ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হচ্ছে। অথচ রামুর বৌদ্ধ মন্দির, নাসিরনগরের হিন্দু সম্প্রদায় এবং গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর বিচার হচ্ছে না। এসব হামলার পর হাজার হাজার ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামির নামে মামলা করে গ্রেফতার-বাণিজ্যে ফায়দা লুটছে পুলিশ প্রশাসন এবং নিপীড়িত মানুষগুলোর জায়গা দখল করছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। এজন্যই ধারাবাহিকভাবে ঘটছে একেরপর এক সাম্প্রদায়িক হামলা। যেগুলোর সর্বশেষ সংযোজন রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামের হিন্দুদের বাড়িতে হামলা।
সর্বশেষ এই সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে আজ শনিবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশে এসব কথা বলেন বক্তারা। বক্তাদের অনেকেই একেরপর এক এসব হামলার পর সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন।
উল্টো সরকার ও পুলিশ-স্থানীয় প্রশাসন এসব সাম্প্রদায়িক হামলাকে সুযোগ হিসেবে ধরে নিয়েছে বলে তীব্র কটাক্ষ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
তিনি বলেন,‘এই সাম্প্রদায়িক হামলা দেশের আইনে ফৌজদারী অপরাধ। এই ফৌজদারী অপরাধের পর পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে জানতে চাই। এক হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে জানলাম। কেমন এই মামলা? নাসিরনগরে মামলার কপি সংগ্রহ করে সরেজমিনে গিয়ে জানলাম ওই মামলায় এরকম অজ্ঞাতনামাদের একজন ঘটনার আট বছর আগেই মারা গেছেন!’
বৌদ্ধ-হিন্দু-সাঁওতালদের ওপর নিপীড়নের বিচারের চেয়ে বরং এসব ঘটনাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটতেই সময় চলে যায় বলে মনে করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময়।
তিনি বলেন,‘রামুর ঘটনায় ৭ টি মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছিলো, অথচ চার্জশিট দেয়া হয় মাত্র ৩৮৪ জনের বিরুদ্ধে। এই যে ১ হাজার অজ্ঞাতনামার বিরুদ্ধে মামলা হলো রংপুরে সেখানে কারা আসামি, কী বাণিজ্য চলবে সেটা এখন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।’
লেখক-শিল্পী পেশাজীবীদের এই প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়ে লেখক ও প্রকাশক রবীন আহসান সামাজিক মাধ্যমের পোস্টকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক হামলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণ খুঁজে বের করার দাবি জানান।
আসছে নির্বাচন,এর আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ নানা অপতৎপরতা চলছে আশঙ্কা করে তিনি বলেন,‘ সত্যিই যদি কেউ ফেসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত দিয়ে কিছু পোস্ট করে তাহলে দেশের আইনেই তদন্ত-গ্রেফতার করার আগেই সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে বর্বর হামলা চালানো হচ্ছে।’
একের পর সাম্প্রদায়িক হামলার পেছনে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে সরে আসাকে মূল কারণ মনে করেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী।
অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের সরকার ধর্মান্ধদের বিশাল জনগোষ্ঠীর মন যোগাতে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে আপোষ করছে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন,‘ড.কুদরত-ই-খুদার বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হয়নি। একই দেশে তিন ধরণের চিন্তার প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে আবার পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতি দাবি মেনে সাম্প্রদায়িক বীজ বোনা হচ্ছে। মানবিক বোধের বদলে চরম অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। দেশ মারাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে দেখেও কিছু দেখছে না সরকার।’
বিকাল সাড়ে চারটা থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ঐক্য ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক সরকার আল ইমরান, ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী লাকী আক্তার প্রমুখ।
উল্লেখ্য,গত শুক্রবার রংপুর সদর উপজেলার খলেয়া ইউনিয়নের ঠাকুরপাড়া গ্রামে শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ৮-১০ হাজার লোক হিন্দুবাড়িগুলোতে হামলা চালায়। ভাঙচুর এবং লুটপাট ছাড়াও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় প্রায় অর্ধশতাধিক ঘর-বাড়ি।








