি ছোট্ট কাঠের নৌকা নিয়ে ক্রমাগত তীরে আসবার চেষ্টা করছেন – কিন্তু ক্ষুব্ধ ঢেউ তাকে বারবারই মাঝ দরিয়ার ঘূর্ণিপাকে নিয়ে যাচ্ছে – সেই খবর কেউ কখনো রাখেনি।
চুয়ান্ন সালের দিকে আবার কোয়ালিশন সরকার। মন্ত্রীত্ব পেলেন আব্বা। কিন্তু আম্মার আর মন্ত্রীপত্নী হওয়ার আগ্রহ অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। এবার ক’দিনের জন্য মন্ত্রী কে জানে! আবার হয়তো মন্ত্রীপাড়ায় ঠাঁই মিলবে।
রজনী লেনের ঘিঞ্জি ঘর ছেড়ে ওরা এবার এলো সেক্রেটারিয়েট রোডের চমৎকার একটা বাড়িতে। আম্মা এমনিতেই আর উৎসাহ পাচ্ছিলেন না। খোলামেলা নিঃশ্বাস নেয়ার ঠাঁই না হয় আপাতত মিললো। কিন্তু কখন তা হারায় সেই শংকা আছে ষোলআনা। এই হারানো-প্রাপ্তি-ফের হারানোর তামাশা ভীষণ যন্ত্রণার – তা ওদের চেয়ে কে-ই বা ভালো জানবে।
মন্ত্রী-মিনিস্টারকে সবাই খুব আদর যত্ন সমাদর করতে ভালবাসেন। কিন্তু মন্ত্রীত্ব হারানো গরীব নেতার পরিবারকে মধ্যবিত্ত সমাজ ঠাঁই দিতে খুব ভয় পায়; ওরা বারবার এই নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল।
সেক্রেটারিয়েট রোডে অবস্থানের স্বস্তি বেশিদিন টিকল না। এবার ঘটনা ব্যতিক্রম। আব্বা নির্লোভ-নির্মোহ চিত্তে বিরল দৃষ্টান্ত দেখালেন। স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেন। জানালেন, তিনি জনগণের সঙ্গেই থাকবেন। বাংলার মানুষের জন্য কাজ করতে না পারলে ওই মসনদের চেয়ার তার কাম্য নয়। মাত্র কয়েকটা মাসের সুখও সইলো না।
আবার ঘূর্ণি হাওয়ায় মাঝ দরিয়ায়। মার্শাল ল’ এলো। এবার জঙ্গি মাতালশাহীর উদ্ভট জমানা।
আব্বার জীবন হয়ে উঠল বিপদ সঙ্গীন। ফৌজিরা লোকনেতাকে বাইরে থাকতে দেয় কেমন করে! মুজিবকে দমন না করতে পারলে বাংলাকে দমন করা যাবে না।
আব্বা আবার বন্দি। রাতারাতি সারা পূর্ব বাংলাই যেন জেলখানা হয়ে উঠল। নিঃশ্বাস নেবার সুযোগও কেড়ে নেয়ার উপক্রম হলো। জঙ্গি তরবারির কোপ মায়ের সংসারে। সর্বশেষ ওরা টি বোর্ডের একটি বাংলো প্যাটার্ন বাড়িতে ছিল। সেখান থেকে মাত্র তিন দিন সময় দিয়ে উচ্ছেদের নোটিশ।
মাত্র তিন দিন! আম্মা, হাসু হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে নতুন ঠিকানা কোথায় পাবে তারা! টুঙ্গিপাড়ায় ফিরে যাবে কি না – সেটাও আম্মা ভাবলেন। কিন্তু আব্বার মামলার নানা ঝক্কি ঝামেলা-উকিলপাতির খাইখরচ – সব সামলাতে হয় তাকেই। টুঙ্গিপাড়ায় ফেরা হয়তো যায় – কিন্তু এই মামলা চালানোর কাজ কে কাঁধে নেবে! আজ আশ্চর্যই হচ্ছিল হাসু এই ভেবে – বাবার জীবনের কঠিনতম দিনগুলোয় আম্মাই ছিলেন বরাভয়। তার তখন কী বা বয়স, সেই লাল আগুন কালক্ষণে রাজনীতির কোনো খেরোখাতায় কিংবা কোনো কমিটিতে মায়ের নামটি কোথাও ছিল না। অথচ তিনি কেবল ‘ভাবী’র গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন তাই নয় – ছায়া-গোপন মাঠ রাজনীতির সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন শক্ত হাতে। মুজিব ঘরণীর চার দেয়ালের মধ্যে থেকেও তিনি সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ছিলেন দেশজুড়ে। দুঃখে কষ্টে হুলিয়ায় পলাতক লড়াকু কর্মীরা জানত – আরেক মুক্তিকামী যোদ্ধা নেত্রী তাদের সঙ্গে ছায়াচ্ছত্র হয়ে আছেন সব সময়।
আম্মার জীবন তো তখন সত্যিই গেরিলাদের মতোই বিপদসংকুল। হাসুরা এই শহরে থেকেও বার বার বাস্তুহারা; ১৫ দিনের নোটিশ, ৩ দিনের উচ্ছেদের শিকার হয়ে একের পর এক ঠিকানা হারিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল নতুন গন্তব্য। নতুন ঠিকানা কি সহজে খুঁজে পাওয়া যায়! সময়ের তরুণ মহানায়ক মুজিবের পত্নীর কাছে ঘরভাড়া দিতে কত হিসাব নিকাশ; কত কার্পণ্য।
ফৌজি শাহীর আজ্ঞাবহরা আততায়ীর মতো তাড়িয়ে ফিরছে ওদেরকে। কার এমন সাহস – তাদের আশ্রয় দিয়ে মার্শাল ল’র চক্ষুশূল হবে!
বাসা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়লো। আব্বা কারারুদ্ধ হতেই নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে। চেনাজানা অনেকেই এড়িয়ে চলছে বেগম মুজিবকে। এই শহরে ওরা তখন একা। আম্মা আরও বেশি একা। পাশে কারও দেখা নেই। কোলে কাঁখে চারটি সন্তান। রেহানা বুকের কাছে; জামাল আঁচলই ছাড়তে চায় না।
অক্টোবরের প্রখর রৌদ্রে ওরা গৃহহারা হয়ে ছুটছিল। একটু ঠাঁই চাই। একটু আশ্রয়। মাথা গোঁজার ঠিকানা। কিন্তু কাজটা যে কত কঠিন, মায়ের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় নিষ্ঠুর সত্য হিসেবে হাসু তা দিব্য জেনেছিল। ঘামে ভিজে যাচ্ছে জামা। ও মা, পা দুটো যে আর নড়াতে পারছি না।
মা হাল ছাড়বার পাত্রী নন। মা গো, আর একটু খুঁজে দেখি। নইলে যে রাস্তায় থাকতে হবে আমাদের।
শিরোধার্য তিনদিনের নোটিশ, কারাবন্দি নেতার বউকে বাসা ভাড়া দিতে অনির্বচনীয় আতঙ্ক – এসবের মুখে এক রকম ওরা পথেই নেমে এলো। ৩টি দিন মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! ফার্নিচার, বাসন কোসন সব উচ্ছেদ হয়ে রাস্তায় – মা উন্মাদের মতো বাসা খুঁজছেন। সঙ্গে হাসুও পায়ে পা মিলিয়ে চলছে। বিপদ যে কত রকম, কী কী – ওরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে।
হাঁটার কষ্টে, খোঁজার বিড়ম্বনায় অতিষ্ঠ-উৎপীড়িত হয়ে হয়তো বলেছে – টুঙ্গিপাড়ায় চলো মা, সেই ভালো।
মা ঘেমে নেয়ে একাকার। কাঠ হাসি হেসে সান্ত্বনা দিয়েছেন – আরেকটু কষ্ট কর। বাসা একটা না একটা পাবই। তোর বাবা জেলে, তাকে নিরুদ্দেশে রেখে কেমন করে বাড়ি যাই রে! মানুষটার কে-ই বা তত্ত্ব-তালাশ করবে! অবশেষে ভোগান্তির দীর্ঘ সফর শেষে একচিলতে ঠাঁই খুঁজে পেল। আজও জ্বল জ্বল করছে স্মৃতিতে।
বাসা তো নয়, হঠাৎ হাতের মুঠোয় যেন স্বর্গ! বাড়িঅলার দয়ার শরীরই বলতে হবে। আল্লাহর অশেষ কৃপায় এই যে পাওয়া গেল, সেই ভাগ্যি।
বাড়িটা পুরো তৈরি হয়নি তখনও। খানিকটা কাজ হয়েছে – তারপর কোনো কারণে নির্মাণ বন্ধ। সে সময়ে অনেকেই এভাবে থেমে থেমে বাড়ি করতেন।
সাকুল্যে দুটি কামরা। দেয়াল হয়েছে। পলেস্তারা হয়নি। সিমেন্টের মধ্যে বেরুনো ইট, আধা পাকা। দূরে কাঁচা পায়খানা। দুর্গন্ধ।
যাই হোক, কিছু একটা ঠাঁই মিলল। রাস্তায় আর থাকতে হচ্ছে না। সেই ঢের। রোদ বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই মিলল। মা সান্ত্বনা দিচ্ছেন সন্তানদের – মানুষ কত কষ্ট করে থাকে, তাই না। এর চেয়েও কত খারাপ অবস্থায় রয়েছে অনেকে। আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন, হাজার শোকর।
হাসু অবাক। কই আমরা কেউ কোনো অনুযোগ করিনি। এ কি বিদঘুটে বাসা, এমন তিক্ত কথাও বলিনি।
যেভাবে রাস্তায় থাকার উপক্রম হয়েছিল, সে তুলনায় হাজার শোকর তো বটেই। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। মিন্টো রোডে সুরম্য সবুজ গাছপালা ভর্তি বাড়িতে থেকেছে। সেখান থেকে এক রাতেই রজনী লেনের গলি ঘুপচি। আবার সেক্রেটারিয়েট রোড; টি বোর্ডের বাংলো বাড়ির দারুণ কয়েকটা দিন। মাত্র তিন দিন সময় নিয়ে রাস্তার বাসিন্দা। মা সত্যিই চুবানি খেতে খেতেই সংসার তরণী এগিয়ে নিচ্ছিলেন।
অকুল দরিয়ায় যার ঠাঁই; সামান্য জল ঝাপটায় তার কী বা ভয়। কৈশোর থেকেই জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা শ্রমে ঘামে কষ্টে বেদনায় প্রত্যক্ষ করেছে হাসু – তার মায়ের কোমল হাতেই ক্রমাগত রচিত হচ্ছিল অবিশ্বাস্য এক ইতিহাস – মা নরম আটপৌরে ছিলেন, কিন্তু সেই যুবতীর চিত্ত ছিল পাথরদৃঢ়। সেই অক্ষয় পাথরে আঁচড় কাটবে – দুঃখ-কষ্ট, গঞ্জনা বিড়ম্বনার তেমন সাধ্য আছে কি!
৭২ ঘন্টার মধ্যে বাসা পেতে গিয়ে কি অভিজ্ঞতাই না হয়েছে!
খালি বাসা যে শহরে ছিল না তা তো নয়।
কেউ কেউ ভাড়া দিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু বাবা পলিটিক্স করেন শুনে চমকে উঠেছেন।
তদুপরি কারাবন্দি শুনে আরও আঁতকে উঠেছেন।
আর সেই লোকনেতা যে মুজিবর; শেখ মুজিবর। ফৌজী শাহীর যে এক নম্বর শত্রু। কার ঘাড়ে ক’টা মাথা – কেউ মিথ্যা বলেছেন – অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন আগেই।এডভান্স নেয়া হয়ে গেছে বোন।
কেউ মুখ বেঁকিয়ে বলেছেন, ভাড়া হবে না।
ক্লিষ্ট মা সব কথা হাসিমুখেই নিয়েছেন। জেলে থেকেও মুজিবর এমন কেউকেটা। তাকে মার্শাল ল’ সরকারের ভয় – সেই ভয়ে থরহরিকম্প সাধারণ বাড়িঅলাদের।
মা ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছেন – বাড়ি মালিকের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। স্বামী জেলখানায় বলে ভাড়া আটকে থাকবে না। ঠিক মাসকাবারি কড়ায় গণ্ডায় পাবেন।
তার কথায় চিড়া ভেজেনি।
তাই দু’টি আধ খাওয়া কামরা যখন মিলল – মা বর্ত্তে গেলেন। বাড়িঅলার কাছে কৃতজ্ঞতার তার শেষ নেই। এক রকম তিনি কেঁদেই ফেলেন আর কি।
কিন্তু, আরও অবাক কাণ্ড ছিল অপেক্ষায়।
যখন ওরা ঠেলাগাড়িতে ফার্নিচার বয়ে এনে কোনোমতে রাত গুজরান শুরু করেছে – আবিষ্কার করলো বিদ্যুৎ নেই। আলো জ্বলে না।
ঢাকা শহরের ভাড়া বাসা; ইলেকট্রিসিটির কানেকশন নেই – সত্যি বিচিত্র। মোম, ল্যাম্প, কুপি জ্বালিয়েই সই। চারপাশে মশা আর মশা। ওরা পরিত্যক্ত কোনো ঘরেই উঠেছিল। মশার কামড়ে রেহানার হাতে পায়ে লাল দাগ। জামাল কামাল মশা মেরে চলেছে।
উফ! আসল কথাই যে বলা হয় নি। পানির কোনো ব্যবস্থা নেই বাড়িতে। খানিক দূরের চাপকল থেকে পানি আনতে হয়। কিংবা পড়শী বাড়িতে ধরনা দিয়ে যোগাড় করো। পাড়াপড়শী কি সহজে পানি দিতে চায়। মা যে তখন দুয়োরানী। সুয়োরানীর সুখ তার কপালে কেমন করে সইবে।
তবে সব মিলিয়ে এটা পরম ভাগ্যি – জীবন নামক সুখ-দুঃখের পাঠশালায় ওরা শৈশব থেকেই কঠিন অধ্যায়ের পাঠ নিয়ে বড় হচ্ছিল। এর পর আরও কঠিন সব চ্যালেঞ্জ এসেছে – সেসবের মুখেও আম্মা ছিলেন অটল, অবিচল; নিজ কতর্ব্য কাজে সদা সক্রিয়। দুঃখে যাদের জীবন গড়া; দুঃখকে ভয় পেলে তাদের চলবে না।
আম্মা সংসারের চাকাকে কোনোদিন থেমে থাকতে দেননি। একাই দু’হাতে ঠেলে বুলডোজারের লৌহচাকাকে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
চৌদ্দ শিকের আড়ালে আব্বা – তার মাথায় গুণে গুণে চৌদ্দটি মামলা। সবগুলোই বিদঘুটে; অসত্য হয়রানি হেনস্থার মারণাস্ত্র। মামলার পর মামলা দিয়ে ওরা জেলেই মুজিবকে নিঃশেষ, মৃতপ্রায় করে ছাড়বে।
কিন্তু আম্মা মজলুম নারী। তিনি জালিমশাহীর ষড়যন্ত্র সফল হতে কেনো দেবেন! জালিমদের যেমন লক্ষ্য মুজিবের টুটি চেপে ধরে তিলে তিলে শেষ করে দেয়া। মহিয়সীর তেমন লক্ষ্য তার চারদিকের দরোজা-জানালা বন্ধ হয়ে এলেও তিনি কারাগারের অন্ধকার থেকে স্বামীকে মুক্ত করে আনবেনই।
জেলখানায় বছরের পর বছর ধুকে ধুকে বেঁচে আব্বা বাঙালির পরম মুক্তির স্বপ্ন দেখছেন; আর আম্মা নীরবে একাকী জেলখানার বাইরে স্বামীর জন্য লড়ে চলেছেন।
চৌদ্দটি মামলা কম কথা নয়। উকিলের বাড়ি কে দৌঁড়াচ্ছে! আম্মা আঁচল বেঁধে ছুটছেন। উকিল সাহেব ঝানু – কিপ্টে উকিল। পয়সা না পেলে তার মুখে রা’টিও নেই। হাতে ফিস আগাম পেলেই এই রাওয়ালপিন্ডি চটকানো তরুণ নেতার জন্য এজলাসে দাঁড়াচ্ছেন। সেই ফি’র টাকা পয়সা আসছে কোত্থেকে! আব্বা তো ঘরে কানাকড়িও রেখে যাননি। এক কাপড়ে মন্ত্রী হয়েছেন; আবার সেই কাপড়েই ইস্তফা দিয়েছেন। তার অর্থকড়ি সম্পদ অর্জনের মন কোথায়। তিনি বাঙালির মন্ত্রী, মন্ত্রীত্ব বাঙালির। নিজের অর্জন বা সম্পদের জন্য কখনো মন্ত্রী হননি তিনি।
সেই মানুষটার গলায় যখন মামলার বজ্র আঁটুনি; তার মোকাবেলায় কেবল উকিল খরচ মেটাতেই লক্ষ্মীমন্ত ভাণ্ডার দরকার। কে দেবে তাকে অর্থ!
নিজের যা কিছু শেষ সম্বল, কখনো বিক্রি, কখনো বন্ধক রেখে মা লড়ছেন। সন্তানদের কথার ফাঁদে ভুলিয়ে কোনোমতে খাইয়ে দাইয়ে রাখছিলেন। আর বাবার জন্য জেলগেটে, কোর্টপাড়ায় ছুটছেন। সত্যিই সে এক বিস্ময়। কী অকল্পনীয় দুর্দশা টানাপোড়েন যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে কালাতিপাত করেছিলেন। গয়না, নিত্য দরকারি আসবাব সবাই পানির দামে খোয়া যাচ্ছিল। খোয়া তো বটেই – যেসব জিনিস বন্ধক রেখে টাকা-পয়সা ধার করছিলেন তা আর কখনোই ফেরত পাওয়া যায়নি।
(চলবে…)
অলংকরণ কৃতজ্ঞতায়: শিল্পী শাহাবুদ্দিন ও উত্তম সেন








