একজন কবি আমাকে প্রশ্ন করলেন, বলেনতো দেশে হঠাৎ শিশু হত্যা এবং নারী নির্যাতন বেড়ে গেছে কেন? আমি বললাম, আমিতো মনে করি এসব ঘটনা আগের মতোই আছে। আগে হয়তো মিডিয়া ছিল না- তাই প্রকাশ হয়নি এভাবে। এখন মিডিয়ার কল্যাণে মুহূর্তে জেনে যাচ্ছি আমরা। আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। তিনি আমার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তার মতে, মিডিয়ায় আসছে এটা সত্য কিন্তু দেশে শিশু হত্যাও বেড়েছে, নারী নির্যাতনও আমার কাছে আগের মাত্রায় মনে হচ্ছে না। মনে হয় বেড়েছে।
আমি গভীরভাবে চিন্তা করলাম গত দুই দিন। আসলে তার কথাই সত্য। আগে মিডিয়া ছিল না কিন্তু চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনাবলি দেশবাসীর অজানা ছিল না। এখন ফেইসবুক, ইউটিউবে মুহূর্তে মানুষ নির্যাতনের খরব জানছে, দেখছে- অতীতেও কিন্তু একেবারে অজানা ছিল না।
আমাদের ছোটকালে এক ডাক্তার তার সুন্দরী স্ত্রী সালেহাকে হত্যা করেছিলেন।কবিতার বইতে সুরে সুরে আমরা পড়েছি সেটা। ছন্দে ছন্দে মিলিয়ে বের হতো সেসব কবিতা। হকারের হাতে হাতে ঘুরতো।
শহীদ সাংবাদিকের কন্যা রীমাকে খুকু নামের এক মহিলার প্রেমে পড়ে তার স্বামী মুনির হত্যা করেন ঢাকার মিজিমিজি এলাকায়। সেই কাহিনীও কবিতার বইতে, সংবাদপত্রে এসেছে দিনের পর দিন। ফলে মিডিয়ার কারণে হত্যা নির্যাতন বেশি মনে হওয়াটা আসলে আমরই ভুল ধারণা। সত্যিকার অর্থে শুধু বাংলাদেশে নয়, পরিসংখ্যানে দেখছি সারা বিশ্বে এখন হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন বেড়ে চলছে।
সারা বিশ্বের কারণ যাই হোক, বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলতে গেলে, দৃশত মনে হচ্ছে সাম্প্রতিকালে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেশ অবনতি হয়েছে। বন্ধু বন্ধুকে মেরে ফেলছে। মালিক কর্মচারি মেরে ফেলছে। চুরির দায়ে কিশোরদের পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সে হত্যার ফুটেজ আবার ইউটিউবে ছাড়ছে হত্যাকারীরাই। মায়ের পেটের সন্তানকে গুলি করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক পার্টনার তার পার্টনারকে হত্যা করছে। প্রেমিক প্রেমিকাকে হত্যা করছে। প্রেমের ছলনা করে কিশোরীকে গণধর্ষণ করা হচ্ছে। স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, এমনকি গণধর্ষণ করাচ্ছে।
রাজনীতির নামে সরকার দলীয় লোকেরা নিজদলের প্রতিপক্ষকে হত্যা করছে, জাতীয় শোকের কর্মসূচিতেও তারা নিজেদের কর্মীকে খুন করে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগ এইসব অপকর্মে শীর্ষে আছে।
সর্বোপরি দেশব্যাপী শিশু নির্যাতনের এবং নারী ধর্ষনের একটা প্রবণতা মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে।এইসব অপরাধ এমন পরিসরে হচ্ছে যে রাষ্ট্রের দায় থাকলেও রাষ্ট্রকে পুরোপুরি অভিযুক্ত করা যাচ্ছে না। কারণ অপরাধগুলো এমন পরিসরে হচ্ছে যে সেখানে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ কখনো কোনোকালেই ছিল না। সম্ভবও নয়। রাষ্ট্র কখনো স্বামী-স্ত্রীকে পাহারা দিতে পারে না, মালিক-চাকরকে পাহারা দিতে পারে না। প্রেমিক-প্রেমিকাকে পাহারা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়। রাষ্ট্র ব্যবসায়িক অংশীদারকে পাহারা দিতে পারে না। কোনও রাজনৈতিক কর্মিকে তার দলের কর্মি হত্যা করলে বা অন্য দলের কর্মি এসে গভীর রাতে ডেকে নিয়ে মেরে ফেললে রাষ্ট্রের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। অথচ রাষ্ট্রের পক্ষে এসব দায়িত্ব এড়ানো সম্ভবও হচ্ছে না। পূর্বে সমাজে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল। বয়স্ক এবং সম্ভ্রান্ত লোকেরা সেখানে থেকে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করতো। সে ব্যবস্থাও এখন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে।
বর্তমানে সমাজের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হওয়ায়, ‘এখন সমাজ আমি, সমাজ তুমি, যার কাছে টাকা আছে সে-ই সমাজপতি।’ পূর্বে আলেমদের একটা প্রতিপত্তি ছিল সমাজের উপর। এখন তাদের কাছে সমাধান চাইতে গেলেও তারা দোররা মেরে আধা মরা করে দেয়। চুল কেটে দেয়। আবার কিছু সংখ্যক আলেম আছেন- মানুষ মেরে নেজামে ইসলাম বা ইসলামী রাজত্ব কায়েমের তালে। অথচ রসুলাল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “খেলাফতের মেয়াদ ত্রিশ বছর।” প্রথম খলিফা হযরত আবু বক্কর (রাঃ)-এর শপথ গ্রহণের দিন থেকে হযরত হাসান (রাঃ) যেদিন হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষে নিজের খেলাফতের দাবী পরিত্যাগ করেন, সেদিনই খেলাফতের ৩০ বছর পূর্ণ হয়।
ইসলামের ইতিহাসে মুয়াবিয়ার শাসনকালকে আমিরাত হিসেবেই দেখা হয়। বাংলাদেশে সমাজের অবস্থা এখন এমন জটিল হয়েছে যে, সমাজতত্ত্বের জনক ইবনে খলদুনকে জিজ্ঞেস করা হলেও তিনি সমাধান দিতে পারতেন কিনা কে জানে। সমাজ নিয়ে হতাশ হলেতো আর চলবে না। সমস্যা আছে, সমাধানের পথও খুঁজে বের করতে হবে। আইনের প্রয়োগ কঠোর না হলে আইন তার কার্যকারিতা হারায়। সুতরাং আজকের এই বিশৃঙ্খল সমাজে, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
মধ্যযুগে ফিরোজ শাহ তুঘলক যখন ভারতের সম্রাট তখন সাম্রাজ্যে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। ওজনে কম দেওয়ার এক প্রবণতা সারা সাম্রাজ্যে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিল। তখন তিনি বাজার মনিটরিং করার জন্য মনিটর নিয়োগ করলেন। মালপত্র বেচা কেনার সময় ওজনে হেরফের করলে যে পরিমাণ মাল কম দেওয়া হতো মহাজনের শরীর থেকে সেই পরিমাণ মাংস কেটে নেওয়ার রাজকীয় হুকুম কার্যকর করা হতো। তিন মাসের মধ্যে সমগ্র সাম্রাজ্য থেকে এই ব্যাধি যে দূরিভূত হয় তা নয় শুধু, বাকি অনেক ত্রুটি থেকেও সমাজ পরিত্রাণ পেয়েছিল।
এখনতো আর রাজকীয় ফরমান জারি করে কারো মাংস কেটে নেওয়া যাবে না। তবে দেশে অপরাধ দমনে যে সমস্ত আইন প্রচলিত আছে তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করলে সমাজ সঠিক পথে ফিরে আসবে। গত তিন দশক ধরে সমাজের এই ত্রুটি ক্রমেই বেড়ে চলছে। এতে রাজনীতিবিদরা তাদের দায়িত্বও এড়াতে পারেন না। কারণ দলীয় কর্মিদেরকে রাজনীতির কাজে ব্যস্ত রাখার সংস্কৃতি-ই দলগুলো ভুলে গেছে। পুর্বে কোনও রাজনৈতিক দল একটা জনসভা ঘোষণা করলে ১৫ দিন ধরে জনসভা সম্পর্কে মাইকিং হতো, রাজনৈতিক কর্মিরা পোস্টারিং করতো, জনসভার আগে মোড়ে মোড়ে পথসভা করতো- তাতে করে বহু রাজনৈতিক কর্মী নিজেদেরকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতো। কর্মিদের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হতো। রাজনৈতিক চেতনা বাড়তো এবং রাজনীতি যে একটি ত্যাগের বিষয় সে ধারণা জাগ্রত হতো।
এই প্রক্রিয়ায় তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলিও ধীরে ধীরে বিকাশ হতো।এখন সেসব কর্মসূচি আর কিছুই নেই। জনসভার দু’দিন আগে ঘোষণা হয় জনসভা হবে। ২/৩ কোটি টাকা খরচ করে ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে উদ্যোক্তরা মিটিং করেন। “সফল জনসভায়” বক্তৃতা করে নেতারা ঘরে ফিরে যান টিভি কাভারেজ দেখতে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবর্জিত রাজনীতি কর্মিদেরকে প্রচুর অবকাশ দিচ্ছে, যে কারণে তারা এখন চাঁদাবাজি, রাহাজানি, মারামারি, খুন, গুম আর দলীয় অন্তকলহে লিপ্ত থাকে। যে করেই হোত রাতারাতি বড় লোক হয়ে যেতে চাচ্ছে তারা সবাই। পোস্টারে ব্যানারে ঢেকে যাচ্ছে অলি গলি। সেখানে হাসিনা-খালেদার চেয়ে তাদের চেহারাই বড়।
মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কারও দুষ্কর্মের দায় ভাগ উনি নেবেন না। কিন্তু বললেইতো আর দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। কারণ তার নেতৃত্বেই সরকার চলে। তার নেতৃত্বে দল চলে। সুতরাং দল ও সরকারের অপকর্মে তিনি সম্পৃক্ত না হলেও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। আর যেহেতু তিনি দায়িত্ব এড়াতে পারেন না সে কারণে দল ও সরকারের মধ্যে যারা অপকর্মে লিপ্ত আছেন তাদের বিরুদ্ধে তাকে কঠোর হওয়া দরকার।
তার এই কঠোর মূর্তি জনগণ হাসিমুখে মেনে নিতে দ্বিধা করবে না। অতি সম্প্রতি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা কর্মীকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে। লক্ষ্যনীয় যে এই ঘটনায় তাদের স্ব স্ব পরিবার দু:খিত হয়েছে সত্য দেশবাসী দু:খিত হয়নি। বরং সিংহভাগ মানুষ কামনা করে সরকার বিচার বহির্ভূতভাবে হলেও এইসব অপকর্মের হোতাদের দমন করুক।
দল নির্বিশেষে সন্ত্রাসী, অপরাধীদের ব্যাপারে সরকার যদি কঠোর না হয়, সরকারের যত অর্জন, শেখ হাসিনার যত পরিশ্রম সবই নর্দমায় যাবে। শেখ হাসিনাকে ভাবতে হবে উনার বাবার সঙ্গে যারা রাজনীতি করতেন, তারা কেউ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের দায় দায়িত্ব নেননি বরং লাইন ধরে মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ নিয়েছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলের দায়ও শুধু শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে, তার দল, তার মন্ত্রিসভার কেউ নেবে না।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







