নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে লোপাট অর্থের ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার গায়েব হয়ে চলে যায় ফিলিপিন্সের ক্যাসিনোগুলোতে। এর প্রেক্ষিতে ফিলিপিন্স সরকারের গঠিত অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল তার তদন্ত শুরু করে। চুরি যাওয়া ওই অর্থ এবং এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে ফিলিপিন্সের গণমাধ্যম ‘র্যাপলার’ কিছু বিষয় তুলে ধরেছে।
তদন্তের ৭ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও রিজার্ভ চুরির এই বিশাল ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের সনাক্ত করা যায়নি, জানা যায়নি চুরি যাওয়া অর্থের বর্তমান অবস্থান।
১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) তার কাজ শুরু করার পর থেকে অনেক কিছু ঘটে গেছে এই রিজার্ভ চুরি নিয়ে: প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান ও পরে দুই ডেপুটি পদত্যাগ করলেন, মামলা দায়ের হলো, ফিলিপিন্সে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত দেশটির রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেঞ্জো ট্যান ছুটিতে চলে গেলেন এবং চুরি যাওয়া কিছু অর্থ এএমএলসির কাছে ফেরত এসেছে।
একে ফিলিপিন্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল জন গোমেজ ‘সঠিক দিকে এগিয়ে চলা’ বলে উল্লেখ করেন। বাকি অর্থ উদ্ধারে ফিলিপিন্স সরকারকে সহায়তা করতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিরা সেখানে যাবেন বলেও জানানো হয়েছে।
আগামী ৫ এপ্রিল ফিলিপাইন সিনেটে এ নিয়ে চতুর্থ শুনানি বসতে যাচ্ছে। ‘র্যাপলার’ যেসব বিষয় তুলে ধরেছে তা নিম্নরুপ:
১. সবাই একে অপরকে চেনে
রিজার্ভ চুরির ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপিন্সে পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের সবাই-ই একে অপরকে কোনো না কোনোভাবে চেনে। ফিলিপিন্সের আরসিবিসি. ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন, সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো, মাইদাস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং কয়েকজন ক্যাসিনো পরিচালকের নাম উঠে এসেছে তদন্তে।
সিনেটের শুনানিতে আটক ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ক্যাম সিন ‘কিম’ ওং জানান, তিনি ফিলরেমের ট্রেজারার মাইকেল বাতিস্তা, আরসিবিসি’র ট্যান, ব্যাংকটির জুপিটার শাখার বরখাস্ত ম্যানেজার মায়া স্যান্তোস-দেগুইতো, চীনা-ফিলিপিনো ব্যবসায়ী উইলিয়াম গো এবং গাড়ি বিক্রেতা জেসন গোকে বিভিন্নভাবে চেনেন।
২. চুরি যাওয়া অর্থ আরসিবিসি অফিসে যায় দু’বার
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চুরি হয়ে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার একবার না, পর পর দু’বার আরসিবিসি ব্যাংকে যায় লেনদেনের জন্য তারপরও ব্যাংকটি যাচাই বাছাই না করেই টাকা তোলা ও ফিলিপাইন পেসোতে রূপান্তরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো।
অর্থটি প্রথমে ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট কোডের (এমটি১০৩) মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলস ফারগো মেলন ব্যাংক, সিটিব্যাংক এবং ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক হয়ে আরসিবিসিতে ডলার রেমিটেন্স হিসেবে প্রবেশ করে। তবে সরাসরি জুপিটার শাখায় নয়, প্রথমে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সেটলমেন্ট ডিভিশন হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি জুপিটার শাখার হাতে গিয়েছিলো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
৫ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি এর ৬ কোটি ১০ লাখ পরিমাণ ভাগে ভাগে আরসিবিসি ট্রেজারি থেকে পেসোতে পরিণত করে ফিলরেমে নেয়া হয় বলে জানান সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট সালুদ বাতিস্তা। সুতরাং টাকাটা আবার আরসিবিসিতে ফেরত গিয়েছিলো। অথচ এর মাঝে ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক লেনদেন থামাতে সুইফট কোডের মাধ্যমে আরসিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও ব্যবস্থা নেয়নি আরসিবিসি।
৩. প্রায় ২ কোটি এখনো নিরুদ্দেশ
সিনেট শুনানিতে ওং দাবি করেন, জালিয়াতির ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রায় ৪ ভাগের এক ভাগের হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার সোলেয়ার এবং মাইদাস ক্যাসিনোতে গেলেও ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের হিসেব এখনো মিলছে না। সেগুলো এখনো ফিলরেমের কাছে আছে বলে দাবি করেন তিনি। অবশ্য ওংয়ের এই দাবি নাকচ করেছেন তদন্তকারীরা।
৪. লোপাট অর্থের কিছু এখনো ক্যাসিনোতেই
সোলেয়ারের অপারেটর ব্লুমবেরি রিসোর্টস করপোরেশনের আইনি প্রধান সিলভারিও বেনি ট্যান গত শুনানির সময় নিশ্চিত করেন, সোলেয়ারের গেমিং টেবিলে ১৩৬ কোটি পেসোর লেনদেন হয়েছে, যার বিরাট একটা অংশ এক প্রভাবশালী বিদেশী ক্যাসিনো ব্যবসায়ীর মাধ্যমে অপারেটর ডিং ঝিজের অ্যাকাউন্টে চলে যায়।
বেনি ট্যান জানান, সোলেয়ার গত ১০ মার্চ ডিংয়ের অ্যাকাউন্ট জব্দ করে। ওই অ্যাকাউন্টে মোট ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৯৬ হাজার পেসো বা ২৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার পাওয়া গেছে। উপযুক্ত কোর্ট অর্ডার পেলেই অর্থটি ফেরত দেয়া হবে বলে জানান ট্যান।
৫. অর্থের এক অংশ এএমএলসিতে ফেরত আসছে
মাইদাস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনোর এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ওং শেষ শুনানিতে নিশ্চিত করেন, তার কোম্পানি ইস্টার্ন হাওয়াই লেজার কোম্পানি লিমিটেড ১শ’ কোটি পেসো বা ২ কোটি ১৫ লাখ ৭৫ হাজার ডলার পায়। এর মধ্যে ৪৫ কোটি পেসো দিয়ে সহযোগী চীনা অপারেটর গাও’র দেনা শোধ করেন ওং। আর ৫৫ কোটি পেসো চলে যায় গেমিং টেবিলে। আরো ৫১ কোটি পেসো মাইদাসে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
তবে তার অধীনে থাকা নগদ ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার ৩১ মার্চ এএমএলসিকে ফেরত দেন ওং।
৬. ক্যাসিনো অপারেটররা জালিয়াতিতে সাহায্যকারী ছিলেন
ওং সিনেট প্যানেলকে জানান, ক্যাসিনো অপারেটর ডিং ঝিজে এবং গাও শুহুয়া ফিলিপাইন ক্যাসিনোগুলোতে জালিয়াতির টাকা সরিয়ে নেয়ার কাজে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মাধ্যমেই ফিলিপিন্সে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলো বলে জানান ওং।









