মাস চক্র মার্চে থামতেই বিশ্বব্যাপী নারী দিবস নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সংগঠনের প্রস্তুতি চলে এক বছর থেকে ছয় মাস ধরে- তারতম্য তো আছেই। প্রতি বছর নতুন পরিসংখ্যান; নারী নির্যাতনের ধারা পাল্টাচ্ছে, সমাজে পুরুষতন্ত্র নিয়ম মেনেই সবলতার আশ্রয় পায় অনাবিল, কারণ খুঁটিটা সনাতনের পথ ধরে গাঁথা, চালকদের মুখোশগুলো পুরনো ধাঁচের।
তাই সোচ্চার হতে হয় নারীকে: দৃঢ়, প্রতিবাদী, অবিচল, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিশ্বের কিছু সংখ্যক নারীর প্রতিনিয়ত নিষ্ঠায় আজ সোচ্চার অনেক নারীকণ্ঠ। জানিয়ে দিতে চায় তারা- ঘরে ঘরে নারীর পদক্ষেপে সৃষ্টি আবর্তিত। বিনিময় প্রথায় ঢেকে যে অবদমনের প্রচেষ্টা এই পুরুষশাসিত সমাজ করে চলেছে, তাদেরকেই নিরলস প্রচেষ্টায় জানিয়ে দেয়া শাসকের পা পিছে ফেলে চলার, আর নারীকে শিখিয়ে দিতে তার ন্যায্য অধিকার আদায়ের: ঘরে, বাইরে, পথে, ঘাটে, প্রতিষ্ঠানে।
নারী যত অগ্রসর হচ্ছে, পুরুষতন্ত্র পাল্টাচ্ছে দমননীতি। ব্যস্ততা বাড়ছে কর্মীদের। ইমিগ্রেন্টরা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে সামাল দিতে নাজেহাল হচ্ছে, নিজ দেশে যে শাসনতন্ত্র পুরুষ নামে চালিয়েছিলো, ভূমিকা পাল্টে যাচ্ছে নতুন দেশে। বাড়ছে অন্যপক্ষে গৃহবিবাদ। টরোন্টোর বেশ কয়েকটি এলাকা্য় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে পারিবারিক কলহ, কখনো কখনো হিংস্রতায় রূপ নিচ্ছে।
দুঃখজনক হলেও পরিসংখ্যানের সত্যতায় মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি, বাঙালিরা তাদের অন্যতম। এছাড়া রয়েছে ফিলিপিনো, ইথিওপিয়ান আর তামিল গোষ্ঠী। অবশ্যই অন্যান্য গোষ্ঠীরা পিছিয়ে নেই। আগে থেকেই তারা অত্যাচারীদের তালিকায় প্রতিষ্ঠিত। অন্টারিও প্রদেশের সামাজিক সেবার মন্ত্রণালয় এই খাতে বাড়িয়েছে তহবিল, বিভিন্ন সংগঠন থেকে উপসংগঠন তৈরির মাধ্যমে চলছে কর্মসূচি।
এমন একটা উপসংগঠন কাজ করে চলেছে মস এবং রিজেন্ট পার্ক এলাকায়, যার নাম ‘বিয়ন্ড বর্ডারস’। নারী, পুরুষ, শিশুদেরকে অধিকার, করণীয়, পদক্ষেপ বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে চলেছে এর সাথীরা, চারমাস ব্যাপী চলেছে প্রশিক্ষণ। ভাষা এবং সংস্কৃতি নির্ভরতায় এদেরকে দলভুক্ত করা হয়, যেমন বাঙালিদের জন্যে কাজ করছে ঐ এলাকার বসবাসরত বাঙালিরাই, ওদের অগ্রগতি ভরসার, এনে দিয়েছে সম্ভাবনার বিশ্বাস।
পঁচিশ নভেম্বর, ‘নারীর বিরূদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ’ দিবস। অন্টারিও স্ট্রিটের ‘সেন্ট্রাল নেইবারহুড হাউজ’-এর আয়োজনে সেদিন ‘বিয়ন্ড বর্ডারস’-এর বাঙালি পিয়ার লিডার নারীদের অগ্রগতির পাওয়ারপয়েন্ট এবং তাদের হাতে তৈরি ব্যাগ অন্যান্য সকলের প্রশংসা আর নজর কাড়ে। সেদিন আনন্দের চোখে দেখেছিলাম ভাষা, যে ভাষার যাপন প্রাণে।
৮ মার্চে উদযাপন করা হয় সারা বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। চলতি বছরে দিনটি ছিলো মঙ্গলবার। র্যালি, মার্চ আর ফেয়ার, সারাদিন ব্যাপী আয়োজন করতে বেছে নেয়া হলো শনিবার, ৫ মার্চ। পশ্চিম ব্লুর ঘুরে রাইয়ারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের অফিসে।
বাংলায় লেখা ব্যাগে সাজানো টেবিলের দিকে তাকিয়ে তৃপ্ত মনে যখন অন্য কাজে মন দিয়েছিলাম, তখন দেখি কম বয়সী একটি মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক টুকরো ঘিয়ে রঙের কাপড় হাতে। আমি চোখ তুলতেই বললো, ওর ওই কাপড়টাতে এই ভাষায় লেখা একটা শ্লোগান লিখে দিতে, লেখাগুলো নাকি দেখতে খুব সুন্দর! মনের প্রশ্ন মুখে আনার আগেই উচ্ছ্বল মেয়েটি জানিয়ে দিলো, লেখা সংগ্রহ করে একটা কাঁথা (quilt) বানাবো। লিখে দিলাম, ব্যাগের উপর থেকেই সংগ্রহ করে। পাশে ইংরেজিটাও।
এই দিনের ঠিক পাঁচদিন আগেই পার হয়ে গেছে ভাষার মাস। আলাপ চালাতেই জানা গেলো মেয়েটি পাকিস্তানি বংশদ্ভূত। উপমহাদেশের ইতিহাস এদেশে বেড়ে ওঠা প্রজন্মদের অধিকাংশই জানে না। বিশ্বায়ন স্বাগত জানায় যাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনে।
তার সঙ্গী মেয়েটি তখনো পৌঁছুতে পারেনি, শুনেছি সে পূর্ব ইউরোপীয়। ঠিক ওর বয়সী দুজন বেড়ে উঠেছে আমার ঘরে-জীবনে। পশ্চিমা একটি দেশে নারী নির্যাতন বিরোধী সচেতনতা তৈরির প্রচারণায় ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে ভাষাকেও বেছে নিয়েছে তারা। ব্যাগের গায়ে ইংরেজি ভাষায় শ্লোগানের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছে বাংলা ভাষাও। এবার ভিনদেশী দু’টি মেয়ে আয়োজন করছে বাংলা ভাষায় নারী নির্যাতন বিরোধী শ্লোগান দিয়ে ‘কাঁথা’ সেলাই।
আবেগ আর আনন্দে শিহরণ খেলে যায় দেহে, মনে। নারীদিবসে ওর হাতে তুলে দেই নারী নির্যাতনের প্রতিবাদের প্রতীক বাক্য, মাতৃভাষায়- বাংলায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








