ওর নাম পাপিয়া। বয়স ৩ মাস। অন্য আর দশজন সন্তানের মতোই বড় হচ্ছে পাপিয়া। অনেকেই জানে তার মায়ের নাম খাদিজা (১৮)। তবে জানা নেই বাবার নাম-পরিচয়। বাবার নাম ব্যবহার করতে না পরায় জম্ম নিবন্ধন সনদও নেই পাপিয়ার।
জম্ম সনদের মতো একটি পরিচয়পত্র যে সমাজে অধরা সেই সমাজে একটি মেয়ে শিশুর বেড়ে উঠা কতোখানি সুখকর হতে পারে? এ নিয়েই কিশোরী মা খাদিজার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ পাপিয়ার বাবার নামের জন্য।
পাপিয়ার মায়ের বাড়ি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার রাজাপুর নামের এক বিচ্ছিন্ন চরে। যেখানে নদীর ভাঙ্গা গড়ার সাথে পল্লা দিয়ে চলে জীবনের ভাঙ্গা-গড়া। যেখানে শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য সেবা নেই। আলো বলতে শুধু দিনের আলো। রাত এলে নেমে আসে অন্যরকম অন্ধকার। সে অন্ধকারের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘুরে বেড়ায় নানা প্রকৃতির হায়েনা।
২০১৫ সালের মে মাসের ১৫ তারিখ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে তেমনি এক হায়েনার নখের থাবা পড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় খাদিজার শরীরে। শাকিল (২১) নামের প্রতিবেশী এক চাচার হাতে ধর্ষণের শিকার হয় সে।
এরপর শাকিলের ভয় আর ভালোবাসা মেশানো প্রতারণার ফাঁদে পা দেয় খাদিজা। বিয়ের আশ্বাসে একাধিকবার মিলিত হয় শাকিলের সাথে। এরই মধ্যে অশিক্ষিত খাদিজা বুঝতেই পারেনি কি সর্বনাশ তার জীবনে ঘটে গেছে। সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। বিষটি শাকিলকে জানালে চলতে থাকে নানা টালববাহানা।
শেষ পর্যন্ত গত ২৪ ফেব্রুয়ারী কন্যা সন্তানের জম্ম দেয় খাদিজা। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রথমে খাদিজার পরিবারকে এক ঘরে করে রাখে সমাজপ্রতিরা। পরে সম্পর্কের কথা শাকিল স্বীকার করায় বসে একাধিক গ্রাম্য সালিশ। সর্বশেষ গ্রাম্য সালিশে গাবসারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামানসহ অন্যরা শাকিলের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রায় দেন ৫ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ের। রায় মেনে নেয় শাকিলের পরিবার।
রাত গভীর হয়ে যাওয়ায় বিয়ের দিন ধার্য হয় তারপর দিন। কিন্তু দিনের আলো ফুটতেই বেকে বসে শাকিলের পরিবার। লাপাত্তা হয় শাকিল। আর এ ঘটনায় বাধ্য হয়েইে পাপিয়ার চৌদ্দ দিন বয়সে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে খাদিজা বাদী হয়ে শাকিলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
মামলার তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও শাকিলকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। অন্যদিকে মামলা তুলে নিতে নিত্য হুমকির শিকার হচ্ছে খাদিজা ও তার পরিবার।
খাদিজার চাচা শাজাহান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, মাদারিয়া গ্রামের সচিবালয়ের পিয়ন হালিম ছেলের পক্ষ নিয়ে বিয়ে করাতে দেয়নি। মামলা তুলে নিতেও নানা হুমকি দিচ্ছে। তার জন্যই পুলিশ আসামি ধরতে কোন পদক্ষেপ নেয়না। হালিমের অনেক ক্ষমতা। তার ক্ষমতার কাছে সবাই অসহায়।
খাদিজার মা রহিমা বেগম বলেন, যে সময়ে মেয়ের এই ঘটনা টের পেয়েছি তখন আর করার কিছু ছিলনা। তারপরেও চেষ্টা করেছিলাম বাচ্চা নষ্ট করতে। কিন্তু আট মাস হয়ে যাওয়ায় মেয়ের মৃত্যু হতে পারে বলে কেউ রাজি হয়নি। এখন মনে হচ্ছে তার মৃত্যুই ভাল ছিল। আমার মেয়ের’ত জীবন শেষই কিন্তু এই ছোট বাচ্চার ভবিষৎ কি? বাবার পরিচয় ছাড়া সে সমাজে চলবে কি ভাবে?
স্থানীয় ইউপি সদস্য ওয়াহেদ আলী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এর চেয়ে ন্যাক্কার জনক ঘটনা আর কিছু নেই। আমরা সালিশ করে ব্যর্থ হয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।
কিন্তু আইন প্রভাবশালীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সুফল পাচ্ছিনা। যাতে সমাজে এমন ঘটনা আর না ঘটে তার জন্য উপযুক্ত বিচার চাই।
পাপিয়ার মা খাদিজা বলেন, আমার যা হবার তা হয়ে গেছে। এই সমাজের কোথাও আমার স্থান নেই। আমার মেয়েটির অবস্থাও তাই। কিন্তু আমার মতো জীবন আমার মেয়ের হতে দিবো না। আমার জীবনের শেষ রক্ত দিয়ে হলেও মেয়ের বাবার পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে যাবোই।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভূঞাপুর থানার উপ-পরিদর্শক শামছুল হক বলেন, মামলার তদন্ত কাজ শেষ করা হয়েছে। শিশু ও তার মায়ের ডিএনএ টেস্টও করা হয়েছে। আসামি পলাতক ও ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করার কারণে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। অচিরেই মামলার চার্জশীট জমা দেয়া হবে।







