কারিগরি সহযোগিতার মধ্য দিয়ে নার্সিং সেবায় দক্ষতা বাড়াতে যৌথভাবে কাজ করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয় ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি-জাইকা।
বাংলাদেশের নার্সিং সেবা খাত নানা ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এ ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্য থেকেই ২০১৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ভ্রমন করেন এক জাপানিজ নার্সিং বিশেষজ্ঞ দল। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন ডা: হিরোকা মিনামি। বিশেষজ্ঞ দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাত করেন। সেই সাক্ষাতে দেশের নার্সিং সেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে যৌথভাবে একটি প্রকল্প পরিচালনায় সম্মত হয় জাপান ও বাংলাদেশ।
এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ও কাঠামোর মান উন্নয়নে নার্সদের ভূমিকা নিশ্চিত করা, নার্সদের নেতৃত্বের উন্নয়ন, নার্সিং শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করার লক্ষ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক খ্যাত সম্পন্ন সংগঠনটি। বিএসসি নার্সিং ডিগ্রীকে শক্তিশালী করতে প্রশানিক কাঠামো নিশ্চিতে নার্সদের ভবিষ্যৎ ভূমিকার জন্য তাদের লক্ষ্যের উন্নয়ন, বিএসসি নার্সিং শিক্ষার মান উন্নয়নে বর্তমান কাঠামোর পর্যবেক্ষন এবং নার্সিং পেশাকে মূল্যবান পেশা হিসেবে প্রসারেও কাজ করছে জাইকা।
একই সঙ্গে ঢাকা নার্সিং কলেজ ও অন্যান্য নার্সিং কলেজগুলোতে ফ্যাকাল্টির উন্নয়ন, শিক্ষক কর্মকর্তাদের সামর্থ্য বাড়ানো এবং সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে।
পাশাপাশি ঢাকা নার্সিং কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতির পরিমাপ করা, নার্সিং এর লক্ষ্য ও মূল্যবোধ বিশ্লেষন এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্ট-জাইকা।
নার্সিং। একটি মহৎ পেশা। এই পেশার কথা বললেই সবার আগে যে নামটি আসে তিনি ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তাকে লেডী উইথ দ্য ল্যাম্প বলা হয়। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের হাত ধরেই সেবিকা পদটি পেয়েছে অনন্য এক মাত্রা।
ফ্লোরেন্স ছাড়াও সেবিকা হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন ম্যারি সীকোল, এগনেস এলিজাবেথ জোন্স ও লিন্ডা রিচার্ড ম্যারি। সীকোল ক্রিমিয়ায় কাজ করেছেন, এগনেস এলিজাবেথ জোন্স ও লিন্ডা রিচার্ডস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে প্রতিষ্ঠা করেছেন মানসম্পন্ন নার্সিং বিদ্যালয়।
বিশ্বের ১ম দেশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পর্যায়ে নার্সদেরকে নিবন্ধিত শুরু করে। ১২ সেপ্টেম্বর, ১৯০১ সালে নার্সেস রেজিস্ট্রেশন এ্যাক্ট প্রণীত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অঙ্গরাজ্যরূপে নর্থ ক্যারোলিনায় নার্সিং লাইসেন্স ল ১৯০৩ সালে গৃহীত হয়। ১৯৯০-এর দশকে নার্সদেরকে ঔষধ দেয়া, ডায়াগনোস্টিক, প্যাথলজি পরীক্ষাসহ রোগীদেরকে প্রয়োজনে অন্য পেশাদারী স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের কাছে স্থানান্তরের অনুমতি দেয়া হয়।
এতো গেলো বিশ্বে নার্সদের অবস্থান ও অবদানের কথা। দেশেও নার্সিং পেশায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। এ পেশায় বর্তমানে যেমন রয়েছে সম্মান, তেমনি আছে সম্ভাবনাও। এখানেও ভালো বেতন ও অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি পদোন্নতির ব্যবস্থা আছে। রয়েছে দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নার্স থেকে সিনিয়র স্টাফ নার্স ও সুপারিনটেনডেন্ট, নার্সিং ট্রেইনিং কলেজের প্রশিক্ষক হওয়ার সুযোগ।
আশার কথা হলো নার্সিংয়ে স্নাতক, মাস্টার্স, পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রি করার সুযোগ সৃষ্টিতে আরো ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জানিয়েছে সরকার।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, সাধারণত সরকারি প্রতিষ্ঠানে নার্স নিয়োগ করে বাংলাদেশ সরকারের সেবা পরিদপ্তর। এই পরিদপ্তর বলছে, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ১০০ জনকে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে।
ডিপ্লোমা ইন নার্সিং অথবা ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন নার্সিং-বিএসসি কোর্স করতে হবে। দেশে বর্তমানে সরকারি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কলেজ আছে ৪৩টি, বেসরকারি কলেজ আছে প্রায় ৭০টি। এ ছাড়া সরকারি বিএসসি ইন নার্সিং কলেজ আছে নয়টি, বেসরকারি আছে ২১টি।
এজন্য এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৬ পয়েন্ট থাকতে হয়। বর্তমানে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সগুলো তিন বছরের ও বিএসসি কোর্সটি চার বছর মেয়াদি হয়ে থাকে। ধাপে ধাপে লিখিত, মৌখিক ও ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ভর্তির জন্য নির্বাচন করা হয়।
নার্স ও ধাত্রী হিসেবে চাকরি বা কাজের জন্য এখন থেকে নার্স ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। এ কাউন্সিল থেকে নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া কেউ নার্স বা ধাত্রী কাজে নিয়োজিত হলে তাঁকে জেল ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। এমন বিধান রেখে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন, ২০১৬ করছে সরকার।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন থেকে প্রকাশিত নার্স নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে, মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নার্স নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করছে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা বেকার নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন -বিডিবিএনএ এবং বাংলাদেশ বেসিক গ্র্যাজুয়েট নার্সেস সোসাইটি-বিবিজিএনএস।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জাপান। সেই ১৯৭৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের উন্নয়নে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেশটি। কখনো প্রত্যেক্ষ কখনো পরোক্ষভাবে এ দেশের উন্নয়নে পাশে রয়েছে জাপান। উন্নয়নের অংশীদারী দেশ হিসেবেও জাপানের ভূমিকার প্রশংসাই করতে হয়।
কারিগরি দক্ষতাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে তাই জাপানের সংযুক্তি দেখিয়েছে নতুন আশার আলো। তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষতা আর পরিশ্রমী মনোভাব বিশ্বজুড়েই পরিচিত এবং ব্যপ্ত।
স্বাস্থ্যসেবায় অনেকটায় অবহেলিত এই খাতটিতে তাই জাইকার সম্পৃক্ততা আরো বেশি আশাব্যঞ্জক। নার্সদের উন্নয়নে নেয়া এই উদ্যোগটির জন্য সত্যিই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য প্রতিষ্ঠানটি। আমরা এর সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








