বেলজিয়ামের শীর্ষ তারকা রোমেলু লুকাকু, যার শরীরে বইছে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের রক্ত। মা-বাবা দুজনই আফ্রিকান দেশটির মানুষ। বেলজিয়ামের আরেক তারকা মুসা ডেম্বেলের বাবা আফ্রিকার দেশ মালির মানুষ। আর ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী মারোয়ান ফেলাইনি মা-বাবা মরক্কোর।
এই রাস্তায় ফ্রান্স দলের হালহকিকত তো আরও এগিয়ে। সুপারস্টারের তকমা পাওয়া পল পগবার মা-বাবা গিনির। ফরাসিদের মাঝমাঠের প্রাণ এনগোলো কন্তের মা-বাবা মালির। বিশ্বকাপের সেরা তরুণ খেলোয়াড় হওয়া কাইলিয়ান এমবাপের বাবা ক্যামেরুন ও মা আলজেরিয়ার নাগরিক। ব্লেইস মাতুইদির মা-বাবা অ্যাঙ্গোলার, আর ডিফেন্সের অন্যতম ভরসা স্যামুয়েল উমতিতির জন্ম ক্যামেরুনে।
এই খেলোয়াড়দের সবাই তাদের মা-বাবার দেশের হয়ে খেলতে পারতেন। কিন্তু এটা কখনোই করেননি। বরং তারা সবাই ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামে হয়েই খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তাদের দিকে তাকিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর অনেকেই হয়ত এখন ভাবছেন, ‘কী হতে পারতো’ -যদি তারা চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং তৃতীয় হওয়া বেলজিয়ামের মতো বিশ্বকাপে খেলতে পারতো। তারা হয়ত এটাই ভাবছেন যে, এসব খেলোয়াড়রা খেললে হয়ত ফ্রান্সের মতো চ্যাম্পিয়ন বা বেলজিয়ামের মতো তৃতীয় হতে পারতো আফ্রিকারই কোনো দেশ।
বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। রাশিয়া অনেক দেশের চেয়ে বেশি শিক্ষা দিয়েছে আফ্রিকাকেই। তাই ইউরোপের কাছে ফুটবল প্রতিভা হারানোর কারণ খুঁজতে বলছেন হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আফ্রিকান অধ্যাপক চুকু অনউইমুচিলি।
ফ্রান্সের ২৩ জনের দলে ১৫জনেরই শিকড় আফ্রিকার। বেলজিয়ামের ২৩ জনের ৯ জন। শুধু এই দুটি দেশই নয়, সেমিফাইনাল খেলা ইংল্যান্ড দলেও ছিল আফ্রিকান প্রতিনিধিত্ব। এই যেমন ডেলে আলি (নাইজেরিয়া) ও দানি ওয়েলব্যাক (ঘানা)।

গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ ফিফা বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। ওই দলের অন্তত ছয়জন খেলোয়াড় ছিলেন যারা শুধু নাইজেরিয়ার হয়েই খেলতে পারতেন।
এটা অবশ্য নতুন বিষয় না। আফ্রিকার ফুটবলার হারানোর গল্পটা অর্ধ শতকেরও বেশি সময় পেছনের। ৮০ বছর আগে, ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের রক্ষণ আগলেছেন সেনেগালের ডিফেন্ডার রাউল ডায়গনে। ফরাসি জার্সিতে ১৮ ম্যাচ খেলা রাউল ডায়গনে পরে স্বাধীন সেনেগালের প্রথম কোচ হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে তার অধীনেই প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে ফ্রান্সকে হারায় সেনেগাল। যার দরুন ন্যাশনাল হিরো হয়ে গিয়েছিলেন রাউল।
কয়েক দশক ধরেই আফ্রিকান সংযোগের অন্যান্য খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে তাদের পদচিহ্ন তৈরি করেছেন। যেমন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জার্সিতে খেলে সুপারস্টার হয়ে যান মরক্কোর জুস্ত ফোঁতেন। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে একই পথে হেঁটেছেন পর্তুগালের হয়ে খেলা মোজাম্বিকের ইউসেবিও। আর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ফ্রান্স দলের প্রধান নিউক্লিয়াস তো ছিলেন আলজেরিয়ান জিনেদিন জিদানই। এ রকম আরও অনেকেই আছেন।
এখন প্রশ্ন, আফ্রিকান দেশগুলো কি এই চক্র ভাঙতে পারবে? বিশ্বকাপে কি বড় কিছু অর্জনের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করতে পারবে তারা?
অধ্যাপক চুকু বলছেন, পরিবর্তনের কাজ ইতিমধ্যেই চলছে। কিন্তু আরও অনেক কিছু করতে হবে।
এই পথে অনেক বাধা দেখছেন চুকু। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা প্রশাসনিক ও পরিচালনায়। তিনি বলছেন, প্রশাসক এবং পরিচালকরা এটাই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন না যে, কেনো আফ্রিকান খেলোয়াড়রা তাদের জন্মভূমির বদলে অন্যান্য দেশকে বেছে নিচ্ছে।
চুকুর মতে, এই জ্ঞানের ফাঁক পূরণ না করা পর্যন্ত, এই প্রবণতা (বিদেশমুখী) বিপরীতমুখী করা অসম্ভব হতে পারে।
অনেকে আর্থিক বিষয়টাকে বড় করে দেখলেও চুকু সে পথে হাঁটেননি। আর্থিক বিষয়টাকে স্বীকার করেও বরং অভিবাসী ফুটবলারদের উপেক্ষা করাটাকে একটা বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

কয়েক দশক আগ পর্যন্ত খেলোয়াড়দের যারা মহাদেশের বাইরে পেশাদার ফুটবল খেলতেন, আফ্রিকান দেশগুলো সেই প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী খেলোয়াড়দের উপেক্ষা করেছে। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও দলগুলো খেলোয়াড় নিয়েছে শুধু দেশে থাকাদের ভেতরে থেকেই।
তবে চুকু বলছেন, এই অবস্থারও পরিবর্তন হচ্ছে। দেশগুলো সক্রিয়ভাবে প্রথম (আফ্রিকান অভিবাসীদের) এবং দ্বিতীয় (আফ্রিকান অভিবাসীদের সন্তান) প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সন্ধান করতে শুরু করেছে। খেলোয়াড় নেয়ার ক্ষেত্রে এখন তৃতীয় প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উপর মনোনিবেশ করা হয়েছে, যারা একই সঙ্গে যোগ্যও।
উদাহরণ হিসেবে চুকু বলেছেন ইংল্যান্ডের রোস বার্কলের কথা। যার দাদা-দাদী নাইজেরিয়ান। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হয়ত এক বা কয়েক বছর লেগে যেতে পারে বলেও তার ধারণা।
ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খেলোয়াড়দের নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতাও দেখছেন চুকু। যার বড় উদাহরণ মরক্কো। বিশ্বকাপ খেলা ২৩ জনের মরক্কো দলে ১৭ জনই ছিলেন যারা দেশের বাইরে জন্মেছেন।
বিশ্বকাপ খেলা নাইজেরিয়া দলেও এমন ঘটনা আছে। সুপার ঈগলদের হয়ে এবার বিশ্বকাপ খেলেছেন এমন ছয়জন ছিলেন যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলতে পারতেন। এছাড়া মরক্কো, সেনেগাল ও তিউনিসিয়া দলে ২৫ জন খেলোয়াড় ছিলেন যারা এবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সে জন্মেছেন।
ইউরোপীয় বা আফ্রিকান দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য এই খেলোয়াড়দের দলে নেয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা এখন অনেক বেশি বেগবান হয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই তাদের দলে পেতে চাই। আফ্রিকান জাতীয় দলের কোচরা- বিশেষ করে ইউরোপীয় কোচরা বিদেশ থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিভাধর খেলোয়াড়দের দলে নিতে বেশি পছন্দ করছেন।
তবে চুকু বলছেন, এই সব (অভিবাসী) কিছু খেলোয়াড় স্থানান্তরিত হওয়ার পরও আফ্রিকান দলগুলোর বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে তাদের কী প্রভাব পড়বে তা বলা কঠিন। তার মতে, এর একটি বড় কারণ হতে পারে, আফ্রিকান দেশগুলো দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী খেলোয়াড়দের শীর্ষ পাইপলাইন নিজেদের দলে টানতে সক্ষম হয়নি।

সমস্যা আরও আছে। শুধু দেশগুলো চাইলেই তো হবে না। ডাকে সাড়া দিতে হবে খেলোয়াড়দেরও। অনেক সময় তারা জন্মসূত্রের দেশে খেলতে না চাওয়ায় অভিবাসী খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়তার ঘাটতিতে পড়েন।
বেশ কিছু ক্ষেত্রে, ইউরোপীয় দেশগুলোর দ্বারা উপেক্ষিত খেলোয়াড়রা সুযোগের আশায় আফ্রিকান দেশের প্রতিনিধিত্বের বিকল্প সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অনেক সময় কাটিয়ে দেন। যেমন, মস্কোর ফাইনালে এনগোলো কন্তের পরিবর্তে খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা স্টিভেন এন’জোনজি। বাবা কঙ্গোর মানুষ হওয়ায় সেদেশের হয়ে খেলতে পারতেন তিনি। একাধিকবার কঙ্গো থেকে ডাকা হলেও সাড়া দেননি। বরং ফ্রান্স দলে সুযোগের আশায় বসে থাকেন। অবশেষে ২৮ বছর বয়সে ফরাসি জার্সিতে অভিষেক হয় তারা। এন’জোনজি এই সিদ্ধান্ত কঙ্গোতে তাকে খুবই অজনপ্রিয়ি করে তোলে।
চুকুর মতে, আলোচনার একটি বড় বিষয় হতে হবে কেনো শীর্ষ পাইপলাইনের খেলোয়াড়রা এখনো আফ্রিকান দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে না। পরিস্থিতি সংশোধন করে তা কাজ লাগানোর এখনই সেরা সময় বলে আফ্রিকানদের বলছেন চুকু। এই ধরনের প্রতিভা টানার সফলতার উপর নির্ভর করছে আফ্রিকার বিশ্বকাপ জয় করার সম্ভাবনা।








