পাঠক জানেন মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গাঙ্গেয় বঙ্গেয় অববাহিকায় ‘খাম্বা’ কথাটি কখন বাজার বেজায় গরম করেছিলো! খৃষ্ট অব্দের একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ২০০১-২০০৬ আমলে একজন ‘হাওয়াই যুবরাজ’-এর নির্দেশনায় বিদ্যুতের জন্য শুধু ‘খাম্বা-খাম্বা’ রব উঠেছিলো। বিদ্যুৎ হোক না হোক, আমাদের চাই খাম্বা। তারপর সেই ‘হাওয়াই’ আমল হাওয়াতে মিলিয়ে যাবার পর ২০০৮ সালেতে সমগ্র উন্নয়নকর্ম রীতিমত ‘বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট’ হয়ে গেলো। ‘চাই বিদ্যুৎ চাই বিদ্যুৎ’ বলে রব উঠলো। অতঃপর নুন আনতে পান্তা সংকট। খাম্বা ফুরায়, বিদ্যুৎ লাইন শুধু বাড়েই আর বাড়েই। বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ে পাঁচগুণ, লোডশেডিং কমে পাঁচ ভাগের এক ভাগ। পাটিগণিতের যাদববাবু আর শুভংকর মশাই এমত পরিস্থিতিতে যুগপৎ মাঠ পরিদর্শনে এসে মাথা ঘুরিয়ে পড়েন। অতঃপর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সেই যে হাওয়ায় মিলিয়ে যান, কোনোই খবর নেই। হাওয়া, ও হাওয়া।
তবে আদম সন্তানদেরতো আর বসে থাকলে চলবে না। তারা রাষ্ট্র চালাবে, রাষ্ট্রসংঘ চালাবে, জোট চালাবে, ঘোঁট চালাবে, নোট চালাবে, বুলেট চালাবে, কাঁদানে গ্যাসে রেটিনা ফাটাবে। শান্তি দূত-তারকা সম্পাদক জুটি বিশ্ব ব্যাংক দফতরে গিয়ে পদ্মাসেতুর খাম্বা না বসানোর তদ্বির-আব্দার জানাবে। রামপাল অঞ্চলটির নাম রাষ্ট্রসংঘে পর্যন্ত জানাজানি হবে। কয়লার ময়লায় রাজনীতি বিষাক্ত হবে। ক্ষমতাসীনরা হিম্মত আর হেকমত একত্র করে যা ধরে রাখবে তার নাম ‘গোঁ’। বিতর্কমূলক প্রকল্পটি দশটি কিলোমিটার সরিয়ে নিলে এতোকালের বিশ্ব উন্নয়নের টুটা ফুটা আকাশের ওজোন-ওজনের যে কিচ্ছুই হেরফের হবেনা, সুন্দরবন-আমাজন জঙ্গলের জন্য তেমন মঙ্গল সংবাদ পৃথিবীর কেউই যে দিতে পারছেনা। তবুও ‘গোঁ’ টুকু ছেড়ে দিলে কী হয় হে নীতিপ্রণেতাবৃন্দ! মাত্র দশটি কিলোমিটার সরিয়ে সুন্দরবন ধ্বংসের ‘মহাঅভিযোগ’ থেকে রেহাই নিন না হে পাওয়ার-টাওয়ার ক্ষমতাসীন মহাজনেরা। একটু নমনীয়-বিনয়ী হলেতো ‘কুছ শরম নেহি’!
ঐসব কথা থাকুক। ফিরে আসি এবার রাষ্ট্রের আসল খাম্বার কথায়। আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাধারণ অ-আ তে জানি রাষ্ট্রের তিন তিনটি প্রকাণ্ড, জোরদার এবং গভীর খাম্বা। এক. আইন তৈরির কারখানা তথা সংসদ। দুই. কাম কাজ চালাবার নির্বাহী বিভাগ। তিন. সব কুছ ঠিকমতো চলছে কিনা, তা দেখভাল করার আম্পায়ার-রেফারি বিচার বিভাগ। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক আরেকখান খাম্বা হলো গণমাধ্যম।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রখানি জন্মের পর থেকেই ঐ বিচার বিভাগটির ‘স্বাধীনতাহীনতা’ নিয়ে গজগজ-গজগজ চলছেই। তিনজন জেনারেল এসেছেন, দুইজন দূর্গ-সালসা দিয়ে দুইটি দল গড়েছেন, আরেকজন ফুরসৎ পাননি। তিনজনই কার্যত বিচার বিভাগকে কুকর্মের সঙ্গী করেছেন। রাজনীতি আসলেই তাই প্রথম জেনারেলের হুংকার-হুকুমমতো ‘ডিফিকাল্ট’ হয়ে গেছে। রাজনীতিতে টোপ-প্রলোভনের ‘হিজবুল বাহার’-এর জয়জয়কার। ‘ত্যাগী রাজনীতিবিদ’ ক্রমশ বিরল প্রজাতিতে পরিণত হয়ে গেলো। মুক্তিযুদ্ধের নামেই বলুন, ধর্মবাণিজ্যের নামে বলুন, আজ চেতনা বাণিজ্যের মেঘ বিস্ফোরণে ভেসে গেছে পথঘাট, চরাচর সবকিছু। দেশে উন্নয়নের ‘তরঙ্গ’ নিয়ে যে যতো রঙ্গতামাশাই করুন, অবকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে ব্যঙ্গের কিছুই নেই। ফলে বাজারে নেমেছে কাঁচা পয়সা। পৃথিবীতে ‘দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন’ হলো ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ প্রবচনের মতোই। সুতরাং উন্নয়নের প্রবাহে যোগ দাও, ক্ষমতাসীন স্রোতধারায় ভেসে যাও, ‘তুফানের গতিতে’ মালপানি কামাও নৃশংস হার্মাদি পদ্ধতিতে। উন্নয়নের সব মহিমা বলতে গেলে ‘তুফানে’ তছনছ। এমনকি কতিপয় অধ্যাপক বুদ্ধিওয়ালাদেরও বুদ্ধিশুদ্ধি আউলাঝাউলা। এক পদ্মা সেতু যে দক্ষিণ বাংলার কোটি কোটি মানুষের জীবনকে কেমন করে বদলে দেবে, সেই সত্যটি উপেক্ষা করে, দশ পদ্মা সেতুতেও লাভ নেই বলে উক্তির বেহিসাবী লাফ দেখছি এপাশে ওপাশে। অথচ এক পদ্মা সেতু গড়তে গিয়ে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ যে বিরল ‘মেরুদণ্ড’ প্রদর্শন করেছে, তা প্রভুত প্রশংসা পাবার মতো। সেই প্রশংসাটুকুও বুদ্ধিওয়ালা, বাম বুঝদার কারো ভান্ডারে দেখিনি। বিশ্বব্যাংক তার আয়ুষ্কালে একটি ‘পুঁচকে’ দেশের এতো বড় ‘বেয়াদবি’র মুখোমুখি আর কখনো হয়েছে কী?
এমনি জটিল জটাজালের বর্তমানে রাষ্ট্রের মধ্যে খাম্বা-খাম্বি বিবাদের মেঘ ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। কখনো ঝড় কখনো ভয়াল বৃষ্টি। ‘তুই বড় না আমি বড়’ নামক এক কাইজা বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ভাইজা’ ফেলছে। ১৯৭২ সনে মাত্র নয় মাসে পৃথিবীর বুকের অন্যতম সেরা সংবিধান প্রণয়নের রেকর্ড আমাদের। সব সংবিধানই সংশোধিত হয়। বঙ্গবন্ধু সময় হারিয়ে দ্বিতীয় বিপ্লবের বাকশাল গঠনের অদ্বিতীয় গতিতে যখন এগিয়ে গেলেন তখন সংবিধান সংশোধিত হয় মারাত্মকভাবে। সেই বাকশালে আতাউর এবং জিয়াউর রহমানসহ অনেকেই যোগদান করেছিলেন। অতঃপর কিসিঞ্জারি ভয়ংকর চালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে কতিপয় দেশি দুর্বৃত্ত দ্বারা রোমহর্ষকভাবে হত্যা করে। এরপর পরপর দুই জেনারেল মিলে সংবিধানখানার যে দশা করে তাতে মুক্তিযুদ্ধের মূল বিষয়টিই ছোবড়া হয়ে পড়ে। ফলতঃ সংশোধনী আর সংশোধনী। বর্তমান জাতীয় সংসদ সংবিধানের ষোল নম্বর সংশোধনী করে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা হাতে নিলে রাজধানী ঢাকার প্রধান ঈদগাহের পাশে বিশাল চুল্লির কড়াইয়ে তেল আর বেগুন একসাথে জ্বলে উঠল। এক সময় ওই আগুনে পুড়ে গেলো সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী। স্বয়ংক্রীয়ভাবে চালু হয়ে গেলো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবো আমরাই। এতে কারো নাক গলানো চলবে না বিধায় এক বিশাল বপু রায়-দৈত্য এসে খোদ সংসদ খাম্বাখানা নাড়িয়ে দিলো। আর সেই রায়ে ধান ভানতে পাটের গীত গাওয়া হলো বড়ই বেসুরো কণ্ঠে। সংসদকে বলা হলো বড়ই কাঁচা আর অপরিপক্ক। নির্বাহী বিভাগকে এমন ধোলাই দেওয়া হলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ ও শক্তিশালী ধোপাখানাটি ওই প্রধান ঈদগাহের পাশেই অবস্থান করছে। সংসদওয়ালাদের অস্তিত্ব এবং ইজ্জতের উপর এতো বড় হামলা কোনো সামরিক জেনারেল কিংবা বিচারকর্তারা কোনো দিনই করেনি। বলতে গেলে নির্বাহী বিভাগ ও সংসদওয়ালারা বেওয়াকুফ স্তব্ধ হয়ে গেলো। বাংলাদেশের প্রধান বিচারওয়ালা নিযুক্ত হবার সময় তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে সাম্প্রদায়িক প্রচারযন্ত্র মেতে উঠেছিলো, আজ তারাই মেতে উঠেছে পরম আনন্দে। আমাদের প্রধান বিরোধী দলের যেই মাজা ভাঙ্গা দশা হয়েছিল নানা কারণে তারাও হঠাৎ তাগড়া হয়ে উঠেছে। আর মহান বামের কিয়দংশ ক্ষমতাসীনদের বেহাল দশায় মুচমুচ চানাচুর চিবুচ্ছে। মূলত নির্বাহী বিভাগের প্রধান এতোকাল যেভাবে বিজয়ের দাপটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই গতিকে হঠাৎ রায়ের ঝড়ে বিদিশা হয়ে গেছে ভেবে নানা মহলে চলছে নাচন। প্রধান বিরোধী পক্ষ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিটি নিয়ে ভাঙ্গা কোমরখানি নিমেষে সোজা করে ফেলেছে। দুই খাম্বার লড়াইয়ে তাদের আজ আনন্দ আর আহ্লাদে আটখানা নয় আটশতখানা হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে খাম্বা-খাম্বি গ্যাঞ্জাম দেখে দেশের হিতৈষী মহলকে বড়ই বেচইন-ব্যাকুল-চিন্তিত হতে দেখা যাচ্ছে।
বিচার খাম্বার একটি পার্শ্ব খাম্বা রয়েছে। তার নাম আইন কমিশন। হঠাৎ সেই কমিশন ফোঁস করে উঠে ওই রায়ের আদ্যশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেছে। এবার ক্ষমতাসীন প্রধান বিচারকর্তা বনাম অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারকর্তার ‘কবি গানের লড়াই’ দেখে আমরা মুখ্য সুখ্য পাবলিকেরা টাসকা ভক্ষণ করছি। কোনটি তাহলে ঠিক! বিরোধী শিবিরের আইন শার্দুলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রধান বিচারকর্তার দরবারে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারকর্তার উপর দীর্ঘকালের ঝাল মেটাবার প্রয়াস পেয়েছিল। তাতে প্রধান বিচারকর্তার কেনো যেনো জল ঢেলে দিলেন।
এবার বলি আমাদের মত আইনজ্ঞানহীন বুদ্ধুদের কথা। আমাদের দেশটি এই দুনিয়ার অন্যতম সেরা সংসদ ভবন পেয়েছে। এটির রঙ মগজের মত ধূসর। এ পর্যন্ত এই ভবনে যতজন সংসদওয়ালা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, তাতে ওই ধূসর মগজের কতটুকু ব্যবহার হয়েছে সেটা আমরা বুঝব না। তবে পাকি আমল থেকে এই সংসদকে ‘অপরিপক্ক’ বলে বারংবার জেনারেলরা ক্ষমতায় হামলে পড়েছে। আমরা ঘর পোড়া পাবলিক। সিঁদুরে মেঘ তথা রায়-দৈত্যের দন্ত খিঁচুনি দেখে ঘাবড়ে গেছি। এবার আর ‘মাই ডিয়ার কান্ট্রি ম্যান’ বলে কোনো হুংকারের জন্য পয়েন্টের অভাব হবে না। সব আছে ওই রায়-দৈত্যের বালাখানায়। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারকর্তাতো বলেই ফেললেন সংসদ যদি অপরিপক্ক হয় তবে সর্বোচ্চ আদালতও অপরিপক্কই বটে। আমরা আম পাবলিক এই তর্ক বুঝব না।

আমরা সাদা চোখে যা দেখি তা হলো সংসদ চালনির অনেক ফুটো। সারা দেশে বহুকাল ধরেই বহু সংসদওয়ালাদের বহু কীর্তি কাহিনী আর কারবারের বিষয় চর্মচক্ষুতে লক্ষ্য করে আসছি অসহায়ভাবে। আর বিচার বিভাগ? একবার কোনো কিছুতে জড়িয়ে আদালতে গেলে যা দেখি তাতে উগ্র নকশালপন্থী হয়ে যাবার বিপদজনক ইচ্ছা জাগে। অন্য সবকিছু বাদ দিন, সর্বোচ্চ আদালত থেকে সর্বনিম্ন আদালত পর্যন্ত রায় বিক্রির যে গোপন মহোৎসবের কথা আদালতের প্রতিটি ইস্টকে শিলালিপি হয়ে আছে, কত বিচার প্রার্থী সাধারণের কত আর্তনাদ গুমরে গুমরে মরছে সেসব কাহিনী দিয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ক্রন্দন উপন্যাস রচিত হতে পারে। শুধু তিন খাম্বার কথা বলি কেনো। চতুর্থ ছোট খাম্বা তথা গণমাধ্যমে নানাভাবে সত্যকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে কত মালিক কত কর্মজীবী কত কিছু কামিয়েছে তা দিয়েও রগরগে উপন্যাস কম তৈরি না হয়ে পারে না। পেশাজীবী? ব্যবসায়ী? শিল্পপতি? দূর্গ? সবখানেই নৈতিক দুর্গতির এক অভাবনীয় জলসা। যাতে ঝলসে যায় সাধারণ পাবলিক।
অতএব বলি, বড় কথা বড় বাক্য, ধান ভানতে পাটের গীত সবকিছুতে খ্যামা দিন। অনেক রক্ত ঢালার স্বাধীন দেশে আমরা অনেক বড় বড় পদে গিয়েছি। সকলের বায়োডাটা গোপনে একবার দেখে নিন। ওয়েবসাইটে প্রতিবেশিসহ অন্যান্য দেশের বড় কর্তাদের বায়োডাটা দেখুন। লজ্জা যদি থাকে তবে কাটা জিহ্বায় বাংলাদেশ ভরপুর হয়ে যাবে। স্বাধীন দেশে মেজর থেকে মেজর জেনারেল, সঙ থেকে সংসদ সদস্য, বটতলার গেঁয়ো উকিল থেকে তৃতীয় বিভাগের ফলাফল নিয়ে অদ্বিতীয় পদে বিরাজ করার কত যে কাহিনী। এসব নিয়ে গীত গিবৎ গেয়ে কারোই লাভ নেই। বরং সবাই মিলে নতুন প্রজন্মকে যোগ্য করে তোলার জন্য কিঞ্চিৎ মনোযোগ দিলে আমরা বেঁচে যাই। নচেত খাম্বা-খাম্বির এই আত্মঘাতি কায়কারবারে আমরা দুনিয়াতে হাস্যকর এক দেশ ও জাতির পরিচয় নিয়ে ‘উদ্ভাসিত’ হবো- এটা নিশ্চিত। সকলের আক্কেল দাঁত গজিয়ে উঠুক এই প্রার্থনায় আজ এখানেই ইতি টানছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








