ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়। আনোয়ারুল ইসলামের মুখ দেখে তা অবশ্য বোঝার উপায় নেই। কথায় কথায় গালভরা হাসি। রানার-চ্যানেল আই বিচ ফুটবল দেখতে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে তার অপেক্ষা শুরু হয়। আগেরবারও নাকি এসেছিল।
ফুটবল দেখলেই আনোয়ারুলের খেলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তাকে সেই ইচ্ছে পূরণের ক্ষমতা দেননি। কিশোর আনোয়ারুল তাই চোখের দেখায় মনের সাধ মেটায়।

মা আসমাউল বেগমের সঙ্গে রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির কালা খোন্দকার পাড়ায় আনোয়ারুলের বাস। বাবা মোঃ হোছন তাদের সঙ্গে থাকে না। আনোয়ারুলের অভিযোগ তার বাবা তাদের ‘নেয় না’।
পকেটে একটি পরিচয়পত্র। তাতে লেখা ২০০১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আনোয়ারুলের জন্ম। যা লেখা নেই তা হল, পৃথিবীর মাটিতে আনোয়ারুলের কখনো স্বাভাবিকভাবে পা পড়েনি। বাড়ির পাশের লোকেরা নাকি ছোটবেলায় ডাক্তার দেখাতে বলেছিল। কিন্তু মায়ের সে সাধ্য ছিল না। এখনো নেই। আনোয়ারুলের কথায় বোঝা যায়, আদৌ সে সাধ্য কোনোদিন তার মায়ের হবে না।
‘আব্বা তো নেয় না। মানুষে ডাক্তার দেখাতে কয়। আমাদের তো টাকা নেই। আমি ভিক্ষা করি,’ আনোয়ারুল তার জীবনের সব থেকে কঠিন কথাটি হাসতে হাসতে বলতে থাকে, ‘আমাগো পাড়ার মানুষের সঙ্গে খেলা দেখতে আইছি। ফুটবল আমার অনেক ভালো লাগে।’
সিগাল পয়েন্ট আনোয়ারুলের এমনিতেই বেশ পরিচিত। আশপাশের সৈকতেই সে ভিক্ষা করে। তবে এখানে তার খুব একটা আসা হয় না। ভিক্ষার জন্য তার অঞ্চল এটি নয়। সে এসেছে শুধু খেলা দেখার জন্য।
বাংলাদেশের ফুটবল এবং কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে আরও জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও ওয়াফ (ফুটবলের জন্য আমরা)-এর সহযোগিতায় চ্যানেল আই ছয় বছর ধরে আয়োজন করছে বিচ ফুটবল। সিগাল পয়েন্টেই এটি হয়। এবারের আসর শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার। শেষ হবে শনিবার।

আনোয়ারুলের সঙ্গে যখন দেখা হয়, তখন মাঠ খালি। মাথার উপর কড়া রোদ। একটু সামনেই শান্ত সমুদ্র থেকে-থেকে অশান্ত হয়ে উঠছে। বালুর ভেতর প্রস্তুত করা মাঠ খেলোয়াড়দের অপেক্ষায়।
-কখনো ফুটবল খেলেছো?
এই প্রথম আনোয়ারুলের মুখ কালো হয়ে যায়, ‘খেলি। আমারে কেউ নিতে চায় না।’
কোনো ভালো খেলোয়াড়ের নাম জানো?
আনোয়ারুল ‘খেলোয়াড়’ শব্দটিই বুঝে উঠতে পারে না। বাংলাদেশের কোনো ফুটবলারের নাম তার জানার কথা নয়। মেসি কিংবা রোনালদোকেও সে চেনে না। আনোয়ারুল আরো অনেক কিছু চেনে না। এই সৈকত আর কালা খোন্দকার পাড়ার বাইরে তার কখনো যাওয়া হয়নি।
হঠাৎ মাঠে কেউ একজন ফুটবল নিয়ে আসে। আনোয়ারুল এবার সরব হয়ে ওঠে। ক্র্যাচে ভর দিয়ে সেদিকে হাঁটতে থাকে। গোলাকার ওই ফুটবলটি তার অনেক পরিচিত। যাকে দেখতে সে এই সিগাল পয়েন্টে এসেছে।
ছবি: ওবায়দুল হক তুহিন








