চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বাবা তোমার বেতন কত?

আকতার হোসেনআকতার হোসেন
১০:২৫ পূর্বাহ্ণ ২২, আগস্ট ২০১৮
শিল্প সাহিত্য
A A
বেতন

গেল বছর থেকে রুমানার একই কথা, পড়ালেখা আর ভালো লাগছে না, আমাকে ঘরে তুলে নাও। প্রতি সপ্তাহেই নাকি তার বিয়ের প্রস্তাব আসছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার কোন প্রয়োজন দেখেনি শাকিব। অস্থায়ী এক চাকরির ভরসায় শাকিব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল রুমানাদের বাসায়।

মিসেস চৌধুরীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে মোটেই বাধল না শাকিবের। বন্ধুর মা তিনি। যখনই ওই বাসায় গিয়েছে তখনই ছেলের মতো যত্ন করে খাইয়েছেন। তবুও বিয়ের প্রস্তাব শুনে মিসেস চৌধুরী এমন আচরণ করতে লাগলেন যে শাকিবকে কখনও চিনতেনই না। খুব অপমান বোধ করলো শাকিব।

চৌধুরী সাহেব সেখানে উপস্থিত থাকলেও তিনি ছিলেন নির্বাক। পরিবারটির নিয়মনীতি এরকমই, মিসেস চৌধুরীর হাতেই সব নিয়ন্ত্রণ। বাবা-মা’র সামনে রুমানা মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারলো না। এ দৃশ্য শাকিবকে আরো বেশি অবাক করলো। রুমানাকে সামনে দাঁড় করিয়ে মিসেস চৌধুরী শাকিবকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যে হুট করে বিয়ে করতে চাইছো, তা বাবা তোমার বেতন কত?

পুনঃপুনঃ একটা প্রশ্ন এমনভাবে করা হলো যার সন্তোষজনক উত্তর শাকিবের জানা ছিল না। শাকিবের নীরবতার মধ্যে থেকে টেনেটুনে তার দুর্বলতাকে তুলে নিয়ে এলেন মিসেস চৌধুরী। মনের মানুষটির সামনে শুধু আয়ের জন্য অপমানিত হতে হচ্ছে, কি করে শাকিব এ পরিস্থিতির সামাল দেবে।

এর পরেও অনেক কাণ্ড ঘটে গেল। মিসেস চৌধুরীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটলো এভাবে। একটা অস্থায়ী চাকরির জোরে বন্ধুর বোনকে বিয়ে করতে এসেছ। যে-বাড়ির গেটের ভিতর দিয়ে নিচু হয়ে ঢুকতে হয়, সে-বাড়ির মেয়ে হবে তোমার স্ত্রী! বাড়ির বাইরে গেট কি আমরা সাধে লাগাই? গরু-ছাগল চোর-ডাকাত নানান বিপদ থেকে নিরাপদে থাকার জন্যই আমরা বাড়ির বাইরে গেট লাগিয়ে রাখি। এই যে, এই মুহূর্তে তুমিও একটা বিপদ হয়ে ঘরের ভেতর বসে আছ সেটাই বা কম কিসে? তোমাদের বংশের সকলে মিলেও যদি রোজগার করতে পথে নেমে যাও তবুও টাকাপয়সা এমনকিছু কামাতে পারবে না যা আমরা এখনি আমাদের মেয়ের পেছনে খরচ করছি। রুমানাকে যদি সত্যি সত্যি তোমার পছন্দ হয়ে থাকে, যাকে তুমি নাম দিয়েছ ভালোবাসা, তাহলে মাসে মাসে ওর নামে ফুল কিনে হাইকোর্টের মাজারে গিয়ে রেখে এসো। তোমার বেতনের টাকায় সেটা হয়তো কুলাতে পারবে। ভালবাসলেই যে বিয়ে করতে হবে এমন চিন্তা মাথা থেকে হটিয়ে কেরানি বাবার সংসারের হালটা শক্ত করে ধরো গিয়ে। রুমানা তোমার চোখের সামনে থেকে এই মুহূর্তে চলে যাবার পর আর কোনদিন ওর দিকে ফিরেও তাকাবে না। এটাই তোমাদের শেষ দেখা।

শাকিব ঘরে ফিরে এসে মায়ের কোলে মাথা গুঁজে বসে ছিল। ওর মা’ও চাইছিল ছেলেটা যেন আরো কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থাকে। ছোট ছেলে হেলাল তখন পাশেই দাঁড়ানো। জন্ম থেকেই ছোট ছেলে হেলাল মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছে। মহল্লার লোক ওকে পাগল বলে ডাকে।

Reneta

ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শাকিবের মা বলল, এখন উঠে হাতমুখ ধুয়ে আয়, খাবার বেড়ে দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমিয়ে নে। সকাল হলে দেখবি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। শাকিবের চোখ আর কোনদিন সকাল দেখেনি। ঘরে ফেরার আগে সেই ব্যবস্থাটুকু সে করে এসেছিল। মায়ের কোলে মাথা গুঁজে পৃথিবীর শেষ সুখ পেতে চেয়েছিল কাল রাতে। নিজ হাতে আত্মহত্যার দলিলে শুধু একটা কথাই লিখে গিয়েছেল ‘বাবা তোমার বেতন কত ?’

যে সংসারটা আগে থেকেই নিচু আয়ের ছিল, ধীরে ধীরে রূপ পরিবর্তন হয়ে তার নাম হলো অভাবী পরিবার।

ছোট ছেলে হেলাল এখন সম্পূর্ণ যুবক। ভাইয়ের মৃত্যুর সঠিক কারণ সেই হয়তো অনুভব করতে পেরেছিল। যারা সুস্থ মানুষ তাদের কেউ কথাটার ভেতর ঢুকতে পারেনি। অথবা পারলেও মনে ধরে রাখেনি। লোকমুখে শুনে শুনে কথাটা হেলালের মাথায় স্থায়ী হয়ে গেছে। কাজেই হেলালের পাগলামির বুলি ওই একটাই, বাবা তোমার বেতন কত? পরিচিত অপরিচিত যাকেই পছন্দ হবে তার হাত টেনে একই কথা বলতে থাকবে। একবার, দু’বার, তিনবার, তারপর হাত ছেড়ে দেবে। প্রশ্নের শুরুতে স্বভাবসুলভ একটা হাসি থাকলেও দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বার প্রশ্ন করার সময় একটা হাত ঢাল বানিয়ে মুখের উপর তুলে রাখবে, যাতে কিল চড় মুখে না লেগে হাতের উপর দিয়ে উড়ে যায়। পাগলের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকে অনেকেই প্রয়োজন মনে করে না, তবুও হেঁটে হেঁটে তার একই প্রশ্ন করা। যতক্ষণ ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব না করবে ততক্ষণ সে এগিয়ে যাবে, ক্ষুধার টান পড়তেই বাড়িমুখো হবে। ফেরার পথেও দেখে-শুনে প্রশ্ন করতে থাকবে। চেনা মানুষজন তাকে কিছু বলে না। বেতন পাগলকে তারা হে হে করে। কেক বিস্কুট কিনে দেয়। কারোটা সে নেয়, কারোটা ফেলে দেয়। তবে অপরিচিত লোকজন তাকে বেশ উত্যক্ত করে। বকাঝকা তো ভালো, কেউ কেউ হেলালকে ড্রাইভারের হাতেও তুলে দেয়। ক্ষুধার চাপে ঘরমুখো হেলালের প্রশ্নের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে গিয়ে বাড়তে থাকে চলার গতি। ক্ষুধা যত বাড়ে ততই ত্বরান্বিত হয় কদম ফেলা। প্রায়সময় বাড়িতে ফিরে আসে দৌড়াতে দৌড়াতে; ঘরে ঢুকে গেলে বাইরের বেলাটাও বেশিক্ষণ টিকে থাকে না। ক্ষুধা আর অন্ধকার এ-দু’টোর আগমনে তার সব প্রশ্ন হারিয়ে যায়। দু’টোকেই তার ভীষণ ভয়।

ঘরে ঢুকে বাবাকে কোনদিনই কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিন্তু মাকে ছাড় দেয় না। মায়ের হাত টেনে টেনে বলবে, বাবা তোমার বেতন কত। ওর মায়ের উত্তর একেক দিন একেক রকম ; কোনদিন বলবেন একশো টাকা, কখনো লাখ টাকা। আজ বললেন, আমার বেতন জেনে তোর কোন লাভ নেই, আমি পেটে-ভাতে কাজ করি। আয়, ভাত খেতে আয়।

একদিন সোনারূপার পাত দিয়ে বানানো বিশাল একটা খোলা গেট দেখে চট করে ভেতরে ঢুকে পড়ল হেলাল। আনোয়ার উল্লাহ্ নামক একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা থাকেন এ-বাড়িতে। সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ার উল্লাহ্ সকালে অফিসে যাবার জন্য বের হয়েই দেখেন একটা কাটা ঘুড়ি তাদের কদম গাছের উপর ঝুলছে। তাই দেখে তিনি সিকিউরিটিকে এমন জোরে হাঁক দিলেন, মনে হলো যেন কামান দাগছে। এ-গাছটা যে ঘুড়ি-গাছ নয়, কদম ফুলের গাছ, কথাটি খুব অল্প বাক্য ব্যয় করে আনোয়ার উল্লাহ্ সিকিউরিটির ছেলেটাকে বুঝিয়ে দিলেন। এ-বাড়িতে খুব বেশিদিনের ডিউটি না হলেও আজমান নামের এই যুবকটি ইতিমধ্যে জেনে গেছে যে আনোয়ার উল্লাহ্ অসম্ভব ক্ষমতাধর ব্যক্তি। সরকার যায় সরকার আসে কিন্তু তার দাপটের কোনো কমতি থাকে না। আজমান সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকলো। আনোয়ার উল্লাহ’র আদেশ যদি এমন হয়, কদম ফুলের গাছের উপর বসে থাকা কাটা ঘুড়ি মালিককে দশ মিনিটের মধ্যে এনে দিতে হবে, আজমান সেটা নয় মিনিটেই করে দেখাবে। আনোয়ার উল্লাহ্ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তার আদুরে কন্যা সুমি আজমানকে আদেশ দিল অক্ষত অবস্থায় ঘুড়িটা উদ্ধার করে সেটা যেন কোনো গরিব ছেলেকে দিয়ে দেয়া হয়।

যতই ক্ষমতা থাকুক, সুমির কথার উপর কোনো কথাই বলেন না আনোয়ার উল্লাহ্। একটাই মাত্র মেয়ে, মেয়ে যা সিদ্ধান্ত দিয়েছে সেটাই যখন করতে হবে তাহলে আর দেরি করে কি লাভ। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। গাড়িতে উঠতে যাবেন এমন সময় আচমকা আনোয়ার উল্লাহর হাত টেনে হেলাল বলতে লাগলো, বাবা তোমার বেতন কত ? আল্লাহ্ প্রদত্ত ফেরেস্তা ছাড়া এমন কাজ ইহজগতের কারো পক্ষে করা অসম্ভব। নিজ বাড়ির গেটের ভেতর আনোয়ার উল্লাহর হাত ধরে টানা, তা’ও আদুরে কন্যার সামনে ! এই অপরাধের শাস্তি হাবিয়া দোযখেও হবার কথা নয়। হেলাল প্রথা অনুযায়ী তিনবার প্রশ্নটা করতে ব্যর্থ হলো। দ্বিতীয়বার একই কথা বলেছে কি অমনি প্রচণ্ড একটা ঘুষি এসে পড়ল হেলালের ঠোঁটের উপর। কয়েক সেকেণ্ড আগে ঘুড়ি সংক্রান্ত বিষয়ে আজমানকে ঠিকমত শায়েস্তা করতে না পারার ক্রোধ তখনো বহমান। সময় নষ্ট হলে সুমি কি বলতে কি বলে ফেলে তাই ঠোঁট কেটে রক্তঝরা মুখের উপর আরো কয়েকটি বজ্রাঘাত ক’রে ফেললেন আনোয়ার উল্লাহ্। রক্তাক্ত অবস্থায় হেলাল সবুজ ঘাসের উপর গড়াগড়ি করতে লাগল। আনোয়ার উল্লাহ্ ছোটবেলায় যেভাবে ফুটবল খেলতেন ঠিক সেভাবেই মানব বল দিয়ে খেলতে শুরু করে দিলেন। আজমান খেলোয়াড় এবং বলের পিছু পিছু এমনভাবে ঘুরতে লাগলো যেন হাই-কিক্ খেয়ে মানব বল উপরে উঠে না যায়। তেমন কিছু অবশ্য হলো না। খেলাতে স্বভাবতই হেলাল পরাস্ত।

বাবার আচরণটি নিয়ে সুমি সারাদিন ভেবেছে। সামান্য লঘু অপরাধের শাস্তি এত বড় হলো কেন? পাগল ছেলেটির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা তাজা রক্ত যেমন সুমিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, সাথে সাথে সুমি এও ভেবেছে আজমান যখন পাগল ছেলেটাকে বের করে দিতে চেষ্টারত, তখন সে আজমানকেও একই প্রশ্ন করে বসল। এত বড় ঝাপটা বয়ে গেল অথচ সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রশ্ন করাটাই যেন একমাত্র লক্ষ্য। অজানা অচেনা একটা লোকের প্রশ্ন মুখে মুখে কয়েকবার উচ্চারণ করার কারণে সুমির মাথার ভেতর সেটা গেঁথে যেতে লাগলো। আবছা আবছা করে সুমির মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। ছোট একটা গলিতে তিন কামরার ঘরে থাকত ওরা। সেখান থেকে গিয়েছিল আজিমপুরের হলুদ কলোনীতে। খেলার সরঞ্জামের মধ্যে ছিল মাটির চারা দিয়ে কুতকুত খেলা, দড়ি লাফানো আর বৃষ্টির দিনে লুডু খেলা। ঝট্পট সুমির বাবার কতগুলো পদোন্নতি ও বদলির কারণে অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করলো। যে কোনো ন্যায়নীতির পক্ষের সরকারি কর্মকর্তার জীবনে উন্নতি আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তার বাবা একজন সৎ পুরুষ। অনেক লোক তার ব্যক্তিত্বের কারণে তাকে অনুসরণ করে চলে। বাবাকে নিয়ে সুমির বেশ গর্ব। তবুও একটি সন্দেহ দূর করতে সুমি তার বন্ধু সমতুল্য একজন সিনিয়ার ভাইকে ফোন করলো রাত দশটায়।

বি.সি.এস. পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের জন্য বসে আছে অনীক। খুবই মেধাবী ছাত্র। বিদেশের বড় বড় স্কলারশিপ যারা অনায়াসে পায়ে ঠেলে দেয় সেইজাতীয় যুবক। খুবই দেশজ। রাত দশটার সময় সুমির ফোন আসাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তবুও সুমির গলা শুনে অনীক একটু ঘাবড়িয়ে গিয়ে বললো, কি খবর রাজকন্যা? অনীক সুমিকে রাজকন্যা বলেই ডাকে। সুমি একটা গল্প আঁটলো। সে বললো, তার এক মামাতো বোনের বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। গরিব মামার মেয়ে, সারাজীবন কষ্ট করেছে। যার সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে সে একজন সদ্য চাকরিলব্ধ সরকারি কর্মকর্তা। তার এই মামাতো বোনটা কি গরিব বাবার ঘরে থেকে গরিব স্বামীর ঘরে যাচ্ছে? সুমির উৎকণ্ঠার জবাবে অনীক বললো, সরকারি চাকরিজীবীদের টাকাপয়সার কি কোন কমতি আছে? একটু অসৎ হলেই তো মুঠি ভরা টাকা।

 অনীক ভাইয়া, তুমি কি করে বুঝলে আমার মামাতো বোনের হবু স্বামী অসৎ লোক? তুমি নিজে কি অসৎ হতে পারবে?
 তাহলে তো তোর বোনের বারোটা বেজে গেছে। জোড়াতালির জীবন থেকে সে আর বের হতে পারলো না। পারলে বিয়েটা ঠেকিয়ে দে।
 কি সব বলছো, সরকারি অফিসাররা কি সব বিনা বেতনে চাকরি করে নাকি ?
 তুই কি সরকারি পে-স্কেলটা বুঝিস?

সুমির গল্প বলাটা এতক্ষণে কাজে লাগলো। এখন সে আসল আলাপে ঢুকলো। সুমির প্রশ্নের কারণে অনীককে বাংলাদশ সরকারের পে-স্কেলটা বুঝিয়ে বলতে হলো।
 দাঁড়াও দাঁড়াও, কি সব কঠিন ফিগার। একটু নোট করে নিতে হবে।
অনীকের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে তার বাবার আনুমানিক বেতন কত হতে পারে সেই ফিগারের উপর আঙুল রেখে একদম আকাশ থেকে পড়লো সুমি।
 অনীক ভাইয়া, তোমার কথা সত্যি হলে বাবার বেতনে আমাদের সংসার চলার কথা বড়জোর এক কি দু’ঘণ্টা!
 এই মেয়ে, তুই তো হলি এ-যুগের রাজকন্যা! রাজকন্যাদের সংসার কি বেতনের টাকায় চলে?
 তার মানে, আমার বাবা … !
 হঠাৎ তুই তোর বাবার বেতনের পেছনে লাগলি কেন? তোর বাবা কি তোকে কম সুখে রেখেছে? সিঙ্গাপুর, মালেয়েশিয়ায় তোর নামে দু’টো ফ্ল্যাট বাড়ি, চিটাগংয়ে তোর নামে পাহাড় কেনা আছে, তুই এত ছাইপাঁশ হিসেব করছিস কেন?
 শুধু তাই নয় অনীক ভাইয়া, বাবা আমাকে দিয়ে তিনবার তিনটি বিদেশি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট খোলার ফর্মে সই করিয়ে নিয়েছে। তার মানে বিদেশি ব্যাঙ্কেও আমার নামে প্রচুর টাকা আছে।
 সেজন্যই তো বলি, আমাকে বিয়ে কর। তোর টাকা-পয়সায় আমি দেবদাসের মতো শুধু মদ গিলবো আর নাচ দেখবো।
 অনীক ভাইয়া ঠাট্টা রাখ। আমি তোমাকে একটু পরে আবার ফোন করছি। এখন রাখি।
 এই শোন্ শোন্ …।

না, সুমি আর কোনো কথাই শুনলো না। সারারাত সে বাতি নিভিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করে বেড়ালো।

পরের দিনে সকালে সুমি তার বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা প্রশ্ন করার অনুমতির অপেক্ষায়। আদুরে মেয়ে কত ভদ্র-নম্রভাবে বড় হচ্ছে সে-কথা উপলব্ধি করে আনোয়ার উল্লাহ্ নিজেকেই বাহবা দিতে লাগলেন। সুমির কিছু বান্ধবীর বিয়ে হয়ে গেছে। কারো কারো ঘরে ফুটফুটে সন্তান এসেছে। সঠিক রাজপুত্রের সন্ধান মেলেনি তাই সুমির বিয়েটা এখনো হয়নি। যে কুমারী মেয়ের নামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি সে কিনা একটা প্রশ্ন করার জন্য অনুমতি চেয়ে অপেক্ষা করছে। সুশিক্ষা দিলে যে কি ফল পাওয়া যায় সুমি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

 বলো মা, কি জানতে চাও, এই বলে আনোয়ার উল্লাহ্ তার পাশে এসে মেয়েকে বসতে বললেন। সুমি আগের জায়গাতে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করলো  বাবা, তোমার বেতন কত ?
আকাশ থেকে বড়শি ফেলে কে যেন সুমির মার চোখ টেনে ধরলো। একটা সিংহের গর্জনে এখনি যেন সমস্ত পাখির ডিম ফেটে যাবে, এ পৃথিবী পাখি-শূন্য হবে, ভয়ে তিনি একটা কেঁচোর মতো এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। আনোয়ার উল্লাহ্ কি ভুল কিছু শুনেছেন, নাকি গতকালকের সেই ছেলেটার প্রশ্ন এখনো কানের ভেতর ঘুরঘুর করছে ? কালবিলম্ব না ক’রে সুমি আবারো প্রশ্নটা করলো,
 সত্যি করে বলো তো বাবা, তোমার বেতন কত।

বলাবলির আর কোন পরিবেশ রইল না। বসে-থাকা চেয়ারটাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে আনেয়ার উল্লাহ্ উঠে দাঁড়ালেন। আনোয়ার উল্লাহর কাছ থেকে চেয়ারটি মুক্তি পেয়ে তেপান্তর পাড়ি দিতে চাইলো। প্রাণহীন চেয়ারটি বেশিদূর পালাতে ব্যর্থ হয়ে অসহায়ের মতো কাত হয়ে শুয়ে পড়লো।

পুরো খাবার টেবিলটা মাটিতে উলটিয়ে দিলেন মিস্টার আনোয়ার উল্লাহ্ চৌধুরী। খাবার টেবিলের উপরে যত খাবার ছিল সব উলটোপালটা হয়ে গেল, আপেলের প্লেটে কমলা, আর কমলার ঝুড়িতে ঝুলন্ত কলা।
 এতবড় সাহস ! আমার মেয়ে আমাকেই জিজ্ঞেস করে আমার বেতন কত ?

আরো অনেক লঙ্কাকাণ্ডই ঘটাতে পারতেন আনোয়ার উল্লাহ্। কপাল ভাল, তিনি শুধু হুঙ্কার দিতে দিতে সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন।
 আজমান, এই বেটা আজমান, ঐ পাগলের বাচ্চাকে এক্ষুণি ধরে নিয়ে আয়। ওটার গায়ে ঘি ঢেলে আমি ওকে পুড়িয়ে মারবো। ঐ বেটা সিকিউরিটির বাচ্চা, কোথায় গেলি?

সুমির মা সুমিকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। সকাল সকাল তার বাবার সাথে বেয়াদবি করা মোটেও ঠিক হয়নি। কতরকমের ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। ঘরেও অশান্তি দেখা দিলে তিনি তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

প্রশ্নটা সুমি এবার ওর মাকে করলো।  মা, তুমি কি তোমার স্বামীর বেতন কত সেটা জান ?
 ছিঃ ছিঃ ছিঃ, একটা পাগলের কথা শুনে তুইও দেখি পাগল হয়ে গেলি।
 সত্যি করে বলো মা, বাবার এত টাকা কোথা থেকে এলো, বাবা কি স্মাগলার না ঘুষখোর ?
 কেন বাজে কথা মুখে আনছিস ? তোর বাবার কতগুলো বিজনেস আছে তুই কি সেটা জানিস ?
 সরকারি চাকরি ক’রে তিনি কি কোনো বিজনেস করতে পারেন ?
 বিজনেস তো সবই তোর নামে।

সুমি তার মায়ের কাছে এসে বললো, সত্যি সত্যি মা তুমি খুব সরল। তোমার স্বভাবটা তুমি হয়তো তোমার নানি-দাদির কাছ থেকে পেয়েছো। অথচ অদ্ভুত কাণ্ড কি জানো মা, বাবারা তোমাদের মতো সরল থাকেনি, গরলে গরলে তারা নতুন যুগ গড়ে তুলেছেন।

কাচের ফ্রেমের ভেতর বসিয়ে রাখা একটি কাচের পুতুল যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। কি এমন কঠিন প্রশ্ন ছিল যার জন্য তার বাবা এত বড় অপমান করলো তাকে! যে-বাড়িতে একটা পিঁপড়ের ছানাও সুমির দিকে মুখ তুলে তাকায় না সে-বাড়িতে সুমি আজ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়লো। ভালবাসা, আদরযত্ন সবই কি মেকি? স্বার্থের উপর বড় কিছু নেই? এমনকি আদরের কন্যাও নয়? নিজের বন্ধ কক্ষে বসে সুমি বেশ কয়েকটা ফোন করলো। ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় সময়মতো আসতে বললো।

সুমির নির্দেশ মতো যে-বাড়িতে সুমির বন্ধুরা জড়ো হয়েছে সে-বাড়িটা বেশ পুরনো। অনেকদিন হয় সংস্কার করা হয় না। সুমির বন্ধু আদনানের বাসা এটা। আদনানের বাবা-মা সিলেটে গিয়েছেন অসুস্থ রোগীকে দেখতে। সুমির বন্ধুরা যত্রতত্র বসে সুমির কথা শুনছে। কেউ টেবিলের উপর, কেউবা সোফার হাতলে, কেউবা মেঝেতে। সুমির পাশে দাঁড়ানো আদনান আর অনীক। অনীকের পাশে জিহান। সৎ বাবার মেয়ে জিহানও অনীকের সাথে বি.সি.এস. পরীক্ষা দিয়েছে। সুমিকে সে আগে কখনো দেখেনি, অনীকই তাকে সাথে করে নিয়ে এসেছে আজ। সুমি সকলের সামনে পাগলের গৃহ প্রবেশ থেকে শুরু করে তার বাবার অস্বাভাবিক আচরণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলে উপস্থিত সকলের ভেতর একটা গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়ে গেল। সুমি বললো, আমাদের কিছু একটা করতে হবে। গোপন এই সমাবেশে জিহান একটি প্রতিবাদী মন জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করলো। সে বললো, কোনো ব্যক্তির ভালকাজের যেমন প্রশংসা করতে হয় তেমনি মন্দকাজের প্রতিবাদ করাটাও জরুরি। দুর্গন্ধ নর্দমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে নাকে দুর্গন্ধ ঢুকে যায়। ভীষণ একটা দুর্গন্ধ মেখে আমরাও সমাজের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা যেখানেই যাইনা কেন, লোকেরা আমাদের থেকে সেই দুর্গন্ধটা পায়। আমরা অনেকেই অসৎ পিতা-মাতার সন্তান। আমরা সকলে চলমান এক একটি নর্দমা। আমাদের নর্দমার চারপাশে শক্ত ইটের গাঁথুনি দেখে কেউ কিছু বলে না ; সত্য কথা হলো, আমাদের কেউ ভালো চোখেও দেখে না। অসুস্থ হাওয়ার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ যেমন সুস্থ থাকতে পারে না, অসৎভাবে উপার্জিত অর্থের সাহায্য নিয়ে বেড়ে উঠে আমরাও স্বাভাবিক থাকতে পারবো না।
এরপর একে একে উপস্থিত সকলে মুখ খুলতে শুরু করলো। মনোযোগ দিয়ে সকলেই সকলের কথা শুনলো।

রাজীব: আমরা অসৎ পিতা-মাতার হাত থেকে মুক্তি চাই।
আসমা: আমরা ওদের শাস্তি দেব। সন্তানের হাতে অসৎ পিতা-মাতারা চরম শাস্তি পাবে।
রাসেল: যে বাবা-মা সন্তান জন্ম দিয়ে মানুষ করার জন্য অসৎ পথ বেছে নেয়, অন্যকে ঠকায়, দেশকে দুর্নামের মুখে ঠেলে দিয়ে ধার্মিক ও সামাজিক মহামানুষ সাজে, ঐ-সমস্ত হিপোক্রিটদের কেন আমরা গুরুজনের সম্মান দেব?
আসাদ: জন্ম দিলেই যদি পিতা-মাতা হয়ে যাবে তাহলে যুদ্ধ-শিশুদের শরীরে তো পাকিস্তানি সেনাদের রক্ত বইছে, ঐ সমস্ত বদরক্তের কোনো পিতৃত্ব নেই!
রাজীব: নির্ভেজাল অভিভাবকের অন্বেষণে আমাদেরকে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে হবে। পবিত্র সন্তান যারা দাবি করেন, তাদেরকেও পবিত্র হতে হবে।
আসমা: আমাদের বাবা-মায়েরাই একদিন বলবে, সন্তানের ভালোর জন্যই তারা খুষ খেতো, দুর্নীতি করতো। বলো তো দেখি, ভাল থাকার জন্য বাবা-মাকে কেন ঘুষ খেতে বলবো? আমরা কি এতই খারাপ?
চন্দন: আমরা কি দেশের মধ্যে আর একটি দেশ বানিয়ে বসবো ? অসৎ বাবা-মা’র সন্তান বলে আমাদের গায়ে একদিন ঢিল ছুড়ে মারবে রাস্তার মানুষ। আর যে-সব লোক আমাদের অসৎ বাবা-মায়ের হাতে ঠকছে, তারা কি চিরদিন এমনি করে ঠকতে থাকবে? একদিন কি তারা জেগে উঠবে না, তাদের সন্তানেরা কি যুগের পর যুগ বঞ্চিত হয়ে থাকার বিড়ম্বনা বয়ে বেড়াবে? তারা জেগে ওঠার আগেই আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে।
রাবিতা: আমার এক চাচা আছেন, ঘুষ খেয়ে খেয়ে প্রচুর সম্পত্তি বানিয়েছেন। কিছুদিন পর রিটায়ার করবেন তবুও এখনো ঘুষ খাওয়া ছাড়ছেন না। তাঁকে গিয়ে বলবো, চাচা আপনি মরে গেলে পাশাপাাশি দুটো কবর খুঁড়ে দেবো, একটা আপনার জন্য, অন্যটা আপনার টাকার জন্য।

জিহান সকলের মতামত শুনে করণীয় কাজগুলো বুঝিয়ে বললো We should engage ourselves in conversation – a dialogue with our parents. আমাদের অনেক পিতা-মাতা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছেন। আমরাও এই দেশের নাগরিক, দেশ গড়ার কাজে আমরা এখনো হাত দিইনি, অথচ যাদের দায়িত্ব তারা দেশটাকে শূন্য করে দিচ্ছে। শূন্যতার মাঝে আমরা কি গড়তে পারবো ? অতএব যতটুক বাকি ততটুকু রক্ষা করতে হবে। এখনই। আমাদের পিতা-মাতাকে প্রশ্ন করতে হবে, আয়ের উৎস কি। এই প্রশ্ন সকলের নাগরিক অধিকার। সরকার, রাষ্ট্র, আইন এ-সব জায়গা থেকে প্রতিবাদ এলে তার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ক্ষমতাবানদের কোনো বেগ পেতে হবে না। যে দেশে আইন কেনা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে ঘুষ দেয়া যায়, প্রশাসনকে তুড়ি মেরে ফেলে রাখা যায়, সে দেশকে ওরা ভয় করবে কেন ? তবে খোদ পরিবার থেকে যদি প্রতিবাদ গড়ে ওঠে সেটা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কারো থাকবে না। দেশের প্রশাসন ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু পরিবার ব্যবস্থা এখানো টিকে আছে। ঘরে ঘরেই আবারো দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। অতীতে আমরা এর সুফল দেখেছি, এবারও দেখবো। ঘরের বিরুদ্ধে ওরা ক্ষমতা দেখালে, ঘর ছাড়া হবে। পথে বসে যাবে। যত বড়ই অসৎ ও দুর্নীতিবাজ হোক না কেন ঘর ছাড়া হতে চাইবে না কেউ। তোমরা সকলে বলো এই বিপ্লবে তোমরা জয়ী হতে চাও কিনা, যেখানে সন্দেহ সেখানেই প্রশ্ন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, টাকাপয়সা থাকা মানেই দুর্নীতিবাজ নয়। আবার যাদের টাকাপয়সা নেই তাদের মধ্যেও অনেক দুর্নীতিবাজ লোক রয়েছে। এদেশে এখনো ভালোমানুষের সংখ্যা বেশি। তারাই আমাদের সাথ দেবে। এই সভা পিতা-মাতার আয়ের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করাকে যুক্তিসিদ্ধ বলে রায় দিলো। এই হোক আমাদের নতুন বিপ্লবের যাত্রা। যেখানেই সন্দেহ, সেখানেই প্রশ্ন।

একে একে বেরিয়ে এলো সুমির বন্ধুরা। যেভাবে একসময় কমিউনিস্ট পার্টির গোপন মিটিং হতো কিংবা অপারেশনে যাবার আগে মুক্তিবাহিনীর নির্দেশ নিতে গোপন আস্তানায় যেতো, ওরাও যেন ঠিক সেভাবেই একত্রিত হয়েছিল। শুরু হয়ে গেল পায়ে পায়ে এগিয়ে চলা। একে একে একটা বিরাট দলের পদযাত্রা। ঘরের বাইরেই শুধু নয়, কেউ কেউ সাহস করে ঘরের ভেতরেও পোস্টার লাগিয়ে দিলো  বাবা তোমার বেতন কত ?

প্রশ্নের প্রথম বোমাটা ফাটালো রাজীব। বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে সে তার মাকে প্রশ্ন করলো। রাজীবের মা জানতেন তার স্বামীর বেতন কত। বেতনের সব টাকাই তিনি স্ত্রীর হাতে তুলে দেন। মায়ের কাছ থেকে বাবার বেতনের কথা শুনে রাজীব বললো  বাবা এত কষ্ট করে, আমাকে একটু জানতেও দাওনি কেন? শুধু একটা ডিম সিদ্ধ দিয়ে বাবা আজ লাঞ্চ করবে। আগামীকাল তার লাঞ্চের তালিকায় শুধু মাত্র সাগর কলা। মা আমার বড় লজ্জা হচ্ছে। আমি এক অপদার্থ সন্তান।

রাজীবের মা রাজীবকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন, আগে পড়ালেখা শেষ কর, পরে সংসার নিয়ে ভাববি।
রাজীব সে-কথা শুনতে রাজি নয়। আগামীকাল থেকে সে একটা পার্টটাইম চাকরি করবে ব’লে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একটা বাসে পা-দানিতে ঝুলে রাজীব তার বাবার অফিসে গিয়ে হাজির। ছোট অফিস রুমে তিনজন একত্রে বসে কাজ করছে। তার মধ্যে তার বাবার মুখটাই খুব হাসিখুশি। অথচ পোশাকআশাকে তাঁকে দেখতে অতি সাধারণ মনে হলো। রাজীবের বাবার সহকর্মী দু’জনের একজন অফিসে আসেন মোটর-সাইকেলে চড়ে, অন্যজনের রয়েছে নিশান গাড়ি। রাজীবের বাবা দুই মাইল পথ হেঁটে হেঁটে অফিস করেন রোজ।
 কিরে, তুই এখানে ?
রাজীব সাথে সাথে উত্তর দিলো ঃ এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোমাকে একটু দেখে যাই।
 আমাকে আবার কি দেখবি, এই তো মাত্র লাঞ্চ শেষ করলাম। একটু আগে এলে আমার সাথে খেতে পারতি।
 কি খেতে পারতাম ?
 কেন লাঞ্চ। তুই কিছু খেয়েছিস ? বস্, তোকে কিছু আনিয়ে দিই।
 না বাবা, আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, আমিও তোমার মতো পেট পুরে খেয়ে এসেছি। যতটুকু খালি পেট ছিল তোমাকে দেখে ভরে গেছে। এখন যাই বাবা।

সেখান থেকে বের হবার সময় রাজীব দেখলো, তার বাবার এক সহকর্মীর টেবিলে কাচ্চি বিরিয়ানি, আর অন্যজনের টেবিলে সুগন্ধি চাইনিজ।

আসমা তার নানুকে বলল, নানু অনেক আগে তুমি যে আমাকে নিজাম আউলিয়ার গল্প শুনিয়েছিলে সেটা আবার শোনাতে পারবে ? আসমার নানু কিছুটা ঠাট্টামশকরা করে গল্পটা আবারো বলতে শুরু করে দিলো। আউলিয়া হবার আগে তিনি ছিলেন ডাকাত দলের সর্দার। লোকে তাকে নিজাম ডাকাত নামে ডাকতো। পথেঘাটে ওত পেতে বসে থেকে সে মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিতো। একদিন এভাবেই সে এক ব্যবসায়ীকে বেঁধে তার সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছিল। বন্দি লোকটি নিজাম ডাকাতকে জিজ্ঞেস করলো  তুমি যে এই কাজটা করছো সেটা যে অন্যায় তা তুমি জানো ?
নিজাম ডাকাত উত্তর দিলো: জানি।
তারপর লোকটা বললো  অন্যায় কাজ করলে গুনাহ্ হয় সেটা জানো ?
নিজাম ডাকাত এবারও উত্তর দিলো, জানি।
তারপর লোকটি বললো  তুমি যে অন্যায় কাজ করে পাপী হচ্ছো সে-কথা তোমার পরিবারের লোকজন জানে ?
নিজাম ডাকাত বললো  জানবে না কেন ? পাপ আমার একা হবে কেন, ওরাও এ-পাপের ভাগীদার।
বন্দি লোকটি বললো  এ-কথা তুমি ঠিক বললে না। কেউ কিন্তু অন্যের পাপের ভাগ নিতে চায় না। যার যার পাপের শাস্তি তাকেই ভোগ করতে হবে। তোমার বোধহয় ঘরে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করার দরকার আছে তাদের কেউ কি তোমার পাপের ভাগ নিতে রাজি হবে কিনা।
নিজাম ডাকাত রেগে গিয়ে বলল  মৃত্যুভয়ে বুঝি তোমার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে, নিজে বাঁচার জন্য এখন আমাকে ঘরে পাঠাতে চাও ? আমি ঘরে যাই আর তুমি এখান থেকে পালাও। আমি আমার পরিবারের সকলকে চিনি। তারা আমার কথার অবাধ্য হবে না।
বন্দি লোকটা হেসে উত্তর দিলো  ডাকাতভাই, ভয় আসলে আমি পাচ্ছি না, ভয় পাচ্ছ তুমি কারণ তুমি ভাল করেই জানো আপনজনের কাছ থেকে তোমাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হবে। আমার তো হাত-পা বাঁধা, আমি পালাবো কি করে ?
উত্তেজিত নিজাম ডাকাত বলল  আমি এক্ষুণি যাচ্ছি, ফিরে এসে তোর কল্লা নেব।
সত্যি সত্যি হন্যে হয়ে নিজাম ডাকাত ঘরমুখো হলো। কিছুক্ষণ পর মাথা নীচু করে ফিরে এসে বন্দির হাত-পা খুলে দিয়ে সেই রশিতে নিজের গলায় ফাঁস লাগাতে চেষ্টা করলো।
নিজাম ডাকাত লোকটির পায়ের কাছে পড়ে বললো  তুমি ঠিকই বলেছিলে ভাই, আমার স্ত্রী সন্তানেরা কেউ আমার পাপের ভাগ নিতে রাজি হলো না। উলটে আমাকেই দু’কথা শুনিয়ে দিলো। সাফ সাফ ব’লে দিলো আমার কৃতকর্মের ফল আমাকে একাই ভোগ করতে হবে। তাছাড়া চোর-ডাকাতের নামের সাথে তাদের নাম জুড়ে থাক সেটাও তাদের অপছন্দ।

নানুর কাছ থেকে গল্পটা পুনরায় শুনে আসমা বললো  নানু, এখন তুমি তোমার মেয়ের কাছে গিয়ে গল্পটা শুনিয়ে এসো।
নানুর সরল প্রশ্ন  তোর মাকে কেন এ-গল্প শোনাতে যাব ? তার কি গল্প শোনার বয়স আছে, কত বড় ব্যস্ত অফিসার তোর মা। সে-কথা তোর খেয়াল নেই?

আসমা চলে যেতে যেতে বললো  না শোনাও সেটা তোমার ইচ্ছে। নিজে কখনো কোনো পাপ করেছ কিনা সেটা তুমিই ভাল জানো। এখন মেয়ের পাপের দায়ভার তুমি কাঁধে তুলে নেবে কিনা বসে বসে ভাবো। আমার সাফ কথা, ঘুষখোরের মেয়ে সে-কথা শুনতে আমি মোটেও রাজি না।
 কি বলছিস্ এ-সব ? তোকে কেন লোক ঘুষখোরের মেয়ে বলবে, তোর মা কি ঘুষ খায় ?
 তোমার মেয়ে ঘুষ খায় কিনা সেটা বের করার দায়িত্ব এখন তোমার। বাড়ি ভাড়া বাদ দিয়ে তোমার মেয়ে সাত হাজার আটশ’ বাহান্ন টাকা বেতন পায়। অথচ প্রতি মাসেই সে দু’টো করে শাড়ি কেনে যার দাম কোনোটাই পাঁচ হাজারের নীচে নয়। আমার একার পেছনেই পড়ালেখা সহ খরচ করে পনেরো হাজার টাকা। আমাদের বাড়ির প্রতি মাসে খরচ কম করে হলেও চল্লিশ হাজার টাকা। বাকি হিসাব তুমি এখন তজবি টিপে টিপে বের করো। আমি চললাম।

ওদের কাজের অগ্রগতি হচ্ছে বেশ। কথাটা এখন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরে ঘরে প্রশ্ন চালু হয়ে গেছে। ‘বাবা তোমার বেতন কত’-র এখন রঙিন পোস্টারও বের করেছে এক সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। অসৎ উপার্জনকারীদের দুরুদুরু বুকে এখন ঘরে ফিরতে হয়।
রাহেলার স্বামী সরকারি মিলের শ্রমিক দলের নেতা। ওজু শেষ করে জায়নামাজের উপর দাঁড়াবে ঠিক তখনই রাহেলা এসে জায়নামাজটা সরিয়ে নিলো। ভয়ে তার স্বামীর মুখ নীচের দিকে ঝুলে পড়লো এবং সে বললো  তোমার কথা মতো দুইবার ওজু করে এসেছি, তারপরেও ওইভাবে জায়নামাজ কেড়ে নিলে কেন?

রাহেলা বললো  তুমি গায়ের ময়লা পরিষ্কার করেছো কিন্তু মনের ময়লা পরিষ্কার করতে পারোনি। আল্লাহ্ তোমার শরীরের এবাদত চান না, তিনি চান পরিষ্কার মন। এই নাবালক দু’টি সন্তানের মাথা ছুঁয়ে সত্যি সত্যি ওদের প্রশ্নের উত্তর দেবে ?
 কেন দেব না ? বলো বাবারা তোমাদের প্রশ্ন কি। দু’টি শিশু ওদের বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা তোমার বেতন কত ?’
রাহেলার স্বামী সত্য কথা বলবে ভেবে সন্তানের মাথার উপর যে হাত রেখেছিল, সে-হাত দু’টি সরিয়ে নিয়ে মাটিতে বসে পড়লো। রাহেলা তার স্বামীকে জায়নামাজ ফেরত না দিয়ে ভেতর ঘরে ঢুকে অঝোরে কাঁদতে লাগলো।

আনোয়ার উল্লাহ্ সিংহের মতো ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছেন। এদিকে সুমির মায়ের শরীরটা শক্ত হয়ে চেয়ারের সাথে লেগে আছে। ঠিক যেন একটা জড়পদার্থ। বাড়িতে দমকা বাতাস বইছে। বিপদ সঙ্কেত দশের উপরে ছাড়া নীচে নয়। এ-রকম পরিস্থিতিতে সুমি আর আজমান এসে হাজির।

 কোথায় ছিলি সারাদিন? আর এই সিকিউরিটির বাচ্চাকে কোথা থেকে নিয়ে এলি ? ওকে সেই সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না কেন?
সুমি বললো  আজমানকে আমিই নিয়ে গিয়েছিলাম।
 কেন, ওকে নিয়ে কেন বাইরে যাবি, ওর সাথে তোর কি কাজ?
সুমির মা বললেন  সেই পাগল ছেলেটাকে খুঁজতে গিয়েছিলি তোরা?
 তুমি চুপ করো, যা জানতে হয় আমি জিজ্ঞেস করবো। কোথায় গিয়েছিলি তোরা ?
 বাবা তুমি অহেতুক চিৎকার করবে না। আমি সবকিছু বলতেই এসেছি, শুধু শুধু চিৎকার করলে আমি কিছু বলবো না।
 কি বলবি না, হ্যাঁ, কি বলবি না শুনি?
আজমানকে সুমি ইশারা দিতেই সে সুমির মায়ের পা ধরে সালাম করলো।
 কি করছো বাবা, হঠাৎ সালাম কেন?
সুমি বললো  আমরা বিয়ে করেছি মা।
চেয়ারশুদ্ধ লাফিয়ে উঠলেন আনোয়ার উল্লাহ্  কি বললি ! কি করেছিস তুই ?
 আহ্ বাবা, চিৎকার করবে না। আমি চিৎকার পছন্দ করি না। একটা মিথ্যে কথা বলে আজমানকে সকালে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর ওকে নিয়ে সোজা কাজী অফিস। আগে থেকেই আমার বন্ধুরা ওখানে অপেক্ষা করছিল। আজমানকে বিয়ে করার কথা বলতেই ও মরে যেতে রাজি হলো কিন্তু আমাকে বিয়ে করতে চাইলো না। আমার নামে যত টাকাপয়সা আছে তার একটা হিসাব দিলাম ওকে, তাতেও সে রাজি হলো না। অত টাকা-পয়সার নাকি তার কোনো প্রয়োজন নেই। সত্যি সত্যি তখন ওকে ভালো লেগে গেল। একজন অভাবী ছেলে, তারও টাকা-পয়সার প্রতি লোভ নেই অথচ আমার বাবার এত লোভ। তোমাদের দুজনের মধ্যে অনেক পার্থক্য বাবা। আমার ছেলে-বন্ধুরা ওকে বোঝালো, পুশ করলো, তারপরও সে শুধু বলে যাচ্ছিলো, নেমকহারামি ওকে দিয়ে হবে না। আমি ওকে বলেছি, যে-লোক নিজের জন্মভূমির সাথে, নিজ দেশবাসীর সাথে নেমকহারামি করছে তার খাওয়া নুনের গুন গাইছো আজমান! এরপরেও তাকে রাজি করাতে পারিনি।

আনোয়ার উল্লাহ্ তার পিস্তল খুঁজতে লাগলেন।
 এই মুহূর্তে আমি এই দু’টোকে খুন করে ফেলবো। তারপর দরকার হলে ফাঁসিতে ঝুলে যাবো।
 বাবা, আমাকে তুমি খুন করবে করো কিন্তু যে ছেলে তোমার মেয়ের এতবড় একটা উপকার করলে তাকে কেন তুমি খুন করবে? ওকে তো তোমার বুকে জড়িয়ে রাখা উচিৎ। একজন কলঙ্কিত দুর্নীতিবাজ পিতার মেয়েকে কে বিয়ে করতে চাইবে বলো? আজমানের মনটা খুব ভালো, তাই তো সে আমাকে দয়া করেছে।

আনোয়ার উল্লাহর স্ত্রী আগে থেকেই পিস্তলটা সরিয়ে রেখেছিলেন বলে তেমন কোনো বিপদ ঘটেনি। যদিও পিস্তল না পেয়ে আনোয়ার উল্লাহর উত্তেজনা আরো বেড়ে গেল। উত্তেজিত হয়ে হাতের কাছে যা পাচ্ছেন সেটা ছুড়ে মারতে লাগলেন। শেষে একটা ক্রিস্টালের ফুলদানি উঠিয়ে আজমানের দিকে তেড়ে আসতেই সুমি তার বাবার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো  প্রয়োজনে তুমি যে মানুষও খুন করতে পারো তার ইঙ্গিতও আমি পেয়েছি। দু’টো খুনের সাথে তুমি জড়িত সে-কথাও আমাকে জানানো হয়েছে। তাই ঘরে ফেরার আগে থানায় গিয়ে ডায়েরি করে এসেছি। যদি প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে আমরা থানাতে ফোন করে নিরাপদ অবস্থানের কথা না বলি তবে ওরা এসে তোমাকে থানায় নিয়ে যাবে। আমাদের এক বন্ধু জিহান, তার বাবা একজন সৎ পুলিশ অফিসার। তিনিই এই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ জেগে উঠেছে বাবা। সৎ লোকেরা সাহায্য, পরামর্শ নিয়ে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। তুমি তোমার সাধারণ বুদ্ধি খোয়াবে না সেটাই আশা করবো। বাড়ির বাইরে দু’টো গাড়িতে আমার সাত-আটজন বন্ধুরা অপেক্ষা করছে। ওদের সকলের হাতে একটা করে সেল্ফোন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায় আমরা ঝড় তুলে দিয়েছি। এ এক নতুন বিপ্লব। তোমরা এই বিপ্লবের শ্রেণীশত্রু বাবা।

সুমির মা তার স্বামীর হাত থেকে ফুলদানিটা কেড়ে নিয়ে তাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। উত্তেজনায় এয়ারকন্ডিশনড রুমে আনোয়ার উল্লাহ্ ঘেমে অস্থির। এবার সুমির মা এসে সুমিকে প্রশ্ন করলো  হঠাৎ বিয়ে করার মতো কি এমন হলো? তাও আবার লেখাপড়া না-জানা একটি ছেলের সাথে !
 আজমান লেখাপড়া জানে না কথাটা ঠিক নয় মা। তবে আমার থেকে কিছু কম। তুমিও বাবার থেকে কম লেখাপড়া করেছো সেজন্য তো তোমাদের বিয়ে আটকে থাকেনি। শুধুমাত্র পড়ালেখা দিয়ে মানুষের বিচার করার দিন শেষ হয়ে গেছে মা। আমেরিকার অনেক বড় বড় কোম্পানীর মালিক হাই স্কুলও শেষ করেনি। সামান্য লেখাপড়া করে অনেকে আবার বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেণ্ট প্রধানমন্ত্রীও হয়েছেন। বাংলাদেশের শ্রমিক-চাষীরা কতটুকু লেখাপড়া করেছে বলো, ওদেরকে কি তোমরা মানুষ ব’লে মনে করো না ? তোমার বাবা তো সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন, তাঁকেও কি মানুষ মনে করো না তোমরা ? মানুষের বিয়ে হবে মানুষের সাথে, এতটুকুই সত্যি। বাকি সব বানানো পদ্ধতি। একটা কথা শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে মা, আজমানকে যখন শেষ পর্যন্ত রাজি করাতে পারছিলাম না তখন ওকে বলেছিলাম আমাকে দয়া করতে। খুব বড় একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে নেমেছি। ছোট ছোট আঘাত দিয়ে সে যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। বড় আকারের যুদ্ধের জন্য বড় বড় সব কাণ্ড ঘটাতে হবে। তাই আমাদের বিয়েটা খুব জরুরি ছিল। লোভ-লালসায় নয়, আজমান তোমার মেয়ের সহযোদ্ধা হতে হাত বাড়িয়েছে। আমাকে সে কোনদিনও অযতœ করবে না তোমরা নিশ্চিত থেকো।

আনোয়ার উল্লাহ্ চেয়ারে বসা অবস্থায় ফোড়ন কেটে বললেন  বিয়ে একটা করলেই হলো, চালচুলো-ছাড়া জীবন যে কতটা কঠিন সেটা তোমার মেয়েকে বোঝাও।
কথাটা যদিও সুমির মাকে বলা হলো, কিন্তু উত্তরটা এলো সুমির কাছ থেকে। তোমার আজ যত টাকা-পয়সা সে তো একদিনে হয়নি, তুমি আমাদের বর্তমান দেখছো, ভবিষ্যতের সাথে বর্তমানকে মেলাতে গেলে ব্যর্থ হবে। সময় পেলে অসৎ না হয়েও আমরা খেয়েপরে বাঁচতে পারবো। সেজন্য ভেবো না আমরা তোমার মত অর্থের পাহাড় গড়বো। এ-পৃথিবীতে সবকিছুই সীমিত। যে কোনো জিনিস একজনের জন্য বেশি মানে অন্যের কাছে তার ঘাটতি। আমরা সেটা বুঝি, শুধু বোঝ না তোমরা। চল আজমান, মা আমরা আসি।

ক্ষণিক করে আসা উত্তেজনা আবারো মাথা তুলে দাঁড়ালো  কোথায় যাচ্ছিস? ঘর থেকে এক পা বাইরে গেলে আমি তোকে মাটিতে পুঁতে ফেলবো।
বাবার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সুমি আবারো বললো  চল আজমান, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।
হাতের কাছে লাঠি-জাতীয় একটা কিছু পেয়ে সেটা উঁচু করে তেড়ে আসতেই আজমান আনোয়ার উল্লাহ্র হাত চেপে ধরলো। সুমির মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। সে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বললো  দেখলে মা, আজমান তোমার মেয়েকে শুধু ভালইবাসবে না, বিপদে আপদে রক্ষাও করতে পারবে।

তারপর সে নব-বিবাহিতা স্ত্রীর ন্যায় ইশারায় বললো  বাবার হাত ছেড়ে দাও আজমান।
কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের একজন বড় কর্মকর্তা হলেন সলিমুল্লাহ জাফর। গাড়ি থেকে নেমে হাতের মুঠোয় ব্রিফকেস ধরে তিনি এগুচ্ছিলেন। সমস্ত দিনের ক্লান্তির পরও ইদানিং ঘরে ফিরতে তার মন চায় না। একটা সংশয় তাকে ঘিরে ফেলেছে। কখন যেন একটা কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ছোট পথটুকু অতিক্রমের মুহূর্তে তিনি মনে করলেন কে যেন তার পিছে পিছে হেঁটে আসছে। পেছনে তাকাতে তার বেশ ভয় হচ্ছিল। সেলিমুল্লাহ জাফরের অনুমান মিথ্যে হয়নি। পেছন থেকে তার বড়ছেলের কণ্ঠস্বর আজ ভেসে এলো  বাবা।

সেলিমুল্লাহ্ সাহেব কাঠপুতুলের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিছু বললেন না, পিছে ফিরেও তাকালেন না। তার বড়ছেলে শুভ্র বললো  বাবা, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
ভয়ে কম্পমান পিতা তার পুত্রকে শুধালেন কি কথা ?
শুভ্র পিছনে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করলো  বাবা, তোমার বেতন কত ?
অনেক নামিদামী ব্যক্তি সেলিমুল্লাহ জাফরের হাতের ব্রিফকেসটাকে মনে হলো পাহাড় সমান ভারী। সেটাকে ধরে রাখার কোনো শক্তি আর রইল না। ভারি ওজনের ব্রিফকেস ভারি একটা শব্দ করে মাটিতে পড়ে রইল। সেলিমুল্লাহ্ জাফরের শূন্য হাত ঝুলে থাকলো শূন্যে।

কোনো পরিবর্তন যার চোখে পড়ে না সেই তো আসল পাগল। এরকম একটা পাগলের নামই বেতন পাগল। ঘরে ঘরে যখন একটা বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে তখনো বেতন পাগল ঘরে বসে থাকে না। পথিকের চলার পথে বাধা দিয়ে সেই একই প্রশ্ন করে চলছে  বাবা তোমার বেতন কত ? ঝড় বৃষ্টি রোদ কোনকিছুই তাকে আটকাতে পারে না, শুধু অন্ধকার আর ক্ষুধার প্রতি তার ভীষণ ভয়। যতদিন এ ভয় মিটে যাবার সম্ভাবনা দেখা না দেবে ততদিন পাগলের প্রলাপও চলতে থাকবেবাবা তোমার বেতন কত ?

Channel-i-Tv-Live-Motiom

ট্যাগ: বেতন
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

ময়মনসিংহে হামে আরও ১ শিশুর মৃত্যু 

জুন ২৯, ২০২৬

জুনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ

জুন ২৯, ২০২৬

শীর্ষ দুই গণমাধ্যম বন্ধের নির্দেশ উগান্ডা সেনাপ্রধানের

জুন ২৯, ২০২৬

ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে ৭ দিনে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মৃত্যু

জুন ২৯, ২০২৬

সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে কানাডার ইতিহাস, শেষ ষোলোতে সহ-আয়োজকরা

জুন ২৯, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey June 2025 Desktop
Bkash Full screen (Desktop/Tablet) Bkash Full screen (Mobile)

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • ফিফা ২০২৬
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT