আজ মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধা মেজর জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিমের ৬৮তম জন্মবার্ষিকী। তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেসবুকে ছবিসহ একটি পোস্ট দিয়েছেন তারই বন্ধু এলিট ফোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজ পিএসসি।
দীর্ঘ ওই পোস্টে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা বীর প্রতীক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইব্রাহিম জন্ম থেকে জীবনের যত অর্জন, আনন্দ-দুঃখসহ সবকিছু তুলে ধরেছেন।
পোস্টটিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরীফ আজিজ লিখেছেন:
‘এক বন্ধুর গল্প। বন্ধুর নাম: ইবরাহিম। জন্মদিন – ৪ঠা অক্টোবর
বন্ধু ইবরাহিম, তোমার গল্প তোমার টাইমলাইনেই দিলাম। অন্য জায়গায় শেয়ার করলাম। ৭ জুলাই ১৯৬২। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমরা ৪৭জন বালক একত্রিত হয়েছিলাম, দি ইস্ট পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজের প্রাঙ্গনে। দু’বছর পর কলেজের নাম বদলে গিয়েছিল; নাম হয়েছিল “ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ”। আমাদের আবাসিক দোতলা ভবনগুলোর দোতলা থেকেই আমরা বঙ্গপোসাগরের নীল পানি দেখতে পেতাম। দিনে অনেকবার রেল ইঞ্জিনের ভুস ভুস, ঝকঝক, ঝকঝক আওয়াজ এবং বাঁশির আওয়াজ শুনতে পেতাম। প্রত্যেকবারই মন ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, ফৌজদারহাট ছেড়ে নিজের মায়ের কাছে চলে যেত।
আমরা বেশিরভাগই ছিলাম নির্দোষভাবে নিরীহ বালক সম্প্রদায়। টয়লেট ব্যবহার করার পর যে চেইন টানতে হয়—সেটাতেও ভয় পেতাম। আমরা মনে করতাম ওখানে ভুত-পেত্নী থাকে। আমাদের মধ্যে যারা বেশি মেধাবী ছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ইবরাহিম। ফুটবল এবং হকি খেলতে পারতো না এটা সত্য; কিন্তু অন্য সবকিছুতেই পারদর্শী ছিল। ষষ্ঠ বছরে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবর হাউজের প্রিফেক্ট হয়েছিল ইবরাহিম। ষষ্ঠ বছরে, ১৯৬৮ সালের মে-জুন মাসে আমরা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ইবরাহিম কুমিল্লা বোর্ডে মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে। আমরা ক্লাসফ্রেন্ডদের মনে ধারণা হয়েছিল ইবরাহিম বড় হতেও পারে।
আমাদের ক্লাসফ্রেন্ডদের মধ্যে অনেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলাম। সবচেয়ে পরে যোগদান করেছিল ইবরাহিম। পড়ুয়া ইবরাহিম হঠাৎ সেনাবাহিনীতে আসলো; মন খারাপ হয়ে গেল। মনে করলাম এখানে ও সুবিধা করতে পারবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, নয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ইবরাহিম জিতে নিয়েছিল সর্বোত্তম ক্যাডেটের পুরষ্কার, যার নাম ছিল কমান্ডার-ইন-চীফ কেইন। সোর্ড অফ অনারের সমতূল্য। আমার এখনও মনে আছে ওটা ১৯৭০ এর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের কথা।
ঐ সময়ের পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমিতে আমরা যারা বাঙালি প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম, আমাদের সবার মন চূড়ান্তভাবে উৎফুল্ল ছিল। আমাদের সবার বুক গর্বে ফুলে গিয়েছিল। কারণ, একে তো বাঙালি ছেলে ইবরাহিম প্রথম পুরষ্কার পাচ্ছে, দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ঢাকার নবাব পরিবারের সন্তান, বাংলার ঘরের সন্তান লেফটেনেন্ট জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন ঐ পুরষ্কার প্রদান করছেন। বলে রাখা ভালো, এর মাসখানেক পরেই আমি বা আমরাও কমিশন পেয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, ঘরে হোক বাইরে হোক বহু লোকই সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেছে অথবা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইবরাহিম ছিল ঢাকার জয়দেবপুরে; দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তরুণ অফিসার। দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকলের সঙ্গে ইবরাহিমও মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস যুদ্ধ করে। দৃষ্টান্তমূলক সাহসিকতাপূর্ণ কাজের জন্য সরকার বীর প্রতীক খেতাব দিয়েছে। আমি পাকিস্তানে আটকা ছিলাম, যুদ্ধে যোগদান করতে পারিনি। বন্ধু যোগদান করেছে, সম্মানিত হয়েছে এতেই আমাদের আনন্দ ও গর্ব। যুদ্ধের পরপর, সেনাবাহিনীর একান্ত শৈশবে, আরেকজন ওল্ড ফৌজিয়ান, তৎকালীন কর্নেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রমের সাথে ইবরাহিমও সেনা সদরে এমএস ব্রাঞ্চে কঠিন ব্যস্ত সময় পার করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ইবরাহিম ব্যস্ত ও উল্লেখযোগ্য সময় পার করে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে, ইংল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত রয়েল স্টাফ কলেজে গিয়েছিল “স্টাফ কোর্স” করার জন্য। ছয় বছর পর গিয়েছিল আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া রাজ্যের কার্লাইল ব্যারাকস-এ, আর্মি ওয়ার কোর্স করার জন্য। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে হাতে গোনা দু’চারজন মাত্র অফিসার পাওয়া যাবে যারা এইরকম উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন এবং বিশ্ববিখ্যাত বিদেশি প্রতিষ্ঠানে বারবার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ১৯৮৭ থেকে ৮৯ পাকা চব্বিশ মাস, ইবরাহিম প্রথমে রাঙামাটিতে এবং পরবর্তীতে খাগড়াছড়িতে, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে, অতুলনীয় সাফল্যের সঙ্গে ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করে। ১৯৯৭-এর ডিসেম্বরে সরকার যেই পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, সেই শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল ইবরাহিম যখন ব্রিগেড কমান্ডার তখন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ইবরাহিম শান্তির কাজটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। “ফার ইস্টার্ন রিভিউ” নামক তখনকার আমলের বিখ্যাত সাপ্তাহিক আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ঐ সময় ইবরাহিমের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করেছিল; সে এক অকল্পনীয় বিষয় ছিল। ১৯৯০ এর ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন হয়েছিল।
ঐ ঐতিহাসিক ঘটনার আগে এবং পরে দীর্ঘদিন ইবরাহিম বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে ডাইরেক্টর অফ মিলিটারী অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসারদের সূতিকাগার, ভাটিয়ারিতে অবস্থিত, বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমীতেও ইবরাহিম কমান্ডান্ট এর দায়িত্ব পালন করে দীর্ঘদিন। “স্বাধীনতা মানচিত্র” নামের যে ভাষ্কর্য মুক্তিযোদ্ধা ইবরাহিম একাডেমীতে নির্মাণ করে রেখে এসেছে, সেটাই তাঁর চিন্তা শক্তির অভিনবত্বের অন্যতম স্বাক্ষী। যথাসময়ে ইবরাহিম মেজর জেনারেল হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৬-এর মে-জুন মাসে অপ্রীতিকর ঘটনায় ততোধিক অপ্রীতিকর বিচারে, ইবরাহিম বাধ্যতামূলক অবসরে যায়। ভেবেছিলাম অকালে একটি ফুল ঝরে গেল! কিছু লোক থাকে যারা নিজেদের জীবনে অবসর সময় চিনে না। ইবরাহিম এমন এক লোক। অবসর জীবন শুরু হওয়া মাত্রই, দেশের বিখ্যাত পত্রিকাগুলো ইবরাহিমকে জড়িয়ে নিল। ইবরাহিম কলাম লেখা শুরু করলো। যখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন আসলো, তখন চ্যানেলগুলো ইবরাহিমকে টেনে নিল।
ইবরাহিমের পরিচয় দিয়েছিল নিরাপত্তা বিশ্লেষক। এমনিতেই মিশুক ও সদালাপী; সাংবাদিক মহল, সুশীল সমাজ সকলের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে গেল আমাদের ইবরাহিম। কালের পরিক্রমায় ইবরাহিম নিজের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল। রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করলো। প্রতিষ্ঠিত কোনো দলে গেল না। নতুন নীতি নিয়ে, নতুন আবেদন নিয়ে, সমমনাদের নিয়ে প্রকাশ করলো বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। তার দলের প্রচারিত নীতিবাক্য: “পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি”। বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তন চায় ইবরাহিম ও তার দল। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম যখন দেখলাম তার দলের ব্যানারে, বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একই ফ্রেমে বাঁধা। যাহোক, আমি রাজনীতি বুঝি কম। মাঝেমধ্যে খোঁজ করলেই শুনি ইবরাহিম ঢাকার বাইরে। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এবং চট্টগ্রাম মহানগরে, অনেক সময় ব্যয় করছে ইবরাহিম; মনে হয় নির্বাচনকে খেয়াল রেখে। ইবরাহিম পারবে কি পারবে না জানি না, বন্ধু হিসেবে তো অবশ্যই দোয়া করবো তার সাফল্যের জন্য। মানুষের খেদমতে আমাদের বন্ধু আরও এগিয়ে যাবে, এটা তো কামনা করতেই পারি।
আমার বন্ধু জেনারেল ইবরাহিমকে তার জ্ঞানের জন্য এবং সমজদারিত্বের জন্য আমি সম্মান করি। লেখাপড়ার জগতে সে উজ্জ্বলভাবে স্থিত। ৫৪ বছর বয়সে মাস্টার্স পাশ করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যায় থেকে, প্রথম শ্রেণীতে। তারপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে নাম লিখিয়েছিল; শেষ করার কথা যদিও আজ অবধি শুনিনি। জেনারেল ইবরাহিম বিস্তর লেখেন; ইংরেজিতে যাকে বলে প্রলিফিক রাইটার। অনেক বই; কয়েকটি সংকলিত আর কয়েকটি মৌলিক। মিশ্র কথন নামে তার যে বই, সেটি পড়তে গিয়ে অনেক আনন্দ পেয়েছি, অনেক তথ্য পেয়েছি। আমি আশ্বর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি, আমিও বাংলাদেশে চাকরি করেছি, আমার বন্ধুও বাংলাদেশে চাকরি করেছে কিন্তু আমার বা আমাদের তুলনায় বন্ধুর পর্যবেক্ষণ কত গভীর এবং বিস্তৃত। জেনারেল ইবরাহিম একজন চমকপ্রদ বক্তা। দেশে হোক বা বিদেশে হোক, শ্রোতামণ্ডলী যেই প্রকারের হোক না কেন, ইবরাহিম উপযুক্ত বক্তব্য নিয়ে উপস্থিত থাকে। উপস্থিত বক্তৃতা হোক অথবা পূর্ব প্রস্তুতির পর হোক। ১৯৬২ সালে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আমাদের সেকেন্ড টার্মে, উপস্থিত বক্তৃতা বা ইমপ্রোমচু স্পীচ এর ইন্টারহাউজ প্রতিযোগিতা ছিল। ইবরাহিম জুনিয়র গ্রুপে পুরষ্কার পেয়েছিল। সেই জেনারেল ইব্রাহিম প্রবীণ বয়সেও ভালো বক্তৃতা দিবে এটাই স্বাভাবিক।
আমি যতদূর দেখেছি, ইবরাহিম সাধারণ মুসলমান হিসেবে ধর্মকর্ম করে। মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে যেমন, তেমনি ধর্মীয় বিষয়ে লেখাপড়া করে, বক্তব্যও রাখে। আমাদের দেশের পরিবেশে দর্শনীয়ভাবে সৎ ও বিনয়ী জীবন যাপন করতে চেষ্টা করে। বন্ধু হিসেবে তার জন্য আমার দোয়া থাকবে। আমি অনেকের ফেইসবুক বন্ধু, অনেকেই আমার ফেইসবুক বন্ধু। সকল বন্ধুদের নিকট, আবেদন করতেই পারি, ইবরাহিমের জন্য দোয়া করুন। বয়স ৬৬ বছর শেষ; ৪ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে ৬৭ বছর শুরু। মহান আল্লাহ তায়ালা যেন নেক হায়াত দান করেন; দেশবাসীর জন্য নিবেদিত হায়াত দান করেন। সেই ১৯৬২ থেকে আজ অবধি দুষ্টামি, ঝগড়াঝাঁটি, মান-অভিমান সবকিছু নিয়েই আমাদের ক্লাসের অনেকেই নিয়মিত বন্ধু। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া।’
বর্তমানে মেজর জেনারেল ইবরাহিম বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান।










