২০১৬ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রার্থী কে হচ্ছেন? তা
মোটামুটি নিশ্চিত। সাবেক ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি
রডহ্যাম ক্লিনটন। যদি আদর্শ অবস্থা বজায় থাকে, অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের
বর্ধিষ্ণু জনপ্রিয়তা হিলারিকে থামাতে না পারে এবং তিনিই যদি হয়ে যান ‘সাদা বাড়ি’র উত্তরসূরি তাহলে কেমন হবে?
প্রেসিডেন্ট বা মন্ত্রীদের বাহুলগ্না হতে থাকা নারীদের জায়গা থেকে এখন দেশ শাসন করার ক্ষমতা হাতে নেয়া কোনো নারীকে যদি পান মার্কিনিরা, তাহলে কী প্রতিক্রিয়া পেতে পারেন হিলারি? মেয়েরা দেশ চালাতে পারেন না এরকম কথা শুনতে হবে? নাকি স্বামীর যৌনাচার নিয়ে কটাক্ষ শুনবেন হিলারি ক্লিনটন? সেটা সময়ই বলে দেবে। তাহলে কি প্রথম নারী প্রেসিডেন্টের জন্য প্রস্তুত আমেরিকা?
মিস্টার প্রেসিডেন্ট সম্বোধন তাহলে কি ম্যাডাম প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছে? তার আগে চলুন জেনে নেই, হিলারি কী বলছেন? হিলারি প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম প্রকাশের আগে জানিয়েছেন, মার্কিনিরা প্রতিদিনই একজন চ্যাম্পিয়ন চায়, সেই চ্যাম্পিয়ন হতে চাই আমি। ফেব্রুয়ারিতে ভোগ ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিনরা নারী প্রেসিডেন্ট চায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে হিলারি বলেছিলেন, এখনো নিউইয়র্ক শহরের মেয়র হতে পারেননি কোন নারী প্রার্থী, তাই ওভাল অফিসে নারীকে মেনে নেয়া হয়তো একটু কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।
২০০৮ সালে নিজের দলের প্রাইমারির কথা তুলে ধরে হিলারি বলেছিলেন, ২০০৮ আর ২০১৬’র মধ্যে তফাত অনেক বেশি। হিলারিকে নিয়ে রিপাবলিকানদের তুরুপের তাস হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারির কিছু ব্যর্থতা। ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার বেনগাজিতে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে হামলায় রাষ্ট্রদূতসহ ৪ কূটনীতিক নিহতের ঘটনাকে রিপাবলিকানরা নিজেদের প্রচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
এমনকি সিরিয়ায় হামলা কিংবা আইএস দমনে ব্যর্থতাকেও অনেকে হিলারির দায়ভার হিসেবেই দেখছেন। এছাড়া রয়েছে মিস্টার ক্লিনটনের নারী কেলেঙ্কারি। মনিকা লিউনিস্কি, পলা জোন্স, জেনিফার ফ্লাওয়ার্সসহ কয়েক নারীর সাথে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ক্লিনটনের সম্পর্ক ছিল বলে কথা ওঠে, অনেক সম্পর্কের কথা ক্লিনটন নিজের মুখে স্বীকারও করেছেন।
রিপাবলিকানরা মনে করে বিবাহ-বহির্ভূত যৌনতার ব্যাপারে মার্কিনিরা খুবই রক্ষণশীল। এটাও হিলারিকে না মেনে নেয়ার একটা কারণ হতে পারে। তবে স্বামীর কারণে স্ত্রীর এই ধরণের সমস্যা হওয়ার মতো এতটা অনুদার মার্কিনিদের ভাবা যায় না! আমেরিকান সমাজ ব্যবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্য এখনো বহুলাংশে বিদ্যমান। তা না হলে ট্রাম্পের মতো এক বৈষম্যবাদী মানুষকে কেন পছন্দ করবে মার্কিন ভোটাররা। ২২৭ বছর পর এই প্রথম মার্কিন নির্বাচনে নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলো। আর হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে বড় গণতন্ত্রের দেশ যুক্তরাষ্ট্র পাবে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট।
আমেরিকার পরে গণতন্ত্র আসা অনেক দেশে সেটা হয়েছে অনেক আগেই, খোদ ইংল্যান্ডেই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মার্গারেট থ্যাচার, ইসরায়েলে ছিলেন গোল্ডা মেয়ার, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী দুটোই পেয়েছে ভারত। বাংলাদেশতো দীর্ঘদিন ধরেই নারী সরকার প্রধানের আওতাধীন।
মার্কিন গণমাধ্যম নির্ভর সমাজ অবশ্য বলছে ভিন্ন কথা। সিএনএনের জরিপ নারী প্রেসিডেন্টের পক্ষে। ৮০ ভাগ আমেরিকান মনে করে তারা এখন নারী প্রেসিডেন্ট-এর শাসনামলে থাকতে চায়। এই ৮০ ভাগের মধ্যে যারা মত দিয়েছেন তাদের ৭৬ শতাংশ নারী আর ৮৩ শতাংশ পুরুষ। অর্থাৎ মোটামুটি পুরুষ শাসিত সমাজেও নারী নেতৃত্ব মেনে নিতে সমস্যা নেই মার্কিন পুরুষদের।
হাফিংটন পোস্টের এক জরিপেও দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করে, পরবর্তী দশকে তারা একজন নারী প্রেসিডেন্ট পাচ্ছে। যারা হিলারির বিপক্ষে তাদের মতামতের যুক্তি আছে। হিলারি নিজেই বলেছেন, আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন চায়। তবে হিলারি যেটা বাদ দিয়ে গেলেন তা হলো আমেরিকা নতুন চ্যাম্পিয়ন চায়। এই কারণেই ক্ষমতায় এসেছিলেন বারাক ওবামা। দীর্ঘদিন ধরে হোয়াইট হাউসে বসবাস, সিনেটর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এরকম নানা সরকারি পদে থাকায় অনেক মার্কিনি হিলারির বিপক্ষে যেতে চান। এর বড় একটা অংশ তরুণী।
হিলারি প্রথম থেকেই তরুণ সমাজকে তেমন একটা আকৃষ্ট করতে পারছেন না। যেখানে ট্রাম্পকে অনেকেই সমর্থন দিচ্ছেন। তার মধ্যে নারীরাই যদি থাকে বিপক্ষে! ওভাল অফিসের যে ডেস্ক রাণী ভিক্টোরিয়ার দেয়া, সেখানে তো একজন নারীর অধিকারই সবার আগে। তবুও অনেকে এটা হয়তো পছন্দ করবেন না। এরপরও বিশোর্ধ্ব অনেক নারী আবার হিলারির ক্যাম্পেইনে অংশ নিচ্ছেন, ডোনেটও করছেন। 
এদের মধ্যে বেশিরভাগ হিস্পানিক কিংবা অভিবাসী কিংবা অশ্বেতাঙ্গ। দেখা যাক এরা হিলারিকে প্রেসিডেন্টের আসনে বসাতে পারে কিনা। শুধু নারী হিসেবেই নয়, হিলারির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও তার সমর্থকদের আশা জাগাচ্ছে। তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর আসনে নারীকেই কি শেষ পর্যন্ত দেখতে যাচ্ছি? তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হলেন ফার্স্ট লেডি, তবে মিস্টার ক্লিনটন কি হতে যাচ্ছেন প্রথম ফার্স্ট জেন্টলম্যান অথবা অন্য কোন নতুন সম্বোধন কি তৈরি হবে তার জন্য? উত্তর দেবে সময়।
একসময় নারীরা পড়াশোনা করতে গেলে কিংবা রাজনীতিবিদ হলে তা সংবাদ হতো। দিন পরিবর্তন হয়েছে কিছুটা, এখন আর ওগুলো সংবাদ নয়। তাহলে আশা করা যায়, কোন একদিন আলাদা করে আমাদের আর লিখতে হবে না, মার্কিনিদের নতুন প্রেসিডেন্ট হতে পারেন কোন এক নারী। এমন এক সময় আসবে যখন আর এগুলো সংবাদ হবে না, খুব স্বাভাবিক হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








