যে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দরিদ্র, দারিদ্রসীমা নিয়ে নানা ধরনের পরিমাপক ও সংখ্যাতত্ত্বের অঙ্ক কষেও সংখ্যাটির বিশেষ হ্রাস-বৃদ্ধি হয়নি, যে দেশে আয়কর দিতে পারেন এমন নাগরিকের সংখ্যা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ মাত্র, যে দেশের কোনও না কোনও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনা দফতর পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিভাগ দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের দায়ে অভিযুক্ত- তেমন একটি দেশ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ কোথায়? বরং দেশটা চলছে কী করে, এই ভাবনাই এক বিস্ময় হয়ে ওঠে!
বিস্ময়ের আরও কারণ, আমাদের এই ছোট্ট দেশটির মধ্যে মিশে থাকা অসংখ্য ছোট ছোট দেশ। রাজনৈতিক বিরোধের দেশ, জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দেশ, জাতপাতের দেশ, ধর্মভিত্তিক দেশ, জঙ্গিবাদের দেশ, ঐদ্ধত্য, দালালি আর দলাদলির দেশ এবং লিঙ্গ ভিত্তিক বিভাজনের দেশ। এ দেশে প্রতিদিন যত মেয়ে ধর্ষিত হয়, যত জন পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়, যত মেয়ে প্রবল অপুষ্টিতে ভোগে স্রেফ এই মানসিকতার কারণে যে সংসারে নারীর স্বাস্থ্যভাবনা অশ্লীল ও স্বার্থপরতা-এমন পুরুষতান্ত্রিক বাংলাদেশে নারীরা সামনে এগোবে, দেশের জন্য সুনাম ও সম্মান বয়ে আনবে-এমন ভাবনা অলীক নয় কী?
কিন্তু এ ভাবে কোনও সম্ভাবনা এবং শক্তিকে চিরকাল দমন করে রাখা যায় না। বহু অসাম্য এবং অর্থহীন সংস্কারে আচ্ছন্ন বাংলাদেশ থেকেও বিশ্বমঞ্চের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে মেয়েরা। তার অনন্য নজির গড়েছেন আমাদের অনূর্ধ্ব ১৬ নারী ফুটবল দলের সদস্যরা। ফুটবলে বাংলাদেশের এশীয় পর্যায়ে সেরা সাফল্য এসেছে এই সোনার মেয়েদের মাধ্যমে। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ উইমেন্স ফুটবলে ‘সি’ গ্রুপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূলপর্বে খেলার টিকিট পেয়েছে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা দল। গ্রুপের শেষ ম্যাচে তারা ৪-০ গোলে হারিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে। এর আগে তারা ৪-২ গোলে হারিয়েছে শক্তিশালী তাইপেকে।
মেয়েদের ক্ষুদে ফুটবলে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং নেই। সিনিয়রদের র্যাংকিংয়ের হিসাবটাই নামিয়ে আনা হয়। তাতে বাংলাদেশের র্যাংকিং ১২১ এবং তাইপের র্যাংকিং ৩৮। পার্থক্যটা অনেক বেশি। এমন শক্তিশালী দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েদের না পারারই কথা। কারণটা তো খুব সহজ। অন্যান্য দেশ যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বড় আসরে এসেছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা তার ছিঁটে-ফোঁটাও পায়নি। এতো সমস্যার মধ্যেও নিজেদের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে মেয়েরা তাদের স্যালুট না জানালে নিজেকেই অপমান করা হয়!
বাংলাদেশের মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়েছে সানজিদা, কৃষ্ণা, মারজিয়া, মারিয়া, নারগিস, শিউলী, মাহমুদাদের খেলা দেখে। তারা যে খেলা দেখিয়েছেন, তা অবিশ্বাস্য!
প্রত্যেকটি ম্যাচে জয়লাভ করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০১৭ সালে চীনে অনুষ্ঠেয় মূলপর্বে বাংলাদেশের কিশোরীরা খেলবে জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে। আমরা আশা করব, সেখানেও তারা দেশের জন্য সম্মান ও সাফল্য বয়ে আনবে।
এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ উইমেন্স ফুটবলে ‘সি’ গ্রুপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে এই কিশোরীরা বাংলাদেশের মুখউজ্জ্বল করেছে। এরা প্রত্যেকেই আসলে যে শিরোপাটি জিতেছেন তার নাম আত্মসম্মান। এরা প্রত্যেকে দেশকে যা দিয়েছেন, তা সাফল্যের গৌরব মাত্র নয়, ফুটবল আসরে বাংলাদেশের নামটি যে তলানিতে পড়ে থাকত, সেখান থেকে আস্তে আস্তে দেশের নামটি উজ্জ্বল আলোর তলায় নিয়ে আসাই নয়, এরা দেখালেন, এমনকি খেলার জগতেও ‘মেয়েরাও পারে’ নয়, মেয়েরাই পারে, পারছে!
দেশের জন্য এই অনন্য গৌরব বয়ে আনা এই নারী ফুটবল দলের সদস্যদের এই পথ চলাটা কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। অন্তত আমাদের মতো পশ্চাৎপদ, মৌলবাদী ধ্যানধারণাপুষ্ট বাংলাদেশে। একটি মেয়ে এবং তার শরীর এমনই নিরাপত্তার বলয়ে পরিবেষ্টিত, যা শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীলতার নামান্তর। জার্সি পড়ে মেয়েরা খেলবে, দৌড়াবে, শরীর দোল খাবে, অসংখ্য লোলুপ দৃষ্টি তাকিয়ে দেখবে-অভিভাবকরা তা মানবেন কীভাবে? পুরুষ কোচও একটা বিরাট সমস্যা। যদি গায়ে হাত দেয়! কানে ফিসফিসিয়ে মন্ত্রটি পড়ে দেওয়ার জন্য বহু খালা-ফুপু মজুত থাকে। কী হবে খেলে? সেই তো বিয়ে করে বাচ্চা মানুষ করতে হবে! যেন মরতে হবে বলে কেউ আর বেঁচে থাকার জন্য ভাত খায় না! বেশি খেলাধুলা করলে মেয়েদের স্বাভাবিক শ্রী যদি নষ্ট হয়ে যায়!
মেয়ে বলেই ‘হার্ডল’ এসেছে পদে পদে। ঘরে, বাইরে, জীবনের সর্বত্র। সমাজ, সংস্কার, পিছুটান অনবরত সামনে এগিয়ে চলার গতির পায়ে লাগাম পরানোর চেষ্টা করছে। থমকে দিতে চেয়েছে এগিয়ে চলার গতি। কিন্তু অদম্য জেদ, অফুরান উৎসাহ-উদ্দীপনার কাছে তা হার মেনেছে বার বার। ‘মুখোশ’-এর যাবতীয় চক্রান্ত ভেস্তে দিয়ে মেয়েরাই হয়ে উঠছেন ‘মুখ’। আশা করি ভবিষ্যতও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
আমাদের দেশে সম্পন্ন ‘উদারচিত্ত’ পরিবারগুলো এখন সকালে একটি সুন্দর চিত্র রচনা করে। ছুটির সকাল। বাবা ছেলেকে নিয়ে চলেছেন ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা টেনিসে। মা মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছেন নাচ বা গানের ক্লাসে। আশা করা যেতে পারে, এবার চিত্র সুন্দরতর হবে। অভিভাবকরা সানজিদা, কৃষ্ণা, মারজিয়া, মারিয়া, নারগিস, শিউলী, মাহমুদাদের অভিভাবকদের মতো হবেন। ক্রীড়াজগৎ, স্বাভাবিক জীবন এবং মেয়েজন্মের সংস্কারে বিরোধ ঘুচবে এ বার। এই নারীরা বাংলাদেশের সমাজের একটা অংশের মধ্যে এখনও লুকিয়ে থাকা নারী-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারের মস্ত বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে৷ ওদের দেখিয়ে বলা যেতে পারে, সযত্নে লালন করলে, যথার্থ ও যথেষ্ট সুযোগ করে দিতে পারলে আপনার মেয়েও একদিন এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে, যা শুধু আপনাদের পরিবার নয়, সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পারে৷ শুধু ছেলেরাই সব পারে, মেয়েরা নয়-এইরকম দীর্ঘদিন লালিত একটা ভ্রান্ত ধারণাকে এবার সকলের চোখের সামনে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত এই ফুটবল দলের সোনার কন্যারা৷ ওরাই নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশের নারীর যথার্থ বিজ্ঞাপন হয়ে উঠতে পারে-ক্রীড়া জগতের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বত্র, সর্ব বিষয়ে৷ যে দৃঢ়তা নিয়ে ওরা লড়াই করেছে, তা তো প্রয়োজন জীবনের সর্বক্ষেত্রেই৷
ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের এই ভূমিকা দেখে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে- তা হলো, আমরা সচরাচর তেমন কোনও ঘটনা প্রসঙ্গে যে বলে থাকি-‘মেয়েরাও পারে’-সেই কথাটা পাল্টে এবার থেকে বলা শুরু হোক, ‘হ্যাঁ, মেয়েরাই পারে’৷ এই কথাটা মুখে মুখে চালু না হওয়া পর্যন্ত বোধ হয় কন্যাসন্তানের গুরুত্বটা সমাজের সর্বস্তরে সকলের মর্মে সঠিকভাবে পৌঁছবে না৷ আর এই গুরুত্বটা যথাযথভাবে না বোঝা বা বোঝানো পর্যন্ত দেশের সকল কন্যাসন্তানকে নিরাপদে রক্ষা করাও সম্ভব হবে না৷
পরিশেষে আবারও স্যালুট জানাই বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলকে! ছেলেরা যা পারেনি, তা তো ওরাই করে দেখিয়েছে! এখন ওরাই হোক বাংলাদেশের নারীর সেরা বিজ্ঞাপন৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








