প্যারিসে পা রাখলেন স্থানীয় সময় বেলা তিনটায়। প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পিএসজির সদর দপ্তর পার্ক দেস প্রিন্সেসে। ভক্তকুলের অপেক্ষা তো ছিলই, অধীর হয়ে ছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। নেইমারও তাদের হতাশ করেননি। পিএসজি আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তিনি মনের দুয়ার খুলে দিয়েছেন। দলবদল, অর্থের ঝনঝনানি, পরিকল্পনা, লক্ষ্যের পাশাপাশি বলেছেন সাবেক ক্লাব বার্সেলোনা ও সেখানকার ভক্তদের নিয়েও।
সংবাদ সম্মেলনের সামান্য অংশেই থাকল বার্সা প্রসঙ্গ। তাতে জুড়ে থাকল ভক্তদের ছুঁড়ে দেয়া অর্থলোভী প্রসঙ্গটি। অবশ্য বার্সা-ভক্তদের শান্ত করার মত কথাই বলেছেন নেইমার, ‘অর্থের পিছনে ছুটলে অন্য কোথাও যেতে পারতাম, অন্য দেশে, ক্লাবে। খুবই দুঃখজনক যে মানুষ এটা বলছে। সব খেলোয়াড়ের ক্লাবে থেকে যাওয়া বা ছাড়ার জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে আমি আনন্দিত, পিএসজি আমার উপর আস্থা রাখছে।’
বৃহস্পতিবার ২২২ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে পাঁচ বছরের জন্য পিএসজিতে নাম লিখিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী নেইমার। প্যারিসের ক্লাবটির হয়ে শনিবার রাতেই লিগ ওয়ানের প্রথম ম্যাচ নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ব্রাজিলিয়ান তারকার।
অর্থের জন্য নয়, ট্রান্সফার ফির রেকর্ড গড়তেও নয়। তবে কী জন্য বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে নাম লেখানো? নেইমার খোলাসা করলেন সেটিও, ‘যারা অন্যভাবে বলছে, তারা আমার জীবন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। কখনই অর্থ দ্বারা প্ররোচিত হইনি। হৃদয় যা বলেছে, সেটাই শুনেছি। মানুষ হয়তো অন্যভাবে ভাবছে। এখানে নতুন শিরোপা ও নতুন চ্যালেঞ্জগুলোর জন্যই এসেছি। আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে আরও বড় স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা।’
সেসময় পাশে বসে থাকা ফ্রেঞ্চ ক্লাবটির সভাপতি নাসের আল খেলাফিও বললেন নেইমারের মত করেই, ‘নেইমার এখানে এসেছে পিএসজির একটা পরিকল্পনা আছে সেটায় বিশ্বাস করে বলে। সে অন্য কোথাও গেলে এর চাইতেও বেশি অর্থ পেত। সে বার্সেলোনার খেলোয়াড় ও সমর্থকদের সম্মান দেখিয়েই স্পেন ছেড়েছে।’
বার্সাকে সম্মান জানিয়ে আসার কথা মুখ ফুটে বলতে হয়েছে নেইমারকেও। সামনে এসেছে বার্সার সাবেক তারকা লুইস ফিগোর প্রসঙ্গও। ২০০০ সালে গ্যালাকটিকো গড়ার সময় বাই আউট ক্লজের ৪ কোটি ১৫ লাখ ইউরো দিয়ে ফিগোতে ভাগিয়ে নিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। সেটা ওই সময়ের রেকর্ড ট্রান্সফার।
দল বদলে সেসময় বার্সেলোনার সমর্থকদের রোষানলে পড়ছিলেন পর্তুগিজ ফিগো। ফিগোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গে নেইমার বললেন, ‘আমি খারাপ কিছু করিনি। কেউই বাধ্য নয় যে, কেবল একটি ক্লাবেই থাকবে। আমি বার্সাকে সম্মান জানিয়েই এখানে এসেছি।’
প্যারিসে আসার পেছনে শুধু নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাই ঘুরেফিরে বলেছেন নেইমার। বার্সেলোনায় নিজেকে একজন বড় তারকা মনে করতে পারেননি বলে যে সমালোচনা, সেটাকেও পাত্তা দিচ্ছেন না। ফ্রান্সেও তারকাখ্যাতি খুঁজতে চান না। তবে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে আসার সিদ্ধান্তটি জীবনের অন্য সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিনই ছিল বলে জানালেন।
শহরটিতে এসে সবকিছু তার বাড়ি ফেরার মত অনুভূতি দিচ্ছে। নতুন ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামতেও তর সইছে না নেইমারের, ‘নতুন সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন শুরু করতে আমি অধীর হয়ে আছি। আরও বড় কিছু চাই, আরও বড় চ্যালেঞ্জ, আরও শিরোপা চাই। আমার হৃদয় এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছে বলেই এখানে এসেছি।’
সব ভেবে বার্সা ছাড়ার কঠিন সিদ্ধান্তটা যখন নিয়েই ফেলেছেন ব্রাজিলিয়ান ওয়ান্ডার বয়, তখন মন সামান্য হলেও পোড়াচ্ছে। তবে সেটাকে আটকে রাখছেন পেশাদারিত্বের খোলসে, ‘বার্সেলোনা শহর ও দলের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছিলাম। সেখানে অনেক বন্ধু আছে। সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না। অনেক ভেবেছি। বার্সা সতীর্থদের প্রতি ধন্যবাদ জানাই। তারা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। চারটা বছর আমি সুখেই ছিলাম। সেখানে অনেক বন্ধু রেখে এসেছি।’
নেইমার সান্তোস থেকে বার্সায় এসেছিলেন ২০১৩ সালে। কাতালানদের দলে নাম লিখিয়ে হয়ে ওঠেন অপরিহার্য সদস্য। মেসি-সুয়ারেজকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আক্রমণভাগ। চার বছর পর শেষ হল নেইমারের সেই বার্সা অধ্যায়।
ন্যু ক্যাম্পে এসে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে ১০৫টি গোল করেছেন নেইমার। কাতালান ক্লাবটির হয়ে দুটি লা লিগা, তিনটি কোপা ডেল রে ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ মোট ৮টি শিরোপা জিতে গেলেন।
২০১৫ সালের বর্ষসেরা ফুটবলার হওয়ার লড়াইয়ে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেছনে থেকে তৃতীয় হন ব্রাজিলের এই ফরোয়ার্ড। গত অক্টোবরে কাতালান ক্লাবটির হয়ে পাঁচ বছরের নতুন চুক্তিতেও এসেছিলেন। কিন্তু সব ছিন্ন করে আইফেল টাওয়ারের দেশে এখন পিএসজির খেলোয়াড় তিনি।









