মতামত

পক্ষে থাকলে জায়েজ বিপক্ষে গেলেই কেন নাজায়েজ?

পক্ষে থাকলে জায়েজ বিপক্ষে গেলেই কেন নাজায়েজ?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাত ও নালিশের ঘটনা নিয়ে প্রিয়া সাহাকে নিয়ে বাংলাদেশে তোলপাড়৷ খোদ ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও মামলার হুমকি! ট্রাম্প বলেছেন, বাংলাদেশটি কোথায়? তিনি কেন বাংলাদেশ চেনেন না’- ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তাই ৬৪ জেলায় মামলার হুমকি দিয়েছেন একজন৷

সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন একটি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকের মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি নিজেকে ‘বাংলাদেশ ইসলামী যুব জোটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নেপোলিয়ন সুমন চৌধুরী’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। সাথে তিনি এও দাবি করেন, তার দল ক্ষমতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরীক, এবং তার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর। ভিডিওতে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগকে কিভাবে ক্ষমতায় আনা যায় তা নিয়ে কাজ করেছি এবং আগামীবারও এই সরকারকে ক্ষমতায় আনার জন্য নৌকায় ভোট দিতে উদাত্ত আহ্বান জানাই।

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছে বাংলাদেশ কোথায়? উনি বাংলাদেশ চেনেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্প উপহাসমূলকভাবে বলেন যে, বাংলাদেশ কোথায়! আমরা মনে করি এটা তারেক জিয়া ও জামাত-শিবিরের ষড়যন্ত্র৷ ড. ইউনুস এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাও এই ষড়যন্ত্রের পেছনে জড়িত আছেন বলে মনে করেন তিনি।

ভিডিওতে এক পর্যায়ে সুমন চৌধুরীকে ক্ষোভের সাথে বলতে দেখা যায়, আপনাকে হুঁশিয়ারি করে বলতে চাচ্ছি, ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব আপনি বাংলাদেশ চেনেন না। আপনাকে বাংলাদেশ চিনিয়ে দেয়া হবে। আপনি ওবামার কাছে জিজ্ঞেস করবেন, বিল ক্লিন্টনের ওয়াইফের কাছে জিজ্ঞেস করবেন। আপনাকে বাংলাদেশ চিনিয়ে দেয়া হবে। সারাদেশের ৬৪ টি জেলায় আপনার নামে মামলা হবে।

প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করে যা বলেছেন তার বাংলা অনুবাদ হচ্ছে- ‘স্যার, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এখানে ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এখনও সেখানে ১৮ মিলিয়ন সংখ্যালঘু মানুষ আছে। আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না। শুধু আমাদের বাংলাদেশে থাকার জন্য সাহায্য করুন। আমি আমার বাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, আমার জমি কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।’

বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রিয়া সাহা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের কাছে অভিযোগ করেও বিচার পাননি তাই ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেছেন প্রিয়া। এমন কথাই বলল বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, চলতি বছরের মার্চে প্রিয়া সাহার পৈতৃক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনার বিচার পেতে প্রিয়া সাহা আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। কিন্তু তিনি বিচার পাননি। এ কারণেই হয়তো তার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে৷ একথা সত্য হলে এই বিচার না পাওয়ার অভিযোগ কি একেবারে ভিত্তিহীন? প্রতিটি নির্বাচনের পরে কারা ভিক্টিম হয়? পূর্নিমা হত্যার কি আজও বিচার হয়েছে? বিচার হয়েছে কি অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মূহুরী হত্যার? বিচার হয়েছে কি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ১১ জন মানুষ হত্যার? বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাঁওতালদের বহু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং তিনজন কে হত্যার এক বছর পাড় হল। বিচার কি হল?ঘরবাড়িতে আগুন দেয়ার ২০১৩ সালের ঘটনায় কবি নির্মলেন্দু গুণ কবিতা লিখলেন,

রাইতভর ঘুমাইতে পারিনা
ওরা আবার কহন আহে,
যশোর মালোপাড়া, অভয় নগর,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাসির নগর,
কক্সবাজারের রামু, নোয়াখালীর রাজাগঞ্জ, পঞ্চগড় এর দেবীগঞ্জ।
এই কবিতা কিসের ঈঙ্গিত দেয়?

অন্যদিকে প্রিয়া সাহার বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন, ১৯৬১ সালে যেখানে ১৯.৫ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা ছিল, ২০১১ তে কমে আট শতাংশে নেমেছে। নাকি এটাকেও তারা বলবেন সংখ্যালঘূদের প্রজনন ক্ষমতা কম অথবা তাদের মৃত্যুহার বেশী জন্মহার কম? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অফ রিফরমিং এগ্রিকালচার-ল্যান্ড-ওয়াটার বডিস ইন বাংলাদেশ’ বইতে বলছেন, প্রতিদিন গড়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৬৩২ জন দেশ ছাড়ছেন৷

আমাদেরকে তাই ভাবতে হবে, প্রিয়া সাহার এমন অভিযোগের ভিত্তি কোথায়?সংখ্যা তত্ত্ব ভুল হলেও বিষয়বস্তু কি ভুল? এখন আবার হেফাজতে ইসলাম প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে৷ এক্ষেত্রে হেফাজত ইসলামের উদ্দেশ্যটা কি? এতে কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রিয়া সাহা কথিত মুসলিম মৌলবাদীদের উত্থানের সত্যতা স্পষ্ট  হয়না? প্রিয়া সাহার বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে এগুলো কি তার বক্তব্যের সত্যতা জাহিরের নগদ উপমা হয়ে উঠছেনা?

প্রিয়া সাহা ৩৭ মিলিয়ন না বলে নির্যাতনের সঠিক সংখ্যা তুলে ধরলে তখন কি বলতো প্রতিবাদকারীরা? এদিকে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের নালিশ জানানোর পরপরই প্রিয়া সাহার এনজিও শারি’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তদন্তে নেমে গেল এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। কিন্তু এতদিন এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কি তবে প্রিয়া সাহার ব্যাপারে ঘুমিয়েছিল? ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রিয়া সাহার এনজিও ‘শারি’ দলিত সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘুদের জন্য দুটি প্রকল্পে অনুদান খরচ করেছে ৬ কোটি ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৪’শ ৮৪ টাকা। এনজিওটির তথ্য বলছে, এই টাকার প্রায় অর্ধেকই খরচ করা হয়েছে পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায়। তবে সংখ্যালঘুদের জন্য যে এলাকায় সবচেয়ে বেশি কাজের কথা বলেছে এনজিওটি, সে এলাকায় এই এনজিও তাদের জন্য কিছুই করেনি। কিন্তু তখন কেন এ নিয়ে কোন কথা উঠলো না?

প্রিয়া সাহা ট্রাম্পের কাছে যদি এই অভিযোগ না করতো তখন কি এনজিও বিষয়ক ব্যুরো তার বিরুদ্ধে এই অনিয়মের অভিযোগ তুলতো? প্রিয়া সাহার এই অভিযোগের পর বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে অনেক কথা বলতে শুরু করল৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে তাদের সুর নরম হয়৷ এদিকে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আহবানে দেশদ্রোহী প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ইসকন নিষিদ্ধ ঘোষণা, ভারতজুড়ে মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ এবং পাঠ্যপুস্তকে ডারউইনের কুফরি বিবর্তনবাদ সংযোজনের প্রতিবাদে ডাকা এক সমাবেশে বলেন, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী প্রিয়া সাহাকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ’ এবংইসকন নিষিদ্ধ করুন। ‘প্রিয়া সাহা’ পরিচালিত শারি’নামে এনজিও’র লাইসেন্স বাতিল করুন। অন্যথায় দেশপ্রেমিক তৌহিদী জনতাকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যে কোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি৷ বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নালিশের পর দেশ-বিদেশে সমালোচনার পর প্রিয়া সাহা সহসাই দেশে ফিরছেন না। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানা গেছে। হেফাজত ইসলামের ঘোষনা ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ভূমিকা,বিভিন্ন জেলায় প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে মামলা ও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ৬৪ জেলায় মামলার হুমকি কি প্রিয়া সাহার নিরাপত্তাহীনতা দাবীর সত্যতাকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান করলোনা?

যেখানে প্রধানমন্ত্রী বলছেন, প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নয়৷ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন,দেশে এলে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হবে৷ সেখানে হেফাজত ইসলামের এমন উস্কানিমূলক বক্তব্য কেন?তারা কেবল প্রিয়া সাহার শাস্তিই নয়৷ একেবারে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নিষিদ্ধের দাবী জানাচ্ছে৷ প্রিয়া সাহার এনজিও শারীর লাইসেন্স বাতিলের দাবী জানাচ্ছে৷ পাঠ্যপুস্তক হতে ডারউইনের বিবর্তনবাদ নিষিদ্ধেের দাবী জানাচ্ছে৷ এসব কি মৌলবাদ উত্থানের দৃষ্টান্ত নয়?বিভিন্ন জেলায় অতি উৎসাহীদের প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা কেন?আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা করার ঘোষনা কেন বাংলাদেশী নাগরিকের৷এ মামলা কোন আদালত নেবে?এগুলো কি অহেতুক শত্রুতা সৃষ্টির কারণ নয়? গণপূর্ত মন্ত্রী শ,ম রেজাউল করিম ও প্রিয়া সাহার বিষয়টি কি মন্ত্রিপরিষদের সভায় এজেন্ডা হবে? কেন প্রিয়া সাহা দেশে বিচার না পেয়ে বিদেশে নালিশ করতে গেল? ঢাকায় ফিরলে গ্রেফতার বা হয়রানির বদলে সরকার নিরাপত্তা দেবে এমন কথায় আশ্বস্থ হতে পারছেন না প্রিয়া সাহা। শোনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছেন তিনি৷ এর আগে দেশত্যাগ করেছেন প্রধানবিচারপতি এস,কে সিনহা৷ এখন প্রিয়া সাহা৷ এস,কে সিনহা যখন সরকারের বিশ্বস্ত ছিল তখন তার বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতির অভিযোগ ছিলনা৷ প্রিয়া সাহার ব্যাপারেও কি এমনটিই ঘটতে চলছেনা? পক্ষে থাকলে সবই জায়েজ বিপক্ষে গেলেই নাজায়েজ এমন রীতি কিন্তু ভয়েরই বটে৷

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:প্রিয়া সাহা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…