সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সবারই মুখে মুখে বিদেশী যে দেশটির নাম রয়েছে তা হলো তুরস্ক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিস্থিতি চলছে তা নিয়ে অনেক আগেই একটি ব্লগ লিখেছিলেন ব্লগার আরিফ জেবতিক।
সাম্প্রতিক সময়ে আবারো প্রাসঙ্গিক বলে পুনরায় নিজের লেখা ব্লগটি ফেসবুকে শেয়ার করেন তিনি। ‘ফ্যাসিবাদি তুরস্ক তোমার এম্বেসি গোটাও’ শিরোনামের সেই ব্লগে তুরস্কের নানান দিক উঠে আসে।
লেখাটি তিনি শুরু করেন এভাবে, একটা সত্যি কাহিনী দিয়ে শুরু করি। ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ সার্কেল অফিসার (বর্তমান টিএনও সমান থানা নির্বাহী পদাধিকারী) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ছুটি নিয়েছেন, সিলেটে নিজের বাড়িতে ফিরবেন কয়েকদিনের জন্য। পরেরদিন তিনি বাড়ি ফিরবেন, কারণ তার ছেলের জন্ম হয়েছে বলে টেলিগ্রাম এসেছে, ছেলের মুখ দেখতে যাবেন। গভীর আনন্দ তার মনে। যথারীতি ট্রেনে করে রওনা হয়েছেন পরদিন দুপুরে। হঠাৎ এক গ্রামের পাশে আটকে গেল ট্রেন। খবর নিয়ে জানা গেল পাকিস্তানী মিলিটারীরা এই ট্রেন আটকে দিয়েছে। ট্রেন চেকিং হবে।
ট্রেনের কামরায় স্বাভাবিকভাবেই সবাই চিন্তাযুক্ত। তবে হঠাৎ দেখা গেল একপাশের দুই কিশোর থরথর করে কাঁপছে। সার্কেল অফিসার বললেন, ‘তোমাদের জন্য ট্রেন আটকেছে, তাই না?’
ছেলে দুটো ঢোক গিলল। একজন বিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমাদের কাছে এই এলাকার ম্যাপ আছে, সবগুলো সরকারি অফিস আর আর্মিদের গতিবিধির লিস্ট আছে। এটা ইন্ডিয়া যাওয়া দরকার। কিন্তু মনে হয় খবর ফাঁস হয়ে গেছে।’
সার্কেল অফিসার বললেন, ‘আমার কাছে কাগজগুলো দিয়ে দাও। আমি সরকারি অফিসার, আমাকে হয়তো চেক করবে না।’
একটি ছেলে বলল, ‘যদি ধরা পড়েন, তাহলে মেরে ফেলবে।’
সার্কেল অফিসার আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, ‘হয়তো। তবে তোমাদের বয়স অনেক কম, আমার চাইতে তোমাদের বেঁচে থাকা বেশি দরকার। এই এলাকার অপারেশন করতে হলে থানা অফিসের অমুক অমুক অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো। আমরা সবাই তোমাদের হেল্প করছি। আমার বাড়ি সিলেটের বারোখলা গ্রামে, সিলেট রেলস্টেশন থেকে নেমে পায়ে হাঁটা দূরত্ব। যদি মরে যাই, তাহলে দেশ স্বাধীন হলে এই খেলনাগুলো তোমরা আমার বাড়িতে দিয়ে আসবা, এই কথা দাও।’
এক কিশোর বলে, ‘দেশ কি স্বাধীন হবে?’
সার্কেল অফিসার গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘অবশ্যই দেশ স্বাধীন হবে। বড়জোর দুইবছর লাগবে, কিন্তু অবশ্যই দেশ স্বাধীন হবে।’ কিশোর দুইজন খেলনাগুলো নেয়, আর কাগজগুলো সার্কেল অফিসারের কাছে দেয়।
প্রিয় পাঠক, এই সার্কেল অফিসার সেদিন প্রথম ধাক্কায় বেঁচে গিয়েছিলেন। পাকি আর্মিরা তার সরকারি পরিচয়পত্র দেখার পরে তাকে চেক করেনি। কিন্তু সঙ্গে থাকা রাজাকাররা পরের দফায় তাকে চেক করে। তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
তারপর…..?
৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রেনে থাকা সেই কিশোর মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট শহরের দক্ষিণ সুরমার বারোখলা গ্রামে আবদুল্লাহর না দেখা সন্তানের কাছে খেলনাগুলো পৌঁছে দিয়েছিল। মোহাম্মদ আবদুল্লাহর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি কোনোদিন।
এরপরে তুরস্কের কথা টেনে সাংবাদিক আরিফ জেবতিক তার ব্লগে লিখেন, তুর্কি সরকার আমাদের যুদ্ধাপরাধী এসব রাজাকারদের বিচার বন্ধের ষড়যন্ত্র করছে। তাদের প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখেছে। তাদের মৌলবাদী সংগঠনগুলোর পান্ডারা অন এরাইভাল ভিসার সুযোগ নিয়ে এখানে এসেছে, স্থানীয় তুর্কি অ্যাম্বাসি এদেরকে নিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধের সব ষড়যন্ত্রে শামিল হয়েছে।
আমার কাছে তুর্কির ফ্যাসিবাদিতার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। আমি এই লেখায় সেই উদাহরণগুলো টেনে আনতে পারতাম। কিন্তু সেটার কোনো প্রয়োজন নেই।
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে সেই সময়েই তিনি তার ব্লগে লিখেছিলেন, আমি বাংলাদেশের একজন জন্মসূত্রের নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, এই ফ্যাসিবাদী তুর্কিদের সঙ্গে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হোক। ইসরায়েলের সঙ্গে যদি সম্পর্ক বন্ধ করে আমাদের কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে এই যুদ্ধাপরাধী তুর্কিদের সঙ্গে, যারা আমাদের বিষয়ে অনৈতিকভাবে নাক গলাচ্ছে, তাদের ব্যাপারে ছাড় দেব কেন?
এই দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি শহীদের রক্তস্নাত।
এখানে মাটির নিচে সন্তানরা শুয়ে আছেন বলে এক মা আজ ৪০ বছর ধরে জুতা পায়ে হাঁটেন না। এই দেশে সন্তান শেষ বেলায় ভাত খেতে পারেনি বলে এক মা আমৃত্যু আর ভাত খাননি, সন্তান মাটিতে শুয়েছিল বলে তিনিও মাটিতে শুয়ে ছিলেন।
এই দেশে এক সার্কেল অফিসার নিজের সন্তানের মুখ দেখার চাইতে দেশের জন্য শহীদ হয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে হাসিমুখে ট্রেন থেকে নেমে গিয়েছিলেন।
এই দেশে তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিকে জাস্টিফায়েড করে আমার লেখার কিছুই নাই।
এইসব ফ্যাসিবাদী ইতর দেশকে আমার পবিত্র ভূমি থেকে লাথি মেরে খেদিয়ে দেয়া হোক, কোনো যুক্তি দেখানোর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।








