৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে সামনে রেখে শনিবার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় আগামী দিনের পথচলা কিভাবে হবে তা ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছেন দলের নেতারা। তারা বলছেন, আগামীর পথচলার বিষয়ে মাঠপর্যায় থেকে যেভাবে আমরা পরামর্শ পাবো, একইভাবে কেন্দ্রীয় নের্তৃবৃন্দের নির্দেশনা মিলিয়ে একটি সুন্দর এবং সুষ্ঠু পথরেখা নির্ধারণ করতে পারবো। এছাড়া দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকেও থাকবে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে সামনে রেখে প্রায় ৩ বছর পর বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকার অভিজাত হোটেল লা মেরিডিয়ানে। শনিবার সকাল ১০টায় এ সভা শুরু হয়ে শেষ হবে বিকেল ৫টায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তিনি নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে বক্তব্য প্রদান করবেন বলেও জানিয়েছেন বিএনপি।
সভা থেকে কোন ধরনের বার্তা আসতে পারে?
আগামীকালের সভা এই সময়ে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন ধরনের বার্তা আসতে পারে এমন প্রশ্নে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নির্বাহী কমিটির সভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাহী কমিটির সভার মধ্য দিয়ে আমাদের আগামী দিনের পথচলা কিভাবে হবে তা ঠিক করা হবে। সে ব্যাপারে মাঠ পর্যায় থেকে যেভাবে আমরা পরামর্শ পাবো, একইভাবে কেন্দ্রীয় নের্তৃবৃন্দের নির্দেশনা মিলিয়ে তার মধ্য থেকে একটি সুন্দর এবং সুষ্ঠু পথরেখা নির্ধারণ করতে পারবো।
‘আন্দোলন করে হোক কিংবা অন্য যেকোন রাজনৈতিক সুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে হোক আমরা আমাদের শক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে অতীতে যে দায়গুলো আমাদের ওপর চাপানো হয়েছিল সে দায়গুলো যেন সরকার চাপাতে না পারে সে সতর্কতার ব্যাপারে মূলত আমরা নির্বাহী কমিটির সভাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি’, বলেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।
বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব আরও বলেন: মাঠ দখল বড় বিষয় নয়, বিষয় হলো আমাদের ভোটারদের মন দখল। ভোটারদের মন দখলের দিকে আমরা গুরুত্ব দিব। বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রচণ্ড রকমের আগ্রহী এবং সারা দেশে এই মনোভাবটি আমাদের মধ্যে চাঙ্গা। কিন্তু এখন যদি পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেয়া হয় সেটা অতিক্রম করার জন্য শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া কী আছে, এই পরামর্শগুলো আমরা গ্রহণ করে এটাকেই একটি সারবস্তুর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যত পথরেখা তৈরি করব।
দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য কোন ধরনের নির্দেশনা আসতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন: মূলত বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব আইনি প্রক্রিয়া আছে সেগুলো সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া যেমন চলবে, একইসঙ্গে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আমাদের যে সরব উপস্থিতি রয়েছে সেটা ভোটারদের কাছে প্রমাণ করে তাদের মনে আস্থা সৃষ্টি করার ব্যাপারে নেতাকর্মীদের জন্য নির্দেশনা থাকতে পারে।
বিএনপির এই নেতা জানান: আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি আমাদের আগে থেকে রয়েছে। নির্বাচনে আমরা যেতে চাই। কিন্তু এই নির্বাচন যেতে যেসব বাধাগুলো তৈরি করা হয়েছে বা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সেগুলোকে শান্তিপূর্ণভাবে উৎরানোর কৌশল নির্ধারণ করা হবে আমাদের এই সভার মূল লক্ষ্য।
বিএনপির একসময়কার তুখোড় নেত্রী, বর্তমানে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা এ বিষয়ে বলেন: ৮ ফেব্রুয়ারির রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে আমরা অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি। যদিও এই মামলায় বেগম খালেদা জিয়া নিঃশর্ত খালাস পাবেন বলে আমার বিশ্বাস। যদি নেতিবাচক রায় চলে আসে তাহলে নেতাকর্মীরা কী করবে সে বিষয়ে শনিবারের সভায় দিক নির্দেশনা আসতে পারে। আমি মনে করি রাজপথ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে কেমন রায় হবে তা জানতে মুখিয়ে আছে মানুষ। হরতাল অবরোধের মতো কর্মসূচি নিতে পারি। এটি মূলত মতামত যাচাইয়ের একটি সভা।
আসন্ন রায় ঘোষণা এবং নির্বাহী কমিটির সভাকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
রিজভী বলেন: বিএনপি নেতাকর্মীদেরকে গ্রেপ্তার করা যেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পুতুল-খেলা। যখন ইচ্ছা হচ্ছে বাসা থেকে, রাস্তা থেকে, হাটবাজার থেকে, দলীয় কার্যালয় থেকে তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে প্রথমে অস্বীকার করার পর দরকষাকষি শুরু হয়, বলা হয় বেশি টাকা দিলে হালকা মামলা দেয়া হবে, আর কম টাকা দিলে কঠিন মামলা দেয়া হবে, আর যদি অর্থ দিতে অক্ষম হয় তাহলে শুরু হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন। কয়েকদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, গ্রেপ্তার হঠাৎ করে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সভায় যারা থাকবেন
বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটিতে মোট সদস্য ৫০২ জন। এর মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন ১৯ জন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রাখা হয়েছে ৭৩ জনকে, ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন ৩৫ জন এবং যুগ্ম মহাসচিব হয়েছেন ৭ জন। এদের সবাই থাকবেন কালকের সভায়। এছাড়া জেলা এবং বিভাগীয় নেতারা থাকবেন।
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের সাড়ে চার মাস পর ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন মাস পরপর জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন এই সভা করেনি বিএনপি। উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই সভা আয়োজনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেন দলটির নেতারা।
সভার ভেন্যু নিয়ে বিএনপি যা বলছে
বিএনপি চেয়ারপার্সনের মামলাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সভায় খালেদা জিয়া যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য দলের নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেবেন।
স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটির এ সভা আয়োজনের জন্য ভেন্যু বরাদ্দ নিয়ে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের। তবে বৃহস্পতিবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সংবাদ সম্মেলনে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে অবস্থিত হোটেল লা মেরিডিয়ানে সভা হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন।
রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী বলেন: নির্বাহী কমিটির বৈঠকের জন্য বিএনপিকে কোথাও জায়গা দেওয়া হয়নি। রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন, কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন, গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চ, মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণী এবং বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারের ‘রাজদর্শন’ হলের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে বসুন্ধরায় অনুমতি দিয়েও পরে তা বাতিল করা হয়।
রিজভী বলেন: গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চের জন্য আবেদন নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করলেও তারা তা গ্রহণ করেননি। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আবেদন নিলেও কোন সিদ্ধান্ত জানাননি।
‘পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর লা মেরিডিয়ান কর্তৃপক্ষের অনুমতি মিলেছে। সেখানে সভা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেখানে সভার ক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন আপত্তি থাকবে না বলে আশা করি’, বলেন রিজভী।
এ সভা অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সব সদস্য, সারাদেশে দলের সব শাখা এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। সবাইকে টেলিফোন এবং মোবাইল ফোনেও সভায় উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য পরিচয়পত্রও প্রস্তুত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের পর জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভার জন্য সদস্যদের পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেন রিজভী। তার কাছ থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, ডা. আবদুল কুদ্দুস পরিচয়পত্র নেন। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত আমন্ত্রিত সদস্যদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়।







