বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে এবং কোটা বিরধী আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কের ডিবি হেফাজত রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটটি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।
তিনদিন শুনানির পর রোববার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটটি (সামারিলি রিজেক্ট) সরাসরি খারিজ করে পর্যবেক্ষণসহ আদেশ দেন।
হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের মৌলিক দিক ও নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পুলিশের কাজ করা অপরিহার্য। তবে কেউ আইন লঙ্ঘন করলে পুলিশ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও তারপরে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করতে পারে। যদি আইন কোনো লঙ্ঘন না ঘটে বা কোনো দাঙ্গা না হয়, তবে কোনো প্রাণঘাতী গুলি (লাইভ বুলেট) ব্যবহার করা যাবে না।
পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ মিছিল, সমাবেশ ও জনসভায় অংশগ্রহণের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। মানবজীবন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হওয়ায় মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় হলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বল প্রয়োগ করতে পারে। দায়িত্ব পালনে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো মানবমর্যাদাকে সম্মান-সুরক্ষা করবে, সব ব্যক্তির মানবাধিকার বজায় ও সমুন্নত রাখবে।
আজ হাইকোর্টে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন ও ব্যারিস্টার অনিক আর হক। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। এছাড়া আজ শুনানিতে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক শাহ মনজুরুল হক ও সিনিয়র আইনজীবী আজহার উল্লাহ ভুইয়া।
আজ শুনানির শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন এই রিটটি ম্যালাফাইডি ইন্টেনশন থেকে করা হয়েছে।বাংলাদেশ টেলিভিশন, মেট্রোরেল, সেতু ভবনে আগুন ও নরসিংদী কারাগারে হামলা চালিয়ে আসামী ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা উল্লেখ অ্যাটর্নি জেনারেল প্রশ্ন রেখে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ কি করবে? গতকাল খুলনায় পুলিশকে কেন মারা হল? এর আগে পুলিশকে মেরে কেন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ কি মানুষ না? তারা এই দেশের সন্তান না? এসব ক্ষেত্রে আমরা এক চোখ বন্ধ করে রাখি।
অন্যদিকে, রিটের পক্ষের আইনজীবী সারাহ হোসেন বলেন, ম্যালাফাইডি ইন্টেনশন থেকে এই রিটটি করা হয়নি। পুলিশের হত্যার নিন্দা জানিয়ে এই আইনজীবী আদালতকে বলেন, ৬ সমন্বয় মুক্ত হলেও তাদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা কেন কেড়ে নেয়া হলো? কারণ তারা বের হয়ে অন্য কথা বলেছে। আর আটক বা গ্রেফতার না করে হেফাজতে নেয়ার গেট ওপেন হয়ে গেলে এটা সামনেও হতে পারে।
গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন প্রীতম ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি একটি রিট করেন। সে রিটে ‘আন্দোলনকারী বা বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামার আশংকা’র কথা উল্লেখ করে তাদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি না চালানোর নির্দেশনা চাওয়া হয়। সেই সাথে এই রিটে কোটা বিরোধী আন্দোলনের ৬ জন সমন্বয়কের ডিবি হেফাজত নেয়াকে বেআইনি উল্লেখ করে তাদের মুক্তির নির্দেশনা চাওয়া হয়।’
এরপর সোম ও মঙ্গলবার এই রিটের আংশিক শুনানি শেষে পরবর্তী শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়। তবে বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের অপর বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন অসুস্থতার কারনে ছুটি নেয়ায় দ্বৈত বেঞ্চ বসেনি। শুধু বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম একক বেঞ্চ পরিচালনা করেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় দিন হাইকোর্টে এই রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন, আইনজীবী অনিক আর হক, আইনজীবী মানজুর আল মতিন প্রীতম ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি। আর রাষ্ট্রপক্ষে সোমবার ও মঙ্গলবার শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম মুনির, শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ ও মেহেদী হাসান চৌধুরী। বুধবার আদালতে আসেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। আগের দুই দিনের শুনানিতে অংশ নেন সিনিয়র আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, নূরুল ইসলাম সুজন, মমতাজ উদ্দিন ফকির, আজহার উল্লাহ ভুইয়া ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক শাহ মনজুরুল হক।








