দেশের তৈরি পোশাক কারখানার মালিকেরা সরকার থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেয়ার পরও প্রতিদিন মজুরি বাবদ শ্রমিকদের প্রায় ৯ কোটি টাকা কম মজুরি দেন বলে অভিযোগ করেছেন নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইসরাফিল আলম।
বুধবার রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনে শ্রমিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)-২০১৭ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগ আয়োজিত ওই আলোচনা সভায় তিনি এই অভিযোগ করেন।
ইসরাফিল আলম বলেন: পোশাক কারখানা মালিকেরা চাইলেই তাদের রেয়াত, প্রণোদনা দেয় সরকার। কিন্তু এসব কাদের টাকা? সরকারের নয়, আওয়ামী লীগেরও নয়। এটা জনগণের টাকা। তাদের এসব দিতে পারলে শ্রমিকদের পাশে কেন দাঁড়ানো যায় না?
তিনি বলেন: পোশাক খাতে বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা যদি ৩৫ লাখ ধরা হয়, আর প্রতিদিন যদি তাদের ২৫ টাকা করে কম দেয়া হয়, তাহলে প্রত্যেকদিনই ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মজুরি কম দিয়ে তা শোষণ করে নেয় মালিক পক্ষ।
এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন: শ্রমিক ১০/১৫ দিন কাজ করে কোনো কারণে চলে গেলে তাকে ওই কয়েকদিনের মজুরি দেয়া হয় না। কোনো কোনো কারখানা বন্ধ করে দিযে পুরো মাসের মজুরি খেয়ে ফেলে। আবার কেউ মাসের ২০ বা ২৫ তারিখে যোগদান করলে ওই কয়েক দিনের মজুরি না দিয়ে পরের মাস থেকে তাকে মজুরি দেয়া হয়। আর এইভাবেই শ্রমিকদের শোষণ করে মালিক পক্ষ।
‘সবচেয়ে বেশি আয় করেও কম আয়কর দেন পোশাক মালিকরা’ এনবিআর এর বরাতে এমন তথ্য জানিয়ে ইসরাফিল আলম বলেন: প্রতিবছরই পোশাক ব্যবসায়ীদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়, যা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলেই পাওয়া যায়। অথচ ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে বলে বারবার তারা (ব্যবসায়ী) বলে আসছে।
তিনি বলেন: পোশাক ব্যবসায়ীদের সব ধরনের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। যেমন উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে ০.২৫ শতাংশ নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ তারা বন্ডেড ওয়্যার হাউজ সুবিধার অপব্যবহার করে পণ্যের মূল্য কোনো ক্ষেত্রে কম কোনো ক্ষেত্রে বেশি দেখিয়ে বিদেশে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা পাচার করেছেন।
শ্রমিক লীগের সাবেক এই নেতা বলেন: বাংলাদেশে যে শ্রম আইন রয়েছে সেখানে শ্রমিকের সব ধরনের নিরাপত্তার বিষয়ে বলা আছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। তাহলে আইন করে কী লাভ? এখনো শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেয়া হয় না। শুধু আইডি কার্ড দেয়া হয়। একজন মালিকের অনেকগুলো কারখানা হয়েছে। দেশে-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের কিছুই হয়নি। তারা সারাজীবন শ্রম দিয়েই যাচ্ছে। তাদের ভাগ্যের কী পরিবর্তন হলো?
‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মজুরি ১৬৬০ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকায় উন্নীত হলো। কিন্তু জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে। খাদ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন ব্যয় সব ধরনের ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু তুলনামূলক মজুরি বাড়েনি। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে মজুরি বাড়েনি বরং কমেছে’, বলেন ইসরাফিল আলম।

তিনি বলেন: আমরা বলছি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং মানসম্মত কারখানা বাংলাদেশে। অথচ সবচেয়ে কম মজুরিও এখানে। বর্তমানে এলাচের দাম ৪ হাজার টাকা। সব পণ্যের দাম বাড়ছে কিন্তু তাদের মজুরি বাড়েনি। তাদের যে পরিমাণ ক্যালরি দরকার তা তারা পাচ্ছে না। ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে কাজ করে তারা মালিকদের উন্নয়নে শ্রম দিচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পর দেখা যায় তারা অর্থের অভাবে, সুচিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে।
পোশাক কারখানা মালিকদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন: পোশাক শিল্পে যতগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ ও উম্নয়ন হয়েছে তার সবগুলোই বিদেশিদের অর্থাৎ ক্রেতাদের চাপেই হয়েছে। নিজ উদ্যোগে বা সরকারের উদ্যোগে হয়নি। যদিও আমি সরকারের একজন সংসদ সদস্য তবু বলতে হয়, এটা পুরোপুরি সত্য কথা।
শ্রমিক সংগঠনগুলোকে মালিকদের দালাল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন: বলতে লজ্জা হয় যে, শ্রমিক সংগঠনগুলো মালিকদের পকেটে থাকে। তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা না বলে মালিকদের পক্ষে বলেন। আপনারা (শ্রমিক) সব কারখানায় আন্দোলন করলে ন্যায্য পাওনা দিতে বাধ্য হবে। তবে সর্বোচ্চ আন্দোলন করতে হবে। এর বিকল্প নেই। মালিকদের দালালি করে কখনোই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় করা যাবে না।
অনুষ্ঠানে পোশাক কর্মী, পোশাক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থার প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।








