বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পরবর্তী সময়ে সামরিক জান্তার নিপীড়ন ও সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের ছোটগল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্টাট্যাস দিয়েছেন লেখক-গবেষক মনোয়ার মুনা।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন,
‘মৃতের আত্মহত্যা’ প্রথম প্রতিবাদ ?
‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বছরখানেক পর। দেশে তখন মিলিটারী জান্তার ভয়াবহ নিপীড়নমূলক অপশাসন জারি আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত কারফিউ দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। জনমনে আতংক। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেল হত্যার ঘটনা মানুষকে বিমূঢ় ও স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এক কথায় সামরিক কর্তাদের বুট এবং ব্যাটনের নিচে তখন সংবিধান , সকল মানবিক বোধ, মুক্তিযুদ্ধ সব। আজকের নবীন প্রজন্ম ভাবতে পারবেনা কতটা অন্ধকার নেমে এসেছিল সেদিন।
বঙ্গবন্ধু তখন নিষিদ্ধ নাম। সেনসরশিপে কন্ঠরুদ্ধ পত্রিকাগুলো লিখতে পারেনা কিছুই । ১৫ অগাস্ট সকালে জনগণের মধ্যে আতংকের সেই যে সূচনা হয়েছে , তা আরো ব্যাপ্ত ও গভীর হয়ে পড়েছে তখন।আরো পরে রাজনৈতিক কর্মকান্ড ক্রমশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ‘ ঘরোয়া রাজনীতি ‘ ( parlour politics ) নামক এক উদ্ভট ব্যবস্থা চালু করা হয় বটে ততদিনে দেশের সমগ্র রাজনীতি হয়ে পড়ে অনেকটা underground politics এর মত।
নিষিদ্ধ জেনেও গোয়েন্দা পুলিশের চোখ এড়িয়ে লিফলেট প্রচার , গোপন বৈঠক , সন্তর্পনে চোখ-কান খোলা রেখে মিলিত হওয়া, কানাঘুষো এই ছিল রাজনীতি । আমরা এসবই করতাম তখন। এই অবরুদ্ধ সময়টায় তোলপাড় করা একটা ঘটনা ঘটে। মফ:স্বল মহকুমা শহরে তরুন রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে কাজ করি আমরা। ঢাকার সাথে ক্ষীণ যোগাযোগ। সে সময় একদিন হঠাৎ আমাদের কাছে খবর আসে ঢাকার এক মাসিক পত্রিকা ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের উপর একটা ছোটগল্প ছেপেছে। গল্পটির নাম ‘ মৃতের আত্মহত্যা ‘। লেখক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আবুল ফজল। তারপর যা হবার। সামরিক গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে। নিষিদ্ধ করা হয় ঐ সংখ্যা। বাজেয়াপ্ত হয় সকল কপি।
আজ আর কেউ কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না ঐ সময় এরকম একটা গল্প ছাপানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও দু:সাহসিক। নিষিদ্ধ হলে কী হবে , আমরা এই এতদূরে বসেও বিকল্প পন্থায় মুদ্রিত এই ছোটগল্পটি লিফলেটের মত গোপনে, চুপি চুপি বিলি করেছিলাম রাজনৈতিক সতীর্থদের মাঝে। ছোটগল্প তো নয় , এটা যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির হাতিয়ার তখন।
কী ছিল সেই গল্পে ? আজ আর তা মনে নেই পুরোটা, অনেক আগে পড়েছি। তবে এটুকু মনে আছে , নির্মম হত্যকান্ডে জড়িত এক সামরিক কর্মকর্তা গভীর অনুশোচনা ও অপরাধবোধে ভুগে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। না , সত্য ঘটনা ছিলনা এটা। এটা গল্পই কিন্তু তৎকালীন সামরিক জান্তা এর গূঢ় ইংগিত ধরতে ভুল করেনি।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ছায়াপাত ঘটেছে সাহিত্যে বহুভাবে কিন্তু কোথাও এই গল্পটির উল্লেখ দেখিনি। সাহিত্যে প্রথম প্রতিবাদ তো এই ‘ মৃতের আত্মহত্যা ‘। নাকি অন্য কোথাও অন্য কিছু লেখা হয়েছিল ?’









