বিপিএলের গত আসরে মুশফিকুর রহিমকে পেতে মরিয়া ছিল বরিশাল বুলস। ‘আইকন’ ক্রিকেটারদের মধ্যে দলটির প্রথম পছন্দ ছিলেন এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান। নেতৃত্বের ভারও ওঠে তার কাঁধে। ব্যাট হাতে অবদান রেখে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় ছিলেন সপ্তম। মুশফিক অবশ্য শুরুতে বুলসে খেলতে চাননি। বিসিবির অনুরোধেই খেলেছেন এবং পারফর্ম করেছেন। কিন্তু শেষ অবধি দল হিসেবে ভালো করেনি বরিশাল।
আরেকটি বিপিএল শুরুর আগে সেই মুশফিকেরই সমালোচনায় মেতেছেন বরিশাল বুলসের অন্যতম কর্ণধার এম এ আওয়াল চৌধুরী বুলু। দেশের একাধিক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাতকারে বাংলাদেশ দলের টেস্ট অধিনায়কের দায়িত্বজ্ঞান, শৃঙ্খলাবোধ, অধিনায়ক হিসেবে দলের ক্রিকেটারদের উৎসাহিত করতে না পারার ক্ষমতা- এমন বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন বিসিবির এই পরিচালক।
অথচ অনেক অনুনয়-বিনয় দেখিয়েই মুশফিককে দলে পেয়েছিল বরিশাল। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিক বললেন, ‘এটা কিন্তু সম্মিলিতভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক ও প্লেয়াররা মিলে ঠিক করেছিল কে কোন দলে খেলবে। আমার স্পষ্ট মনে আছে মুশফিকের বরিশালে খেলার ব্যাপারটা। আমি নিজে তাতে হস্তক্ষেপ করেছিলাম। মুশফিক কিন্তু বরিশালে যেতে চায়নি। বরিশাল টিম তাকে চেয়েছে। আমরা রাজী করিয়ে মুশফিককে বরিশাল টিমে দিই।’
ঘটনা এখন অনেকদূর গড়িয়েছে। শনিবার মুশফিক বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে এসে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বিপিএল কমিটি এবং বিসিবিও গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে টাইগার তারকার এমন অবমাননার ঘটনা।
জাতীয় দলের ক্রিকেটারকে অসম্মান করায় বুলসের মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়ার কথা বলেছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। যথাযথ জবাব না পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানালেন ইসমাইল হায়দার মল্লিক, ‘তাকে ডাকা হয়েছে। আমরা শোকজ করবো। সঠিক উত্তর না পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আর্থিক জরিমানা হতে পারে বা অন্য যে শাস্তি আছে, সেটি হতে পারে, জবাবটা যদি আমাদের যথাযথ না মনে হয়।’
জাতীয় দলের ক্রিকেটারের নামে গণমাধ্যমে ‘আজেবাজে’ মন্তব্য করায় মল্লিক বুলসের মালিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘যেভাবে আমাদের ন্যাশনাল ক্যাপ্টেন সম্পর্কে বলেছে; ক্যাপ্টেন বড় কথা না, সে তো আগে প্লেয়ার তারপর ক্যাপ্টেন। ন্যাশনাল প্লেয়ার সম্পর্কে এভাবে কেউ কথা বলুক, সেই অধিকার আমরা কাউকে দেইনি। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের কোড অব কন্ডাক্ট আছে। যে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকই হোন না কেন, তা মেনেই চলেতে হবে। কারও যদি প্লেয়ারের নামে অভিযোগ থাকে তারা দেবে। কাউন্সিল খতিয়ে দেখবে সত্য-মিথ্যা। প্লেয়ার কোন ভুল করলে বোর্ডের অনুমতিক্রমে গভনিং কাউন্সিল শাস্তি দেবে।’
টেলিভিশন চ্যানেলে প্রতিবেদন দেখে শনিবার সকালে মুশফিক বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের কাছে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষনিক সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। যেখানে মুশফিক বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেননি। আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। কান্না লুকানোর চেষ্টায় শেষে তো কথা শেষ না করেই সংবাদ সম্মেলন স্থান ত্যাগ করেন।
যাওয়ার আগে বলেছেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, আমাকে নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠে না। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারেন। বলতে পারেন, আমি ভালো খেলোয়াড় নই। তবে আমার শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন কিংবা আমি খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করতে পারি না, টিম মিটিংয়ে কথা বলি না— এসব ভাষ্য খুব খারাপ লেগেছে। আজ আমার সঙ্গে হয়েছে। কাল অন্যদের সঙ্গে যে হবে না, এ নিশ্চয়তা নেই। একজন খেলোয়াড়, এতটুকু সম্মান আশা করতেই পারে। দেশকে এত দিন সেবা দিচ্ছি, এতটুকু সম্মান পেতেই পারি।’
মুশফিকের প্রতিক্রিয়ার পর ব্যাপারটি স্পষ্ট করতে মিরপুরে এসে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন এম এ আওয়াল চৌধুরী। সাংবাদিকদের অপেক্ষাও করতে বলেন। কিন্তু পরে আর আসেননি তিনি, ফোনও আর ধরেননি।
গত আসরে বরিশাল বুলসের মালিকপক্ষে থাকা রিজওয়ান বিন ফারুক এশিয়া কাপ চলাকালীন মাঠে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে আজীবন নিষিদ্ধ হন। বিপিএল চলার সময় দলের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন বরিশালের বুলসের শুভেচ্ছাদূত, সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরও। এবার মুশফিককে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করলেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিক। যিনি একাধারে বিসিবির একজন পরিচালক, একটি কমিটির (উইমেন্স উইং) চেয়ারম্যান। এমন অবস্থায় বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল তাকে উপযুক্ত শাস্তি আদৌ দিতে পারবে কিনা; সেটাই এখন বড় প্রশ্ন!








