বিশ্বায়নের এ যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের এই অগ্রযাত্রার পথচলাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে কর্মদক্ষ নারী এবং পুরুষদের। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এখানে যে বিষয়টি বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় তা হলো, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের নারীরা নানা ধরনের সামাজিক , পারিবারিক ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
তবে সাম্প্রতিক কালে দেখা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হলেই স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি রাজাকার-আলবদরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় মৌলবাদী সংগঠন ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের উপর আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিতে শুরু করে। এর মাধ্যমে তারা তথাকথিত ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
তারা নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করাসহ নানা বিষয়ে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে। আর তাদেরকে সমাজের এক শ্রেনীর মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সমর্থন করতে থাকে। এসব কারণে দেশের নারীদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে ধর্মের পাশাপাশি সারা বিশ্বের নারীদের অধিকার-কর্তব্যসহ সামগ্রিক বিষয়াদি জানা খুবই প্রয়োজন ।
ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে মৌলবাদীরা নারীর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে, সেই ধর্মেই স্বয়ং স্রষ্টা এবং মহানবী (সা.) নারীকে দিয়েছেন সর্বোত্তম মর্যাদা এবং অধিকার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের পূর্বে জাহেলিয়াতের যুগে নারীর অধিকার বলে কিছু ছিল না। সেসময় নারীর অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। নারীকে মানুষ বলে গণ্য করা হত না। কেবলমাত্র ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অবস্থাটা এমন ছিল যে, কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করলেই তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। এই যখন নারীর অবস্থা, তখন বিশ্বমানবতার মুক্তির আলোর দিশারী পবিত্র কোরআনে ঘোষণা দেয়, ‘নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো’ (সুরা নিসা : ১৯)। এই জাহিলিয়াতের যুগেই নবীজীর মতো একজন মহামানবের আবির্ভাব ঘটে। সেসময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, ‘নারীগণ পুরুষদেরই সহোদরা।’ (আহমদ, আবু দাউদ)
এভাবে ইসলাম সর্বপ্রথম নারীদেরকে সমাজে স্বাধীন, সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার প্রদান করে। এমনকি সূরা নিসা নামে পবিত্র কুরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয় নারীর যাবতীয় অধিকারের বার্তা নিয়ে।
মূলত সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীর মর্যাদা কেমন তা আরো উপলব্ধি করা যায় নবীজীর বিদায় হজের ভাষণের মধ্য দিয়ে। বিদায় হজে মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে মানুষ! নারীদের সম্পর্কে আমি তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করো না। তাদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও তাদের সমান অধিকার রয়েছে। সুতরাং তাদের কল্যাণের দিকে সব সময় খেয়াল রাখো।’ বিদায় হজের বাণী থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে নবীজী (সা.) নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তিনি পুরুষকে নারীর চেয়ে বেশি নয় বরং উভয়কেই অধিকারের দিক হতে সমান মর্যাদা ও অধিকারের আসনে বসিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে সৃষ্টিকর্তা নারী বা পুরুষ হিসাবে মানুষের অধিকার বা মযার্দাকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। তার কাছে মর্যাদার দিক থেকে নারী-পুরুষ বলে আলাদা কিছু নেই; পুরুষের বেশি মর্যাদা আর নারীর কম মর্যাদা এমন নয়। বরং মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদার অধিকার রাখে। সূরা আল ইমরানের ১৯৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা পুরুষ হও বা নারী হও, আমি তোমাদের কারো আমল নষ্ট করবো না। তোমরা সবাই সমজাতের লোক।’
হযরত মোহম্মদ (সা.) এর জীবদ্দশায় থেকেই ইসলাম বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে। এতে করে এ ধর্মের সাথে সংযোজিত হতে থেকে নানা ধরনের সংস্কৃতি এবং কৃষ্টি।
সহজে করে বলা যায় নানা দেশ ভেদে নানা আচার বিধি ইসলামে রয়েছে বহুদেশ জুড়ে এবং বহু সংস্কৃতি নিয়ে। আরবের এক প্রান্ত থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত, বসনিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বহু লোক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। এমনকি ইসলাম ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রসার লাভ করেছে দ্রুতগতিতে। প্রত্যেক ইসলামী রাষ্ট্রের নিজস্ব কৃষ্টি বা সংস্কৃতি রয়েছে। ইসলামে রয়েছে বহুমুখী সংস্কৃতি। কেননা কারোরই একার পক্ষে কখনই সফলভাবে একই সংস্কৃতি বহন করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক ধারা, জাতীয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস করার পদ্ধতি, ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহ্য এবং চিন্তাধারার ভিন্নতা দেশগতভাবে এক হওয়া সম্ভব নয়। সে দিক হতে ইসলামী আইন-কানুন, রীতি-নীতি প্রত্যেক দেশের নিজস্ব ধারা অনুযায়ী পালিত হয়। আর প্রত্যেক দেশেই একটি অন্যটি থেকে আলাদা। কখনও উভয়ের সংস্কৃতি বা কৃষ্টি এক নয়।
অন্যদিকে সৃষ্টিকর্তা মানব রূপে পৃথিবীতে প্রেরন করেছেন নর-নারীকে। কিন্তু পুরুষ শাসিত সমাজে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই লিঙ্গগত বৈষম্য দিয়ে নারীদের অবস্থানকে করে রেখেছে কোনঠাসা। ধারণা করা হয় নারী হল পর্দার ভিতরে লুকায়িত, স্বরবিহীন, নীরবতার প্রতীক এবং অধিকার বঞ্চিত। নারীদের জন্ম হয়েছে কেবল সংসার ধর্ম পালন, সন্তান জন্মদানের জন্যই। এ চিত্র সকলের কাছেই অতি পরিচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশে অতি দুঃখজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে নারীদের সঙ্গে বৈষম্যমুলক আচরনের মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায়, নারীরা সেখানে সর্বদাই অবদমনের শিকার এবং কালো বোরকা দ্বারা আবৃত যা শুধু লজ্জাজনকই নয় বরং তা ইসলামের বিশালতাকে খাটো করার সামিল।
কিন্তু ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকে দেখা যায় যে নারীরা সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও সকল ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নিজেদের ভূমিকা রেখেছেন স্বীয় শক্তি ও সাহস দিয়ে। তাই ইসলামে নারীর ভূমিকা সম্বন্ধে জানতে চাইলে প্রথমেই ইসলাম সর্ম্পকে স্বচ্ছ ধারণা নিতে হবে। জানতে হবে ইসলামে নারীদের জন্য কিভাবে আইনের বিধান করেছে। সর্বোপরি মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যেভাবে ষড়যন্ত্রমূলক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে তা থেকে দূরে থাকতে হবে। যখন কেউ ধর্মকে রূপক বা স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অপপ্রচার করে তখন সে মিথ্যায় পরিনত হয়।
সকল ধর্মই মানবতার অধিকার নিয়েই প্রতিষ্ঠিত। কোন ধর্মেই নারীদের কঠোর অনুশাসনের বেড়াজালের বন্ধনে আবদ্ধ করার কথা বলা হয় নাই। মানুষ হিসাবে পুরুষ নারী উভয়েই স্বাধীন। এবং উভয়কেই কোন নিন্দাপূর্ণ কাজে যেন নিজেদেরকে না জড়ায় সে বিষয়ে সচেতন হতে বলা হয়েছে।
শুধু মুসলমান নারীগণই নয় এই আধুনিক যুগে সকল ধর্মের নারীগণ সবর্ত্রই বর্বরতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নানাভাবে। নারীদেরকে সর্বদাই বলা হয় তারা পুরুষের সমকক্ষ নয়। বরং সমাজের অনুশাসন দিয়ে তাদের ব্যক্তিত্বহীন, বুদ্ধিহীন বিবেচিত করে। সেই সাথে ধর্মের অপব্যাখা দিয়ে কোনঠাসা করে প্রতিনিয়ত ।
কিন্তু বর্তমানে নারীরা তাদের কর্ম ও সাধনা দ্বারা নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে সকল ক্ষেত্রে। প্রমান করেছে যে নারীরা সেই ইসলামের প্রথমকাল থেকেই আজ অব্দি তাদের যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছেন লড়াই করে। যদিও তার প্রকাশ খুবই কম। তাই বর্তমান সমাজে নারীদের নারী নয় বরং মানুষ হিসাবে মেধা ও মননের বিকাশের দ্বারা জানতে বুঝতে হবে। সেই সাথে তাদেরকে সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাজ-দেশ-জাতি ও পৃথিবী গড়তে সম্পৃক্ত করা উচিৎ।
এ প্রেক্ষাপটে বলা যায় ইসলাম যেখানে নারীদের অধিকার দায়িত্ব এবং জীবনধারন পদ্ধতিকে একজন মানুষ হিসাবে নির্ধারিত করে দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের অবদমিত করার অপচেষ্টা দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
সুতরাং অধিকাংশ মুসলমান জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের নারীরা তাদের মেধা মনন কর্ম আর সাহসিকতা দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যে সৃদৃঢ় অবস্থান সৃষ্টি করেছে তা ধর্মান্ধতার কাছে কোনদিনই নত হবে না এটাই চিরসত্য।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








