উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা আর জাতীয় সংসদের হাতে থাকছে না। এ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল সোমবার খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে ওই ক্ষমতা এখন চলে যাবে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে। এরইমধ্যে এ রায়কে নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। রায়কে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে রিটকারীসহ দেশের শীর্ষ আইনজীবীরা বলছেন, এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ রায়ে জাতি হতাশ। আর বিএনপি বলছে, আদালতের এ রায় জনগণের বিজয়। আমরা জানি, প্রথম সংবিধানে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে করা সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেয়া হয়। তবে পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেন। পরবর্তীতে এ সংশোধনী আদালতে অবৈধ হলে সেসময়ের আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিষয়ে কোন পরিবর্তন করেনি। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনে আওয়ামী লীগ সরকার। বিষয়টি তখন তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। মাস দেড়েকের মধ্যেই ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। যার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। গত কয়েক মাস ধরেই আমরা লক্ষ্য করছি বিচার বিভাগ সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রের দুই অন্যতম স্তম্ভ-নিবার্হী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে এক রকম ঠান্ডা লড়াই চলছে। বিশেষ করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় বারবার সময় নিয়েও তা প্রকাশ না করায় একাধিকবার আমরা প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে তা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখেছি। তিনি বারবার আইন মন্ত্রণালয়ের অসহযোগিতার কথা বলেছেন। কিছুদিন আগে অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘দুই সপ্তাহ, দুই মাস বা দুই বছর আপনার কাছে একই। আড়াই বছর ফাইল চলাচলে সময় লাগলো! সুপ্রিম কোর্ট থেকে বঙ্গভবন-গণভবনের দূরত্ব মনে হয় কয়েক লাখ কিলোমিটার! আড়াই বছরে যে পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়নি। আড়াই হাজার বছরেও মনে হয় না তা সম্ভব হবে।’ এর বাইরেও প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভুল বোঝানো’ হয়েছে বলেও বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেছেন। তার এসব মন্তব্য থেকে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের এক রকম দূরত্ব লক্ষ্য করা যায় যা কোন পক্ষের জন্যই শুভ নয়। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ ধরণের অবস্থান বৈরি পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ করে দেয়। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের সংবিধান কোন বিভাগের কী দায়িত্ব; তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছে। সেই সংবিধানের মধ্যে থেকে যার যার দায়িত্ব পালন করে গেলে যে কোন সাংঘর্ষিক অবস্থান এড়ানো সম্ভব। আমরা কোন অবস্থাতেই এ দুই বিভাগের মধ্যে সাংঘর্ষিক কোন অবস্থা চাই না।







