১.
রমা চৌধুরী চলে গেলেন। আমার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে। সে সূত্রে দিদির সাথে চেনাজানা ছিল। এই শহীদ জননীকে দেখতাম সকাল ১১টার দিকে খালি পায়ে কাপড়ের একটা ব্যাগে করে কিছু বই নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। সারা শহর ঘুরে ঘুরে সুধীজনের কাছে সেই বই বিক্রি করে বেড়াতেন। অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক বয়স্ক মহিলার অনুরোধ ফেলতে পারতেন না। তার বই কিনতেন। আমার কাছে বিষয়টা খুব একটা সুখপ্রদ মনে হতো না। আমি প্রায় দিদিকে বিষয়টা নিয়ে আপত্তি জানাতাম। উনি হেসে বলতেন, ‘আমার বই বেচবে কে?’ কথাটার মর্মার্থ তখন বুঝিনি। এখন বুঝতে পারছি। কথাটা প্রায় আমার কানে বাজে। এখন নিজে বই লিখি। দুটো বই আমার প্রকাশিত হয়েছে। একটা বাজারে নেই। আরেকটা গেলো বইমেলায় মাত্র এসেছে। কিন্তু এক প্রকার সেটাও বাজার আউট। চট্টগ্রাম থেকে লোকে ফোন করে, ‘তোমার বই কই পাই?’ সিলেট থেকে ফোন করে। খুলনা রাজশাহী মাগুড়া… আমি আর তালিকা দীর্ঘ করতে চাই না। দেশের যে ক’টি প্রতিষ্ঠিত পুস্তক বিপনী আছে, তারা ব্যস্ত গুটিকয়েক লেখক নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে নবীন লেখকদের সেখানে প্রবেশাধিকারই নেই। বাজারে বই-ই পাওয়া যায় না, তারপরও প্রকাশকদের অভিযোগ, বিক্রি হচ্ছে না। আমার শেষ বইটি মেলাতেই সাড়ে ৪শ কপি বিক্রি হয়েছে। পাঠকের ভালো সাড়াও পেয়েছিলাম। শুধু দুর্বল বিপণন ব্যবস্থার কারণে মিডিয়ার আশীর্বাদ থেকে দূরে থাকা লেখকরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। তাও বাঁচোয়া, অনলাইন বুকশপ এসে গেছে। রমাদি তো সেই সুযোগও ব্যবহার করতে পারেনি। তার অসহায়ত্ব মর্মে মর্মে এখন উপলব্ধি করছি।
২.
রবীন ভাই (রবীন আহসান) লোকটাকে আমার কেন জানি বিশেষ পছন্দ। তার সাথে কোন লেনদেন হয়নি কখনো। বইমেলায় দুয়েকবার কথা হয়েছে এই যা। তিনি শ্রাবণ প্রকাশনীর মালিক। ম্যান অব বরিশাল। তিনি অকপটে বলেন, তিনি ঢাকায় এসেছেন নাম ফুটাতে নয়, পেটের অন্ন যোগাতে। যদিও এটা তার বিনয়, কিন্তু এ স্পষ্টবাদিতাকে আমি সম্মান জানাই।
কিন্তু তাকে বিশেষ পছন্দের কারণ ভিন্ন। তিনি কাঠখোট্টা বই-ব্যবসায়ী হয়ে বসে থাকেননি। প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতেই তার অবস্থান স্পষ্ট ও কর্মমুখর। সম্প্রতি তিনি বিরাট একটা কাজ শুরু করেছেন। যা সত্যি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তিনি ট্রাকে করে বই নিয়ে দেশের জেলা শহরগুলোতে ছুটে বেড়াচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৩০ টি জেলা তিনি কাভার করেছেন। এই মুহূর্ত তিনি বাংলাদেশের প্রকাশকদের কাছে একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বটে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের মধ্যে এ ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগের খুব অভাব লক্ষ্য করা যায়। তারা মনে করেন বই বিক্রি সম্পূর্ণ লেখকের উপর নির্ভরশীল। লেখকের নাম হলে, লেখা পড়ে ভালো লাগলে- লোকে বই কিনবে। কিন্তু লেখক আর পাঠকের মধ্যে যে মেলবন্ধনের দায় প্রকাশকের, সে কথাটাই তারা ভুলে গেছেন।
৩.
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প বহুলাংশে ‘মোরগা জবাই’য়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিক্রি স্বল্পতার অজুহাতে লেখকের বই লেখকের কাছে বিক্রি করে মুনাফা তোলার সহজ প্রক্রিয়ায় চলে গেছেন প্রকাশকরা। তাহলে প্রকাশক আর ছাপাখানার মালিকের মধ্যে পার্থক্য রইলো কি?
প্রকাশকের কাজ নতুন নতুন লেখা ও লেখক খুঁজে বের করা। পাঠকের অভিরুচি লক্ষ্য করে বিভিন্ন পদের বই প্রকাশ করা। তা পাঠকের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা। সব যে জনপ্রিয় হবে তাও না। কিছু বই প্রকাশিত হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। আর লাভ লোকসান তো থাকবেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রকাশক সম্প্রদায় চলে গেছেন সেইফ সাইড গেইমে। নয়টা পাঁচটা সরকারি চাকরির মতো। কোন লস না দিয়ে যতটুকু লাভ করা যায়। কিন্তু ঝুঁকি না নিলে তো ব্যবসায় বড় লাভের মুখও দেখা যাবে না। ফলে এই ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতির কারণে বাংলাদেশের পুস্তক বিপণন শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। কিন্তু কতোদিন এভাবে চলবে বাংলাদেশের প্রকাশকরা? একসময় লেখকরাই যদি নিজেরাই সংগঠিত হয়ে কিছু করে ফেলে! তারা প্রকাশকের কাছে না গিয়ে নিজেরাই বই ছাপিয়ে নিজেদের বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে বই বিক্রি করা শুরু করে দেয়!
৪.
এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থার কর্মকাণ্ড আমরা দেখতে পাই। এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যেন ঐতিহ্যবাহী, তেমনিই পাঠপ্রিয়। তারপরও তারা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সর্বদা সক্রিয় থাকে। এরা নিয়মিত সাহিত্য সভা করে। পাঠের আসর করে। ছোট ছোট মেলা করে। লেখকদের জন্মদিনগুলো অভিনব উপায়ে সেলিব্রেট করে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের এ নিয়ে এখন নতুন করে ভাবা উচিত। সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতির কাছে অনুরোধ থাকবে, এমন একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন, যাতে একটা বই প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে দেশের ৬৪ টি জেলায় অন্তত ৫ টি কপি করে হলেও যেন যায়। বই বিক্রির তথ্য ও মূল্য আরোপন যেন একটি নীতিমালার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়। চুক্তিবদ্ধ না হয়ে যেন কোন বই না বের হয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








