নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় যেন একটি বিধ্বস্ত ভবন, যেন নুয়ে পড়া বৃক্ষ! কাঠখড়ের মতো শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। দলের সর্বোচ্চ নেতা বেগম খালেদা জিয়ার আকস্মিক কারাদণ্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের মতো কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও যেন বিমর্ষ এবং বিধ্বস্ত!
খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিলেও শুক্রবার সকাল থেকে কার্যালয়ের সামনে এসে বিক্ষোভের কোন আলামত দেখা যায়নি। কার্যালয়ের মূল গেটে ছিল তালা। গেটের সামনে ছিল পুলিশ এবং গোয়েন্দাদের আড্ডা। ছিলেন সাংবাদিকরাও, পরিস্থিতি নিরুত্তাপ থাকায় যেন একটু আয়েশি ভঙ্গিতেই ছিলেন তারা।
এর আগে শুক্রবার বাদ জুমা সারাদেশে জেলায়-উপজেলায় এই বিক্ষোভের ঘোষণা দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাদ জুমা সারাদেশে জেলায়-উপজেলায় এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তখন তিনি বলেন: দেশনেত্রীর সঙ্গে রায়ের আগের দিন কথা হয়েছে। রায় হওয়ার পর শন্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদ থেকে বিএনপি চেয়ারপার্সনের মুক্তির দাবিতে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব থাকলেও পরে তিনি দ্রুত মিছিল ত্যাগ করেন। এরপর শান্তিপূর্ণ মিছিলটি নয়াপল্টনে এসে দুয়েকটি স্লোগান দিয়ে কাকরাইলের পথে গিয়ে শেষ হয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু নেতাকর্মী আশপাশের অলিগলিতে ঢুকে পড়লে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে তিনজনকে আটক করে। এটুকুতেই শুক্রবার বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচির শেষ দেখা যায়।
এর আগে সকাল থেকে কার্যালয়ের গেটের গার্ড ম্যানকে বললে ভেতরে প্রবেশ করার তালা খুলে দেয়। প্রবেশ করার পর পুনরায় বন্ধ। সকালে কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলের মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী। আগে সংবাদ সম্মেলনে রিজভীর পাশে বসার জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা ভিড় করলেও এখন আর তেমন কোন নেতার উপস্থিতি নেই। পাশে বসে ছিলেন বিএনপির সহ দপ্তর বেলাল হোসেন, নির্বাহী সদস্য আমিনুল ইসলাম, জাসাসের সদস্য শায়েলা।
তাদের চোখে মুখে হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, হারানোর সুর। রিজভীকে দেখেও বুঝা গেছে তিনি বিধ্বস্ত, বিমর্ষ, বেদনাহত। মনে হলো, চোখের কোণার জল এখনো শুকায়নি। গতকাল রায় ঘোষণার পরপর সংবাদ সম্মেলনে তিনি অজর ধারায় কেঁদেছেন মিডিয়ার সামনেই। আর অন্তরালে কত অশ্রু ফেলেছেন তা স্বয়ং তিনি জানেন আর তার শ্রষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনের পর চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে একান্ত আলাপে গত ২৮ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকা দলের মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী বলেন: আমি মর্মাহত, সংক্ষুব্ধ, বিমর্ষ! এটি মানা যায় না। এ রায় পুরোপুরি প্রতিহিংসার, প্রতিশোধের! আর কতো প্রতিশোধ নিতে হবে, আর কতো নির্যাতন করতে হবে?
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে যেদিন গ্রেপ্তার করা হয় সেদিন থেকে রিজভী আহমেদ নয়াপল্টন কার্যালয়ে অবরুদ্ধ বলে জানালেন। বলেন, নির্বাহী কমিটির সভার দিন একবার বের হই। এরপর ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে দ্রুত পুনরায় নয়াপল্টনে ফিরে আসি। সেই থেকে আছি।
তিনি বলেন: কার্যালয়ের ভেতরে এখনো পর্যন্ত পুলিশ প্রবেশ করেনি। তবে গেট দিয়ে বের হতে বা প্রবেশ করতে গিয়ে ঝামেলা করে।
আজকের বিক্ষোভ বা সামনে বিএনপির আন্দোলন হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমরা আন্দোলনেই আছি। এই যে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ আছি। এটাও তো আন্দোলনের অংশ। দীর্ঘদিন এখানে অবরুদ্ধ হয়ে আছি। আর গতকাল পুলিশি বাধা পেরিয়ে হাজার হাজার নেতাকর্মী ম্যাডামের গাড়িবহরে যেভাবে ছিলো তা আন্দোলনে অংশ।
রিজভী আশা করছেন, উচ্চতর আদালতে আপিল করে বেগম খালেদা জিয়ার জামিন পাওয়া যাবে। বলেন, এ অন্যায় রায়ের বিরুদ্ধে জামিন করা হবে। আশা করছি উচ্চতর আদালত জামিন দিবেন। আর যদি জামিন না হয় তার পরের পদক্ষেপ জানানো হবে।







