বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে পুনরায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ন্যস্ত করার পর এর প্রথম ‘ভিকটিম’ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিজেই হবেন কি না, তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। কেননা তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনসহ ১১টি অভিযোগ রয়েছে বলে খোদ সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের তদন্ত করবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যে ক্ষমতা আগে ছিল সংসদের হাতে।
এখন প্রশ্ন আরও একটি থাকছে, যেহেতু ষোড়শ সংশোধনীর রায় সংসদ মানেনি এবং এই রায়ের রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, তাই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কি পুনর্বহাল হয়েছে নাকি রিভিউয়ের রায়ের আগ পর্যন্ত বিচারকদের অপসারণ বা তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার সংসদের হাতে? যদি সংসদের হাতে থাকে তাহলে কি ষোড়শ সংশোধনী রিভিউ নিষ্পত্তির আগে এ বিষয়ে মি. সিনহার বিরুদ্ধে আনীত ১১টি অভিযোগের বিষয়ে সংসদ কোনো উদ্যোগ নেবে না নিতে পারবে?
প্রশ্ন আরও থাকছে, এস কে সিনহার বাইরে অন্য কোনো বিচারকের বিরুদ্ধেও যদি এখন নৈতিক স্খলন বা অসদাচরণের অভিযোগের তদন্তের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি কে করবে? জুডিশিয়াল কাউন্সিল নাকি সংসদ? যদি এর সুস্পষ্ট জবাব না থাকে বা এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়, তাহলে সেই অবস্থাকে ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ বলা যাবে কি না?
আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও মনে করেন, এক্ষেত্রে একটা শূন্যতা আছে। তবে রাষ্ট্রপতির কিছু নিজস্ব ক্ষমতা আছে। অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত হবে, তারপর আইন অনুযায়ী কার্যক্রম চলবে।
রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে যে ১১টি অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার অনুসন্ধান করবে। অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। তবে আইনমন্ত্রী এও মনে করেন যে, একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন নয়।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের ভাষ্য, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কনসেপ্ট সরকার মেনে নেয়নি। যে কারণে রাষ্ট্র ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের রিভিউয়েরর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখানে প্রশ্ন হলো, সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ আপিল বিভাগের রায়ে পরে কি সংবিধান ষোড়শ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি?
সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধঃস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্যপালনীয় হইবে।’এই বিধানের যে স্পিরিট তাতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর ৯৬ অনুচ্ছেদ আগের অবস্থায় অর্থাৎ বিচারকদের অপসারণ বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তের এখতিয়ার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতেই ন্যস্ত হয়। যদিও ওই রায়ের পরে সরকারের তরফে একাধিকবার বলা হয়েছে যে, তারা এই রায় গ্রহণ করে না এমনকি অর্থমন্ত্রী এও বলেছেন যে, আদালত যতবার এই সংশোধনী (ষোড়শ) বাতিল করবেন, তারা (সংসদ) ততবারই এটি পাস করবেন। ফলে একটি বড় সাংবিধানিক তর্ক এখনও জীবিত রইলো।
তবে এই তর্কের সুরাহা যেভাবেই হোক, একটা বিষয় এখন মোটামুটি পরিস্কার যে, ছুটি শেষে দেশে ফিরলেও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আর তার চেয়ারে বসতে পারছেন না।
আইনমন্ত্রীও বলেছেন যে, মি. সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা ১১টি অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব নিতে পারবেন না।
তাছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের পাঁচজন বিচারক তার (এস কে সিনহা) বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে বিচার কাজে বসবেন না বলে জানিয়েছেন। সুতরাং মি. সিনহা দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ তার একার পক্ষে আদালত পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
এটিও এখন ধারণা করা যায় যে, যেহেতু এস কে সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর নথি বিচারপতিদের হাতে দিয়েছেন খোদ রাষ্ট্রপতি, সুতরাং এর তদন্ত হবেই এবং মি. সিনহাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার দেয়া রায় অনুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেই হয়তো তার বিচারের উদ্যোগ নেয়া হবে। আবার দুদকও এর তদন্ত করতে পারে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন। সুতরাং আগামী ৩১ জানুয়ারি এস কে সিনহার মেয়াদ শেষ হলেও এই ইস্যুটা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
আবার যদি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয় এবং তিনি যদি শাস্তি পান, তাহলে এটি দেশের ইতিহাসে একটি বিশাল এবং বিরল ঘটনা হবে। এই ঘটনা তখন দেশের বিচার বিভাগে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে তা এখনই বলা মুশকিল। তবে যদি সত্যিই মি. সিনহার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয় এবং তিনি শাস্তি পান, তাহলে এটি ভবিষ্যতে অন্যদের জন্য একটি বড় উদাহরণ হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







