সদ্য সমাপ্ত ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণায় ব্যবহৃত পোস্টার দিয়ে ছিন্নমূল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাতা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টার পুনঃব্যবহার করা যাবে না বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনী প্রচারণা পরিবেশ বান্ধব করতে প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশনকে তাগিদ দেন তারা।
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রচারণার জন্য প্রথম বারো দিনে প্রায় আড়াই হাজার টন প্লাস্টিক ঝোলানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। সংস্থাটি বলছে প্রতিযোগী প্রার্থীরা তাদের পোস্টার, লিফলেট এবং কর্মীদের পরিচয়পত্রের জন্য এসব প্লাস্টিক ব্যবহার করেছেন।
সিটি নির্বাচন শেষে পোস্টারগুলো ময়লার ভাগাড়ে না ফেলে এর ভিন্ন ব্যবহার করছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যে তারা নির্বাচনী পোস্টার দিয়ে ২০ হাজার খাতা তৈরি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির সহ সভাপতি ফারুক আহমেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আমরা পোস্টার লিফলেট সংগ্রহ করেছি। আমাদের বিদ্যানন্দ শিশু নিকেতনে যেসব শিক্ষার্থী পড়ে, ওদের প্রচুর খাতা দরকার হয়। এই পোস্টার বা লিফলেটের অনেকগুলোর এক পাশ প্রিন্ট করা থাকলেও আরেক পাশ সাদা। ওই সাদা অংশটুকু লেখার উপযোগী করে আমরা খাতা তৈরি করে দেব আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের।

তিনি বলেন: এখন পর্যন্ত ২০ হাজার খাতা এসব পোস্টার দিয়ে করা হয়েছে। কয়েকদিনের মাঝে ট্রাকে খাতাগুলো চলে যাবে আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মাঝে।
প্লাস্টিকের পোস্টারের কী হবে?
পরিবেশ বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: নির্বাচনে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পুনরায় ব্যবহার অযোগ্য ও অ অবননযোগ্য। কারণ এগুলো বহু স্তর বিশিষ্ট প্লাস্টিক। এই প্লাস্টিকের যখন লেমিনেটেড শিট তৈরি হয় তখন প্রেসার ও নিদিষ্ট পরিমাণ হিট দিয়ে পেস্টিং করা হয়। যাতে অ্যালুমনিয়াম, কিছু কেমিক্যাল ও মেটাল ব্যবহার করা হয়। ফলে এই যে বহু স্তর বিশিষ্ট প্লাস্টিক, এখান থেকে যখন পুনর্ব্যবহার করে প্লাস্টিকটা বের করতে যাবে তখন সেটা কোনভাবেই ফলপ্রসু ব্যয় হবে না, বরং এটা থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক তৈরি হবে।

যে আড়াই হাজার টন প্লাস্টিক জমেছে তা কিন্তু দিনশেষে পরিবেশেই যাবে এবং সরাসরি পরিবেশকে ক্ষতি করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন: ক্ষুদ্র প্লাস্টিক পৃথিবীতে যতোদিন আছে ততোদিন থাকবে, ক্ষুদ্র প্লাস্টিক পশু পাখি গবাদি প্রাণীর মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করবে। যেটা আমরা হজম করতে পারব না, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্ষতি সাধন করবে।

এমন অবস্থায় করণীয় কি জানতে চাইলে ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন: যদি সঠিকভাবে সব প্লাস্টিক পোস্টার সংগ্রহ করে একটা নিদিষ্ট জায়গায় রাখা যায় এবং সেখান থেকে প্লাস্টিকগুলো ছড়িয়ে না পড়ে। যদি আমরা ছড়িয়ে পড়াটা বন্ধ করতে পারি, তাহলে অনেকাংশেই পরিবেশের ক্ষতিটা কমাতে পারব।
ড. শাহরিয়ারের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মানুষ এখন সচেতন হয়েছে, প্লাস্টিক পোস্টার ব্যবহার করে ভোটারদের আকৃষ্ট করা বিরক্তকর। প্রার্থী ও নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী প্রচারণা পরিবেশ বান্ধব করা উচিত।
তিনি বলেন, শুধু প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টারই নয়, ছাপানো পোস্টারে যে কালি ব্যবহার করা হচ্ছে তা সীসাযুক্ত। এমনিতেই ঢাকার মাটি ও বাতাসে সীসার পরিমাণ বেশি। রাজধানীতে লাখ লাখ পোস্টার বৃষ্টিতে ভিজে তা মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে যাবে। যা ভয়াবহতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে।

আবু নাসের খান বলেন: প্লাস্টিকের পোস্টার পুনর্ব্যবহার করা যাবে না, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক একটা বিপর্যয়, এই প্লাস্টিক নিয়ে কী করা যায় সেটা নিয়েও একটা সার্বিক গবেষণা প্রয়োজন, যাতে তুলনামূলকভাবে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়।
যা বলছে দুই সিটি করপোরেশন
উত্তরের নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম প্লাস্টিক পোস্টার না পোড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এটা করবেন না। এটা রিসাইকেল করা হবে। পলিথিন ও কাগজ আলাদা করা হবে। তবে ঠিক কী উপায়ে পোস্টার থেকে আলাদা করা প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হবে তা জানাননি তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম মঞ্জুর হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস প্লাস্টিক পোস্টারের বিষয়ে বলেছেন, লেমিনেটেড পোস্টারের প্লাস্টিক বর্জ্য ধ্বংসে এখন যে উপায় আছে, তা-ই ব্যবহার করা হবে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নত বিশ্বের মতো প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে আধুনিক পদ্ধতি নেওয়া হবে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: প্লাস্টিক পোস্টার পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা যায় না। এগুলো অন্য বর্জ্যের মতো মাতুয়াইলের ভাগাড়ে ফেলে ডাম্পিং করা হচ্ছে।
সরকার ২০০২ সাল থেকে পলিথিন (প্লাস্টিক) শপিং ব্যাগের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর পলিথিনের (প্লাস্টিক) ব্যবহার নিয়ে ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে উল্লেখ করা হয়, পলিথিন ব্যাগ বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা স্পষ্টত সরকারি আদেশের লঙ্ঘন এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।








