প্রতিবছর ঈদ আসলেই মনে পড়ে ছোটবেলার ঈদের কথা। আমার ছোটবেলার ঈদের দিনগুলো কেটেছে পার্বত্য এলাকায়। যেখানে বাঙালি পরিবার মানেই শরণার্থী। অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে সবাই নিম্নবিত্ত। ঈদের কেনাকাটা চলতো গ্রামের হাট-বাজারগুলোতেই।
তাতেই খুশি থাকতে দেখেছি সবাইকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকার কারণে দূরে কোথাও কেউ খুব একটা যেতো না। আশপাশের গ্রামেই স্বজনদের বাড়ি বাড়ি ছোটদের দল বেঁধে বেড়ানোও ছিল একটা মহাআনন্দের ব্যাপার। মনে পড়ে ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে ৭ মাইল হেঁটেও বেড়াতে গেছি। ঈদের সেলামিতে পাওয়া ৩ টা হরিণের ছবিওয়ালা সেই এক টাকার একটা নোট যে খুশি দিতো এখনও ভাবলে মনে অন্যরকম আনন্দে ভাসি। তখন সবার মাঝে দেখতাম একই রকম খুশি।
মনে পড়ে রোজা আসলেই ঘরে ঘরে একটা সাধারণ দৃশ্য খো যেতো। গৃহিনীদের হাতে সেমাই বানানো। বাজারের সেমাই যে কেনা হতো না তা নয়। তবে হাতে বানানো সেমাইয়ের যেনো একটা আলাদা কদর ছিল।
পার্বত্য এলাকায় বেড়ে ওঠার কারণে আমাদের অনেক সহপাঠী বন্ধু-বান্ধব ছিল আদিবাসী। কিন্তু তখন তাদেরকে বাঙালিদের কোনো উৎসবে সামিল হতে দেখিনি। আমরা নিজেরাও তাদের উৎসবে যোগ দিতাম না। তবে এখন দিন পাল্টেছে। পাল্টেছে দৃশ্যপটও।
এখন বাঙালিরা সাংগ্রাই উৎসবে যায়। ওরাও ঈদ আনন্দে সামিল হয়। আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে পাহাড়ের গহীনে থেকেও কিশোরীরা পাখি, কিরণমালার নামধারী পোশাক আর গৃহিণীরা রাশি রাশি শাড়ির খবর রাখেন। বাচ্চারা বায়না ধরে। না হলে যেনো ঈদটাই মাটি।
এসব কেনার জন্যে তাদের এখন আর সেই গেয়োঁ হাটবাজারে যেতে হয় না। তাদেরও যেতে হয় শহরের অভিজাত বিপণি বিতানগুলোতে। কারণ তারা নিম্নবিত্ত শরণার্থী থেকে এখন নিম্নমধ্যমধ্যবিত্ত নাগরিকে পরিণত হয়েছে। শরণার্থী এখন কেবল কাগজে কলমে।
দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের আশির দশকের বাঙালি শরণার্থীদের সামাজিক আচার ও সংস্কৃতি এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কিছু ভালো থেকে মন্দ হয়েছে আবার কিছু মন্দ থেকে ভালো। আর এসব পরিবর্তনের যাঁতাকলে পড়ে হারিয়ে গেছে মানুষের প্রতি মানুষের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহানুভুতি। ইট-পাথরের শহুরে সংস্কৃতি ঢুকে কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ের সবুজ সহজ সারল্য। এই সবুজের ভেতর এখনও খুঁজি সহজ সরল মানবিক মূল্যবোধ।






