যেমনটা আশা করা হয়েছিল, কোনো ঝুঁকি ছাড়া ঠিক তেমনটাই মেক্সিকোর বিপক্ষে করে দেখিয়েছে ব্রাজিল। জার্মানির বিপক্ষে নিজেদের খেলার পুনরাবৃত্তি করতে না পেরে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে।
আলোচনার উপরে থাকা প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকার মাতেও লোজনোকে অন্ধকারে রেখে প্রদীপের আলো কেড়েছেন নেইমার। ম্যাচসেরা পারফরম্যান্স দিয়ে সমালোচকদের মুখবন্ধ করেছেন।
নেইমার শো’র শেষ নেই, যদিও ব্রাজিলিয়ান তারকা মনোযোগ ফুটবলের উপর কেন্দ্রীভূত করতে পারলে সেটা আরও ভালো হবে। থিয়েটার… নাটক… তার পেছনে ফেলে রাখা উচিত! মাদ্রিদভিত্তিক ক্রীড়া দৈনিক মার্কায় নেইমারকে নিয়ে নিজের লেখাটা এভাবেই শুরু করেছেন স্প্যানিশ ক্রীড়াবিশ্লেষক হুগো সেরোজো।
মেক্সিকান খেলোয়াড় মিগুয়েল লায়ুনের ছোট্ট একটি ঘটনা পার্ক সান ভিটোর নৃত্যকে উস্কে দিয়েছিল। যদি তাকে ভালোভাবে না জানতেন, তবে সবাই চিন্তিত হতেন যে, এটি একটি গুরুতর আঘাত ছিল।
বিশ্বকাপ শিরোপাটার অনেকটা কাছাকাছি ব্রাজিলিয়ান তারকা। মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করে এবং করিয়ে ব্যালন ডি’অরের রাস্তাটাও চওড়া করেছেন। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জোড়েই কোয়ার্টার ফাইনালে সেলেসাওরা।
শুধু নেইমার নন, মেক্সিকো ম্যাচে টপ পারফর্মারদের মধ্য উইলিয়ানও আছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সেলোনার মতো দলকে তিনি কীভাবে ভুগিয়েছিলেন ফুটবলে নিয়মিত চোখ রাখা দর্শকরা সেটা ভালোভাবেই জানেন।
নেইমারের করা প্রথম গোলটি উইলিয়ানেরই দুর্দান্ত পাসের ফসল। পরে ফিরমিনোকে দিয়ে গোল করিয়ে উইলিয়ানের কাজটা নিজেও করেছেন নেইমার।
সবমিলিয়ে পুরো ম্যাচই প্রায় নেইমারময়। তার গোল, অ্যাসিস্ট এবং নিশ্চয়ই ইনজুরির নিয়ে তার ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াও।’
নেইমারের এই ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া’ নিয়ে ম্যাচের আগেই কথা বলেছিলেন মেক্সিকো অধিনায়ক আন্দ্রেস গুয়ার্দাদো। ম্যাচের পর একই কথা বলেছেন, মেক্সিকান কোচ হুয়ান ওসোরিও।
ব্রাজিলের কাছে হারের পর ওসোরিও বলেন, ‘দূর্ভাগ্য ও লজ্জার বিষয় হল, একজন ফুটবলারের জন্য আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে। এই খেলাটা শক্তিশালী মানুষদের খেলা। ব্যক্তির খেলা। কিন্তু এখানে এত এত অভিনয় সত্যিই মানা যায় না।’
নেইমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বারবার তিনি মারাত্মক আহত হওয়ার ‘অভিনয়’ করছেন। ব্রাজিলের কোচ টিটে অবশ্য এই ধরনের কথাকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না। বলেছেন, ‘ঘটনার ভিডিও দেখুন। তখন দেখবেন আপনাদের কিছুই বলার থাকবে না। কারণ তাকে মাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।’
নেইমারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে টিটের অবস্থানের কারণেই হয়ত আরও বেশি ক্ষেপেছেন মেক্সিকো কোচ, ‘নেইমার আজ(সোমবার) যা করল সেটা ফুটবলের লজ্জা। তার প্লে-অ্যাক্টিং সামলানোর জন্য রেফারিদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তারা সেটা করেননি।’
শুধু একটা ম্যাচ নয়, নেইমার ফুটবলের জন্য অনেককিছু। সেটা উল্লেখ করে মেক্সিকান কোচ যোগ করেন, ‘বিশ্বের বহু শিশু নেইমারের ভক্ত। তাকে অনুসরণ করে। কিন্তু সে যা করল, তাতে তাকে আর আদর্শ হিসেবে মানা যাবে না। অনেক নাটক করেছে, এটা ফুটবল নয়, বিশ্ব ফুটবলে এটা নজির হয়েই থাকল।’
বিশ্বকাপ থেকে মেসি-রোনালদোর অকাল বিদায়ের পর ফুটবল দুনিয়ার আলোচনায় নেইমার। কিন্তু সেটি শুধু শ্রেষ্ঠত্বের জয়গান গাইতে নয়, তার ‘নাটক’ বা ‘অভিনয়’ নিয়েও। তার ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া’র জন্য পারফরম্যান্সের প্রশংসার পাশাপাশি নেইমারকে নিয়ে হাসি ঠাট্টার জোয়ারও বইছে।
নেইমারের এটা বন্ধ করা উচিত বলে মনে করছেন অনেকে। সেই কাতারে আছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনাও, ‘নেইমারও একজন বড় তারকা। তবে এখনও তার অনেক খামতি রয়েছে। তবুও তাকে তারকা বলা যায়। কিন্তু তাকে বুঝতে হবে মাঠে অতিরিক্ত ডাইভ দিলে হলুদ কার্ড দেখতে হয়। এখন তো আবার ভিএআর পদ্ধতিও রয়েছে। কোস্টারিকার বিপক্ষে ইতিমধ্যেই একটা কার্ড দেখেছেন। তাই নেইমারের ‘সস্তা’র নাটক কম করা উচিত।’
তবে নেইমার নিজেকে এসব থেকে দূরে রাখতেই ভালোবাসেন। তার লক্ষ্য স্থির। দলকে কাঙ্ক্ষিত জয় এনে দেয়া। সমালোচকদের কথায় বিরক্ত নেইমারের তাই ভিন্ন প্রতিক্রিয়া, ‘এটা আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা ছাড়া অন্যকিছুই না। এই সব সমালোচনাকে পাত্তা দিই না। কারণ এগুলো নিয়ে ভাবলে একজন খেলোয়াড়ের খেলায় প্রভাব পড়ে। শেষ দুটো ম্যাচের পরে আমি কথা বলিনি। কারণ, অনেকে মিলে বড্ড বেশি কথা বলছিল আর উত্তেজিত হচ্ছিল। জানি না এসব লোক দেখানো কি না। এখানে এসেছি সতীর্থদের নিয়ে ম্যাচ জিততে। অন্য কিছু করতে নয়।’
নেইমার সেটাই করছেন। মেক্সিকো ম্যাচটা একাই বের করেছেন! একটি গোল করে, অন্যটি করিয়ে। এবার দুটি গোল হয়ে গেছে। ফিরেছেন চেনারূপে। ব্রাজিলের দুর্দান্ত জয়ের দিনে নেইমার এগিয়ে গেছেন পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানেও। এবার প্রতিপক্ষের রক্ষণে সবচেয়ে বেশি ২৩ শট নেয়া খেলোয়াড়টির নাম নেইমার। যার মধ্যে গোলমুখে অন টার্গেট সর্বোচ্চ ১২টি শটও তার। সতীর্থদের জন্য গোলের সুযোগ তৈরিতেও এগিয়ে নেইমার, ১৬বার।
দুঃখের কথা, সবচেয়ে বেশি ২৩বার ফাউলের শিকারও নেইমারই। ব্রাজিল দলের নিউক্লিয়াসকে আঘাত করা হচ্ছে ঠিকই, সেটা নিয়ে মাঠে-বাইরে জোর প্রতিবাদই উঠত। কিন্তু আঘাত পাওয়ার পর নেইমার যে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ, সেটি হয়ত তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার চেয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মন অন্যদিকেই ঘুরিয়ে দিচ্ছে!








