অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালির জ্ঞান ও সৃজনশীলতার প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারে রাষ্ট্রীয় প্রধান আয়োজন। শুধু বাঙালি নয়, বাংলাদেশের অন্য জাতিসত্তাগুলোরও জ্ঞান ও মননচর্চার প্রধান প্রকাশক্ষেত্র একুশে বইমেলা। তাই এই বইমেলার সাথে লেখক-প্রকাশকের স্বার্থ যেমন জড়িত, তেমনি বাংলাদেশের সকল জাতিসত্তার স্বার্থ জড়িত।
অমর একুশে গ্রন্থমেলার সেই সার্বিক গুরুত্বের জায়গা থেকে এর আগামী আয়োজনকে সর্বাঙ্গীন সুন্দর ও লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের জন্য অধিক উপযোগী করে তোলার জন্য বাংলাদেশ লেখক ঐক্য ১৮টি প্রস্তাবনা বা দাবি তুলে ধরেছে।
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে(ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটির সভাপতি রাখাল রাহা প্রস্তাবনাগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করেন।
ক. একুশে গ্রন্থমেলা সম্পর্কিত প্রস্তাবনা সমূহ:
১.‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো পর্যন্ত শুধু প্রকাশকদের প্রতিনিধিত্ব থাকে, লেখকদের থাকে না। অথচ লেখকদের লেখা বই নিয়েই বইমেলা। তাই মেলা-আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল প্রক্রিয়ায় লেখকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। বইমেলার সার্বিক বিকাশের স্বার্থে প্রকাশকদের সংগঠনের পাশাপাশি প্রতিনিধিত্বশীল লেখক-সংগঠনকেও মেলা-আয়োজনে সম্পৃক্ত করার জন্য বাংলাদেশ লেখক ঐক্যের পক্ষ থেকে আমরা দাবি জানাচ্ছি।
২. বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ফেব্রুয়ারির প্রথম তিন দিন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন বা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় বলে আমরা শুনেছি। বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ লেখকেরা এতে অংশ নেন। কিন্তু এই উৎসব এতই নিভৃতে হয়ে থাকে যে বাংলাদেশের লেখক-পাঠকেরা তা জানতেই পারেন না। লেখকদের আমন্ত্রণ জানানোরও প্রয়োজন মনে করেন না বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। এরকম নিভৃতচারী উৎসব পালনের মানে কী তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমাদের দাবি-আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন সফল করার জন্য যথাযথভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এই আয়োজন এমনভাবে অনুষ্ঠান করতে হবে যাতে এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও জাতির লেখক-প্রকাশকের সাথে এদেশের লেখক-প্রকাশকের পারস্পরিক ভাব-বিনিময় ও সম্পর্কসূত্র স্থাপনের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা ও অন্যান্য সকল আয়োজনে কোটারি লেখক ও কর্মকর্তার বাইরে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল সকল নবীন-প্রবীণ লেখকের অংশগ্রহণের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকেরই লেখক-সম্মানী বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। জ্ঞান ও সৃজনশীল চিন্তা বিকাশের স্বার্থেই এ অবস্থার নিরসন হওয়া প্রয়োজন। সারাবছরের মধ্যে বইমেলাতেই যেহেতু সর্বোচ্চসংখ্যক লেখক-প্রকাশক একত্র হন, তাই এ সংক্রান্ত অভিযোগ পেশ ও মীমাংসার জন্য আমরা মেলা-প্রাঙ্গণে স্বতন্ত্র আইনি সেল বা বুথ খোলার দাবি জানাচ্ছি।
৪. লেখকের সাথে চুক্তি না করে বই প্রকাশ ও বিক্রি করেন যেসব প্রকাশক, বইমেলায় তাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া যাবে না। মেলা চলাকালে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা বিবেচনায় নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্টল বরাদ্দ বাতিল করতে হবে।
৫. ২০১৭ সালের গ্রন্থমেলায় আপত্তিকর বইগুলো খুঁজে বের করতে এবং প্রয়োজনে সেগুলো নিষিদ্ধ করতে পুলিশকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি ছিল পুরো লেখক ও প্রকাশক সমাজের জন্য অপমানজনক। যে-বই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ নয় তার প্রদর্শন ও বিক্রির ওপর কোনো ধরনের পুলিশি বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এমন কোনো নেতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা যাবে না যাতে লেখক-প্রকাশকের স্বার্থ ও সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়।
৬. মেলার নকশা ও স্টল-বিন্যাস এমন হতে হবে যেন মেলা-প্রাঙ্গণের একপাশ দিয়ে প্রবেশ করলে অনায়াসে সবগুলো স্টল দেখতে দেখতে পুরো মেলা ঘুরে আসা সম্ভব হয় এবং সহজে কাঙ্খিত স্টলটি খুঁজে পাওয়া যায়। প্যাভিলয়ন বা বড় স্টলগুলো যেন অপেক্ষাকৃত ছোট স্টলকে আড়াল না করে তা নকশা তৈরির সময় খেয়াল রাখতে হবে। গোটা মেলাকে পরিচ্ছন ও নান্দনিক করতে হবে। সামনের বা মাঝের কিছু স্থান সুন্দর করে সীমানা-সংলগ্ন স্থানগুলো অগোছালো ও এলোমেলো করে রাখার সংস্কৃতি পরিত্যাগ করতে হবে।
৭. বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশই প্রাথমিক স্তরের শিশু। বইমেলায় বিক্রিত বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ শিশুতোষ বই। অথচ গোটা মেলার পঞ্চাশ ভাগের একভাগ স্থানও শিশুদের বইয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় না। এ অবস্থার নিরসন করতে হবে। শিশুকর্নারে অভিভাবকদের সাথে শিশুরা যাতে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারে সেভাবে মেলার নকশা তৈরি করতে হবে। শিশুকর্নারকে আরো আকর্ষণীয় এবং শিশুদের বিনোদন উপযোগী করে সাজাতে হবে।
৮. লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা ও তরুণ লেখকের বই বহির্ভূত অসঙ্গত যাবতীয় প্রকাশনার প্রদর্শন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। অতীতে যারা এগুলো করেছে, এই চত্বরের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার স্বার্থে তাদের স্টল বরাদ্দ দেয়া যাবে না।
৯. বাংলা ভাষার ধ্রুপদী সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের বিষয়ে তরুণ পাঠকদের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা কমানোর স্বার্থে তাদের সব বই এবং তাদের ওপর করা গবেষণাগ্রন্থগুলো যেন মেলায় সহজে পাওয়া যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্র, মানিক, বিভূতিভূষণ, শহীদুল্লাহ, রোকেয়া এবং জসীম উদ্দীনের মতো চিরায়ত লেখকদের নামে পৃথক পৃথক স্টল তৈরি হতে পারে। এই স্টলগুলো বরাদ্দ পেতে যে-কোনো ব্যক্তি আবেদন করতে পারবেন এবং লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ প্রদান করা যেতে পারে। যিনি যে লেখকের নামে স্টল বরাদ্দ পাবেন তিনি সেই লেখকের সকল বই এবং তাঁর ওপর করা গবেষণাগ্রন্থগুলো বিভিন্ন প্রকাশকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে প্রদর্শন ও বিক্রি করবেন। এর বাইরে আর কোনো বই তিনি প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারবেন না।
১০. বাংলা একাডেমি মেলাতে নিজেদের বইয়ে ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে থাকে। অন্যান্য প্রকাশনী ২৫ শতাংশ ছাড় দেয়। কিন্তু সারাবছর ধরে ক্রেতারা বিভিন্ন প্রকাশনীর বই, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, প্রায় ২০-২৫ শতাংশ ছাড়ে কিনতে পারেন। সুতরাং বাংলা একাডেমির সঙ্গে ছাড়ের সমতা আনা এবং একইসাথে ক্রেতাদের উৎসাহিত করার জন্য মেলায় সাধারণ ছাড় ৩০ শতাংশ করা যেতে পারে।
১১. ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তের দূরত্ব, যানজট ও অফিস ছুটির বিষয়টি বিবেচনা করে মেলা সমাপ্তির সময় রাত সাড় আটটা থেকে বাড়িয়ে রাত সাড়ে নয়টা করতে হবে। ২১শে ফেব্রুয়ারির পরের দিনগুলোতে মেলা শুরুর সময় সকাল ১১টা করা যেতে পারে। এতে সারাদেশ থেকে আগত মানুষের বিশেষ সুবিধা হবে।
১২. মেলায় আগত ক্রেতা-দর্শকদের বিশ্রামের জন্য বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিশেষায়িত খাবারের দোকানের পাশাপাশি স্বল্প মূল্যের স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দোকান বাড়াতে হবে। বিশুদ্ধ পানি ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
১৩. বইমেলায় নিরাপত্তার নামে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাতে লেখক, প্রকাশক ও দর্শক-ক্রেতাদের নিরাপত্তা কতটা রক্ষিত হয় তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু নিরাপত্তার নামে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। এ অবস্থার নিরসন করে লেখক-প্রকাশকসহ মেলায় আগত সব মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য হয়রানিমুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
১৪. জ্ঞান ও সৃজন জগতের বিকাশের স্বার্থে মেলায় আগত সম্ভাবনাময় নবীন প্রকাশকদের আরও কম ভাড়ায় স্টল বরাদ্দ দিয়ে তাদরে উৎসাহিত করতে হবে। স্টল পাওয়ার ক্ষেত্রে মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যার যে শর্ত রয়েছে তা সম্ভাবনাময় নবীন প্রকাশকের ক্ষেত্রে শিথিল করতে হবে। প্রকৃত অর্থেই নবীন ও সম্ভাবনাময় প্রকাশক যেন এই সুযোগটা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
খ. বাংলাদেশের লেখক, প্রকাশক ও প্রকাশনা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রস্তাবনা:
১. একসময় বাংলাদেশে ‘লেখক কাগজ’ নামে এক ধরনের কাগজ ছিল যা তুলনামূলক কম মূল্যে পাওয়া যেত। সে ধরনের কাগজ পুনরায় উৎপাদন করতে হবে। বই প্রকাশের এই কাগজ হতে হবে ওজনে হালকা, দীর্ঘস্থায়ী ও চোখের জন্য সহনীয়। বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাসহ অনেক খাত রয়েছে যেখানে রাষ্ট্র ভর্তুকি দিয়ে থাকে। সরকারি বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি থেকে শুরু করে তাদের আরও অনেক ধরনের আয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু জাতির সৃজন ও মনন প্রকাশে যারা কাজ করছেন তারা রাষ্ট্র থেকে কোনো ধরনের প্রণোদনা বা সুবিধা পান না এবং তাদের বই বিক্রির বাইরে আর কোনো আয়ের সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
২. ভারতে প্রকাশিত বাংলা বই যে পরিমাণে বাংলাদেশে আসে এর পেছনে ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের সার্বিক সহায়তা রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের বই ভারত ও অন্যান্য দেশে রপ্তানী বা ডাকযোগে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।
৩. বাংলা একাডেমি থেকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবদুল্লাহ আল-মুতী, জসীম উদ্দীনের মতো সম্ভাব্য সকল লেখকের রচনাবলি প্রকাশ করতে হবে। রচনাবলি প্রকাশ করার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করতে হবে। বাংলা একাডেমি থেকে নানা সময়ে যেসব লেখকের রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছিল জাতির জ্ঞান চর্চার উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে সেগুলো আবারও ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতে হবে।
৪. বাংলাদেশের লেখকদের আড্ডা দেওয়া বা তারা পরষ্পরের সাথে বসে ভাবের আদান-প্রদান করবে এমন কোনো উপযোগী স্থান নেই। সম্প্রতি বাংলা একাডেমিতে একটা ক্যাফে চালু হয়েছে যা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আমাদের প্রস্তাব ক্যাফেটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।







