দেশে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর ফলে ব্যাপক খুশি হয়েছেন তারা। তবে এই সুবিধার খবর প্রচারের পাশাপাশি ঋণ পেতে ভোগান্তি কমিয়ে আনার অনুরোধ করেছেন তারা।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা বলছেন, সরকার ঋণের সীমা বাড়ানোর ফলে ঘরবাড়ি নির্মাণে আশার আলো দেখছেন তারা। তবে ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় সব ধরনের কার্যক্রম শেষ করে ঋণ পেতে অনেক সময় লেগে যায়। এছাড়া সংশ্লিষ্টদের কমিশন দিয়ে ঋণ নিতে হয়। ফলে ফ্ল্যাট কেনার ইচ্ছা থাকলেও এসব ঝামেলার কারণে অনেক প্রবাসী এগিয়ে আসছেনা। আবার কোন ব্যাংক থেকে, কিভাবে ঋণ পাওয়া যায়-এসব বিষয়েও জানে না অনেকে।
১৪ বছর ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে থাকেন নোয়াখালী জেলার আনোয়ার হোসেন। ফেসবুকে তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, গত পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে কিছু জায়গা কিনেছেন তিনি। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় বাড়ি করতে পারছেন না।
এই প্রবাসী বলেন, ‘শুনলাম বাড়ি করতে ব্যাংক আমাদের ঋণ দেবে। কিন্তু কিভাবে পাব, এর সুদ কত হবে, কত দিনে পরিশোধ করতে হবে এসব বিষয়ে এখনও জানি না।’
কুমিল্লা জেলার ইউছুফ আলী থাকেন বাহরাইনে। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, পড়াশুনা না থাকায় অনেক প্রবাসী ঋণসুবিধা সম্পর্কে জানে না। আবার কেউ কেউ ঋণ নিতে গেলে কর্মকর্তাদের পেছন পেছন ঘুরতে হয়। দিতে হয় কমিশনও। এসব ঝামেলার কারণে ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই ঋণ নিতে আগ্রহী নয়।
ঋণ সুবিধা বাড়াতে স্বস্তি পাচ্ছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, এর ফলে ঝিমিয়ে পড়া আবাসন খাত চাঙ্গা হবে। বিক্রি হবে অবিক্রিত ফ্ল্যাট। পাশাপাশি নতুন বাড়ি তৈরি করতেও আগ্রহী হবে অনেকে।
রিহ্যাবের তথ্যমতে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত অবিক্রিত ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। তবে এই হিসেব মাত্র ২০৯টি আবাসন প্রতিষ্ঠানের। যদিও দেশে আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩ হাজার।
প্রবাসীদের এসব অভিযোগ-অনুযোগের সাথে একাত্বতা প্রকাশ করে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবের প্রথম সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সরকার ঋণের সীমা বাড়িয়েছে-এটা অবশ্যই সুসংবাদ। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আবাসান খাতে। মধবিত্তদের অনেকে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে এগিয়ে আসবে।
তবে এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর প্রচারণা নাই বললেই চলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেসব প্রবাসীদের অধিকাংশই জানে না কোথায় থেকে, কিভাবে ঋণ পাওয়া যায়। ঋণের এই সুবিধা বৃদ্ধির বার্তা প্রবাসীদের কাছে না পৌঁছালে এর সুফল পাবে না তারা।
গত ২৩ জুলাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য আর্থিক সুবিধা আগের তুলনায় আরো বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এতে বলা হয়, ভোক্তা ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট কিনতে তারা মোট খরচের ৭৫ শতাংশই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবেন।
অর্থাৎ কোনো প্রবাসী বাংলাদেশে ১ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি কিনতে চাইলে তিনি ২৫ লাখ টাকা রেমিট্যান্স পাঠাবেন। বাকি ৭৫ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রবাসীদের জন্য এতদিন ১ কোটি টাকা মূল্যে বাড়ি কিনতে বা নির্মাণে তার ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেয়ার সুযোগ ছিল। অর্থাৎ মোট খরচের অর্ধেক (৫০:৫০) ঋণ নেয়ার সুযোগ ছিল। নতুন আইনে এই সীমা আরো ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।
প্রবাসীদের অভিযোগগুলো সর্ম্পকে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কিভাবে ঋণ পাবে তার বিস্তারিত ব্যাংকের ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। গ্রাহক তার প্রয়োজন অনুযায়ী সন্ধান করে নিবে।
হয়রানি ও কমিশন বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ ঋণ নিতে গিয়ে হয়রানি হলে বা কর্মকর্তারা কমিশন চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মানুসারে, ভোক্তা ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী, গৃহায়ন খাতে সর্বোচ্চ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। অর্থাৎ- কোনো প্রবাসী ২ কোটি হোক আর ৩ কোটি হোক, ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনলে বা নিজের জমিতে বাড়ি নির্মাণ করলে তিনি সর্বোচ্চ এক কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতেন। মোট ব্যয় এর চেয়ে বেশি হলেও সর্বোচ্চ এ পরিমাণ ঋণই দিতো ব্যাংকগুলো।
নিয়মানুসারে, প্রবাসীরা বিদেশি উৎস থেকে আয়ের বিপরীতে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংক শাখায় প্রবাসীর পরিচালিত অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন তিনি। আবার কেউ চাইলে বাসা ভাড়া থেকে পাওয়া অর্থের বিপরীতে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন।







