সারা বছর সুপ্ত থাকে হৃদয়জুড়ে। চার বছর অন্তর হৃদয় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে সেই ভালোবাসা। প্রতিদানের প্রত্যাশাবিহীন নিখাদ ভালোবাসা, নিঃশর্ত আনুগত্য। ভালোবাসা-অনুরাগ প্রকাশে শ্রম, অর্থ এমনকি জীবন বাজি রাখতেও দ্বিধা নেই। বেরসিকদের কাছে উন্মাদনা মনে হতে পারে, কেউ কেউ এই অনুরাগকে জ্বরের সাথে তুলনা করে ঠাট্টা-মশকরাও করেন। তবে বাঙালির ফুটবল ও বিশ্বকাপ প্রেমের নজীর কিন্তু অতুলনীয়।
ফুটবল বাঙালির খেলা বলা হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে আমরা বরাবরই ব্যাকবেঞ্চার। তাই বলে, বাঙালির ফুটবল প্রীতি নিয়ে সংশয় চলে না। সাত সমুদ্র তেরো নদী আর হাজার হাজার মাইল দূরের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ক্যামেরুন কিংবা নাইজেরিয়া দলের জন্য বাঙালি যখন রাত জাগে, বিশ্বকাপের খেলা দেখতে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখে কিংবা প্রিয় দলের বিশালাকার পতাকা বানাতে পকেটের শেষ কড়িটি নিঃসংকোচে খরচ করে, তখন অবাক হয় পৃথিবী । প্রিয় দলের জাতীয় পতাকার রংয়ে নিজের বাড়ি সাজানোর মতো বিস্ময়কর ভালোবাসাও দেখায় এদেশের মানুষ। ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিপরীতধর্মী অবস্থানের পরও বাঙালির এমন প্রবল অনুরাগের সাক্ষী হতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা থেকে আসছে সাংবাদিকের দল।
তবে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ বা বাঙালির লাতিন আমেরিকার দুই দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা প্রীতি সবকিছুকে ছাড়িয়ে যায়। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই পুরো দেশ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত হয়ে যাওয়া। পেলে, জিকো, রোনাল্ডো, নেইমার, ম্যারাডোনা, মেসি, ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতারা হয়ে যান বাঙালির স্বপ্নের নায়ক। ১৯৮২ থেকে বিশ্বকাপের সব খেলা সরাসরি দেখাচ্ছে এদেশের টিভি। এরপর থেকেই বাড়ছে বিশ্বকাপ ক্রেজ। ১৯৭৮’র আগে ব্রাজিল কিংবা কালোমানিক পেলের বিশ্বজয়ের অভিযান বাঙালি চর্মচক্ষে দেখে নাই, বই-পুস্তকে পড়ে জেনেছে।

আর্জেন্টিনার প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়, ফুটবল সম্রাজ্যে ম্যারাডোনার রাজকীয় বিচরণ টিভির সৌজন্যে দেখেছে এদেশের মানুষ। আর্জেন্টিনা, ম্যারাডোনা মেসির জাদুকরী নৈপুণ্যের প্রত্যক্ষদর্শী বেশি বলেই তরুণ প্রজন্মের কাছে আর্জেন্টিনার আকর্ষণও বেশি। ম্যারাডোনা-মেসি’র মতো কালজয়ী ফুটবলার ব্রাজিলেও জন্মেছে, তবে সেটা ১৯৭৮র আগে। ম্যারাডোনা ও মেসির সমসাময়িক কালে নয়। রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, নেইমারের মতো কিংবদন্তী ফুটবলার এ সময় ব্রাজিলে জন্ম নিলেও তারা স্কিল, কারিশমা ও জনপ্রিয়তায় ম্যারাডোনা-মেসির পাশে একই মর্যাদা কিংবা তারকা খ্যাতিতে দাঁড়াতে পারেননি। তাই আটের দশকের পর গত দুই যুগে দুবার বিশ্বকাপ জিতেও তরুণ প্রজন্মের কাছে অবিসংবাদিত সেরা সমর্থিত দল নয় ব্রাজিল। আবার গত ৩২ বছরে বিশ্বকাপ না জিতেও ম্যারাডোনা-মেসির মতো সুপার ফুটবল হিরোদের কারিশমায় আর্জেন্টিনা তরুণদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।
এমন সব জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে বিশ্বকাপে বাঙালির আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল প্রেমের রসায়নে। পেলে, সাম্বা নাচ, যোগো বনিতো, কোপা কাবানা সৈকত, কার্নিভাল কিংবা সাও পাওলোর বস্তিতে হেলাফেলায় বেড়ে ওঠা প্রতিভাবান ফুটবল রাজকুমারদের বিশ্বজয় বাঙালির চিত্তে চাঞ্চল্য জাগায়। তবে বাঙালির ‘আর্জেন্টাইন ভালোবাসা’ যেন মমতার চমৎকার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা। এই মিতালি হৃদয়ের কাছাকাছি আসার সাথে সাহিত্য, রাজনীতির ঐকতান আছে। ফুটবল তাকে দিয়েছে মজবুত বাঁধন। এই নৈকট্যের পেছনে নৃতাত্ত্বিক কারণ কতটা তা গবেষণার বিষয়। তবে বাঙালির আর্জেন্টিনা প্রীতির ইতিহাস শত বছরের পুরনো। শুরুটা সম্ভবত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আর্জেন্টাইন লেখিকা ও বুদ্ধিজীবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বহুল আলোচিত পারস্পরিক অনুরাগের সম্পর্ক থেকে।
১৮৬১ সালে কলকাতায় জন্ম বাঙালি রবীন্দ্রনাথের। তার ২৯ বছর পর বুয়েনেস আয়ার্সে জন্মেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ১৯১৪ সালে ফরাসী ভাষায় অনূদিত গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থ পড়ে ৬৩ বছর বয়সী কবিগুরুর প্রেমে পড়েন ৩৪ বছর বয়সী ওকাম্পো। তবে হৃদয় দোলা দেয়া এই সম্পর্ক নিছকই প্লেটোনিক লাভ বা স্বর্গীয় ভালোবাসা। রবি ঠাকুরের প্রতি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর নিষ্কাম অনুরাগ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র । ওকাম্পো যেমন কবিগুরুর জীবনে প্রথম নারী নন, তেমনি ওকাম্পোর হৃদয়ে দোলা দেয়া প্রথম পুরুষ নন রবিঠাকুর। পারস্পরিক এই অনুরাগের মুখ্য উপাদান রবীন্দ্র সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের প্রেমে পড়া ওকাম্পো নিজের প্রকাশনায় বের করেছিলেন ‘সুর’ নামে ফরাসী ভাষার এক সাহিত্য পত্রিকা। ১৯২৫ সালে কবিগুরু তার লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’ উৎসর্গ করেন ওকাম্পোকে। ১৯১৪ থেকে ১৯৩০ সময়কালে দুজনের মধ্যে প্রায় ৫০টি পত্র বিনিময় হয়। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পেরু ও মেক্সিকো ভ্রমণকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে শুশ্রূষার জন্য কবিগুরুকে আর্জেন্টিনায় নিজের বাড়ী ‘ভিলা ওকাম্পো’তে’ নিয়ে যান অভিজাত পরিবারের সন্তান ভিক্টোরিয়া।

হীরের অলংকার বেঁচে কবিগুরুকে আপ্যায়িত করেন তার ‘প্রেমিকা’। দুই মাস ওকাম্পোর তত্বাবধানে থেকে সুস্থ হন কবিগুরু। রচনা করেন ৩০টির মতো কবিতা। কবিগুরু ‘বিজয়া’ নামে ডাকতেন ওকাম্পোকে। আর ওকাম্পোর ‘গুরুদেব’ ছিলেন রবি ঠাকুর। ধারণা করা হয় কবিগুরু তার অমর সৃষ্টি শেষের কবিতায় ‘লাবণ্য’ চরিত্রটি ওকাম্পোর আদলেই গড়েছিলেন। চিত্রকলায় কবিগুরুর পারদর্শিতা অর্জনে ওকাম্পোর অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ মানেন অনেক রবীন্দ্র গবেষক।
১৯৩০ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় ও শেষবার দেখা এই গুরু-শিষ্যার। প্যারিসের বিখ্যাত পিটাল গ্যালারিতে কবি গুরুর আঁকা চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দেন এই আর্জেন্টাইন নারী। তার প্রেয়সীকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু। কিন্তু বাঙালি প্রেমিকের আহ্বানে সাড়া দেয়া হয়নি আর্জেন্টাইন প্রেমিকার। তবে বাঙালি কবি/প্রেমিকের প্রতি অনুরাগ যে শেষ পর্যন্ত ছিলো তা ফুটে ওঠে ওকাম্পোর হাহাকারে, ‘ডিয়ার গুরুদেব, ডেজ আর এন্ডলেস সিন্স ইউ ওয়েন্ট অ্যাওয়ে।’
কাব্যপ্রেমীর পাশাপাশি বাঙালির আরেক বড় গুণ সংগ্রামী। ভাষার অধিকার, স্বাধীনতা সংগ্রাম, সমাজ বদলের লড়াই কিংবা স্বৈরাচার খেদাও আন্দোলনে ক্ষুদিরাম, একাত্তরের অযুত শহীদদের পাশাপাশি বাঙালি অনুপ্রেরণা খোঁজে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেয়া অমর বিপ্লবী আর্নেস্তো চে-গুয়েভারার মাঝে। কিউবাসহ লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় সম্রাজ্যবাদ বিরোধী, শ্রেণি সংগ্রামের প্রধান ব্যক্তিত্ব চে-গুয়েভারা। কিউবার সশস্ত্র বিপ্লবের প্রধান সেনাপতি চে-গুয়েভারা ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় সিআইএ মদতপুষ্ট সেনাদের হাতে ধৃত ও নিহত হন। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক যেকোনো অধিকার আদায়ের সংগ্রামে একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি তরুণ বুকে চে-গুয়েভারাকে নিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে। তবে বাঙালির হৃদয়-আত্মায় সত্যিকারের দোলা দিয়েছেন বুয়েনেস আয়ার্সের সাধারণ বস্তিতে জন্ম নেয়া দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির গাঁট্টাগোট্টা এই তরুণের সাফল্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদে বাঙালি খুঁজে পায় নিজের বঞ্চনার প্রতিকার।

১৯৮২’র বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অন্যায় আক্রমণে মেজাজ হারানো ম্যারাডোনার জন্য সহানুভূতি ও ভালোবাসার সূচনা। ১৯৮৬’র বিশ্বকাপে ফুটবল ঈশ্বরের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স, পাঁচজনকে কাটিয়ে জাদুকরী গোল এমনকি ঈশ্বরের হাতের গোল, ম্যারডোনাকে বাঙালি মানসে চিরদিনের ঠাঁই দিয়েছে। পাশাপাশি তার সংগ্রামী প্রতিবাদী ইমেজ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী অবস্থান তাকে বসিয়েছে নায়কের আসনে। এ জন্য কোকেইন আসক্তি ও নিষিদ্ধ ইফিড্রিন গ্রহণের জন্য দুদুবার দীর্ঘমেয়াদী নিষিদ্ধ ম্যারাডোনার শাস্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজপথ জঙ্গী মিছিলে উত্তাল করেন সব পেশা ও বয়সের অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ও তরুণদের মাঝে ম্যারাডোনার প্রথাবিরোধী ইমেজ ও বিশ্বসেরা ফুটবলারের ভাবমূর্তি বাঙালির আর্জেন্টিনা প্রীতিকে এভারেস্ট উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ফুটবলে বাঙালির আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে ওঠার পেছনে ম্যারাডোনার অবদানই সবচেয়ে বেশি। ম্যারাডোনা রাজত্বের পরম্পরা ধরে রেখেছেন এ যুগের বাঁ-পায়ের জাদুকর লিওনেল মেসি। বাংলাদেশে মেসির প্রতি ভালোবাসা দ্বিমাত্রিক: আর্জেন্টিনার মেসি ও বার্সেলোনার মেসি। ফিফার পাঁচবারের বর্ষসেরা, গত বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জয়ী মেসির বার্সেলোনার ভক্তরা আর্জেন্টাইন সমর্থক বনে যান তাদের স্বপ্নের রাজকুমার যখন লা-আলবিসেলেস্তের জার্সিতে মাঠে নামেন। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার পিএসজিতে যোগ দেয়ায় এবার বার্সেলোনা-ভক্তদের মেসি বা আর্জেন্টিনাকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিতে দ্বিধায় ভোগার কথা নয়।








