‘ফাগুন হাওয়ায়’ তৌকীর আহমেদের ৬ষ্ঠ ছবি। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ এর কথা বাদ দিলে বলা যায়, চলচ্চিত্রকার তৌকীর আহমেদের প্রকাশভঙ্গীটি একটু গম্ভীরই। কিন্তু তাঁর ৬ষ্ঠ ছবিতে এসে তিনি সেই গম্ভীর ভাষাভঙ্গীটি পাল্টে নিয়েছেন! তার এবারের চলচ্চিত্রে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন কৌতুকের। আদতে ছবিটির গল্প সিরিয়াস। মূল উপজীব্য ভাষা আন্দোলন। কিন্তু তিনি ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ঢাকা থেকে সরে গিয়ে বেছে নিয়েছেন দূরের এক মফস্বল। সেখানের পাত্র পাত্রীরা কেউ রফিক সালাম বরকত নন, সেখানে গাজীউল হক বা ভাষা মতিন নেই, নেই জিন্নাহ বা নাজিমুদ্দিন। কিন্তু তাদের ছোট ছোট আলো-ছায়া গভীর আলো আর অন্ধকারে নিয়ে হাজির করে ইতিহাসের পাত্র পাত্রিদের!
তৌকীর তার এই ছবিতে রাজনীতিটার ক্ষেত্রটা একটু দূরে নিয়ে গেছেন। কিন্তু দেখিয়েছেন অণুবীক্ষণ দিয়ে। যেখানে একটু আড়াল সরিয়ে চোখ বড় করলেই দেখা যায় ভিত্তিভূমিটা। এইখানে প্রেম উপস্থিত। সেই প্রেম বাধা হিসেবে আসে ধর্ম। এটা দেয়াল, ৪৭ বিগত, কিন্তু ’৪৭ এইখানে যেন দেয়াল। নাড়ি ছিঁড়ে গেছে, এক হবে কিসে! নাসির তবু হাত ধরে দীপ্তির, দীপ্তি নাসিরের। ভেতর থেকে কালো একটা হাত, মুসলিম লীগের! আর একটা কালো হাত, দূর হতে, পাকিস্তানি- জমশেদ। পূর্ব পাকিস্তানে ‘শাস্তিমূলক’ বদলি নিয়ে আসেন পুলিশ অফিসার জমশেদ। তিনি সব কিছুই অপছন্দ করেন বাঙালিদের, ভাত মাছ ভাষা সব। তিনি প্রজেক্ট নেন উর্দু শেখানোর, মৌলবি নিয়োগ দেন। গাছে ময়না ডাকে, বউ কথা কও! তিনি পাখিকেও শেখাতে চান উর্দু, বিবি বাত করো! কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের মতো তিনিও হাস্যকর হয়ে উঠেন। টিটো রহমানের যে গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্ক্রিপ্ট, সেই গল্প থেকে একটু পড়ে নেয়া যাক, “…তিনি একটি বোকা পাখিকে উর্দু শেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাহলে জিন্নাহ সাহেব কেমন করে এতগুলো বুদ্ধিমান মানুষকে উর্দু শেখাবেন?” জিন্নাহ সাহেব পারেন নি।
এই ছবিতে আমরা ক্ষমতার এক অশ্লীল বিকার দেখতে পাবো। এই বিকারটা তৌকীর তার গল্পে এডাপ্টেশনের সময় খুব সচেতনে এনেছেন বলেই ধারণা করি। আপনারা যারা টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ গল্পটা পড়েছেন, জানেন যে গল্পের পুলিশ অফিসার আজীজ সাহেব (যার আদলে জমশেদ চরিত্রটি তৈরি করা হয়েছে) নিজে বাংলা শেখেন তার কলিগ কাম রুমমেটের কাছে যেন তিনি সহজেই ঘুষ খেতে পারেন! কিন্তু ফাগুন হাওয়ায় জমশেদ উল্টোটা! সে সবাইকে উর্দু শেখাতে চায়, এমন কি বনের পাখিকেও। এই যে ক্ষমতার বিকার, এই বিকার সর্বগ্রাসী। মানুষসহ সমস্ত প্রাণ প্রকৃতির বিরোধী এবং এর পরাজয় অনিবার্য! ফলে আমরা দেখি ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ এর দোহায় দিয়ে যে হাত আলাদা করা হয়, সেই হাত সত্য মিছিলে এক হয়, বিকৃত ক্ষমতা পালায়, সে মানুষের সুরে সুর মেলায়। ভালোবাসা জিতে যায়।
দিনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ নাটকটি করবে বলে ঠিক করে একদল মফস্বলের নাট্যকর্মী। কিন্তু সেই নাটক তখনকার রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক রেজিম মঞ্চস্থ হতে দেয় না। এটা তো সময়ের বাস্তবতা, সমকালীন বাস্তবতা, হয়তো ভবিষ্যতেরও বাস্তবতা। এটাই তৌকীরের ছবির ফোকাল পয়েন্ট। কিংবা এমনটা নাও হতে পারে! এমন কি তার সিনেমার মুনশিয়ানার একটা জায়গাও এখানে আমরা দেখি, কেমন করে অতীতের ব্রিটিশ পিরিয়ডের সাথে পাকিস্তানি রেজিমের সম্পর্ক স্থাপন করেন, এবং নীল করের অত্যাচারীর সাথে পাকিস্তানিদের তুলনা। নীল দর্পণের রিহার্সালের ধর্ষণের দৃশ্যে যখন দেখি ‘আমি তোর সন্তানের পিতা হতে চাই’; সেটার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে বোবা মেয়েটা, ‘অচ্ছুত মেথর’! জমশেদের রেপের দৃশ্য! এই অদ্ভুত প্রতীক সিক্ত করে।
পিরিওডিক স্টোরি বেছে নেয়ার একটা বড় চ্যালেঞ্জ থাকে, পিরিওডিক অথেন্টেসিটি রক্ষার। অন্তত দৃশ্য সজ্জার ক্ষেত্রে। ট্রেন বা বড় রাস্তা এবং শহর দেখানো থেকে বিরত থেকে পরিচালক এখানে অর্ধেক এগিয়েই ছিলেন বলা যায়। যদিও লঞ্চ যথেষ্ট উজ্জ্বল ছিল। যে লিমুজিন গাড়িটা দেখানো হয়েছে, বেশ ভালই মানিয়ে গেছে। একটা মোবাইলের টাওয়ার না দেখা যাওয়াও চাট্টিখানি ব্যাপার না! যদিও গ্রাফিক্সের সহায়তা এখন অনেক কিছুই সহজ করে দিয়েছে। শেষের দিকে বাড়ির দীপ্তিদের বাড়ির পিলারগুলোতে বড় বড় টাইলসে মোড়ানই মনে হলো, এইটা খুঁত ধরবার বাসনা থেকেও মনে হতে পারে। তাছাড়া খুব ভালো ভাবেই পিরিওডিক অথেন্টেসিটির পরীক্ষায় পাশ করেছে ছবিটা। উর্দুভাষী পুলিশের ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন যশপাল শর্মা। সায়েমের অভিনয় লক্ষণীয়। তিসা বরাবরের মতই সাবলীল। আবুল হায়াত, ছাড়াও ছোট ছোট চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন সবাই। ফারুক আহমেদ বা সাজু খাদেম বেশ আনন্দ দিয়েছেন যতক্ষণ পর্দায় ছিলেন।
‘ফাগুন হাওয়ায়’ শীতল সময়ের পরে ফুলে ভরা বসন্তের গল্প। বসন্ত আসতে একটা বড় লড়াই করতে হয়। লড়াই আসলে কখনই থামে না। ধরে রাখার লড়াই চলেই সবসময়। ফাল্গুনে ৮ তারিখ হয়। একবার। এটাই অনুপ্রেরণা হয়। ইতিহাস পুনরাবৃত্তিতে ঠাঁসা থাকে। ব্রিটিশরা গেলে পাকিস্তান আসে…আর পরে… মানুষের লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হয়। অধিকার বিনা লড়াইয়ে অর্জন হয় না। লড়াই চলুক, ‘ফাগুন হাওয়ায়’ হোক প্রেরণা! ফাল্গুনে মানুষের ভালোবাসার জয় হোক। পুষ্পে উদ্যান শোভিত হোক, ভালোবাসায় হাতে হাত রেখে মিছিল এগুক। জয় হোক ফাগুন হাওয়ার।








