দুনিয়ার তাবৎ মানুষ বৃটেনের ঐতিহ্য, রয়েল ফ্যামিলি, ঐতিহাসিক ভবন, জাদুঘরসহ
নানা আকর্ষনীয় স্থান এবং অসাধারণ নৈশ প্রমোদ পছন্দ করে থাকেন। পর্যটক
আকর্ষনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার প্রায় সবকিছু থাকা সত্বেও ইউরোপীয়
পর্যটকদের বৃটেন পুরোপুরি আকর্ষণ করতে পারে না।
কারণ তারা বৃটিশ বিশেষ করে ইংলিশদের আচরণ পছন্দ করেন না। পর্যটকদের মতে, ইংলিশদের অস্বাভিক দাম্ভিকতা রয়েছে এবং তারা একদম বন্ধুবৎসল নয়। ইংলিশদের নেই সেন্স অব হিউমারও। দশ বছর আগে এমন একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিলো ব্রিটিশ সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ। বিদেশে বৃটেনের পক্ষে প্রচারের দায়িত্বে থাকা সংগঠন ভিজিট বৃটেনের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী দৈনিকটি এ খবর প্রকাশ করে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
অন্যান্য ইউরোপীয়দের চেয়ে ফরাসীরা ইংরেজদের একটু বেশি মাত্রায়ই অপছন্দ করে। তাদের মতে ইংরেজরা অতিমাত্রায় মদ্যপ এবং ভীষণ রকম আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়। এমনকি তাদের শিক্ষিতও বলা যায় না। ফরাসীদের মতে, বৃটেনে বেড়াতে যাওয়া ফরাসীদের ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে ইংলিশরা হাসাহাসি করে কিন্তু ফ্রান্সে এসে ওরা ফরাসী একটি শব্দও বলার ক্ষমতা রাখে না। অথচ ইংরেজি ও ফরাসী দুটিই আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে সমান স্বীকৃত।
অন্য দেশের মানুষের যখন এমন মুল্যায়ন তখন খোদ বৃটেনে স্কটিশ ও আইরিশরাও ইংলিশদের খুব ভালো চোখে দেখে তা নয়। মুখের উপর দরোজার কপাট বন্ধ করে দেয়ার মত অশোভন আচরণের জন্য ইংরেজদের তারা সভ্য ভাবতে রাজি নয়। এ ধরনের আচরণের জন্য প্রতিবেশি হিসেবে অনেকেই ইংলিশদের গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক। এছাড়া ছোটখাটো বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে শ্রুতিকটু শব্দ প্রয়োগ, মধ্যাঙ্গুলি প্রদর্শনের মতো অশোভন অঙ্গভঙ্গি ইংরেজরা হরহামেশাই করে থাকে বলে শোনা যায়।
শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধে উন্নত এবং অগ্রসর বৃটিশদের পৃথিবীর মানুষ সভ্য হিসেবে সমীহ করে আসছে সবসময়। সব বৃটিশ যেমন ইংরেজ নয়, সব ইংরেজ হয়তো দাম্ভিক, আক্রমণাত্মক এবং হিংস্র নয়। কিন্তু কোথাও কোথাও কোনো কোনো ইংরেজের আচরণ টেলিগ্রাফের খবরের সত্যতার প্রমাণ দেয়। যেমনটি দিয়েছে ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে, ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের অধিনায়ক জস বাটলারের মারমুখি আচরণ। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা বলে এমন আচরণের দেখা কদাচিৎ মিললেও ফুটবল মাঠে বা গ্যালারিতে কিছু কিছু ইংরেজের আচরণ মাঝে মাঝে বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় তাদের দাম্ভিকতা আর হিংস্রতার কথা।
সেদিন কী ঘটেছিলো মিরপুর স্টেডিয়ামে, টিভি পর্দায় দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ইংল্যান্ড ইনিংসের ২৮তম ওভারে তাসকিন আহমেদের বলে এলবিডব্লিউ আবেদনে আম্পায়ার সাড়া দেননি। রিভিউ নিলে ফল আসে বাংলাদেশের পক্ষে। আম্পায়ার সিদ্ধান্ত বদল করতেই বাঁধনহারা উদযাপনে ফেটে পড়ে মাশরাফি-তাসকিনরা। আর দাম্ভিক ইংরেজদের প্রতিবিম্ব জস বাটলারের কাছে তা সীমা লংঘন মনে হয়েছে। মারমুখি হয়ে তেড়ে গেছেন মাহমুদউল্লাহ-তাসকিনদের দিকে। আম্পায়াররা তাকে থামিয়ে দেওয়ায় ব্যাপারটি অবশ্য বেশি দূর গড়ায়নি।
মারমুখি আচরণের ব্যাখ্যায় তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশের কেউ তাকে বাজে কোনো কিছু বলেনি। স্রেফ উদযাপনটাই তাকে ক্ষুব্ধ করে দিয়েছিলো। এখানেও বিষয়টি শেষ হয়নি। ইংরেজরা ম্যাচ হারার পর যা করলো তা ক্রিকেটে নজিরবিহীন। খেলা শেষে হাত মিলিয়ে সৌহার্দ্য বিনিময়ের সময় তামিমের সঙ্গে জিন বেয়ারস্টো লেগে গেলেন। মাঝখান থেকে এসে দুজনের বাকযুদ্ধে ঝাঁজ বাড়িয়ে দিলেন বেন স্টোকস। তামিমের বুকে যে তিনি একটা ধাক্কা দিয়েছেন, সেটাও গোপন থাকেনি, ভিডিও ফুটেজের সৌজন্যে। অবশেষে সাকিবের হস্তক্ষেপে তা নিরসন হয়। 
ইংলিশদের কেউ কেউ কতটা ভয়াবহ হিংস্র হতে পারে তা ফুটে উঠেছে সাবেক ইংলিশ ফাস্ট বোলার হার্মিসনের কথায়। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, নম্র স্বভাবের বাটলারের বদলে খেলোয়াড়টি যদি হতেন বেন স্টোকস, তাহলে ব্যাট হাতে মাঠ ছাড়তেন না তিনি। ব্যাট দিয়ে হয়তো আঘাতই করতেন স্টোকস! তবে ম্যাচের অমন সময়ে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের উল্লাস আবার অস্বাভাবিক মনে হয়নি হার্মিসনের কাছে। বড় পর্দায় এভাবে নিজেদের পক্ষে সিদ্ধান্ত যেতে দেখলে সমবেত উদ্যাপনটা একটু বাড়তি রং পায়, বলেছেন তিনি।
এতে একটি প্রশ্নের উত্তর অন্তত পাওয়া গেলো যে, নম্র স্বভাবের বাটলারই যদি এমন আক্রমণাত্মক হন তাহলে উগ্র স্বভাবের স্টোকস কতটা ভয়ংকর হতে পারেন, অনুমান করা যায়। তবে দুজনই যে ইংলিশদের দাম্ভিকতা এবং হিংস্রতার বিজ্ঞাপন তা নির্দ্ধিধায় বলা যায়।
বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার কথায় স্পষ্ট হয়েছে তারা ইংরেজদের আগ্রাসী হতে প্ররোচণা দেননি। তিনি বলেছেন, আমরা ভুল কিছু করিনি। আমরা শুধু একটা আউটের পর সেটা উদ্যাপন করেছি।
এ ঘটনায় আইসিসির নেয়া সিদ্ধান্তেও বেশি ক্ষতি হলো বাংলাদেশের। বাটলার-স্টোকসরা তেড়ে গেলেন, তামিমের গায়ে হাত দিলেন যা কোনভাবেই খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নয়; অথচ বাটলার পার পেয়ে গেলেন শুধুমাত্র তিরস্কারের উপর দিয়ে। আর স্টোকসতো পুরোটাই ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেলেন।
অথচ বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি এবং সাব্বিরকে জরিমানা করা হলো। অবশ্য তিন মোড়ল ভারত, অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের ক্রীড়নক আইসিসির এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ঝরলেও অবাক হওয়ার কথা নয় কারো। আমাদের ক্রিকেটারদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য এরচেয়ে বড় কোন শাস্তি যে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেয়নি তাতেই অনেকে হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন।
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







