শিউলী জাহান
এক ঝাঁক তরুণ তরুণীর স্বদেশীয় মিশ্রধ্বনির কলতানে মুখর হলো টরন্টোর আলবার্ট ক্যাম্পবেল লাইব্রেরি মিলনায়তন। বহু জাতি এবং বহু ভাষাভাষীর শহর টরন্টোর একটি সুন্দর সন্ধ্যায় আয়োজনে উপস্থিত সবার হৃদয় আদৃত হলো তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে মাতৃভাষার প্রতি তাদের অনুভূতি এবং কানাডার প্রথম ভাষা ইংরেজির পাশাপাশি মাতৃভাষাকে ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অভিমত জেনে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে টরন্টোর সাহিত্য সংগঠন বেঙ্গলি লিটারারি রিসোর্স সেন্টারের (বিএলআরসি) উদ্যোগে ১৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত হলো ‘মাতৃভাষা উৎসব’।
বহু ভাষাভাষী তরুণদের এই সম্মিলনকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিতে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে ছিলেন বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের দুই সংসদ সদস্য ন্যাথানিয়েল এরকিন-স্মিথ এবং আর্থার পটস। বিএলআরসি সভাপতি ড. রাখাল সরকারের শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়ে শুরু হয় মাতৃভাষা উৎসবের আয়োজন। তিনি প্রবাসের তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করে প্রত্যেকের নিজ নিজ মাতৃভাষাচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আহ্বান জানান।
মাতৃভাষা সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ: স্টোরিজ অব দ্য ইয়ুথস’ পর্বে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জসুয়া যার জন্ম এবং বেড়ে উঠা টরন্টোতে, তার অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে, ‘ভাষা যেমন যোগাযোগের একটি বাধা, তেমনি ভাষাই আবার যোগাযোগের দরজাকে উন্মুক্ত করার মাধ্যম। একটি ভাষার মাধ্যমে জানা যায় অন্যদের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। ভাষাকে সংরক্ষণ করা মানে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা।’ নিজের উদ্যোগেই আগ্রহী হয়ে বাংলা ভাষা শিখেছে জসুয়া।
বাংলাদেশি তরুণ হাসিব করিম বলেন, ‘আমার বাবা-মা সবসময় আমাকে বাংলা বলার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু আমার তেমন করে সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি কারণ কানাডায় আমাদের প্রথমত শিখতে হয় ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষা, তারপর ধর্মীয় কারণে আররি এরপর আসে বাংলার কথা। আমি খুব সাবলীলভাবে বাংলা বলতে না পারলেও এখন আমি বাংলা বুঝতে পারি। আমাদের কোন অনুষ্ঠানে গেলে আমি অন্যদের মত হতাশ হয়ে যাই না কারণ আমি আমার আশেপাশে সবার কথোপকথন এবং বাংলা গান বুঝতে পারি এবং উপভোগ করি।’
নিজ মাতৃভাষাকে জানার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে শর্মিলা সেনথিল মনোহরন বলেন, আমি যখন কানাডায় এসেছি, তখন আমার মাত্র কয়েক মাস বয়স। কিন্তু আমার সৌভাগ্য যে আমার বাবা মা আমাকে মাতৃভাষা তামিল শিখিয়েছেন। আমি তাই আমাদের কমিউনিটির অনুষ্ঠানে গিয়ে বুঝতে পারি তারা কী নিয়ে কথা বলছে।’
চাইনিজ বংশোদ্ভূত জুনিং (শ্যারন) শি বলেন, ‘অন্যান্য নতুন অভিবাসীদের মত আমিও যখন কানাডায় আসি, আমি যতটা সম্ভব শুধু ইংরেজি শিখেছি এবং বলেছি। কিন্তু পরে দেখেছি, নিজস্ব অনুভূতিকে অন্য ভাষায় ঠিক সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা যায় না। আমি দোভাষী হয়ে গর্ববোধ করি এবং আমি গর্বিত যে কানাডায় একই ভাবে আমার মাতৃভাষাও বলতে পারি।’
কানাডিয়ান-গায়ানিজ অমর অজয়ল্যাচমান তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেন, ‘১৮৩৮ সালে আমার পূর্ব পুরুষরা ভারত থেকে চলে এসেছিলেন। আমি আগে জানতাম না আমার ইতিহাস। আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে এসব জেনেছি এবং আমার ভাষা শিখেছি। আর এখন অন্যকেও শিখতে উৎসাহিত করছি।’ কানাডায় জন্মগ্রহণকারী জ্যোতি দত্ত পুরকায়স্থ বাংলা ভাষা শিখতে তাকে কিছুটা বাধ্য করার জন্য বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘বাংলা বলতে এবং লিখতে পারা একটি অন্যরকম অনুভব। অন্তত আমাকে বাংলা এখন লেখাপড়ার জন্য বাবা মার সাহায্য নিতে হয় না।’
মাতৃভাষা বিষয়ক তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ভাষা-বিষয়ক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য রবীন্দ্রপ্রেমী মেথিউ কেলওয়ে, ‘বিচমেট্রো নিউজ’ পত্রিকার সম্পাদক আনা কিলেন, মুক্তচিন্তক আকবর হোসেন, ইংরেজি-ভাষী বাঙালি কবি সব্যসাচী নাগ এবং টরন্টোর পরিচিত উর্দু কবি ভাকার রাইস।
মেথিউ কেলওয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কানাডা এবং বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বলে মনে করেন, যা একই অনুভূতি সবার মধ্যে সঞ্চালন করে। আকবর হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন ভাষা শেখার মাধ্যমে আমরা অন্য ভাষাভাষী মানুষকে বুঝতে এবং জানতে পারি। কানাডার অভিবাসীদের একটি দায়িত্ব আছে যতটুকু সম্ভব আমাদের সন্তানদের মধ্যে নিজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলা এবং সেই সাথে কানাডার সংস্কৃতির প্রতিও তাদের শ্রদ্ধাশীল করা উচিত।’ সম্পাদক আনা কিলেন মাতৃভাষা দিবসে নিজ মাতৃভাষার পাশাপাশি কানাডার আদিবাসীদের ভাষার কথা উল্লেখ করেন যাদের অনেকাংশই আজ বিলুপ্তির পথে। কবি সব্যসাচী নাগ এবং ভাকার রাইস দুজনেই বর্তমান প্রজন্মকে ভাষার কোন গন্ডিতে না রেখে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে যে কোন মাধ্যমে ভাষাকে আত্মীকরণের কথা বলেন। নিজেকে প্রকাশ করতে পারাটাই জরুরি সেটা যে ভাষায়ই হোক।
বাংলাদেশে মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস তুলে ধরা হয় একটি চমৎকার নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। দেশের গান এবং নিজ ভাষার প্রতি প্রবাসীরা ভালোবাসায় কতটা আপ্লুত হয় বোঝা গেল পুরো হলের পিনপতন নীরবতায়। একুশের গানে সজল হল প্রতিটি হৃদয়। নৃত্যালেখ্যটি উপস্থাপনা করেন সূচনা দাস বাঁধন, শ্রেয়সী প্রামানিক, রাধিকা ভট্টাচার্য, আরিত্রি ভট্টাচার্য, সুকন্যা চৌধুরী, সামারা এবং নিশুতি সাহা।
তরুণ পরিচালক নাদিম ইকবালের তথ্যচিত্র ‘মাদার টাং’-এর প্রদর্শনী ছিল অনুষ্ঠানের শেষ পরিবেশনা। প্রদর্শনের শুরুতে তিনি সিনেমাটি বানানোর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। অভিবাসী শিশুদের মাতৃভাষাকে ভুলে যাওয়া বা শিখতে না পারা এবং এর কারণে বয়স্ক দাদা-দাদি, নানা-নানীদের সঙ্গে তাদের ভাব প্রকাশের যে ব্যবধান সৃষ্টি এই তথ্যচিত্রের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী অর্ক ভট্টাচার্য, সূচনা দাস বাঁধন, অদিতি জহির, ব্রতী দাসদত্ত, জ্যোতি দত্ত পুরকায়স্থ, কৃত্যা চৌধুরী, সুবর্ণ চৌধুরী এবং চিত্তা চৌধুরীর সাবলীল সঞ্চালনা এবং পরিচালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি ইংরেজিতে উপস্থাপন করা হয় সব ভাষাভাষীদের সুবিধার্থে।
শেষ হয়েও যেন তার রেশ শেষ হলো না এমন একটি অনুভূতি জেগে উঠলো মাতৃভাষা উৎসবের এই আয়োজনের শেষলগ্নে।







