১৯৯০ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বের সব অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে একটি সনদ অনুমোদন করা হয়। সেইসঙ্গে দিনটিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস হিসেবেও পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এরপর থেকে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করে আসছে। দিবসটির এবছরের প্রতিপাদ্য “বিশ্বময় অভিবাসন, সমৃদ্ধ দেশ, উৎসবের জীবন”।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টি দেশে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি কর্মী কর্মরত আছেন। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ লাখ কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হচ্ছে।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রার একটি সিংহ ভাগ আসে অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স থেকে। প্রবাসী আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
১৯৭৬ সালে মাত্র ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী প্রেরণের মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সূচনা হয়। সে বছর এ খাতে রেমিটেন্স অর্জিত হয় মাত্র ২৩.৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তখন মাত্র ৭-৮টি দেশে কর্মী পাঠানো হতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বাড়তে থাকে কর্মীর সংখ্যা, দেশের সংখ্যা আর রেমিটেন্সের পরিমাণ।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্বপ্ন ধরতে প্রবাসে গিয়ে গত ১০ বছরে লাশ হয়ে ফিরেছেন অন্তত ১৫ হাজার কর্মী। সরকারি হিসাবেই রয়েছে এ সংখ্যা। সরকারের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বছরে ২ হাজার কর্মীর লাশ হয়ে ফেরা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
তবে মানবাধিকার কর্মী এবং সংশ্লিষ্টরা সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, এ সংখ্যাকে আমলে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে। তাছাড়া প্রবাসে অধিকাংশ কর্মী মৃত্যুর কারণকে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে চালিয়ে দেয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এ নিয়েও আপত্তি রয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার।
বিদেশে কর্মরত একজন বাংলাদেশীর মৃত্যুর পর তার লাশ দেশে নিয়ে আসা নিয়েও রয়েছে জটিলতা। দায়িত্বটা মূলত সরকারের হলেও দূতাবাস ও সরকার সে দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। মারা যাওয়াদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে বড় বাধা উত্তরাধিকার প্রমাণের দায়।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশের পরিবার-পরিজনও শেষ পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে নূন্যতম ক্ষতিপূরণও বুঝে পায়নি। উত্তরাধিকার প্রমাণের পথে নানা জটিলতা অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অর্থপ্রাপ্তি আটকে দিয়েছে। তাছাড়া আমলাতান্ত্রিক মানসিকতাও এক্ষেত্রে আরেক বাধা। অন্যদিকে প্রায় সব দেশেই কর্মস্থলে মৃত্যু হলে বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তা আদায়ে মোটেই কার্যকরী ভূমিকা রাখছে না দূতাবাসগুলো।
সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ফেরত আসা কর্মীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিদেশ থেকে আসা লাশের সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়ছে। চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩ হাজার কর্মীর লাশ এসেছে। প্রবাসে মারা যাওয়াদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের লাশ প্রবাসেই দাফন করা হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৭৪৫ জন বাংলাদেশির লাশ এসেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিসহ সরকারের অন্যান্য উইং এ সংখ্যাকে স্বাভাবিক বলেই দাবি করেছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, ২০০৮ সালে লাশ হয়ে ফেরেন ২ হাজার ২৩৭ জন কর্মী। তবে ওই বছর সব মিলে প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৭২। বাকিদের লাশ স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাজার হাজার পরিবার জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দ্বারে দ্বারে ঘুরে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে বিদেশ থেকেও যে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই বিএমইটির।
২০০৭ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যাওয়া টাঙ্গাইলের মহেশ সরকারকে নিয়ে তখন দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে। অসুস্থ হওয়ার পরও হাসপাতালে ভর্তি না করায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি। পরে এ নিয়ে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা আন্দোলনে পর্যন্ত নামেন। পরে ওই কারখানায় কর্মরত সব কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ৮ বছরের বেশি হয়ে গেলেও এখনও মহেশের দুই মেয়ে অনামিকা ও মিথিলা এবং তার বিধবা স্ত্রী ঝরনা সরকার ক্ষতিপূরণের কানাকড়িও পাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে নিহতের উত্তরাধিকার আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ দিতে হবে। সঙ্গে লাগবে জেলা জনশক্তি অফিসারের সম্মতিপত্রও। নামে জেলা জনশক্তি অফিসার হলেও সারাদেশে এ অফিস দেশে আছে মাত্র ১৭টি। অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে টাকা দেয়ার কথা সেটাও সরকারের নিজের টাকা নয়, বরং শ্রমিকদেরই টাকা। বিদেশে যাওয়ার আগেই ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল নামে একটি তহবিলে তাদের জমা রাখতে হয়েছে এ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ফান্ডে বর্তমানে ৩শ’ কোটি টাকার বেশি জমা আছে। এ টাকা দিয়ে সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক করতে চাইছে। কিন্তু এ ফান্ড থেকে প্রবাসে মারা যাওয়াদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার সহজ ও ত্বরিত কোনো ব্যবস্থা সরকার নিচ্ছে না।
বিএমইটি সূত্র দাবি করেছে, এ পর্যন্ত এ ফান্ড থেকে ১০ কোটি টাকার মতো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। তারা বলছে, ‘নিয়মমতো এলে’ যে কোনো কর্মীর উত্তরাধিকাররাই ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে যাচ্ছে। যদিও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দুর্দশার চিত্র সে কথা বলছে না।
মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘কথায় কথায় আমরা রেকর্ড রেমিটেন্সের কথা বলি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা কখনোই কর্মীদের পাশে দাঁড়াই না। আর প্রবাসে মারা যাওয়া কর্মীর পাশে দাঁড়ানোর তো কোনো ব্যবস্থাই নেই। তাছাড়া একজন কর্মী কেন এবং কীভাবে মারা যাচ্ছে সে বিষয়েও সরকারের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের ক্ষতিপূরণের চেয়েও যে দেশে কর্মী মারা যাচ্ছে, সেখান থেকেই আরও বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব যদি দূতাবাসগুলো আরেকটু ভূমিকা নেয়।’
জনশক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, এক শ্রেণীর রিক্রুটিং এজেন্সী এবং দালাল চক্র তথ্য গোপন করে শ্রমিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি তিনগুণ নিয়ে অধিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠাচ্ছে। পরিণামে হাজার হাজার শ্রমিককে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে অথবা বিদেশের জেলে থাকতে হচ্ছে। এর ফলে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তারা এসব দালাল চক্রকে প্রতিরোধ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, আগামী ৪০ বছরে বিশ্বে অভিবাসীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশ বাড়বে। সে সময়ে অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০ কোটি ৫০ লাখ। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উঠতি অর্থনৈতিক দেশগুলো হবে নতুন অভিবাসীদের গন্তব্যস্থল। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে ইতিমধ্যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অভিবাসীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে তাদের সংখ্যা ২১ কোটি ৪০ লাখ। আগামী ২০ বছর একই হারে বাড়তে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ অভিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০ কোটি ৫০ লাখ।
আইওএম-এর দাবি, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি এবং উন্নত দেশগুলোতে জনশক্তি বুড়িয়ে যাওয়ায় অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে।
আইওএম জানায়, ২০২৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দক্ষ জনশক্তি বেড়ে যাবে। এর সংখ্যা শিল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনশক্তি থেকে বেশি হবে। আর অভিবাসী শ্রমিকদের গন্তব্য হবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলো।
বর্তমানে অভিবাসীদের পছন্দের শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে অভিবাসীর সংখ্যা ৪ কোটি ২৮ লাখ। অর্থাৎ বিশ্বের মোট অভিবাসীর ২০ শতাংশের বাস যুক্তরাষ্ট্রে। এ ছাড়াও তাদের পছন্দের তালিকায় রাশিয়া, জার্মানি, সৌদি আরব, কানাডা, ব্রিটেন, স্পেন, ভারত ও ইউক্রেনের নাম আছে।
প্রবাসীদের সীমাহীন দুঃখ কষ্টের কথা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন! শুধু কথায় নয় প্রবাসীদের জন্য সরকারকে প্রকৃত পক্ষে আন্তরিক হতে হবে। যেখানে প্রবাসীদের শ্রমের ফলন দেশের রিজার্ভ ১ হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করেছে, সেখানে সরকারকে প্রবাসীদের জন্য আরও আন্তরিক হওয়া উচিৎ। একজন মানুষ যখন প্রবাসী হয়ে কঠিন শ্রম দিয়ে নিজ অর্থনৈতিক সাফল্য বয়ে আনে তাতে অনেকাংশে দেশের সাফল্যেই নিহিত থাকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






