শাসনে কঠোর, ভালোবাসায় কোমল, স্নেহে উদার, ত্যাগে অগ্রগামী তিনিই বাবা। সন্তানের মাথার ওপর যার স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো। সন্তান যতই বড় হোক না কেন বাবার কাছে সে সব সময়ই ছোট। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে অসীম সংগ্রাম করে স্নেহপ্রবণ বাবা, শত কষ্টের মধ্যেও সন্তানের জন্য সাধ্যমতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়েই যার আনন্দ তিনিই তো বাবা। যেকোন ধরনের দুঃখ-কষ্ট একাই সহ্য করেন বাবা। সব সময় চেষ্টা করেন দুঃখ-কষ্ট যেন তার সন্তানদের স্পর্শ না করে। সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে যিনি সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, বাবা তিনিই।
একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যে শব্দগুলো সবার আগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার অন্যতম হচ্ছে `বাবা`। এ যেন সন্তানের কাছে চিরন্তন আস্থার প্রতীক। কোনো শিশু যখন এই শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে তখন বাবার মন পুলকে ভরে যায়। বাবা বলে ডাকতে পারাতে বাবার হাস্যোজ্জ্বল অনুভূতি যেন সেই অবুঝ শিশুর হৃদয়কে মুহূর্তেই আন্দোলিত করে তোলে।
‘বাবা’। ছোট্ট একটি শব্দ। অথচ এর ব্যাপকতা বিশাল। ডাকটির মাধ্যেই লুকিয়ে থাকে কী গভীর ভালোবাসা, নিরাপত্তা, নির্ভরতা। সাহিত্যে, গীত-আনন্দ ও লোককথা শিল্পকর্মে বাবা স্থান করে নিয়েছেন এক দায়িত্বশীল স্নেহময় পুরুষ হিসেবে। সন্তানের সুখ-দুঃখে বাবা তাকে বুকে চেপে রাখেন। ঘুঁচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন সন্তানের সব কষ্ট। বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক বন্ধুত্বেরও।
বাবা দিবস পালনের রীতি মূলত প্রথম শুরু হয় আমেরিকায়। কিন্তু ঠিক কোন জায়গা বা কোন সময় থেকে এটি শুরু হয়েছিলো সে সর্ম্পকে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। জানা যায়,আমেরিকার পশ্চিম ভার্জেনিয়ায় মিসেস জন ডড তার বাবাকে সম্মান প্রর্দশনের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ দিনটির প্রচলন করেন। সেই প্রচলিত ধারাটি ব্যাপকতা লাভ করে ১৯১০ সালের জুন মাসের তৃতীয় রোববার ওয়াশিংটনের স্পোকনিতে।
মিসেস ডড তার বাবা উইলিয়াম স্মার্টকে বিশেষ সম্মান প্রর্দশনের এই ভিন্নধর্মী দিবসটি প্রচলনের সুপ্ত কারণ ছিলো পৃথিবীর অন্তত একটি দিনে যেন সন্তানেরা তাদের বাবাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভালোবাসা জানাতে পারে। উলিয়াম স্মার্ট সন্তান প্রসবকালীন স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার ৬ সন্তানকে পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ একা লালন-পালন তথা মানুষ করেন। মিসেস জন ডড পিতার এই বিশাল স্বার্থ ত্যাগের কথা বিশেষ ভাবে অনুধাবন করেন। আর এই উপলদ্ধি-ই বাবার প্রতি তার ভালোবাসাকে অনুপ্রাণিত করে।
সেই অনুপ্রাণিত ভালোবাসাকে আনুষ্ঠানিকতার সাথে প্রকাশের জন্য তিনি মনের মাঝে তীব্রভাবে আলোড়ন অনুভব করেন। ভালোবাসার সেই আলোড়ন থেকেই ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বিশ্ব বাবা দিবস।
পৃথিবীর প্রথম বাবা দিবস পালিত হয় ওয়াশিংটনে ১৯১০ সালের ১৯ জুন। এরপর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে দিবসটি আয়োজনের সাথে পালনের রেওয়াজ চালু হয়। ১৯২৪ সালে বোলভিন ক্যালিস বাবা দিবস পালনের এই পরিকল্পনার প্রতি তার ব্যক্তিগত আন্তরিক সমর্থন ব্যক্ত করেন। অবশেষে ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিনডন ব্যানিস জনসন এক ঘোষণার মাধ্যমে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার কে আর্ন্তজাতিক বাবা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
বাবা, সে তো বাবাই। যার কারণে এই পৃথিবীর রং, রূপ ও আলোর দর্শন। সেই বাবা শব্দটির সঙ্গেই অপার স্নেহ আর মমতার মিশেলে এক দৃঢ় বন্ধনে জড়িয়ে থাকি আমরা। একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে প্রিয় এবং সর্বাধিকবার উচ্চারণ করতে হয় যে শব্দগুলো তার মধ্যে `বাবা` অন্যতম।
নতুন প্রজন্মের কাছে মা দিবস-বাবা দিবসের ধারণাগুলো দিন দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। গত শতাব্দীর প্রথমদিকে বাবা দিবস পালন শুরু হয়। আসলে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও যে তাদের সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল- এটা বোঝানোর জন্যই এ দিবস পালন শুরু।
বাবা কি শুধুই একটি বিশেষ দিনের জন্য! এরকম বিতর্ক থাকলেও এই বিশেষ দিনটিতে একটি ফুল অথবা একটি কার্ড নিয়ে শুভেচ্ছা জানালে বাবা তাতেই খুশি। বাবার চাহিদা এতটুকুই। ছোট-বড়, অখ্যাত-বিখ্যাত সকলের কাছেই বাবা অসাধারণ। বাবার স্নেহ-ভালোবাসা সকলেরই প্রথম চাওয়া আর পাওয়া। সন্তানের কাছে বাবা বন্ধুর মতো। কারও বাবা পথপ্রদর্শক। যাদের বাবা বেঁচে নেই, তাঁরা হয়তো আমার মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে তারাদের মাঝে বাবাকে খুঁজে বেড়ায়, মগ্ন হয় স্মৃতি চর্চায়!
ভাষা ভেদে শব্দ বদলায়। স্থান ভেদে বদলায় উচ্চারণও। তবে বদলায় না রক্তের টান। জার্মানিতে যিনি ‘ফ্যাট্যা’,এই বাংলায় তিনি ‘বাবা’। ইংরেজ সন্তান যতটা আপ্লুত হয়ে ‘ফাদার বা ড্যাড’ ডাকে, ভারতীয়দের ‘পিতাজি’ নিশ্চয় একই ব্যঞ্জনা তৈরি করে। বাবার প্রতি সন্তানের সেই চিরন্তন ভালোবাসার প্রকাশ প্রতিদিনই ঘটে। এই বিশেষ দিনে সন্তানরা তাদের বাবার প্রতি বিভিন্নভাবে সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করার এক ঐকান্তিক সুযোগ পায়।
সার্মথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন উপহার সমগ্রী দেয়ার মাধ্যমে এই প্রর্দশিত ভালোবাসা হয় আরো গাঢ় এবং উজ্জ্বল আনুষ্ঠানিকপূর্ণ। পিতার পছন্দ অনুযায়ী উপহার সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দোকানে সন্তানদের উপস্থিতি ও উৎসাহ থাকে পরিলক্ষনীয়।
২০০৬ সালের এমন দিনে আমি চট্রগ্রামের মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত থাকাকালীন সময়ে আমার বাবা আমার ওখানে উপস্থিত ছিলেন। বাবা দিবসে আমি তাকে একটি টেবিল ঘড়ি উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। আজ বাবা নেই। উপহার দিয়ে কারো চোখে আনন্দ অশ্রু দেখার সৌভাগ্যও আমার নেই। ঘড়িটি আজও টিক টিক শব্দে সময়ের শ্রোতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাবার সাথে আমার অনাবিল স্মৃতি বিজরিত সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত গুলোতে।
২০০৬ সালের আগষ্ট মাসে আমার বাবার আকশ্মিক মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর আমার ভাগ্যের চাকাটি একদম থেমে গেছে। কতকিছু পরিবর্তন হচ্ছে, কত কিছুর পরিবর্তন হবে, কিন্তু আমার এই থেমে থাকা ভাগ্যের চাকাটি হয়তো আর সঞ্চালিত হবে না। নিয়তির নির্মম পরিহাসে আমাকে চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে বাবার আবেগপূর্ণ সকল স্মৃতি! আমার মতো এতিম ভাগ্যহীনদের প্রতি আজকের দিনে আমার সমবেদনা রইলো।
বাবা মানে একটু শাসন অনেক ভালোবাসা। বাবা মানে একটু কঠিন, মাথার উপর ছায়া। বাবা মানে কাছের বন্ধু, বন্ধু দুঃসময়ের ধ্বজা। বাবা মানে নির্ভরতার আকাশ, আর একরাশ নিরাপত্তা। বাবাদের রাগ, শাসন আর রাশভারী চেহারার পেছনে মানুষটির যে কোমল হৃদয় তা মাতৃ হৃদয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বাবা আমাদের যতটুকু শাসন করেন তার চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসেন। পৃথিবীর সুন্দরতম শব্দগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর শব্দ ‘বাবা’।
বাবা হলেন অদ্বিতীয় আলো, যার আলোয় আলোকিত হয়েই আমাদের সারা জীবনের পথচলা। আমরা এই সন্তানদের সব দায়- দাযিত্ব নিঃস্বার্থভাবে কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে সৃষ্টির শুরু থেকে বিন্দু বিন্দু করে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে কামনা করেন আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। বাবা ছাড়া আর কে দেবেন সন্তানের জন্য এমন বিসর্জন? বাবা শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্ভরতা। রয়েছে এক বিশালতা। বাবা শব্দটি অনেক কঠিন কাজকে করে দেয় সহজ; পাহাড় সমান বিষন্নতাকে শুষে নেয় নিমিষেই। বাবা তো সেই জন, যার হাতে হাত রেখে হাঁটি হাঁটি পায়ে আমরা এগিয়ে যাই নতুন পৃথিবীর সন্ধানে। যার কাঁধে চড়ে আমরা প্রথম জানতে পারি পৃথিবী রূপ কী।
জাগতিক সব সম্পর্কই যেন গৌণ হয় বাবা-সন্তানের সম্পর্কের কাছে। মায়া-মমতা-স্নেহ আদর আর ভালোবাসার মিশেল হলো বাবা-সন্তানের মায়াবি সম্পর্ক। মানুষ গড়ার কারিগর বাবার ভূমিকা সন্তানের জীবনে অপরিসীম। ইংরেজি এক প্রবাদে আছে, ‘শতজন শিক্ষকের চেয়ে একজন বাবার অবদান অনেক বেশি।’ যার ফলে সন্তানের পথচলার অনুপ্রেরণায় সম্মুখেই থাকেন বাবা। বাবাই চিনিয়ে দেন শতরঙা পৃথিবীর চতুষ্কোণ। তাই সব সন্তানের কাছেই তার বাবা, সেরা বাবা। নান্দনিক কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার শেষ দিনকার লেখা ‘বল পয়েন্ট’ বইয়েও লিখেছেন, ‘‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই।’
যাদের বাবা আজ প্রয়াত, তাদের উপলব্ধি এতটাই তীব্র ও বেদনাবিদুর, যেটা অনেকেই বুঝতে চাইবেন না। বিশেষত যারা এখনও পিতার স্নেহ বঞ্চিত নয়। বাবার অনুপস্থিতি কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হবার নয়। সন্তান বাবার ঋণ কখনো পরিমাপ ও শোধ করতেও পারে না। পরিবারের মহীরুহ হয়ে দায়িত্ব পালনে, সন্তান-সংসার পরিচালনায় ব্রতী যিনি, সেই বাবার প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনে একদিন কিছুই নয়। তবুও শুধুই তার জন্য একটি দিন,একটু আলাদা করে উদযাপন করতেই ‘বাবা দিবস’।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








