বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় খালেদা জিয়া নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, “কোন অপরাধ তো নাই, বিচার হবে কিসের? তারপরও তারা গায়ের জোরে বিচার করতে চায়”।
শনিবার হোটেল লা মেরিডিয়ানের হল রুমে নির্বাহী কমিটির সভায় তিনি বলেন, আমি যেখানেই থাকি না কেন, আপনাদের সাথে আছি, থাকবো। আমাকে কোন ভয় ভীতি- লোভ-লালসা দেখিয়ে কোন কিছু করতে পারবে না। অতীতেও পারেনি, এখনো পারবে না। আমি দেশের মানুষের সাথে আছি, থাকবো।
খালেদা বলেন, ঘরে বন্দী রেখে গাড়ি পোড়ানোর মামলা দেয়া হয়। আরে ঘরে বন্দী থেকে আমি কী করে চৌদ্দ গ্রামে গিয়ে গাড়ি পোড়াবো?
তিনি আরও বলেন, নিম্ন আদালত সরকারের কবজায়। সরকারের কথার বাইরে তাদের হাজারও চিন্তা থাকলেও সঠিক রায় দিতে পারবে না। বিচার বিভাগ আজ স্বাধীন নয়। তারা সবচেয়ে বেশি পরাধীন। তারা হকুমের আদেশে থাকেন। শেখ হাসিনা নিজেকে এখন আল্লাহর পরের স্থান হিসেবে বিবেচনা করে। সে যখন যা ইচ্ছা করবে এ দেশে তাই হবে! কিন্তু ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ দেখছেন সব। আল্লাহ হয়তো এখন ছাড় দিচ্ছেন, যা ইচ্ছা যারা করে তাদেরকে আল্লাহ দেখেন যে, কতদূর তারা যেতে পারে! একসময় আল্লাহ রশিটা এমনভাবে টান দিবেন তখন আর সুযোগ থাকবে না কিছু করার। সময় থাকতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নেন।
শনিবার বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা শুরু হয় বিএনপি চেয়ারপার্সন আসার পর। সকাল ১১টায় লা মেরিডিয়ান হল রুমের সভাস্থলে উপস্থিত হন খালেদা জিয়া। এরপর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে সভা শুরু হয়। সভায় শোক প্রস্তাব করেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন। এরপর বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। বিএনপি চেয়াপার্সনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দিয়ে সাজা দেয়ার পায়তারা করছে বলেও মন্তব্য করেন ফখরুল।
মহাসচিবের বক্তব্যের পর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয় হল রুমে। ভিডিও বার্তাটির দৈর্ঘ ছিলো ১৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড।
এর পরপরই সভার উদ্বোধনী বক্তব্য শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও নির্বাহী কমিটির সভার সভাপতি বেগম খালেদা জিয়া।
বক্তব্যের শুরুতে খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার জুলুম-নির্যাতন করে যাচ্ছে। মানুষের অবস্থা দুর্বিসহ আজ। দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। মানুষের কোন অধিকার নেই। নতুন নতুন আইন করে মানুষের বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে–
অস্ত্রের মুখে বিচারককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে:
খালেদা জিয়া তার বক্তব্যে বিচার ব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আগের বিচারক এসকে সিনহা দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ দেন। তা শুনে সরকারের মাথা খারাপ হয়ে যায়। সে জন্য তাকে বাধ্য করা হয় দেশ ত্যাগে। পরে তিনি দেশে ফিরে আসার কথা বলেন। কিন্তু ফিরে আসার আগে অস্ত্রের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এর আগে আমরা অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা নিতে দেখেছি। কিন্তু বিচারককে পদত্যাগে বাধ্য করতে কখনো দেখিনি।
নৌকা ডুবে গেছে:
খালেদা জিয়া বর্তমান প্রধামন্ত্রীর অগ্রিম নির্বাচনী প্রচারণার সমালোচনা করে বলেন, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে। নৌকা এমন ডুবা ডুবছে যে এখন থেকে প্রচারণা করে জোর করে জনগণকে পক্ষে হাত উঠাতে হয়। জোর করে হাত উঠানো যায়। কিন্তু ভোট পাওয়া যায় না। সরকার জোরপূর্বক সব করছে। ফখরুদ্দীন- মঈন উদ্দীনের মধ্যে এদের কোন পার্থক্য নেই। একদিনে ৪শ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিএনপিকে কেন এতো ভয়? জনগণের সাথে বিএনপির সম্পর্ক। তাদেরকে দুর্বল করতে পারলে তারা ভয় মুক্ত থাকে। তাই দুর্বল করতে চায়। নিজস্ব লোক দিয়ে প্রশাসন সাজিয়ে নিয়ে তারা টিকে থাকতে চায়। তারা ভাবে, প্রশাসন নির্বাচনে জিততে তাদেরকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ নির্বাচনের সুযোগ পায়, তাহলে তারা তা করবে না। প্রশাসনে যারা আছেন তারা এ দেশের মানুষ। বিবেকবান।
তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে জনগণ, প্রশাসন, পুলিশ আছে সবই আছে।দেশের বাইরের মানুষ আছে। তার জন্য বিএনপিকে দমন করতে চায়। বর্তমান সংসদ ইয়েস স্যার টাইপের বলে দাবি করেন খালেদা জিয়া। কী বিরোধী দল, কী সরকারি দল সবাই একই।
বিশাল দুর্নীতি:
দেশের আর্থিক খাত ধ্বসে পড়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। ব্যাংক লুট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আসলেই শেয়ার মার্কেটের দূরাবস্থা হয়। তারা নিশ্চয় সে রকম কোন কারসাজি করে। সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকা লোপাট হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লুট ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এটি নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট বের হলে দেশের মানুষ জানতে পারতো। জানলে তদের মুখ পোড়া যাবে। তাই কোন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় না। এর আগে কয়েক বছরে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সুইজ ব্যাংকে জমা রাখতে শুনিনি। বিএনপির এমন কোন সামর্থ নেই যে সুইজ ব্যাংকে টাকা রাখবে। তারা বিদেশে সেকোন্ডহোম বানিয়ে রাখছেন। পাসপোর্ট সাথে থাকে তাদের। অনেকের ছেলে দেশের বাইরে।
সব কিছু মিলিয়ে দেখলে বুঝা যায় যে কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান, মানুষ ভালো নেই। চাকরি পেতে মিনিমাম ঘুষ হলো নাকি ৫ লাখ টাকা। ৫/১০ লাখ টাকা ঘুষ না হলে তো চাকরি হয় না।
খালেদা বলেন, ১/১১ এর ভূত এখনো আছে। মিথ্যা মামলা থেকে রেহায় পাচ্ছে না কেউ। মহিলারাও বাদ যাচ্ছে না। আজ বেশ কিছু নেত্রী কারাগারে। রিমান্ড নেয়া হয়েছে। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম আওয়ামী লীগের নারীরা রাস্তায় শুয়ে থাকতো। রান্না বান্না করতো। কাপড় -সোপড় নিয়ে আসতো রাস্তায় থাকার জন্য। আর আমাদের নারীরারা তাদের মতো উশৃঙ্খল নয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থা খারাপ!
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ বলতো, তারা ক্ষমতায় আসলে নাকি হিন্দু সম্প্রদায় ভালো থাকে। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের জমি, ঘর বাড়ি কোড়ে নিচ্ছে। মন্দির ভেঙে দিচ্ছে। এই হলো আওয়ামী লীগ। মুসলমান হলে বানিয়ে দেয় জঙ্গি। আর হিন্দুদের মন্দির ভাঙে।
তিনি বলেন, আজ আমাদের সাথে সাথে হিন্দুরাও নির্যাতনের শিকার। হিন্দুরা এখন বলছেন, আমরা অনেক ভুল করেছি। আর নৌকার কাছে যাবো না। নৌকা আমাদের সব কেড়ে নিচ্ছে।
নির্বাচন নিয়ে যা বলেন :
নির্বাচনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আবারও একদলীয় নির্বাচন আয়োজনের ষড়যন্ত্র চলছে দেশে। মানুষ আজকে এ দুঃশাসন থোকে, গুম খুন, অত্যাচার থেকে মুক্তি চায়। মানুষ পরিবর্তন চায়। সে পরিবর্তন অন্য কোনভাবে নয়। গণতন্ত্রের মাধ্যমে। সে জন্য আমরা বলছি ভোট। ভোট হয়তো হবে কিন্তু বিএনপিকে মাইনাস করতে চায়। সে জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো। এসময় নির্বাহী সদস্যরা হাত তোলে চেয়ারপার্সনের বক্তব্যের পক্ষে সায় দেন।
নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়ার শর্ত:
নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়া কয়েকটি শর্ত তোলে ধরেন-নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। শেখ হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচন হতে পারবে না। নির্বাচন পরিচালনা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সেখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ দিতেই হবে।অবশ্যই দিতে হবে। সেনাবাহিনী দেখবে, দেশের মানুষ নিরাপদে ভোট দিতে পারে কিনা। ইভিএম এর ব্যবহার করা যাবে না। তার প্রতিরোধ করতে হবে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভাঙতে হবে। অবশ্যই ভেঙে দিতে হবে এবং সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন দিতে হবে।
‘বেঈমানি করলে ক্ষমা নেই’- নির্বাহী সদস্যদের খালেদা জিয়া:
নির্বাহী কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া বলেন, দলের জন্য যারা ত্যাগ করেছেন, তাদের খবর আমি ঘরে বসেও রাখি। যারা আন্দোলন-সংগ্রামে থেকেছেন তাদের আমরা দেখছি। খবর রাখছি। আমরা তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করবো। আর যারা বেঈমানি করে তাদের খবরও আমি রাখি। যারা এক পা এদিকে, আরেক পা ওদিকে রাখে তাদের কোন মূল্যায়ন করা হবে না দলে। আমরা ক্ষমা করি। কিন্তু বারবার ক্ষমা করবো না।
তিনি বলেন, দলের ইয়ং লিডারশিপ তৈরি হয়েছে। সামনে তাদের নিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করে যাবো। ষড়যন্ত্র আসবে অনেক। তবে সকল ষড়যন্ত্রের সময়ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দলকে এগিয়ে নিতে হবে।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
বক্তব্যের শেষের দিকে এসে বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। দেশের সকল মানুষকে, অন্য দলগুলোকে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি আহ্বান জানাই সকল দলকে। দেশের মানুষকে। আসুন আমরা একসাথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই। যারা এখন জুলুম নির্যাতন করছে আমরা ক্ষমা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তাদেরকে সাথে নিতেও আমাদের সমস্যা নেই।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পরামর্শ:
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা জানি আমরা জুলুমের শিকার হচ্ছি। মানুষ ভালো নেই। সর্বত্র অরাজকতা। আমাদের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে ঘায়েল করা হচ্ছে। গুম-খুন, হামলা নিত্যদিনের ঘটনা। দেশে কোন গণতন্ত্র নেই। মানুষের মৌলিক অধিকার নেই। এই অবস্থায় আমাদের আন্দোলন করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নামতে হবে সবাইকে। “আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করি। দেশের মানুষকেও আহ্বান জানাই। তবে এ আন্দোলন হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে”-বলেন খালেদা জিয়া।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে নানা শংকা ও ভয় সঙ্গ করে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় যোগ দেন দলটির নির্বাহী সদস্যরা। রাজধানী সহ সারা দেশ থেকে নির্বাহী সদস্যরা রাজধানীর বিলাসবহুল হোটেল লা মেরিডিয়ানে সভাস্থলে আসতে থাকেন।প্রায় সাড়ে ৪শ এর মতো নেতা সভায় উপস্থিত হন। এর মধ্যে অনেকে জেলার সভাপতি, মহানগরির নেতা রয়েছেন।
সকাল ১০টায় সভাস্থলে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, ড. মঈন খান, মির্জা আব্বাস, মাহবুবুর রহমান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ ছাড়াও দলের ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্যবৃন্দ। দুপুর ১.২০ মিনিটে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বক্তব্য শেষ হয়। এরপর দলের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নিয়ে পরবর্তী অধিবেশন শুরু হয়। সভা চলবে বিকাল ৫টা পযন্ত।








