জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করলো খুনিরা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে যারা সেদিন প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল তৎকালীন সরকার দুষ্কৃতিকারী আখ্যা দিয়েছিল তাদেরকেই৷
প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে গিয়ে কেউ জীবন হারিয়েছে,বাড়ি জমি হারিয়েছে৷ দুষ্কৃতিকারী বলে তার পরিবার পরিজন হয়েছে লাঞ্চিত৷ তবে কি তারা আজও দুষ্কৃতিকারীই রয়ে গেছেন? নইলে কেন মূল্যায়িত হচ্ছেন না তারা? মুঠোফোনে কথা হলো কয়েকজন প্রতিরোধ যোদ্ধার সাথে৷
সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর থানার সাউদ পাড়া গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর পুত্র আলী উছমান (৭৮) ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ছুটছেন৷ তার পাশে নেই সরকার, নেই বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ৷ তিনি বলেন, আমি মাস দুয়েক আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করি ও চিকিৎসার জন্য আর্থিক সাহায্য চেয়ে একটি আবেদন জমা দেই। কিন্তু জানি না সুদৃষ্টি পাবো কিনা?
‘আমি ১৯৭১ সালের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম৷ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমি শপথ নিয়েছিলাম, এ হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে আমি বিয়ে করবো না৷ আমার বর্তমান বয়স ৭৮৷ আজও বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি৷ একাকি ও অসহায় জীবনের এক মানবেতর জীবন যাচ্ছে আমার৷’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে একলাখ টাকা করে যে অনুদান দেয়া হয়েছিল তা পেয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এগুলো সত্যিকারের প্রতিরোধ যোদ্ধারা পায়নি৷ কোনো এক অদৃশ্য কারণে সত্যিকারের প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি পেতে সক্ষম হচ্ছে না৷ উল্লেখ্য তিনিও এ অনুদান পাননি৷
ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার উত্তর কয়রাকুরি গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে আলী হোসেন আরজু (৬৫)৷ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধ যুদ্ধে যাওয়ার সময় তিনি সিপিবির উপজেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন৷ তার যৌবন কেটেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধে৷ তারও বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি৷ ভূগছেন শ্বাসকষ্ট, কিডনী ও ডায়াবেটিস রোগে৷
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার চেয়ে একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি৷ এ মিছিলে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন৷ ফেরারি অনিশ্চিত জীবন, মামলা ও নির্যাতনে আজ চরমভাবে অসুস্থ তিনি৷ শ্বাসকষ্ট, কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিস সহ নানা রোগে ভুগছেন। টাকার অভাবে এসব রোগের চিকিৎসা হচ্ছেনা তার৷
আলী হোসেন আরজু বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা গবরাগোরা গ্রামে প্রবোদ দিওর বাড়িতে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার ছিল৷ তিনি ১৯৭৭ সালের ১১ নভেম্বর ভারত হতে দেশে ফেরেন৷ প্রতিরোধ যোদ্ধা প্রবোধ দিও অভিমানে আজও দেশে ফেরেননি৷ হয়তো ভারতের মেঘালয়ে আজও ফেরারি জীবন কাটাচ্ছেন৷
গুরুতর অসুস্থ আলী হোসেন আরজু সহায় সম্বলহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন৷ তিনিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে কোনো সাহায্য পাননি৷ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ১৫ আগস্ট আসে যায় কিন্তু ১৫ আগস্টের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না৷
তিনি জানান, ১৯৮৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তার বাড়িতে এসেছিলেন৷ আমি প্রতিরোধ যুদ্ধে গিয়েছিলাম বলে আমার বাবাকেও জিয়া সরকার কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে৷ আমাকে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের ৮৮ নম্বর সদস্য করা হয়৷ এ ট্রাস্ট হতে আমাকে মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেয়া হয়৷ এ পর্যন্ত এইটুকুও শুধু পেয়েছি৷
ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের চকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নিখিল রায় (৬৯)৷ তিনি স্বর্গীয় রসরাজ রায়ের ছেলে৷ ১৯৭৫ সালে ডিগ্রী পরীক্ষার্থী ছিলেন৷ তিনি তখন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের গৌরীপুর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক৷ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগে সম্পৃক্ত হন৷ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে যে একলাখ টাকা করে অনুদান দেয়া হয় সেটা আমার নামেও এসেছিল৷
কিন্তু চেকে আমার নাম নিখিল রায় না লিখে লেখা হয় নিলিখ রায়৷ চেকটি আমাকে দিয়েছিলেন প্রতিরোধ যোদ্ধা সেলিম তালুকদার৷ আমি ভুল সংশোধনের জন্য চেকটি সেলিম তালুকদারের কাছে দেই৷ আর তিনি সেটা কলমাকান্দা দূর্গাপুরের এমপি মানু মজুমদারের হাতে তুলে দেন৷ ৫ মাস হয়ে গেল আমার চেকের কোনো সুরাহা হলো না৷
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চেয়ে পোষ্টার লাগানোর অপরাধে আমি গ্রেপ্তার হই৷ এরপর ছাড়া পেয়ে চলে যাই প্রতিরোধ যুদ্ধে৷ তৎকালীন সরকারের চোখে আমরা ছিলাম দুষ্কৃতিকারী৷ আমরা কি আজও দুষ্কৃতিকারীই রয়ে গেলাম?
সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার রাঙ্গামাটি গ্রামের মৃত সুরেন্দ্র চন্দ্র সরকারের ছেলে সুকেশ রঞ্জন সরকার (৬৫)৷ তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন ধর্মপাশা বাজারের নতুন পাড়ায়৷ তিনি সুখাইর রাজাপুর (উত্তর) ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের চাকরি করতেন৷ ১৯৭৫ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যান প্রতিরোধ যুদ্ধে৷
এরপর আর চাকরি ফিরে পাননি৷ তার নামে ৯টি মামলা ছিল৷ কারাগারে কেটেছে ৯ বৎসর৷ বর্তমানে ডায়বেটিস,গ্যাস্ট্রিক ও হাইপ্রেসারে ভুছেন৷ তিনি বলেন,২ বৎসর আগে আমরা ২৬/২৭ জন প্রতিরোধ যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের সাথে সাক্ষাত করি ও উনার হাতে সবাই আবেদন জমা দেই৷ সেটি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা৷
এই প্রতিরোধ যোদ্ধাও পেলেন না কোনো সাহায্য৷ আরেক প্রতিরোধ যোদ্ধা স্বপন চন্দ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ছুটছেন৷
তার জন্মস্থান নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার মানশ্রী গ্রামে৷ প্রতিরোধ যুদ্ধে যোগদানের পর আর ঘরে ফেরা হয়নি তার৷ তিনি অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে ঢাকার টঙ্গীতে বসবাস করছেন৷ তার সাথে কথা বললে তিনি জানান, আমার নামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে একলাখ টাকা অনুদানের চেক হয়েছিল৷
তিনি বলেন, কলমাকান্দা দূর্গাপুরের এমপি মানু মজুমদারের বৈরিতায় চেকটি পাইনি৷ আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসানের সাথেও যোগাযোগ করেছি৷ একলাখ টাকার চেক বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর সাজ্জাদুল হাসান নিজে যোগাযোগ করে আমার কাছ থেকে একটি আবেদন নেন৷
‘আমি এবার আশাবাদী হয়েছিলাম৷ কিন্তু আশায় গুড়ে বালি৷ ২ মাস পাড় হয়ে গেল কোন সুফল হল না৷ আমি এখন মৃত্যুর প্রহর গুণছি৷ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের আমলেই জুটলো না কোনো সাহায্য৷ এ লজ্জা বলবো কাকে?’
এর মানে হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অভিযোগ অনুদানগুলো সঠিক জায়গায় যাচ্ছে না৷ অনেক ক্ষেত্রেই অনুদানগুলো চলে যাচ্ছে ভুয়াদের হাতে৷ এ পর্যন্ত কতজনকে ও কত টাকা অনুদান দেয়া হল ও কারা পেল অনুদান? এর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ জরুরি নয় কি? এসব প্রতিরোধ যোদ্ধা বিনাচিকিৎসায় মারা গেলে এ লজ্জা কার? এর দায় কার?
প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের যৌবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে৷ এজন্য লাঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিগৃহিত হয়েছে তাদের পরিবার৷
মোশতাক ও জিয়া সরকারের আমলে রেডিও, টিভিতে এই যোদ্ধাদের কতিপয় দুষ্কৃতিকারী হিসাবে প্রচার করা হত৷ তবে কি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তারা রয়ে গেলেন দুষ্কৃতিকারী হিসেবেই? এমন প্রশ্ন এসব অসুস্থ অসহায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








