আইপিএলে মোস্তাফিজ নিয়মিত হলেও গত তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ দল তাকে ধারাবাহিকভাবে পায়নি। পাওয়া যায়নি ঘরোয়া ক্রিকেটের বেশিরভাগ আসরেও। যে সম্ভাবনা নিয়ে কাটার মাস্টারের আবির্ভাব, সেটি ধরে রাখতে পারছেন না চোটের কারণে। পেসাররা এমনিতেই ইনজুরি প্রবণ, তবে মোস্তাফিজ যতটা ভুগছেন তা চিন্তারই কারণ!
সদ্যগত আসরে মুম্বাইয়ের হয়ে খেলা ফিজ ফিরেছেন চোট নিয়ে। আইপিএলের চোটে খেলতে পারবেন না আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি সিরিজে। তাকে ছাড়াই মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ দল গেছে ভারতের দেরাদুনে। চোটের ধরন বলছে সুস্থ হতে মোস্তাফিজের সময় লাগবে তিন-চার সপ্তাহ।
প্রত্যাশিতভাবে সেরে না উঠলে শঙ্কায় পড়বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে খেলাও। জুনের শেষ সপ্তাহে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে সফরে যাবে বাংলাদেশ। সিরিজের শুরু টেস্ট দিয়ে। শুরু থেকে মোস্তাফিজ না খেলতে পারলে বড় ক্ষতিই হবে বাংলাদেশের জন্য। চোটে আছেন তাসকিনও। টেস্টে বিকল্প পেসার-সংকটে পড়তে হবে বাংলাদেশকে।
‘আশায় বুক বাধা’ বিসিবির প্রধান চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী অবশ্য বললেন, ‘বাংলাদেশের পরের সিরিজ ওয়েস্ট ইন্ডিজে। সেই সিরিজে মোস্তাফিজকে পাওয়ার জন্যই ওকে বোলিং থেকে বিরত রাখা হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করি, ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে কোনো সমস্যা হবে না।’
মোস্তাফিজ যেভাবে হাত ঘুরিয়ে দুর্লভ কাটার করেন, তাতে ইনজুরি প্রবণ হতেই পারেন। এ ব্যাপারটি অবশ্য এখন আর ‘স্বাভাবিক’ পর্যায়ে নেই। ইনজুরি লুকানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে ফিজের বিরুদ্ধে।
এক্স-রে রিপোর্ট দেখে বিসিবির চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী জানিয়েছেন, পায়ের বুড়ো আঙুলের পশম আবৃত অংশে চিড় ধরেছে। অথচ মোস্তাফিজ স্পর্শকাতর ইনজুরি বয়ে বেরিয়েছেন দেশে ফিরে। জানাননি টিম ম্যানেজমেন্টের কাউকেই।
আইপিএল থেকে ফিরেই দেশের বাড়ি সাতক্ষীরায় চলে যান মোস্তাফিজ। সেখানে পরিবারের সঙ্গে দুদিন কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে শনিবার মিরপুরে যোগ দেন অনুশীলন ক্যাম্পে। তখনও সবাই জানতেন মোস্তাফিজ শতভাগ ফিট। পরদিন আফগান সিরিজে টাইগারদের হেড কোচ কোর্টনি ওয়ালশ সিরিজ-পূর্ব আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জানান মোস্তাফিজের চোটের কথা।
তখন অবশ্য তিনি জানতেন না আঙুলে চিড় ধরার মতো ঘটনা ঘটেছে। ভারত রওনা হওয়ার আগেরদিন মোস্তাফিজ নিজেই টিম ম্যানেজমেন্টকে জানান আঙুলে ব্যথার কথা। যে বোলারের উপর আক্রমণের গুরুভার, আকাশসম প্রত্যাশা; সেই বোলারটি নিজের শরীর নিয়ে সিরিয়াস নন, এমন অপ্রিয় সত্যগুলো সামনে আসতে শুরু করেছে।
আইপিএলে প্রথম সুযোগেই বাজিমাত করেছিলেন মোস্তাফিজ। দারুণ বোলিংয়ে সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে শিরোপা তুলে দিয়ে দেশে ফিরেছিলেন বীরের বেশে। টানা ম্যাচ খেলার ধকল অবশ্য কেড়ে নেয় চেনা হাসি। আইপিএল থেকে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে ফিরেছিলেন। টানা ম্যাচ খেলা ও স্লগ ওভারে বোলিংয়ের ধকলে মোস্তাফিজ বয়ে নিয়ে এসেছিলেন কাঁধের চোটও।
দুর্বল কাঁধ নিয়েই সাসেক্সের হয়ে টি-টুয়েন্টি ব্লাস্টে খেলতে যান। দ্বিতীয় ম্যাচেই পড়েন মারাত্মক ইনজুরিতে। সেখানে তাকে করাতে হয়ে অস্ত্রোপচার। ক্রিকেটের এই অমিত প্রতিভা যখন ফর্মের তুঙ্গে, তখনই নিতে হয় লম্বা বিরতি। কাটার মাস্টারের ৫ মাস কাটে পুনর্বাসনে। ম্যাচ খেলার অবস্থায় ফিরতে লেগে যায় আরও অনেকটা সময়।
২০১৭ সালে আইপিএলে নিজের দ্বিতীয় আসরে এক ম্যাচ খেলেই বাদ পড়েন। আর জায়গা হয়নি তার। কাঁধের চোটে পড়ার আগের মোস্তাফিজ এবং পরের মোস্তাফিজে ব্যবধান কতটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায় বোলিংয়ে দুই মৌসুমে আইপিএল-পারফরম্যান্সেই।
এরপর নিজেকে ফিরে পেতে চলে সংগ্রাম। সাউথ আফ্রিকা সফরে ওয়ানডে সিরিজের আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে গোড়ালির চোটে পড়েন ফিজ। টাইগারদের রেখে ফিরে আসেন দেশে।
আইপিএলের তিন আসরের মধ্যে দুবারই ফিরেছেন চোট সঙ্গী করে। প্রথমবার হ্যামস্ট্রিং ও কাঁধের চোট। এবার পায়ের সম্মুখভাগে। মাঝখানের আসরে খেলেছেন মাত্র এক ম্যাচ। যে কারণে ইনজুরিতে পড়ার ঝুঁকিও ছিল না বাঁহাতি পেসারের। প্রতি মৌসুমে একবার করে ইনজুরিতে পড়ায় বাংলাদেশ একটানা পাচ্ছে না মোস্তাফিজকে। হাই-ইনটেনসিটির টুর্নামেন্ট আইপিএল ফিজের জন্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে ক্ষতির কারণ।
মোস্তাফিজ এবার আইপিএল খেলেছেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে। সাত ম্যাচে ছিলেন একাদশে। উইকেট পেয়েছেন ম্যাচের সমান সাতটি। আগেরবার এক ম্যাচ খেলে ২.৪ ওভারে ৩৪ রান দেয়ার পর আর একাদশে রাখেনি হায়দরাবাদ। প্রথমবার সবগুলো ম্যাচ (১৬টি) খেলে নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট। পারফরম্যান্সের এমন ওঠা-নামার পেছনে যে ইনজুরির বড় প্রভাব, সেটি আর না বললেও চলে।
জাতীয় দলের বাইরে দুটির বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলা যাবে না বলে নিয়ম করেছে বিসিবি। বিস্ময়কর প্রতিভা মোস্তাফিজের বেলায় সংখ্যাটা আরও কমিয়ে আনার ব্যাপারটি নিয়ে হয়ত নতুন করে ভাববে বোর্ড। সামনের আইপিএলে মোস্তাফিজকে ছাড়পত্র দেয়া হবে কিনা এ ব্যাপারে বিসিবি সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও আছে দুধরনের মতামত।
মতভিন্নতার সময়ে আলোচনার উপসংহার টানা হয় আইপিএল না খেললে মোস্তাফিজের আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারটি সামনে এনে। অথচ সামনের আইপিএলের পরেই ইংল্যান্ডে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আসর। শঙ্কা এড়াতে এখনই সাবধানা আর চূড়ান্ত ভালোর সিদ্ধান্তে আসা জরুরী।
ছবি: সাকিব উল ইসলাম






