২৪ জুলাই জাসদ সভাপতি এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু টিআর-কাবিখার অনিয়ম নিয়ে একটি সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। আর এতেই তেঁতে উঠলেন দেশের নীতি নির্ধারকদের বড় এক অংশ। আত্মবিশ্লেষণ বা আত্মজিজ্ঞাসা না করেই হৈ হৈ করে উঠলেন এই বলে যে, ইনু সাহেব কার্যত সংসদ সদস্যদের ভীষণরকম অমর্যাদা, মানহানি করেছেন। অপমান করেছেন। তাঁকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে। এমপি, জনপ্রতিনিধিরা সব দুধে ধোয়া।
শেষপর্যন্ত পরেরদিনই তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সংসদে দাঁড়িয়ে প্রদত্ত বক্তব্যের জন্যে ক্ষমা প্রার্থণা করেন। পত্রিকা মতে, ঐদিন কিছু সংসদ সদস্য নাকি সংসদীয় শিষ্টাচার পদদলিত করে মন্ত্রীর দিকে তেড়েও আসেন। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির কয়েকজন এমপি শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে পানি গোলা করতে উঠে পড়ে লাগেন।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বিষয়টির জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও এ দেশের লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ, ক্ষুধার্ত, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, বয়স্কারা যে কোনোদিন গরিবের হক মেরে খাওয়া এমপি মহোদয় ( যারা এই কাজটি করেন) আর জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমা করবেন না তা বলাই বাহুল্য। কারণ আমাদের জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশের দ্বারা গরিবের হক মেরে খাওয়া, চুরি করা, লুট করা নতুন কিছুই নয়।
পুরনো সংস্কৃতির মাঝে এই মাত্রা কখনও বেড়েছে, কখনও কমেছে-এই যা। তবে নির্মুলও হয়নি, আবার বিশ্বাসযোগ্য জায়গায়ও আসেনি। তাই মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের হরিলুটের গল্পও চলে আসে। এই মাত্রা এখন কোন পর্যায়ে আছে তা আর কারো অজানা নয়।
২৪ জুলাই পিকেএসএ-এর পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ভবনের সম্মেলন কক্ষে ছিল ‘গ্লোবাল সিটিজেনস ফোরাম অন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সামিট ২০১৬’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী মহোদয়।
বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন দরিদ্রদের সহায়তার জন্য সরকারি কর্মসূচি টিআর ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) বরাদ্দের বড় অংশই চুরি হয়। ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলে এর অর্ধেক যায় এমপিদের (সংসদ সদস্য) পকেটে। বাকি ১৫০ কোটি টাকার সিংহভাগ যায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পকেটে। এ দুর্নীতিকে আমরা চোখ বন্ধ করে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি।
মন্ত্রী আরও বলেছিলেন, সব এমপিই হয়ত চুরি করেন না। কিন্তু বেশির ভাগ এমপিই এ কাজটি করেন। এটি বন্ধের জন্য উন্নয়ন বাজেটের অর্থ সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদের বাজেটে দেয়া উচিত। এতে উন্নয়ন বৈষম্য কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি। মন্ত্রী আরও বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে সক্ষম হতে হবে। তা না হলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যতই বরাদ্দ দেয়া হোক; কোন কাজে আসবে না।
মন্ত্রীর বক্তব্যের পরপরই দৈনিক পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সনে নিউজটি ভেসে উঠে। একই দিনে দুপুরে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম বাংলাদেশ-এর সহায়তায় সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি) আয়োজিত বৈষম্য ও দারিদ্র্য নিরসনে বাজেট ও অন্যান্য নীতি কাঠামোর ভূমিকা শীর্ষক জাতীয় সংলাপেও তিনি বক্তব্য প্রদান করেন।
যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশজনেরও বেশি সংসদ সদস্য। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সেখানেও তথ্যমন্ত্রী এমডিজি, এসডিসি উন্নয়ন নিয়ে চমৎকার বক্তব্য রাখেন। মন্ত্রী সেখানে বলেন, ‘আমরা দারিদ্র্য কমাতে পারি কিন্তু বৈষম্য নাও কমতে পারে। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক কাঠামোর মধ্যে কিছু অন্যায্যতা রয়েছে এই অন্যায্যতা দূর করা না গেলে দারিদ্র্য পুনরুৎপাদন হবে, সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে।’
ঐ বক্তব্য দেওয়ার সময়ও অবশ্য মন্ত্রী বুঝতে পারেননি পানি কতদূর গড়িয়েছে। এর মধ্যেই পিকেএসএফ-এর অনুষ্ঠানে দেওয়া মন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম আর ফেসবুকের নিউজফিড পেরিয়ে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের কাছে চলে যায়। মন্ত্রীর এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন অনেকেই। জাসদ এবং হাসানুল ইনু বিরোধী সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা থেকে নিউজটি প্রিণ্ট করে একে অপরের মাঝে বিলি করেন। 
বিকেলে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে জাসদের সবচেয়ে বড় সমালোচক জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশিদসহ আরো কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে নাকচ হয়ে যায়। পরেরদিনই সকালে মন্ত্রীসভার তোপের মুখে পড়েন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুসহ কেউ কেউ আপত্তি তুলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ তোলেন। ঐদিনই অবশ্য সংসদে দাঁড়িয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থণা করলে সংসদ শান্ত হয়।
সংসদ শান্ত হলেও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু যে সত্য উচ্চারণ করে গেছেন সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর কী জাতি পেয়েছে? ঐদিনই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারি ফেসবুক স্ট্যাটাসে যথার্থই বলেছিলেন, সঠিক একটি তথ্য দেবার পর তথ্যমন্ত্রীকে মাফ চাইতে বাধ্য করা হয়েছে! বাজে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে গেলো! প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারতেন।
না, প্রধানমন্ত্রী কোনো তদন্তের নির্দেশ দেননি। অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা সে সম্পর্কেও বলতে শোনা যায়নি। আসলে টিআর কাবিখার অপচয়, অনিয়ম, লুটপাট, চুরি নিয়ে অভিযোগ মোটেও নতুন নয়। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বহু আগেই টিআর কাবিখার বরাদ্দ ও ব্যয় নিয়ে জোর আপত্তি তুলেছেন, কথা বলেছেন। অপচয়, অনিয়ম এবং লুটপাট বন্ধে পরামর্শ দিয়েছেন সুশাসন দাবি করেছেন কোনো কাজ হয়নি।
২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো লিখেছিল- টিআর কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ করা খাদ্যশস্যের একটি বড় অংশই প্রকৃত কাজে ব্যবহার করা হয় না। নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা এগুলো ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। আবার এ কারণেই খাদ্যশস্য উত্তোলনের হারও বরাদ্দের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে।
২০১২-১৩ অর্থবছরে ২ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ থাকলেও উত্তোলন করা হয় তিন লাখ ১৭ হাজার টন। এর আগে রমেশ চন্দ্র সেন পানি সম্পদ মন্ত্রী থাকা অবস্থা তার মন্ত্রণালয়ে কাবিখা কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক যখন খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ছিলেন তখন তিনিও এ নিয়ে বহুবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এইতো কিছুদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রী আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান ও অভিজ্ঞ নেতা তোফায়েল আহমেদ, এমপি টিআর ও কাবিখার বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছিলেন- এটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
শুধু টিআর এবং কাবিখা বলে নয়, বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তামূলক যে সব কর্মসূচি রয়েছে সেখানে অনিয়ম, লুটপাট, চুরি চলছে দেদারছে। বলা হচ্ছে আগামী ২০২২ সালের মধ্যে দেশের প্রায় সব গরিব মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আনা হবে। সরকারের এই প্রস্তাব খুবই ভাল। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির খাতের দুর্নীীতি কমিয়ে আনা কী সম্ভব হয়েছে?
২৪ জুলাই সোনারগাঁও হোটেলে-এ সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপ (এপিপিজি) আয়োজিত বৈষম্য ও দারিদ্র্য নিরসনে বাজেট ও অন্যান্য নীতি কাঠামোর ভূমিকা শীর্ষক জাতীয় সংলাপেও সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি কামরুল লায়লা জলি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন ‘বিধবাদের প্রতিমাসে ৪০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়। অথচ তারা পায় ৩০০ টাকা।’
আসলেইতো আমরা নির্লজ্জের মতো অসহায় দরিদ্র বিধবাদের ভাতা থেকেও ১০০ টাকা করে লোপাট করছি। বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ ভাতা থেকে কমিশন খাচ্ছি। ভিজিডি, ভিজিএফ থেকে কমিশন খাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর যে ধান, চাল, গম কেনা হয় সেখান থেকেও লক্ষ লক্ষ টাকা মেরে খাচ্ছি।
এ সব কারা করছে?
এই মেরে খাওয়াতো এখন সর্বত্র সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। সেই সত্যটাই মন্ত্রীর মুখে উচ্চারিত হয়েছিল। সত্যটাই উচ্চারণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সত্য কথার ভাত নেই। তবে জাসদ সভাপতি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা না চাইলে সেটা সত্যকে আরও বেশি সত্য করতো।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)










