বই আর ফেব্রুয়ারি, দুটির মধ্যে মানুষ যখন থেকে সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে তখন থেকেই বই কেনার মাস হয়ে উঠেছে ফেব্রুয়ারি। এই মাসেই যাবতীয় বইয়ের কেনাবেচা, নতুন নতুন বইয়ের আগমন। তাহলে কী অবস্থা দাঁড়ায় বছরের বাকি ১১টি মাসে? তখন কেমন পরিস্থিতি হয় বই কেনাবেচার? পাঠকের আগ্রহই বা কেমন থাকে? বইমেলা শেষ হওয়ার পরের মাসের চিত্রটা কী?
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অন্যপ্রকাশের প্রধান মাজহারুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এতবড় একটি মেলার পর স্বভাবতই বেচা-বিক্রি একটু কমে আসে। তবে মার্চ ও এপ্রিলের দিকে একটু বেচাকেনা চললেও এর পরের মাসগুলোতে বই বিক্রির কোনো সম্ভাবনাই থাকে না।
তবে এই সময়গুলোতেও কিছু বই ছাপানো হয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটা পুরোপুরিই নির্ভর করে বইয়ের চাহিদার উপর। যেই বইয়ের চাহিদা বেশি সেটা আবার ছাপানো হয়।

বইকে আরো বেশি বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে মিডিয়ার আরো বেশি সরব হওয়ার দরকার আছে বলে মনে করেন মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, বইমেলার সময় যেভাবে মিডিয়া বইমেলাকে কাভারেজ দেয় ঠিক সেভাবেই যদি তারা সারা বছর দিয়ে থাকে তাহলে বই নিয়ে পাঠকের আরো বেশি আগ্রহ তৈরি হবে।
পাশাপাশি বছর জুড়েই নানান জায়গায়, ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের মেলার আয়োজনের কথা বলেন তিনি। মেলার পাশাপাশি আরো নানান আয়োজনের পরামর্শও।
একইরকম কথা বলছিলেন আরেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ভাষাচিত্রের খন্দকার সোহেল। তিনিও বইয়ের প্রচারণা বাড়াতে মিডিয়ার বাড়তি উদ্যোগের উপরই গুরুত্ব দেন।

‘বইয়ের খোঁজ খবর কেবল শুধু বইমেলার সময়েই নয়, সারাবছর চালাতে হবে। প্রতিমাসে নতুন কী কী বই আসছে, কতগুলো বই আসছে সেসব বিষয়েও সারা বছরই আপডেট রাখতে হবে মিডিয়ায়। তাহলে পাঠকের মনে সারাবছর একটু একটু করে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে।’
তবে বইমেলার পর বই কেনা-বেচাটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনলাইন কেন্দ্রিক। বেশিরভাগ পাঠকই বইমেলার পরে বই কেনেন অনলাইনে। ফলে লেখক-পাঠক ও প্রকাশকের মধ্যে সম্পর্ক কেবল গড়ে উঠে সেই বইমেলাতেই।
খন্দকার সোহেল বলেন: সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর তাছাড়া দেশে বইয়ের জন্য আলাদা কোনো ভালো মার্কেট নেই। বাংলাবাজারে সাধারণত পাঠক যান না। সেটা বানাতে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। আর সেই বইয়ের বাজার শুধু বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠবে না, বরং সেটা হবে দেশের সংস্কৃতি কেন্দ্র।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শ্রাবণ- এর প্রধান রবিন আহসান মনে করেন, বই যা বিক্রি হওয়ার তা হয় সেই ফেব্রুয়ারি মাসেই। সেই সময়ে যদি বই বিক্রির পরিমাণ থাকে ১০০ শতাংশ তাহলে তার পরে বই বিক্রির পরিমাণ নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২ শতাংশে।

এর কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ থেকে বই পড়ার সংস্কৃতিই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে যখন ইন্টারনেট বা ফেসবুক ছিল না, তখন অবসর সময়টা মানুষ বই পড়েই কাটাতো। আর এখন কজন বই পড়ে? আগে বই পড়লে মানুষ সেই বই নিয়ে গল্প করতো, বুক রিভিউও আসতো খুব, এখনতো সেসবও কম দেখা যায়।
তাছাড়া দেশের বাইরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাইরের দেশের মানুষ বাসে বা ট্রেনে ভ্রমণের সময় বই পড়ে। আমাদেরতো সেই সুযোগও নেই। সব মিলিয়ে চাপটা গিয়ে পড়ছে বইয়ের পাঠকদের উপরই।
সমাধান হিসেবে তিনি প্রচুর পাঠাগার গড়ে তোলার উপর জোর দেন। ‘ঢাকায় এত এত মানুষের বাস কিন্তু সেখানে পাঠাগার কোথায়! বইয়ের দোকানগুলোও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সেই জায়গাগুলোকেই আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই আবার পাঠক ঝুঁকবে বইয়ের দিকে।’

তবে, আরেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দেশ পাবলিকেশন্সের অচিন্ত্য চয়ন বলেন, আগের পরিস্থিতির থেকে বর্তমান পরিস্থিতি খানিকটা বদলেছে। এখন বইমেলার পরেও বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে বই। মেলার রেশ থেকে যাচ্ছে মার্চ-এপ্রিল মাসেও। নতুন নতুন বইও ছাপানো হচ্ছে এই সময়ে।
মুহাম্মদ জাফর ইকবালের একটি কথার সূত্র টেনে তিনি বলেন: তিনি বলেছিলেন প্রিন্ট উঠে যাবে ধীরে ধরে, সব অনলাইন কেন্দ্রিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমার সেটা মনে হয় না। বইয়ের আবেদন পাঠকের কাছে সবসময়ই থাকবে। তবে বই আরো বেশি নজর দিতে হবে বইয়ের মার্কেটিংয়ের উপর। পাঠক কিন্তু বইয়ের কাছে আসতে চায় না, বইকেই আরো বেশি বেশি পাঠকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তাহলে ১০ জন বই দেখলেও একজন অন্তত বই কেনায় আগ্রহী হবে। মার্কেটিং পলিসিটা আরো বেশি ভালো করতে পারলেই সম্ভব হবে দেশে বই আরো বেশি জনপ্রিয় করে তোলা।







