আসামি পক্ষ হতে উত্থাপিত ‘আইনগত কিছু প্রশ্ন’ নিষ্পত্তি হওয়ার পরই পিলখানা হত্যা মামলার শুনানি হাইকোর্টে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এছাড়া মামলার কিছু খালাসপ্রাপ্ত আসামি এবং কম দণ্ড হওয়া কিছু আসামীর দণ্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ফের আপিল করবেন বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের আট বছর পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টে বিচারাধীন এই মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু আসামি আইনগত কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যে, ইতিমধ্যে তাদের বিদ্রোহ মামলায় সাজা হয়েছে, আবার যদি এই হত্যা মামলায় তাদের সাজা হয় তাহলে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন হবে কি না?’
অ্যাটর্নি জেনারেল এই মামলার আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ‘এই হত্যা মামলায় আইনগত কিছু জটিলতাও দেখা দিয়েছে। যেমন একই সাক্ষীতে কিছু লোকের ফাঁসি হয়েছে আর কিছু লোকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আবার কিছু লোকের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এসব বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তাই উত্থাপিত ওইসব আইনগত প্রশ্নের নিস্পত্তি হতে হবে। উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে আদালতকে আমাদের সন্তস্ট করতে হবে। তারপরই এই হত্যা মামলার শুনানি হাইকোর্ট শেষ হবে বলে আমি মনে করি।
বর্তমানে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিও শেষ পর্যায়ে। সামনে আইনগত প্রশ্নের উপর শুনানি হলেই রায়ের পর্যায়টি আসবে। তাড়াহুড়ো করে এই মামলা শেষ করা করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে মাহবুবে আলম আশাবাদ জানান যে, এ বছরের মধ্যেই হয়তো হাইকোর্টে মামলাটির বিচারকাজ শেষ। কিছু আসামীর সাজার বিষয়ে আপিল করার কথাও ভাবছে রাষ্ট্রপক্ষ।
সর্বশেষ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের করা আপিলের ওপর শুনানি ২ এপ্রিল ২০১৭ পর্যন্ত মুলতবি করেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মুলতবির আদেশ দেন। এই মামলার ৩৫৯তম দিনের (কার্যদিবস) মত শুনানিও ওইদিন অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ চলাকালে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত করা হয়। এবং মামলার বিচার চলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠসংলগ্ন অস্থায়ী এজলাসে।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর বিএনপির সাবেক সাংসদ নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু (মারা গেছেন), স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেন আদালত।
ওই রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের ‘ডেথ রেফারেন্স’ হাইকোর্টে আসে। সেই সাথে আসামিরা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। এদিকে বিচারিক আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ জনের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে রাস্ত্রপক্ষ।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এই মামলা শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন বলে জানান এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কে এম জাহিদ সারওয়ার।








