মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু ফরিদ খান আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল হতে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার সমাজ সহিলদেও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করাতে রাতদিন পরিশ্রম করে যুবকদের উদ্বুদ্ধ করে নৌকাযোগে ভারতের দেরাদুনের টানডুয়ায় নিয়ে যেতেন তিনি। যাদের যুদ্ধে পাঠাতেন তাদের বাড়িতে চাল, ডাল, তেল পাঠাতেন ও সর্বক্ষণ সেই পরিবারের খবর রাখতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার জায়গা ছিল আবু ফরিদ খানের বাড়ি। পাকবাহিনীর অগ্নিসংযোগ হতে বাঁচতে ঘরের চৌকি ও খাট পালঙ্ক পুকুরে ডুবিয়ে রাখত আর মুক্তিযোদ্ধারা ত্রিপাল অথবা বস্তা বিছিয়ে মাটিতে ঘুমাতো। ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা আবু ফরিদ খানের বাড়িতে ৬ মাস অবস্থান করেছে বলে জানালেন তার ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ খাঁ। তার বাড়ির পেছনে তিনটি বাংকার ছিল।
পাকবাহিনীর আগমন সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংকারে লুকিয়ে থাকত আর বাড়ির মহিলারা তার উপরে ত্রিপাল, বাঁশের কঞ্চি ও লতাপাতা ফেলে রাখত যাতে পাকবাহিনী বুঝতে না পারে এর ভিতরে মানুষ আছে। আবু ফরিদ খানের ৫ ছেলে ও ৬ মেয়ে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মিথ্যে মামলার ভারে পরিবারটি সব সহায়-সম্পদ হারিয়েছে। সমাজ সহিলদেও গ্রামে আর তাদের কোনো জায়গা জমি নেই। তার স্ত্রী তার বাবার বাড়ি কাজিয়াটিতে ছেলেদের নিয়ে থাকেন।
আবু ফরিদ খানের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাবার শিষ্যরা মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেয়েছেন। তিনি পাননি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাবার মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। তিনি বলেন, আমার আর বাঁচার উপায় নেই। চক্রান্তকারীরা জেগে উঠবে। আবু ফরিদ খানের স্ত্রী সবুজা আক্তার জানালেন, রাজাকার জমরুদ ও তিনি সমবয়সী ছিলেন। আমার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেন সে হল রাজাকার। রাজাকার জমরুদ আমার স্বামীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে।
আবু ফরিদ খানের ছোট ভাই নূর মোহাম্মদ খাঁ জানান সমাজ সহিল দেও গ্রামে পাকবাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে রামজীবন পুরের ব্রিজটি ভেঙ্গে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধারা। ব্রিজটি ছিল কাঠের তৈরি। ভাঙ্গা ব্রিজের কাঠগুলো জলে ভেসে সমাজ সহিলদেও গ্রামের জাহেদ মাষ্টারের বাড়ির সামনে যায়। এলাকাবাসী দেখতে পেয়ে তৎকালীন ইউনিয়ন প্রশাসককে জানায়। প্রশাসক এগুলো নিলামে দিয়ে দেয়। আবু ফরিদ খান যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে কাঠগুলো নিলামে কিনে নেন।
আবু ফরিদ খানের স্ত্রী বলেন, একই গ্রামের মতিউর রহমান ঠাকুর ওরফে মন্তু মিয়া বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সরকারি ব্রিজের কাঠ দিয়ে ঘর বাঁধার মিথ্যে মামলা করে। এই মামলায় আসামি হন আবু ফরিদ খান ও তার তিন ভাই। ১৯৭৬ সালে আসামিরা গ্রেফতার হয়। শুরু হয় একের পর এক মিথ্যে মামলা। একে একে ১৮টি মিথ্যে মামলার আসামি হন আবু ফরিদ খান ও তার পরিবার। ১২৫ টাকা কাঠা(১০ শতাংশ)মূল্যে জমি বেঁচে মামলা মোকাবেলা করে স্বর্বস্ব হারান তিনি। চক্রান্তকারীদের ইন্ধনে উগ্রপন্থীরা আবু ফরিদ খানের ঘরের টিন খুলে নিয়ে যায় ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এতে পুড়ে যায় দলীয়, মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত ও রিলিফ কমিটি সংক্রান্ত কাগজ। এব্যাপারে থানায় জিডি করেছে আবু ফরিদ খানের পরিবার।
উল্লেখ্য আবু ফরিদ খান সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের রিলিফ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। রিলিফের টিন দিয়ে আবু ফরিদ খান বসত ঘর নির্মাণ করেছে এই গুজব তুলে চক্রান্তকারীরা আবু ফরিদ খানের বাড়িতে হামলা চালায়। সমাজ সহিলদেও গ্রামের বাসিন্দা মোঃ ইদু মিয়া বলেন, আবু ফরিদ খানের পরিবারকে স্বর্বস্বান্ত করার চক্রান্তকারীদের মূল হোতা ছিলেন আব্দুল মান্নান খান মতি মিয়া। তিনিই মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে তার বিরুদ্ধে লোকজনকে লেলিয়ে দিয়েছেন। আবু ফরিদ খানের স্ত্রী সবুজা আক্তার বলেন, আমার স্বামী মৃতুবরণ করলে আব্দুল মান্নান খান মতি মিয়া জানাযায় এসে দোষ স্বীকার করেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এলাকার মানুষের সাথে কথা বললে অনেক ক্ষোভের কথা জানালো তারা। শিষ্যরা মুক্তিযোদ্ধার সনদ পায় আর গুরু পায়না। এটা কী ধরনের কথা হলো? সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমদ আলী চৌধুরী হীরা বলেন, আবু ফরিদ খান অসুস্থ শরীরেও মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী যুবকদের নৌকাযোগে পাড় করে দিতেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শত অসুস্থতাতেও মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ডে সামান্যতম পিছপা হননি তিনি। তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তার মুক্তিযোদ্ধার সনদ না পাওয়া খুবই দুঃখজনক।
আবু ফরিদ খানের স্ত্রী সবুজা আক্তার ১০/৮/২০১৩ ইং তারিখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বরাবরে আবু ফরিদ খানকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্তি করণের জন্য আবেদন করেন। এতে সুপারিশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রেবেকা মমিন। কিন্তু দরখাস্ত হিমাগারেই পড়ে থাকে। ১৪/৬/২০১৪ ইং তারিখে মুক্তিযোদ্ধার নিবন্ধন আবেদন ফরমে আবেদন করা হয়। মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ, ক, ম মোজাম্মেল হকের সুপারিশ সম্বলিত আবেদনটি ১৩/৩/২০১৬ ইং তারিখে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পৌঁছেছে বলে তার পরিবার জানায়। মামলা, হয়রানী, আতঙ্ক ও আর্থিক টেনশনে শেষ জীবনে যক্ষা ব্যাধিতে আক্রান্ত হন আবু ফরিদ খান। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি মুজিব কোট ছাড়া বেরোতেন না। অবশেষে মিথ্যে মামলা হতে রেহাই পান সাবেক রাষ্ট্রপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমানের সহযোগিতায়। ৫৯ বৎসর বয়স্ক আবু ফরিদ খানের কন্যা হোসনে আরা পুতুল বলেন, কী দূর্বিসহ আতঙ্কের দিন গেছে আমাদের। বাবা মামলার হাজিরা দিয়ে এসে রাস্তায় শারীরিক হামলার স্বীকার হয়েছেন কয়েকবার। তাকে কয়েকবার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা সব হারিয়েছি, দুঃখ নেই। বাবার রক্তের সাথে মিশে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আমরা বাবার অবদানের স্বীকৃতি চাই।
উল্লেখ্য, আবু ফরিদ খান বঙ্গবন্ধু আমলের মন্ত্রী আব্দুল মমিনের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন বলে জানা যায়। আবু ফরিদ খানের মতো ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধার কেন স্বীকৃতি মিলছেনা এই প্রশ্নটা এলাকাবাসীর মুখে মুখে। তার প্রাণের সংগঠন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও তার মূল্যায়ন না হওয়া মেনে নেয়ার মতো না বলে মনে করছেন তারা। স্বাধীনতা যুদ্ধের নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা আবু ফরিদ খান মৃত্যুবরণ করেনও স্বাধীনতা দিবসে। ২০০০ সালের ২৬ মার্চ সকাল ৭টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রতি স্বাধীনতা দিবসেই নিরবে নিভৃতে শুধুই পারিবারিক আবহে পালিত হয়ে আসছে তার মৃত্যুদিন। এব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউই কোনো খোঁজ নেননি বলে জানা যায়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







