বাংলাদেশে যারা আইন ও বিবেকের চোখে অপরাধী হয়ে ফাঁসিতে ঝুললো তারা পাকিস্তানের চোখে হয়ে গেল তাদের সুহৃদ। যেমন এসব বিচারের রায়ে বাংলাদেশে হয় আনন্দ মিছিল আর পাকিস্তানে হয় শোকের মাতম! তাদের কাউকে তারা উপাধিও দিয়েছে নিশান-ই পাকিস্তান। তারা এদেশের খেয়েছে এদেশের পরেছে। এদেশের রাজনীতি করে এমপি মন্ত্রী হয়েছে কিন্তু তারা যে এদেশের ছিল না তা খোদ পাকিস্তানই স্পষ্ট করে দিল। সম্প্রতি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর কর্তৃক সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে সেদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৭ সালের ২০ নভেম্বর পাকিস্তানের করাচিতে। এজন্যই তাকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রদানের দাবি তুলেছেন পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর সিরাজুল হক। ২৫ নভেম্বর লাহোরে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি এই কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, তারেক জিয়ার নেতৃত্বে পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের আন্দোলন নতুন করে শুরু করা উচিত। না হলে বাংলাদেশে জামায়াত বিপন্ন হবে। ‘তবে কি পাকিস্তান পুনরুদ্ধার করে জামায়াতকে রক্ষা করার বুদ্ধি হচ্ছে?
আর নতুন করে শুরু করার কথায় তো এটাও স্পষ্ট হয় যে এরকম প্ল্যান প্রোগ্রাম অতীতেও হয়েছিল। পাকিস্তানের দলিল পর্যালোচনায় দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তীকালে তিন শতাধিক পাকিস্তানী (বাঙালি) নাগরিককে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে। আরও শোনা যায়, তারেক রহমানের পিতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তান শত্রু তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেনি। কিন্তু কেন? তিনিতো মুক্তিযুদ্ধের এগারটি সেক্টরের একটি সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। তার দল বিএনপি তো তাকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে। তবুও তিনি কেন তিন শতাধিক এর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হননি?
এ তালিকায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও কর্নেল ওসমানী প্রমুখ। আরও শোনা যায়, মেজর জিয়াকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মেজর জিয়া ছিলেন একজন স্বাধীন দেশের সেনা কর্মকর্তা। অন্য একটি দেশের পদস্থ নাগরিককে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা কতটা সঙ্গত? তবে কি এতদিন তাকে ঘিরে পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেছিল তারা?
১৯৭২ সালে এসে তাদের কি স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছিল? কেন ও কী ঘটেছিল তখন? আর যদি পাকিস্তান এমন স্বপ্ন দেখেই থাকে, তবে তাদের এ স্বপ্নের ভিত্তি কী ছিল? স্বাধীনতার এত বছর পরে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে সেদেশে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রস্তাব ও পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের এই দিবা স্বপ্ন কেন, কী উদ্দেশ্যে? তারেক রহমান কি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন? এ ব্যাপারে তার বক্তব্য জাতি প্রত্যাশা করে। তিনি একটি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান। দলটি জনরায় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও গিয়েছে। এ ব্যাপারে দলের বক্তব্যও আবশ্যক।
সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। নিজে ধর্ম কর্ম না করেও কেউ কেউ হয়ে গেছেন মুসলিম জাতীয়তাবাদের নেতা। মুহম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেও তেমন ধর্মীয় আচার বিধি মেনে চলতেন না বলে শোনা যায়। কিন্তু রাজনীতিতে একেবারে সাচ্চা মুসলমান! ওরা হিন্দু আমরা মুসলিম এই সেন্টিমেন্টে পরধর্মে বিদ্বেষ জাগিয়ে মুসলিমদের কাছাকাছি যাওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। হুজুগ আর গুজবই ছিল তাদের রাজনৈতিক প্রধান অস্ত্র। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই মিথ্যা প্রচারণা ও গুজব তুলে আদমজী পাটকল শ্রমিকদের লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল লাঙ্গলবন্দের মেলায় আসা নিরীহ স্নানার্থীদের উপর। শতশত হিন্দু নারী পুরুষ শিশু এ হামলার শিকার হয়েছিল।
১৯৬৫ সালে রায়ট হল। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় রক্তাক্ত হল গোটা ভারতবর্ষ। পাকিস্তানে বসবাসরত হিন্দুরা প্রাণভয়ে ভারতে চলে গেল। আর তাদের রেখে যাওয়া সহায় সম্পত্তিকে বলা হল শত্রু সম্পত্তি। তার মানে তারা এতদিন শত্রু হিসাবেই পাকিস্তানে বসবাস করছিল। তারা চলে যাওয়ায় শত্রু মুক্ত হল পাকিস্তান। আর শত্রুর সম্পত্তি হল রাষ্ট্রের সম্পত্তি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, দেশ স্বাধীনের পরও এই সব সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তিই বলা হত। এখন বলা হচ্ছে অর্পিত সম্পত্তি। কারা করল এ অর্পণ?
একটি পরধর্ম বিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক হুজুগ আজকের বাংলাদেশেও ব্যাপক ভাবে আছে। রসরাজ ইস্যুতে হিন্দুদের উপর হামলা হল ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নাসির নগরে। টিটু রায় ইস্যুতে রংপুরের পাগলা পীর এলাকায়।
এগুলো কি পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের দিবাস্বপ্নের ফল নয়? পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর তারেক রহমানকে দিয়ে পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের খায়েশ ব্যক্ত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় তারেক রহমান ও তার দল নিরব থাকল। অথচ এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। নাকি তারা পাকিস্তানের এই খায়েশকে স্বাগত জানিয়েছেন?
পাকিস্তান পুনরুদ্ধারের দিবাস্বপ্ন দেখনেওলারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন? দেশটাকেও বা কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন তারা?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








