বাংলাদেশ সময় ভোর ৩ টা ৪৭ মিনিটে মহাকাশ যাত্রা শুরুর সব প্রস্তুতির পরও আপাতত মহাকাশের যাত্রা শুরু করতে পারলো না বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। মঞ্চে উঠেও ওড়া হলো না আজ। বিশ্বের ৫৭ তম স্যাটেলাইটধারী দেশ হিসেবে নাম লেখানোর অপেক্ষার পালা তাই আরও বাড়লো।
এই অপেক্ষা হয়তো বেশিক্ষণ করতে হবে না। পূর্ব নির্ধারিত বিকল্প বা ব্যাকআপ উইন্ডো হিসেবে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিট থেকে ভোর ৪টা ১৪ পর্যন্ত আবার উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি শুরু হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্পেসএক্সের সরাসরি সম্প্রচারে উৎক্ষেপণ স্থগিত হয়েছে জানিয়ে বলা হয়, ফ্যালকন রকেট এবং স্যাটেলাইটে কোন সমস্যা নেই। তাহলে কেন স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হলো না তার কোন নির্দিষ্ট কারণ লাইভ সম্প্রচারে জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যাওয়া নতুন কিংবা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। রকেট উৎক্ষেপণে অভিজ্ঞ সংস্থা নাসা’র অভিজ্ঞতা বলছে, দূর থেকে যতো সহজ মনে হয়, রকেট উৎক্ষেপণ ততো সহজ বিষয় নয়।
সাধারণ ধারণায় রকেটকে শক্তিশালী আর নিরেট মনে হয়। এমনকি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পার হওয়ার সময় তীব্র তাপের মোকাবেলা করে রকেটগুলো। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়া এবং রকেট যানগুলো এতো সুক্ষ্ম যে চুল পরিমাণ ঝুঁকি নেয়ার সুযোগ নেই।
ইন্টারনেট ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশকে আপাতত ডিজিটাল বলা গেলেও মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর অভিজ্ঞতা সরকার এবং দেশের জনগণের জন্য একেবারেই নতুন। তাই বারবার উৎক্ষেপণের তারিখ পেছানো নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অভাব হয় না। সমালোচনা এবং জনমনে সংশয় বাড়তে থাকে।
স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি হচ্ছে প্রতিকূল আবহাওয়া। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে ফ্যালকনের ৪ মে উড়াল দেয়ার পথেও সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার আবহাওয়া। ৪ মে থেকে উৎক্ষেপণের তারিখ পেছানোর কারণ বলতে গিয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এসব তথ্য জানান।
প্রতিকূল পরিবেশের কারণে স্পেসশাটলের মতো জটিল ও সুক্ষ্ম সার্কিটের মহাকাশযানের উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলেই মনে করে নাসা।
বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিবেদনের অনলাইন পোর্টাল ‘হাউস্টাফওয়ার্কস’-এর প্রতিবেদনে নাসার রকেট উৎক্ষেপণ বিলম্বের কারণগুলো প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রকেট বিশেষ করে মনুষ্যবাহী স্পেসশাটল উৎক্ষেপণের আগে চুল পরিমাণ ঝুঁকি থাকলে নাসা উৎক্ষেপণ পিছিয়ে দেয়। এরপর সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা হয়। সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে ১৯৮৬ সালে বিধ্বস্ত হয় চ্যালেঞ্জার রকেট এবং ২০০৩ সালে বিধ্বস্ত হয় কলম্বিয়া।

তাই উৎক্ষেপণে তড়িঘড়ি করার সুযোগ নেই। আবহাওয়ার অবস্থা বুঝতে ওয়েদার বেলুন, ডপলার রাডারসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরি চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণের সময় ছিল ২০১৭ সালে। কিন্তু ২০১৭ সালে তারিখ ঠিক করেও একবার দুইবার নয়, ছয়বার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়েছে। সর্বশেষ আশা করা হয়েছিল ১০ মে (বাংলাদেশ সময় ১১ মে, রাত ৩ টা) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে মহাশূন্যে উড়বে স্পেসএক্সের ফ্যালকন নাইন রকেট।
আবহাওয়ার যেসব বিষয় রকেট উৎক্ষেপণ পিছিয়ে দিতে সক্ষম:
বৃষ্টি, তুষার কিংবা অনুরূপ কিছুর বর্ষণ
বৃষ্টিপাত, তুষারপাত কিংবা এরকম কোন কিছুর বর্ষণের সময় রকেট বিশেষ করে স্পেসশাটল উৎক্ষেপণ করা হয় না।
মেঘ
আকাশে জমাট বাধা মেঘ থাকলে রকেট উৎক্ষেপণে বজ্রপাতের ঝুঁকি দেখা দেয়। তাই আকাশে এরকম মেঘ থাকলে উৎক্ষেপণের আগে এই মেঘ রকেটের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা খতিয়ে দেখেন বিশেষজ্ঞরা।
বাতাস
যদি উৎক্ষেপণস্থলে উত্তরপূর্ব দিক থেকে ১৯ নট গতির বাতাস বা অন্যান্য দিক থেকে ৩৪ নটের বেশি গতির বাতাস আসে তাহলে রকেট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয় না।দৃষ্টিসীমা
মহাকাশযান উৎক্ষেপণের পর আকাশসীমা দৃষ্টিগোচর হতে হয়। একে এভিয়েশনের ভাষায় ‘সিলিং’ বলা হয়। এই সীমা ৬ হাজার ফিটের কম হলে দৃষ্টি রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তাপমাত্রা
আবহাওয়ার উষ্ণতা বা গরম আবহাওয়া উৎক্ষেপণের জন্য তেমন কোন সমস্যা নয়। তাপ মাত্রা কম হলেই সমস্যা। যদি তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৮৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হয় তাহলে পরিণতি হিসেবে বরফ জমাট বাধার মতো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।
আর মহাকাশে রকেট পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে মানুষ এবং যন্ত্রের সুক্ষ্মতম কাজ জড়িয়ে থাকায় কারিগরি কারণেও উৎক্ষেপণ পিছিয়ে যেতে পারে।
অনেকসময় উৎক্ষেপণের জন্য রকেট লঞ্চিং প্যাডে নিয়ে রাখার পর আবহাওয়ার কারণে উৎক্ষেপণ বাতিল করা হয়। রূঢ় আবহাওয়া থেকে রকেটের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে রকেটকে পুনরায় ‘ভেহিকেল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং’ (ভিএবি) তে ফিরিয়ে আনার ঘটনাও ঘটেছে। এটি ‘রোলব্যাক’ নামে পরিচিত। ১৯৮৩ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত মোট ১৭ টি রোলব্যাকের ঘটনা ঘটে।
শুধু এসব কারণই নয়, বিশ্বের মহাকাশ সংস্থাগুলোর নিজ নিজ রকেট উৎক্ষেপণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে। এক্ষেত্রে নাসা’র সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ রাখতে হয়। যাতে একই সময়ে উৎক্ষেপণের ঘটনা এড়ানো যায়।








